স্ত্রী একা থাকতে চাইলে স্বামীর উপর ওয়াজিব একা রাখা সেই ক্ষেত্রে বাবা-মা নিষেধ মানা যাবে না। এখন আমার প্রশ্ন যে, তাহলে একা থাকলে বৃদ্ধ বাবা-মার খোজ খবর রাখা খুব কঠিন চোখের সামনে থাকে না। সেই ক্ষেত্রে খেদমতে ত্রুটি হয়েই থাকে। এমতাবস্থায় কি করনীয়?

ইসলামে স্ত্রী ও বাবা-মা—উভয়েরই হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন স্বামীর জন্য যেমন স্ত্রীর নিরাপত্তা, স্বস্তি ও বৈবাহিক অধিকার নিশ্চিত করা ওয়াজিব, তেমনি বাবা-মায়ের খেদমত, সম্মান ও দেখাশোনাও বড় দায়িত্ব। তাই এ বিষয়টি “একজনকে রেখে আরেকজনকে বেছে নেওয়া” নয়; বরং ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে নেওয়ার বিষয়।

যদি স্ত্রী যৌক্তিক কারণে আলাদা থাকতে চায়—যেমন গোপনীয়তার অভাব, ঝগড়া-বিবাদ, মানসিক কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি—তাহলে সামর্থ্য থাকলে স্বামীর জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা শরীয়তসম্মত। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল।

এমতাবস্থায় করণীয় হতে পারে—

  1. বাবা-মায়ের খেদমতের নির্দিষ্ট রুটিন করা প্রতিদিন বা নিয়মিত সময় নির্ধারণ করে তাদের কাছে যাওয়া, খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজন পূরণ করা।
  2. বাসস্থান কাছাকাছি রাখা সম্ভব হলে আলাদা বাসা এমন জায়গায় নেওয়া, যেখান থেকে বাবা-মায়ের কাছে দ্রুত যাওয়া যায়।
  3. আর্থিক ও শারীরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা ওষুধ, খাবার, চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় কাজে সহযোগিতা করা। প্রয়োজনে একজন সহকারী বা আত্মীয়ের সহায়তা নেওয়া।
  4. স্ত্রীকে বিষয়টি বুঝানো কোমলভাবে বোঝানো যে বাবা-মায়ের খেদমত ইসলামি দায়িত্ব। একজন দ্বীনদার স্ত্রী সাধারণত এ দায়িত্বে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন।
  5. সময় ভাগ করে নেওয়া কিছু সময় স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য, কিছু সময় বাবা-মায়ের জন্য নির্ধারণ করা। এতে উভয় পক্ষই অবহেলিত বোধ করবে না।
  6. দোয়া ও উত্তম আচরণ বজায় রাখা অনেক সমস্যা কঠোর কথার কারণে বাড়ে। নরম ব্যবহার, ধৈর্য ও দোয়া পরিবারে শান্তি আনে।

ইসলামে বাবা-মায়ের খেদমতের ফযীলত অত্যন্ত বড়।সহিহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতামাতার সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কিত। আবার স্ত্রীর হক আদায় না করাও গুনাহের কারণ হতে পারে। তাই একজন মুমিনের চেষ্টা হবে—যতটা সম্ভব উভয় হক আদায়ে ভারসাম্য রক্ষা করা।

অনেক সময় বাস্তব সমাধান হয়: “আলাদা বাসা, নিয়মিত খেদমত এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ”। এতে স্ত্রীর অধিকারও রক্ষা হয়, আবার বাবা-মাও অবহেলিত হন না।

বিশেষত:

  • বার্ধক্যে সেবা
  • চিকিৎসা
  • ভরণ-পোষণ
  • মানসিক সহায়তা

এগুলো সন্তানের দায়িত্ব।

যেমন:

  • আলাদা ঘরের ব্যবস্থা
  • নিরাপত্তা
  • ভরণ-পোষণ
  • স্বামীর সময় ও ভালো আচরণ

অনেক সময় মা-বাবা চান ছেলে সবসময় তাদের কাছেই থাকুক, কিন্তু যদি একই বাসায় থাকার কারণে স্ত্রী নির্যাতিত, অপমানিত বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়, তাহলে স্বামীর দায়িত্ব হবে ন্যায়বিচার করা এবং প্রয়োজন হলে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে নিজের ইবাদতের পরই মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহারের কথা বলেছেন:

“তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।”— সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩

বিশেষত বৃদ্ধ বয়সে তাদের কষ্ট দেওয়া, অবহেলা করা বা রূঢ় আচরণ করা বড় গুনাহ।

তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহ’লে তুমি তাদের প্রতি উহ্ শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তুমি তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বল’।

