মাযহাবের তাকলীদ সম্পর্কে মওদূদী সাহেবের বক্তব্য
মওদূদী সাহেব তাকলীদ ও প্রচলিত মাযহাব অনুসরণের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন:
“আমার মতে صاحبِ علم বা জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য তাকলীদ নাজায়িয এবং গুনাহ; বরং গুনাহের চেয়েও অধিক গুরুতর বিষয়।”
— রাসায়েলে মাসায়েল, ১/২৪৪; বক্তব্যটির উদ্ধৃতি বিভিন্ন আলোচনায় এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যত্র তিনি বলেন:
“আমি আহলে হাদীসের মস্লককে তার সমস্ত বিস্তারিতসহ সঠিক মনে করি না, আবার হানাফিয়্যাত বা শাফেয়িয়্যাতেরও پابন্দ বা অনুসারী নই।”
— রাসায়েলে মাসায়েল, ১/২৩৫।
অর্থাৎ তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসারী হিসেবে আবদ্ধ মনে করতেন না এবং বিশেষ করে জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য তাকলীদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মওদূদী সাহেবের বক্তব্য ও তার পর্যালোচনা
মওদূদী সাহেব বলেন:
“জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য তাকলীদ করা নাজায়েয এবং গুনাহের চেয়েও জঘন্য।” রাসায়েলে মাসায়েল, ১/২৩৫
ফিকহের পরিভাষায় তাকলীদ বলতে কোনো মুজতাহিদ ইমামের কুরআন-সুন্নাহর আলোকে প্রণীত ইজতিহাদী সিদ্ধান্ত অনুসরণ করাকে বোঝানো হয়। এই অর্থের তাকলীদকে সরাসরি নাজায়েয এবং “গুনাহের চেয়েও জঘন্য” বলা অত্যন্ত কঠোর এবং দলীলবিহীন দাবি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“তোমরা যদি না জানো, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।” সূরা নাহল: ৪৩; সূরা আম্বিয়া: ৭
যে ব্যক্তি নিজে কুরআন-হাদীস থেকে ইজতিহাদ করার যোগ্য নয়, তার জন্য শরিয়তের বিধান জানতে যোগ্য আলেমের কাছে ফিরে যাওয়া যদি শরিয়তসম্মত হয়, তাহলে একজন স্বীকৃত মুজতাহিদ ইমামের ফিকহি সিদ্ধান্ত অনুসরণ করাকে কীভাবে সাধারণভাবে “নাজায়েয” বলা যায় এটাই এখানে মৌলিক প্রশ্ন।
দ্বিতীয়ত, তাকলীদকে “গুনাহের চেয়েও জঘন্য” বলা আরও গুরুতর বিষয়। কারণ কোনো কাজকে গুনাহের চেয়েও জঘন্য বলার অর্থ হলো সেটিকে শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা। অথচ চার ইমাম,ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ রহ. উম্মাহর স্বীকৃত মুজতাহিদ ইমাম। তাঁদের ফিকহি ইজতিহাদ অনুসরণ করে শত শত বছর ধরে মুসলিম উম্মাহ আমল করে আসছে। সুতরাং তাঁদের ইজতিহাদ অনুসরণ করাকে এমন কঠোর ভাষায় আখ্যায়িত করতে হলে সুস্পষ্ট শরয়ি দলীল প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, মওদূদী সাহেবের উক্ত বক্তব্যের সমস্যা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, সাধারণ মানুষ নিজে মুজতাহিদ নয়। সে কুরআন-হাদীসের বিভিন্ন দলীলের মধ্যে কোনটি আম, কোনটি খাস, কোনটি নাসিখ, কোনটি মানসুখ, কোন হাদীস সহীহ, কোনটি দুর্বল এবং কোন দলীলের ভিত্তিতে কোন হুকুম প্রযোজ্য এসব নির্ণয় করার যোগ্যতা সাধারণত রাখে না। তাহলে তাকে কোনো স্বীকৃত ফকিহের ইজতিহাদ অনুসরণ করতেই হবে।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ
“তাদের প্রত্যেক দলের মধ্য থেকে একটি দল কেন দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে না?” সূরা তাওবা: ১২২
অর্থাৎ সবাইকে একই স্তরের মুজতাহিদ বানানো হয়নি; বরং একদল দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করবে এবং অন্যরা তাদের কাছ থেকে দ্বীন শিখবে।
তাই সমালোচনার মূল জায়গাটি হলো,কোনো ইমামের অন্ধ অনুসরণকে সমালোচনা করা এক বিষয়, আর মুজতাহিদ ইমামের ফিকহি ইজতিহাদ অনুসরণকেই “নাজায়েয” এবং “গুনাহের চেয়েও জঘন্য” বলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটির ব্যাপারে সতর্কতা যুক্তিসঙ্গত হতে পারে; কিন্তু দ্বিতীয় দাবির জন্য যে শক্তিশালী শরয়ি দলীল প্রয়োজন, উপরোক্ত বক্তব্যে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অতএব, আহলে সুন্নাতের ফিকহি ঐতিহ্যের আলোকে বলা যায়,মুজতাহিদ ইমামদের অনুসরণকে সামগ্রিকভাবে নাজায়েয ও গুনাহের চেয়েও জঘন্য বলা একটি ভ্রান্ত ও অতিরঞ্জিত বক্তব্য। কুরআনের নির্দেশ হলো, যে জানে না সে জ্ঞানীদে
নির্দিষ্ট মাযহাব মানার শরয়ী বিধান
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
فاسئلوا اهل الذكر ان كنتم لاتعلمون.