তুমি শোকর আদায় কর আমার এবং তোমার পিতা-মাতার। আমারই কাছে (তোমাদেরকে) ফিরে আসতে হবে। -সূরা লুকমান (৩১) : ১৪

আর যদি পিতা-মাতা তোমাকে চাপ দেয় আমার সাথে কাউকে শরীক করার জন্য, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহ’লে তুমি তাদের কথা মানবে না। তবে পার্থিব জীবনে তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে চলবে’ (লোকমান ৩১/১৫)লোকমান ৩১/১৫

আল্লাহ বলেন,

আর আমরা মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে। অতএব তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রেখ, তোমার) প্রত্যাবর্তনস্থল আমার কাছেই’

—সূরা লোকমান ৩১/১৪)।

আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য। তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করেছে কষ্টের সাথে। তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধ পান ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস’

—আহক্বাফ ৪৬/১৫)।

এর দ্বারা বুঝা যায় যে, গর্ভ ধারণের সর্বনিম্ন মেয়াদ ছয় মাস (কুরতুবী)। কেননা বাচ্চাকে দু’বছর যাবৎ বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে মায়েদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন

‘জন্মদানকারিনী মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, যদি তারা দুধপানের মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়’ (বাক্বারাহ ২/২৩৩)বাক্বারাহ ২/২৩৩

মানুষ তার পিতা-মাতার মাধ্যমেই দুনিয়াতে এসেছে। অতএব তারাই সর্বাধিক সদাচরণ পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ বলেন,

‘নিশ্চয়ই মানুষের উপর যুগের এমন একটি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না’। ‘আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি (পিতা-মাতার) মিশ্রিত শুক্রবিন্দু হ’তে, তাকে পরীক্ষা করার জন্য। অতঃপর আমরা তাকে করেছি শ্রবণশক্তিসম্পন্ন ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন’ (দাহর ৭৬/১-২)দাহর ৭৬/১-২

জাহেমাহ আস-সুলামী (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে এলাম জিহাদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পরামর্শ করার জন্য। তিনি আমাকে বললেন, তোমার কি পিতা-মাতা আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন,‘তুমি তাদের নিকটে থাক। কেননা জান্নাত রয়েছে তাদের পায়ের নীচে’।

—ত্বাবারাণী কাবীর হা/২২০২; ছহীহ আত-তারগীব হা/২০৮৫।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, জাহেমাহ আস-সুলামী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ডান দিক থেকে ও বাম দিক থেকে দু’বার এসে বলেন, আমি আপনার সাথে জিহাদে যেতে চাই এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাত কামনা করি। জবাবে রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমার মা কি বেঁচে আছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ارْجِعْ فَبَرَّهَا ‘ফিরে যাও। তার সাথে সদাচরণ কর’। অবশেষে তৃতীয় বার সম্মুখ থেকে এসে একই আবেদন করেন। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন তোমার মা কি জীবিত আছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন,وَيْحَكَ الْزَمْ رِجْلَهَا فَثَمَّ الْجَنَّةُ ‘তোমার ধ্বংস হৌক! তার পায়ের কাছে থাক। সেখানেই জান্নাত’

—ইবনু মাজাহ হা/২৭৮১)

আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর (রাঃ) বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে এসে বলল, আমি আপনার নিকটে হিজরত ও জিহাদের উপরে বায়‘আত করতে চাই। যার দ্বারা আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাত কামনা করি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, তোমার পিতা-মাতার কেউ জীবিত আছেন কি? লোকটি বলল, হ্যাঁ। বরং দু’জনেই বেঁচে আছেন। আমি তাদের উভয়কে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, এরপরেও তুমি আল্লাহর নিকট পুরস্কার আশা কর? লোকটি বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন,فَارْجِعْ إِلَى وَالِدَيْكَ فَأَحْسِنْ صُحْبَتَهُمَا فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ ‘তুমি তোমার পিতা-মাতার নিকট ফিরে যাও ও সর্বোত্তম সাহচর্য দান কর এবং তাদের কাছেই জিহাদ কর’ 

—মুসলিম হা/২৫৪৯ (৫-৬)

তিনি আরও বলেন

‘তুমি তাদেরকে হাসাও, যেমন তুমি তাদেরকে কাঁদিয়েছ। অতঃপর তিনি তার বায়‘আত নিতে অস্বীকার করলেন’।