যদি তোমাদের জানা না থাকে তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করে নাও।সূরা নাহল ৪৩
الرحمن فاسئل به خبيرا. (سورة الفرقان(
তিনি রহমান। তাঁর মহিমা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো এমন কাউকে যে জানে।সূরা ফুরকান, ৫৯
ولو ردوه الى الرسول والى اولى الامر منهم لعلمه الذين يستبطونه منهم.
তারা যদি ব্যাপারটি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা যারা আলেম তাদের কাছে নিয়ে যেত তবে তাদের মধ্যে যারা তার তথ্য অনুসন্ধানী তারা তার বাস্তবতা জেনে যেত।সূরা নিসা ৮৩
নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
نعم الرجل الفقيه ان احتيج اليه نفع والا اغنى نفسه.
ফকীহ ব্যক্তি কতই না উত্তম, লোকেরা দ্বীনি ব্যাপারে তার মুখাপেক্ষী হলে তিনি তাদের উপকার করেন অন্যথায় নিজেকে অমুখাপেক্ষী রাখেন। (কানযুল উম্মাল হা.২৮৯০৭)
এসব আয়াত ও হাদীস দ্বারা জানা গেল, কুরআন হাদীসে অনভিজ্ঞ সাধারণ মুসলমানদের কতর্ব্য হলো, বিজ্ঞ আলেমদের নিকট থেকে আল্লাহ তা‘আলার হুকুম আহকাম জেনে জেনে সে অনুযায়ী আমল করবে। তাদের জন্য নিজেদের গবেষণার উপর আমল করার অনুমতি নেই। এটা একটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যা বোধ-বুদ্ধি সম্পন্ন কোনো ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারে না।
কুরআন হাদীসে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জ্ঞানীদের নিকট থেকে জেনে জেনে আমল করার এই যে পদ্ধতি, পরিভাষায় একে তাকলীদ বলা হয়। তাকলীদ দুই প্রকার। এক.তাকলীদে মুতলাক। স্বাধীনভাবে যখন যে মুজতাহিদকে ইচ্ছা মেনে চলা। দুই.সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট একজন মুজতাহিদের মতানুযায়ী শরী‘আতের উপর আমল করা।
যিনি মুজতাহিদ নন তার জন্য তাকলীদে মুতলাক ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। তবে তাকলীদে শাখসী অর্থাৎ নির্দিষ্ট এক ইমামের মাযহাব অনুসরণের ব্যাপারে গায়রে মুকাল্লিদ বন্ধুগণ ভীষণ আপত্তি তুলে থাকেন। এমনকি তারা এটাকে শিরক পর্যন্ত আখ্যা দিয়ে থাকেন। এজন্য তাকলীদে শাখসীর স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করা দরকার।
মাযহাবের বিষয়ে আকাবিরদের কয়েকটি ফাতাওয়া
মাযহাব অনুসরণ ওয়াজিব হওয়ার উপর আকাবিরদের কয়েকটি ফাতাওয়া উল্লেখ করা হলোঃ
১. প্রশ্ন : কোনো নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করা সাধারণ মুসলমানের জন্য ফরয, ওয়াজিব না মুবাহ?
উত্তরঃ মুতলাক তাকলীদ ফরয। আর তাকলীদে শাখসীর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কেরামের মতে ওয়াজিব। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/১২১)
২. শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. (হাদীস শাস্ত্রে যার পাণ্ডিত্যের উপর আহলে হাদীসদের ইমাম নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান সাহেবও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন) বলেন, হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর পর জনসাধারণের মধ্যে বিশেষ বিশেষ ইমামের মাযহাবের পাবন্দী অর্থাৎ তাকলীদে শাখসী শুরু হয়ে যায়। আর বর্তমান যুগে এটাই ওয়াজিব। (আল ইনসাফ পৃ. ৫৯)
৩. প্রশ্নঃ তাকলীদে শাখসী ওয়াজিব না ফরয?