—আহমাদ হা/৬৮৩৩; আবুদাঊদ হা/২৫২৮।

এর দ্বারা বুঝা যায় যে, পিতা-মাতার সেবা কখনো কখনো জিহাদের চেয়ে উত্তম হয়ে থাকে। জমহূর বিদ্বানগণের নিকটে সন্তানের উপর জিহাদে যাওয়া হারাম হবে, যদি তাদের মুসলিম পিতা-মাতা উভয়ে কিংবা কোন একজন জিহাদে যেতে নিষেধ করেন। কেননা তাদের সেবা করা সন্তানের জন্য ‘ফরযে ‘আয়েন’। পক্ষান্তরে জিহাদ করা তার জন্য ‘ফরযে কিফায়াহ’। যা সে না করলেও অন্য কেউ করবে ইসলামী রাষ্ট্রের আমীরের হুকুমে।

আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেন, ওয়াক্ত মোতাবেক ছালাত আদায় করা। আমি বললাম, তারপর কি? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সেবা করা। বললাম, তারপর কি? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা’।

—বুখারী হা/৫২৭; মুসলিম হা/৮৫; মিশকাত হা/৫৬৮।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা’।

—তিরমিযী হা/১৭০; মিশকাত হা/৬০৭।

এর দ্বারা বুঝা যায় যে, পিতা-মাতার সেবা করার স্থান জিহাদে গমন করার উপরে।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন, তার নাক ধূলি ধূসরিত হৌক (৩ বার)। বলা হ’ল, তিনি কে হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে কিংবা একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল, অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না’।

—মুসলিম হা/২৫৫১;

জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বরে আরোহণ করলেন। অতঃপর ১ম সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন। ২য় সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন। এরপর ৩য় সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে তিন সিঁড়িতে তিন বার আমীন বলতে শুনলাম। তিনি বললেন, আমি যখন ১ম সিঁড়িতে উঠলাম, তখন জিব্রীল আমাকে এসে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যে ব্যক্তি রামাযান মাস পেল। অতঃপর মাস শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হ’ল না। পরে সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। তুমি বল, আমীন। তখন আমি বললাম, আমীন’। ২য় সিঁড়িতে উঠলে জিব্রীল বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বা তাদের একজনকে পেল। অতঃপর সে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করলো না। ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। তুমি বল, আমীন। তখন আমি বললাম, আমীন’। অতঃপর ৩য় সিঁড়িতে পা দিলে তিনি বললেন, যার নিকটে তোমার কথা বর্ণনা করা হ’ল, অথচ সে তোমার উপরে দরূদ পাঠ করলো না। অতঃপর মারা গেল ও জাহান্নামে প্রবেশ করলো। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। তুমি বল, আমীন। তখন আমি বললাম, আমীন’।

—ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪০৯, ছহীহ লেগায়রিহী; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৬৪৬, হাদীছ হাসান ছহীহ।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সেবা পাওয়ার সর্বাধিক হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা। অতঃপর তোমার রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়গণ যে যত নিকটবর্তী’।

—বুখারী হা/৫৯৭১; মুসলিম হা/২৫৪৮; মিশকাত হা/৪৯১১।

অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন,

তুমি তোমার মায়ের সেবা কর। فَإِنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلَيْهَا ‘কেননা জান্নাত তার দু’পায়ের নীচে’ 

—নাসাঈ হা/৩১০৪)

আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

‘পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার ক্রোধে আল্লাহর ক্রোধ’।

—তিরমিযী হা/১৮৯৯; মিশকাত হা/৪৯২৭; ছহীহাহ হা/৫১৬।

আবুদ্দারদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি শামে তার নিকটে এসে বলল, আমার মা, অন্য বর্ণনায় আমার পিতা বা মাতা (রাবীর সন্দেহ) আমাকে বারবার তাকীদ দিয়ে বিয়ে করালেন। এখন তিনি আমাকে আমার স্ত্রীকে তালাক দানের নির্দেশ দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় আমি কি করব? জবাবে আবুদ্দারদা বলেন, আমি তোমার স্ত্রীকে ছাড়তেও বলব না, রাখতেও বলব না। আমি কেবল অতটুকু বলব, যতটুকু আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট থেকে শুনেছি। তিনি বলেছেন

‘পিতা হ’লেন জান্নাতের মধ্যম দরজা। এক্ষণে তুমি চাইলে তা রেখে দিতে পার অথবা বিনষ্ট করতে পার’।

—শারহুস সুন্নাহ হা/৩৪২১; আহমাদ হা/২৭৫৫১; তিরমিযী হা/১৯০০;

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, আমার স্ত্রীকে আমি ভালবাসতাম। কিন্তু আমার পিতা তাকে অপসন্দ করতেন।  তিনি তাকে তালাক দিতে বলেন। আমি তাতে অস্বীকার করি। তখন বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলা হ’লে তিনি বলেন, أَطِعْ أَبَاكَ وَطَلِّقْهَا، فَطَلَّقْتُهَا ‘তুমি তোমার পিতার আনুগত্য কর এবং তাকে তালাক দাও। অতঃপর আমি তাকে তালাক দিলাম’।

—হাকেম হা/২৭৯৮; ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪২৬; ছহীহাহ হা/৯১৯।

ঈমানদার ও দূরদর্শী পিতার আদেশ মান্য করা ঈমানদার সন্তানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু পুত্র ও তার স্ত্রী উভয়ে ধার্মিক ও আনুগত্যশীল হ’লে ফাসেক পিতা-মাতার নির্দেশ এক্ষেত্রে মানা যাবে না। একইভাবে সন্তান ছহীহ হাদীছপন্থী হ’লে বিদ‘আতী পিতা-মাতার ধর্মীয় নির্দেশও মানা চলবে না। কারণ সকল ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বিধান অগ্রাধিকার পাবে।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন

‘তিনটি দো‘আ কবুল হয়। যাতে কোনরূপ সন্দেহ নেই। পিতার দো‘আ, মুসাফিরের দো‘আ ও মযলূমের দো‘আ’ 

আবুদাঊদ হা/১৫৩৬)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, وَدَعْوَةُ الْوَالِدَيْنِ ‘পিতা-মাতার দো‘আ’ 

(আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৩২)

আরেক বর্ণনায় এসেছে,وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ ‘পিতার বদদো‘আ তার সন্তানের বিরুদ্ধে’ 

তিরমিযী হা/১৯০৫)

এক কথায় সন্তানের জন্য বা সন্তানের বিরুদ্ধে পিতা-মাতার যেকোন দো‘আ বা বদদো‘আ নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। অতএব এ ব্যাপারে পিতা-মাতা ও সন্তানদের সর্বদা সাবধান থাকতে হবে। যেন সন্তানের কোন আচরণে পিতা-মাতার অন্তর থেকে ‘উহ্’ শব্দ বেরিয়ে না আসে। অথবা সন্তানের প্রতি রুষ্ট হয়ে পিতা-মাতা যেন মনে বা মুখে কোন বদদো‘আ না করে বসেন। যেকোন অবস্থায় উভয়কে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং সর্বদা উভয়ে উভয়ের প্রতি সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল থাকতে হবে। প্রত্যেকে পরস্পরের কল্যাণ কামনা করতে হবে। নইলে যেকোন সময় কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে যাওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা থেকে যাবে।

‘আমর বিন শু‘আইব তার পিতা হ’তে, তিনি তার দাদা ‘আমর ইবনুল ‘আছ (রাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বলল, আমার সম্পদ আছে। আর আমার পিতা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, أَنْتَ وَمَالُكَ لِوَالِدِكَ، إِنَّ أَوْلاَدَكُمْ مِنْ أَطْيَبِ كَسْبِكُمْ، كُلُوا مِنْ كَسْبِ أَوْلاَدِكُمْ ‘তুমি ও তোমার সম্পদ তোমার পিতার জন্য। নিশ্চয়ই তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের পবিত্রতম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। অতএব তোমরা তোমাদের সন্তানদের উপার্জন থেকে ভক্ষণ কর’।

—আবুদাঊদ হা/৩৫৩০; ইবনু মাজাহ হা/২২৯১; মিশকাত হা/৩৩৫৪।

আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّ   أَطْيَبَ مَا أَكَلْتُمْ مِنْ كَسْبِكُمْ وَإِنَّ أَوْلاَدَكُمْ مِنْ كَسْبِكُمْ- ‘নিশ্চয়ই সবচেয়ে পবিত্র খাদ্য হ’ল যা তোমরা নিজেরা উপার্জন কর। আর তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের উপার্জনের অংশ’ (তিরমিযী হা/১৩৫৮)তিরমিযী হা/১৩৫৮
উক্ত বিষয়ে জাবের ও আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর প্রমুখ ছাহাবী থেকেও ছহীহ হাদীছ সমূহ রয়েছে। ইমাম তিরমিযী বলেন, অনেক ছাহাবী ও অন্যান্য বিদ্বানগণ বলেন, পিতা-মাতা সন্তানের সম্পদ থেকে যতটুকু ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন। তবে কেউ কেউ বলেন, কেবল প্রয়োজন অনুপাতে নিতে পারেন’তিরমিযী হা/১৩৫৮-এর ব্যাখ্যা

নেককার সন্তানের সকল নেক আমলের ছওয়াব তার পিতা-মাতা পাবেন। যদি তারা কাফের-মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ না করেন। পক্ষান্তরে তাদের পাপের অংশ পিতা-মাতা না পেলেও দুনিয়াতে তারা সন্তানের কারণে বদনামগ্রস্থ হবেন। যেভাবে নূহ (আঃ)-এর অবাধ্য পুত্র জগদ্বাসীর নিকটে চিহ্নিত হয়ে আছে এবং ছেলেকে বাঁচানোর জন্য প্রার্থনা করে নবী নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট ধমক খেয়েছিলেন 