উত্তরঃ তাকলীদে শাখসী ওয়াজিব। (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ৪/৩৫২)
৪. মূলনীতি হলো, ওয়াজিব কাজ সম্পাদনের জরুরী মাধ্যমগুলোও ওয়াজিব হয়, সে হিসেবে তাকলীদে শাখসী অর্থাৎ নির্দিষ্ট ইমামের মাযহাব অনুসরণ করাও ওয়াজিব হবে। (আহসানুল ফাতাওয়া ১/৪১৪)
৫. প্রশ্নঃ বর্তমানকালে যারা ইমাম চতুষ্টয়ের কোনো একজনেরও তাকলীদ করে না তাদের বিধান কী?
উত্তরঃ বর্তমান যুগে যারা চার ইমামের কোনো একজনেরও তাকলীদ করে না তারা ফাসেক। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের গণ্ডিবহির্ভূত। হারামাইন শরীফাইনের ফাতাওয়া অনুযায়ী তাদের উপর শাস্তি প্রয়োগ করা ওয়াজিব। (মাজমুআয়ে রাসায়েল ১/২৮)
মাযহাব না মানার ক্ষতি
মাযহাব না মানলে হাদীসের উপরও পুরোপুরি আমল করা সম্ভব নয়
আহলে হদীস ভাইয়েরা আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের মাযহাব অর্থাৎ হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও সিদ্ধান্তের কোনো তোয়াক্কা করেন না। তারা নিজেদের বুঝ-বুদ্ধি মাফিক সরাসরি হাদীসের উপর আমল করার দাবি করে থাকেন। কিন্তু বাস্তব কথা হলো, একজন অমুজতাহিদের পক্ষে মাযহাব না মেনে কিছুতেই হাদীসের উপর পূর্ণভাবে আমল করা সম্ভব নয়। কয়েকটি উদাহরণ লক্ষ্য করা যাকঃ
১. জামাআতে নামায আদায়কারী মুসল্লীদের পরস্পরের পা কিভাবে থাকবে?
এ ব্যাপারে হাদীসের কিতাবসমূহে কয়েক ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।
ক. عن أنس وكان احدنا يلزق منكبه بمنكب صاحبه وقدمه بقدمه
অর্থ ‘হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নামাযে আমাদের প্রত্যেকে তার কাঁধ পাশের ব্যক্তির কাঁধের সাথে মিলিয়ে রাখত এবং পা পাশের ব্যক্তির পায়ের সাথে মিলিয়ে রাখতো। (বুখারী হা.৭২৫) এই হাদীস দ্বারা বাহ্যত মনে হচ্ছে উভয় মুসল্লীর পা মিলানো থাকবে।
খ.
قَالَ رسول لله صلى الله عليه وسلم: إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلاَ يَضَعْ نَعْلَيْهِ عَنْ يَمِينِهِ وَلاَ عَنْ يَسَارِهِ فَتَكُونَ عَنْ يَمِينِ غَيْرِهِ إِلاَّ أَنْ لاَ يَكُونَ عَنْ يَسَارِهِ أَحَدٌ وَلْيَضَعْهُمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ
অর্থ: তোমরা নামাযে তোমাদের ডান পায়ের পাশে জুতা রাখবে না। (কারণ সেখানে ফেরেশতা থাকে) এবং তোমাদের বাম পায়ের পাশেও রাখবে না। কারণ সেটা অন্য ভাইয়ের ডান পাশ। (আবূ দাউদ হা.৬৫৪)
এই হাদীস দ্বারা বাহ্যত বুঝা যাচ্ছে, দুই মুসল্লীর পায়ের মাঝখানে ফাঁকা থাকবে। যেখানে জুতা রাখা সম্ভব। কিন্তু নবীজী صلى الله عليه وسلم সেখানে জুতা রাখতে নিষেধ করেছেন। দুজনের পায়ের মাঝখানে যদি ফাঁকাই না থাকে তাহলে তো জুতা রাখতে নিষেধ করার কোনো মানে হয় না।
উক্ত দুই হাদীসের বাহ্য বিরোধ লক্ষ্য করে আহলে হাদীস ভাইয়েরা দ্বিতীয় হাদীসের ওপর আমল করা ত্যাগ করেছেন এবং হাদীসটিকে একপ্রকার অস্বীকার করেছেন। কিন্তু যারা মাযহাব মানেন বিশেষত হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ নিজেদের ইমামের মাযহাব অর্থাৎ ব্যাখ্যা অনুযায়ী (ফাতা হিন্দিয়া:১/৭৩) উভয় মুসল্লীর পায়ের মাঝে সামান্য ফাঁকা রাখেন। এতে উভয় হাদীসের উপর তাদের আমল হয়ে যায়। দ্বিতীয় হাদীসের ওপর আমল হয় সরাসরি ও প্রতক্ষ্যভাবে আর প্রথম