(হূদ ১১/৪৫-৪৬)

অতএব সন্তানদের অবশ্যই পিতা-মাতা ও বংশের সম্মান ও সুনামের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, পূর্ব কালে তিন জন ব্যক্তি সফরে বের হয়। পথিমধ্যে তারা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে পতিত হয়। তখন তিন জনে একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ গুহা মুখে একটি বড় পাথর ধসে পড়ে। তাতে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। তিন জনে সাধ্যমত চেষ্টা করেও তা সরাতে ব্যর্থ হয়। তখন তারা পরস্পরে বলতে থাকে যে, এই বিপদ থেকে রক্ষার কেউ নেই আল্লাহ ব্যতীত। অতএব তোমরা আল্লাহকে খুশী করার উদ্দেশ্যে জীবনে কোন সৎকর্ম করে থাকলে সেটি সঠিকভাবে বল এবং তার দোহাই দিয়ে আললাহর নিকট প্রার্থনা কর। আশা করি তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।

তখন একজন বলল, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট কয়েকটি শিশু সন্তান ছিল। যাদেরকে আমি প্রতিপালন করতাম। আমি প্রতিদিন মেষপাল চরিয়ে যখন ফিরে আসতাম, তখন সন্তানদের পূর্বে পিতা-মাতাকে দুধ পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে রাত হয়ে যায়। অতঃপর আমি দুগ্ধ দোহন করি। ইতিমধ্যে পিতা-মাতা ঘুমিয়ে যান। তখন আমি তাদের মাথার নিকট দুধের পাত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, যতক্ষণ না তারা জেগে ওঠেন। এ সময় ক্ষুধায় আমার বাচ্চারা আমার পায়ের নিকট কেঁদে গড়াগড়ি যায়। কিন্তু আমি পিতা-মাতার পূর্বে তাদেরকে পান করাতে চাইনি। এভাবে ফজর হয়ে যায়। অতঃপর তারা ঘুম থেকে উঠেন ও দুধ পান করেন। তারপরে আমি বাচ্চাদের পান করাই। اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتُ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَفَرِّجْ عَنَّا مَا نَحْنُ فِيهِ مِنْ هَذِهِ الصَّخْرَةِ ‘হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ’লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও’! তখন পাথর কিছুটা সরে গেল এবং তারা আকাশ দেখতে পেল।

দ্বিতীয় জন বলল, হে আল্লাহ! আমার একটা চাচাতো বোন ছিল। যাকে আমি সবচেয়ে ভালবাসতাম। এক সময় তাকে আমি আহবান করলে সে একশ’ দীনার নিয়ে আসতে বলল। আমি বহু কষ্টে একশ’ দীনার জমা করলাম। অতঃপর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। কিন্তু যখন আমি তার প্রতি উদ্যত হ’লাম, তখন সে বলল, يَا عَبْدَ اللهِ اتَّقِ اللهَ، وَلاَ تَفْتَحِ الْخَاتَمَ ‘হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর। আমার সতীত্ব বিনষ্ট করো না’। তৎক্ষণাৎ আমি সেখান থেকে উঠে এলাম। হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ’লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও’! তখন পাথর কিছুটা সরে গেল।

তৃতীয়জন বলল, হে আল্লাহ! আমি জনৈক ব্যক্তিকে এক পাত্র চাউলের বিনিময়ে মজুর নিয়োগ করি। কাজ শেষে আমি তাকে প্রাপ্য দিয়ে দেই। কিন্তু সে কোন কারণবশত তা ছেড়ে চলে যায়। তখন আমি তার প্রাপ্যের বিনিময়ে গরু ও রাখাল পালন করতে থাকলাম। অতঃপর একদিন লোকটি আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার উপর যুলুম করো না। আমার পাওনাটা দিয়ে দাও’। তখন আমি বললাম, এই গরু ও রাখাল সবই তুমি নিয়ে যাও। লোকটি বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করো না’। আমি বললাম, আমি ঠাট্টা করছি না। ঐ গরু ও রাখাল সবই তুমি নিয়ে যাও। অতঃপর লোকটি সব নিয়ে গেল’। হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ’লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও’! তখন পাথরের বাকীটুকু সরে গেল এবং আল্লাহ তাদেরকে মুক্তি দান করলেন’।

—বুখারী হা/৫৯৭৪, ২৯৭২; মুসলিম হা/২৭৪৩;

এগুলি হ’ল বৈধ অসীলা সমূহের অন্যতম। যাতে কোন রিয়া ও শ্রুতি ছিল না। কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি কাম্য ছিল। সেজন্য আল্লাহ উপরোক্ত সৎকর্ম সমূহের অসীলায় তাদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

আবু বাকরাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ কোনটি সে বিষয়ে খবর দিব না? আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। এসময় তিনি ঠেস দিয়ে ছিলেন। অতঃপর উঠে বসে বললেন, সাবধান! মিথ্যা কথা ও মিথ্যা সাক্ষ্য। কথাটি তিনি বলতেই থাকলেন। আমরা ভাবছিলাম, তিনি আর থামবেন না’।

—বুখারী হা/৫৯৭৬; মুসলিম হা/৮৭।

অত্র হাদীছে বুঝা যায় যে, শিরকের পরেই মহাপাপ হ’ল পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। এরপরে মহাপাপ হ’ল মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।

(ক) আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মুশরিক মা আমার কাছে এসেছে। আমি কি তার সাথে সদ্ব্যবহার করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সদ্ব্যবহার কর’।

—বুখারী হা/৩১৮৩; মুসলিম হা/১০০৩; মিশকাত হা/৪৯১৩।

ইবনু হাজার (রহঃ) বলেন, ঘটনাটি ছিল হোদায়বিয়া সন্ধি থেকে মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত সময়কার। যখন তিনি তার মুশরিক স্বামী হারেছ বিন মুদরিক আল-মাখযূমীর সাথে ছিলেন (ফাৎহুল বারী)

(খ) আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমার মা ছিলেন মুশরিক। একদিন আমি তার নিকটে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি আমাকে রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেন, যা আমার নিকট খুবই অপসন্দনীয় ছিল। তখন আমি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট গিয়ে কাঁদতে লাগলাম এবং তার হেদায়াতের জন্য দো‘আ করতে বললাম। অতঃপর তিনি দো‘আ করলেন। এরপর আমি বাড়িতে ফিরে এসে দরজা নাড়লে ভিতর থেকে মা বলেন, তুমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর। তারপর তিনি গোসল সেরে পোষাক পরে দরজা খুলে দেন এবং কালেমায়ে শাহাদত পাঠ করে তার ইসলাম ঘোষণা করেন।

—মুসলিম হা/২৪৯১; মিশকাত হা/৫৮৯৫।

জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে রাসূল (ছাঃ) বলেন, لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ ‘রেহেমের সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।

আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে,لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنَّانٌ وَلاَ عَاقٌّ وَلاَ مُدْمِنُ خَمْرٍ ‘খোটা দানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য ও মদ্যপায়ী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[

—নাসাঈ হা/৫৬৭২; দারেমী হা/২০৯৪; মিশকাত হা/৪৯৩৩।

ইবনু ওমর (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে,ثَلاَثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِمُ الْجَنَّةَ مُدْمِنُ الْخَمْرِ وَالْعَاقُّ وَالْدَّيُّوثُ الَّذِى يُقِرُّ فِى أَهْلِهِ الْخَبَثَ- ‘তিন জন ব্যক্তির উপরে আল্লাহ জান্নাতকে হারাম করেছেন। মদ্যপায়ী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং দাইয়ূছ। যে তার পরিবারে অশ্লীলতা স্থায়ী রাখে’।

—আহমাদ হা/৫৩৭২; নাসাঈ হা/২৫৬২; মিশকাত হা/৩৬৫৫।

‘দাইয়ূছ’ অর্থ যে ব্যক্তি তার পরিবারে ব্যভিচার, ব্যভিচার উদ্রেককারী পরিবেশ, মদ্যপান ও বিভিন্ন ধরনের অনৈসলামী আচরণ জিইয়ে রাখে এবং তা দূরীকরণে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেয় না (মিরক্বাত)

আবু বাকরাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন, বিদ্রোহ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা অপেক্ষা কোন পাপই এত জঘন্য নয় যে, পাপীকে আল্লাহ সবচেয়ে দ্রুত এ দুনিয়াতেই শাস্তি দেন এবং আখেরাতেও তার জন্য শাস্তি জমা রাখেন’।

—তিরমিযী হা/২৫১১; ইবনু মাজাহ হা/৪২১১; আবুদাঊদ হা/৪৯০২; মিশকাত হা/৪৯৩২।

অর্থাৎ অন্যান্য পাপের শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতে নাও দিতে পারেন অথবা বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু বর্ণিত দুই পাপের শাস্তি দুনিয়াতেই আল্লাহ কিছু না কিছু দিয়ে থাকেন। আর আখেরাতে তো থাকবেই। যদি না সে তওবা করে।

পিতা-মাতা হ’লেন রেহেমের সম্পর্কের মূল সূত্র। অতএব পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার হ’ল সর্বাগ্রে। অতঃপর পিতৃকুল ও মাতৃকুলের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়গণ এই হাদীছের মধ্যে শামিল।

কেননা আল্লাহ বলেন, وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا ‘তিনিই মানুষকে পানি হ’তে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বিবাহগত সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন’ (ফুরক্বান ২৫/৫৪)ফুরক্বান ২৫/৫৪

বনু মুছত্বালিক্ব যুদ্ধে পরাজিত গোত্র নেতার কন্যা জুওয়াইরিয়াকে বিবাহ করার সূত্রে ঐ গোত্রের বন্দী একশ’ পরিবার মুক্তি পায় এবং তারা মুসলমান হয়ে যায়। অতঃপর রাসূল (ছাঃ)-এর শ্বশুর গোত্র (أَصْهَارُ رَسُولِ اللهِ) হিসাবে তারা সম্মানিত হয় ও ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় পরলোকগত স্ত্রী খাদীজার বান্ধবীদের কাছে হাদিয়া পাঠাতেন।

এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ককে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। যার মূলে হ’ল পিতা-মাতার রক্ত সম্পর্ক।

আবু উমামাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ثَلاَثَةٌ لاَ يُقْبَلُ مِنْهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَرْفٌ وَلاَ عَدْلٌ: عَاقٌّ وَمَنَّانٌ وَمُكَذِّبٌ بِقَدْرٍ- ‘তিনজন ব্যক্তির কোন দান বা সৎকর্ম আল্লাহ কবুল করেন না : পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, খোটা দানকারী এবং তাক্বদীরে অবিশ্বাসী ব্যক্তি’।

—ত্বাবারাণী কাবীর হা/৭৫৪৭; ছহীহাহ হা/১৭৮৫।

প্রথম করণীয় হ’ল,

তাঁদের ঋণ পরিশোধ করা ও অছিয়ত পূর্ণ করা। অতঃপর মীরাছ বণ্টন করা (নিসা ৪/১১)নিসা ৪/১১

অতঃপর পিতা-মাতার জন্য দো‘আ করা, ছাদাক্বা করা এবং ইল্ম বিতরণ করা। আরেকটি হ’ল তাদের পক্ষ হ’তে হজ্জ করা।

—ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩১০; তালখীছ ৭৬।

… তবে এজন্য উত্তরাধিকারীকে প্রথমে নিজের ফরয হজ্জ আদায় করতে হবে।[36]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ জান্নাতে সৎকর্মশীল বান্দার মর্যাদার স্তর উঁচু করবেন। তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে এটা আমার জন্য হ’ল? তিনি বলবেন, بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ ‘তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার কারণে’।[37] এজন্য সন্তানকে সর্বদা দো‘আ করতে হবে,رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِيْ صَغِيْراً-  (রবিবরহাম্হুমা কামা রববাইয়া-নী ছগীরা) ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া কর যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়াপরবশে লালন-পালন করেছিলেন’ 

—ইসরা ১৭/২৪)

ছাদাক্বার মধ্যে ঐ ছাদাক্বা উত্তম, যা ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ, যা সর্বদা জারি থাকে ও স্থায়ী নেকী দান করে। এর মধ্যে সর্বোত্তম হ’ল ইল্ম বিতরণ করা। যে ইল্ম মানুষকে নির্ভেজাল তাওহীদ ও ছহীহ সুন্নাহর পথ দেখায় এবং শিরক ও বিদ‘আত হ’তে বিরত রাখে। উক্ত উদ্দেশ্যে উচ্চতর ইসলামী গবেষণা খাতে সহযোগিতা প্রদান করা, সেজন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনা করা। বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমল সম্পন্ন বই ছাপানো ও বিতরণ করা এবং এজন্য স্থায়ী প্রচার মাধ্যম স্থাপন ও পরিচালনা করা ইত্যাদি।

অতঃপরমসজিদ, মাদরাসা, ইয়াতীমখানা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ ও পরিচালনা, রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ, অনাবাদী জমিকে আবাদ করা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, দাতব্য চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল স্থাপন ও পরিচালনা করা ইত্যাদি।

জানা আবশ্যক যে, ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ দু’ভাবে হতে পারে। (১) মৃত ব্যক্তি স্বীয় জীবদ্দশায় এটা করে যাবেন। এটি নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম। কারণ মানুষ সেটাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে (নাজম ৫৩/৩৯)

(২) মৃত্যুর পরে তার জন্য তার উত্তরাধিকারীগণ বা অন্যেরা যেটা করেন। সাইয়িদ রশীদ রিযা বলেন, দো‘আ, ছাদাক্বা (ও হজ্জ)-এর নেকী মৃত ব্যক্তি পাবেন, এ বিষয়ে বিদ্বানগণ সকলে একমত। কেননা উক্ত বিষয়ে শরী‘আতে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।[38]

আরেকটি বিষয় মনে রাখা আবশ্যক যে, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ছাদাক্বায়ে জারিয়াহর ধরন পরিবর্তন হয়ে থাকে। অতএব যেখানে বা যাকে এটা দেওয়া হবে, তার গুরুত্ব ও স্থায়ী কল্যাণ বুঝে এটা দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে সদা সতর্ক থাকতে হবে, যেন উক্ত ছাদাক্বা ধর্মের নামে কোন শিরক ও বিদ‘আতের পুষ্টি সাধনে ব্যয়িত না হয়। যা স্থায়ী নেকীর বদলে স্থায়ী গোনাহের কারণ হবে। ক্বিয়ামতের দিন বান্দাকে তার আয় ও ব্যয় দু’টিরই হিসাব দিতে হবে।[39] অতএব ছাদাক্বা দানকারীগণ সাবধান!

বিয়ের পর স্ত্রী স্বামীর ওপর আমানত হয়ে যায়। তার ভরণ-পোষণ, নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি ও সম্মান দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।”
— জামে তিরিমিযি

আরেক হাদিসে এসেছে:

“তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের হক আছে, আর তোমাদের ওপরও তাদের হক আছে।”

অর্থাৎ স্ত্রীকে অবহেলা করে শুধু মা-বাবার খেদমত করলেই দায়িত্ব পূর্ণ হয় না।

স্বামীর করণীয়:

  • স্ত্রী ও মা-বাবার মধ্যে ন্যায়বিচার করা।
  • কারও কাছে অন্যজনের বদনাম না করা।
  • স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করা।
  • মা-বাবার ভরণ-পোষণ ও খেদমতে অবহেলা না করা।
  • ঝগড়া বাড়লে আলাদা বাসার চিন্তা করা, তবে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন না করা।

স্ত্রীর করণীয়:

  • শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান করা।
  • স্বামীকে মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা না করা।

মা-বাবার করণীয়:

  • ছেলের সংসারে অযথা হস্তক্ষেপ না করা।
  • পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো দেখার চেষ্টা করা।

প্রশ্ন ১: দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর মৌলিক অধিকারগুলো কী কী?

উত্তর: স্ত্রীর মৌলিক অধিকারের মধ্যে রয়েছে—আলাদা ঘরের ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, ভরণ-পোষণ, স্বামীর সময় ও উত্তম আচরণ।

প্রশ্ন ২: ইসলামে স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা কি স্বামীর দায়িত্ব?

উত্তর: হ্যাঁ, প্রয়োজন ও সামর্থ্য থাকলে স্ত্রীর জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিকর আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব।

প্রশ্ন ৩: যদি একই বাসায় থাকার কারণে স্ত্রী মানসিক কষ্ট পায়, তখন স্বামীর করণীয় কী?

উত্তর: হ্যাঁ, প্রয়োজন ও সামর্থ্য থাকলে স্ত্রীর জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিকর আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব।

প্রশ্ন ৪: বাবা-মা চাইলে কি ছেলেকে সবসময় তাদের সাথেই থাকতে হবে?

উত্তর: বাবা-মায়ের সম্মান ও খেদমত করা জরুরি। তবে যদি একই বাসায় থাকার কারণে স্ত্রীর অধিকার ক্ষুন্ন হয়, তাহলে স্বামীকে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রশ্ন ৫: স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: কারণ স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বামীর দায়িত্ব এবং এটি ইসলামে স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।

প্রশ্ন ৬: দাম্পত্য সম্পর্কে উত্তম আচরণের গুরুত্ব কী?

উত্তর: উত্তম আচরণ দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, শান্তি ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখে। ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে।

প্রশ্ন ৭: স্বামীর সময় পাওয়াও কি স্ত্রীর অধিকার?

উত্তর: হ্যাঁ, স্ত্রীর প্রতি সময় দেওয়া, খোঁজ নেওয়া এবং মানসিকভাবে পাশে থাকা স্বামীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন ৮: একজন স্বামী কীভাবে স্ত্রী ও বাবা-মায়ের হকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে?

উত্তর: স্ত্রীকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করার পাশাপাশি নিয়মিত বাবা-মায়ের খোঁজখবর, খেদমত ও সম্মান বজায় রাখার মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।

What's your reaction?

সোশ্যাল কমেন্ট এখনো চালু হয়নি — পাশের “সাইট কমেন্ট” ট্যাবে মতামত দিন।