হাদীসের ওপর আমল হয় ব্যাখ্যাসাপেক্ষে পরোক্ষভাবে। তা এ ভাবে যে, মুহাক্কিক আলেমগণ বলেছেন, প্রথম হাদীসের يلزق শব্দ থেকে উভয় মুসল্লীর পা মিলিয়ে রাখার যে অর্থ বাহ্যত বুঝে আসে হাদীসে তা বুঝানো হয়নি। কেননা ‘এলযাক, শব্দের বাহ্যিক অর্থ মিলানো হলেও এখানে তা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। কারণ সে ক্ষেত্রে তখন স্বয়ং প্রথম হাদীসের উপরই আমল করা সম্ভব হবে না। দেখুন না, হাদীসে মুসল্লীদের পরস্পরে কাঁধ ও পা মিলিয়ে রাখার কথা বলা হয়েছে, অথচ মুসল্লীদের পরস্পরে পায়ে পা মিলিয়ে রেখে একই সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিশ্বাস না হলে পাশাপাশি পাঁচজন লোক নিজ নিজ পায়ের মাঝে এক বিঘতের বেশি ফাঁকা রেখে (যেমনটি আহলে হাদীসের ভাইয়েরা করে থাকেন) তারপর পাশের জনের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে নিন এবং এ অবস্থায় সকলেই পরস্পপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাখার চেষ্টা করুন। কস্মিনকালেও সম্ভব হবে না। বিশেষতঃ মুসল্লীগণ যদি দৈর্ঘ্যে কমবেশি হয়ে থাকেন। যদি বলা হয় পা মিলিয়ে রাখলেই হবে কাঁধ মিলানো জরুরী নয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা একই হাদীসে বর্ণিত একই ধরনের দুটি বিধানের একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে আঁকড়ে ধরা কিংবা একটিকে প্রাধান্য দেওয়ার গ্রহণযোগ্যতা নেই। তা ছাড়া আবূ দাউদ শরীফে বর্ণিত (হাদীস নং হা.৬৬২) নুমান ইবনে বশীর রাযি. থেকে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
فرأيت الرجل يلزق منكبه بمنكب صاحبه وركبته بركبة صاحبه وكعبه بكعبه.
অর্থ: আমি দেখেছি লোকেরা নামাযে তার কাঁধ পার্শ্ববর্তীর কাঁধের সাথে তার হাঁটু পার্শ্ববর্তীর হাঁটুর সাথে আর টাখনু টাখনুর সাথে মিলিয়ে রাখতো’।
পাঠক ! হাঁটুর সাথে হাঁটু রাখতে হলে তো দুজন ব্যক্তিকে মুখোমুখি বসে তবে কাজটি করতে হবে। দাঁড়ানো অবস্থায় এটা বিলকুল অসম্ভব। যা হোক, রেওয়ায়াতগুলোর মধ্যে এই যে এতগুলো অসংগতি সৃষ্টি হচ্ছে, তা মূলত ‘এলযাক, শব্দটিকে মিলানো অর্থে ব্যবহার করার কারণে। সুতরাং বাধ্য হয়েই শব্দটিকে কাছাকাছি, পাশাপাশি, সমান ও সমান্তরাল অর্থে ব্যবহার করতে হবে। যেমনঃ আরবী ভাষায় مررت بزيد বাক্যটির ب বর্ণের মূল অর্থ মিলানো হলেও অর্থ করা হয়, আমি যায়েদের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করেছি। এখানে কেউ এ অর্থ করে না যে, আমি যায়েদের শরীরের সাথে শরীর মিলিয়ে তাকে অতিক্রম করেছি। সুতরাং হাদীসে يلزق শব্দটিকে মিলানো অর্থে আতিশয্যের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যেন কেউ কাতারের মাঝখানে অযথা ফাঁকা না রাখে। কিংবা হাদীসে কাতার সোজা করার সময় পা, কাঁধ মিলিয়ে মিলিয়ে কাতার সোজা করার কথা বলা হয়েছে। কাতার সোজা হওয়ার পর নামাযের মধ্যেও তা ধরে রাখতে হবে সেটা বলা হয়নি। নচেৎ সেজদা থেকে পরবর্তী রাকাআতের জন্য উঠে মুসল্লীকে আবার তার পার্শ্ববর্তীর পা খুঁজে বের করে তার সাথে নিজের পা মিলাতে হবে। যা নিঃসন্দেহে নামাযের একাগ্রতা বিনষ্টকারী হওয়ায় মাকরুহ বলে গণ্য হবে।
মোদ্দাকথা, এতসব বিষয় বিবেচনা করে ইমাম আবূ হানীফা রাহ. দ্বিতীয় হাদীসের ওপর সরাসরি আমল করার কথা বলেছেন। আর প্রথম হাদীসের يلزق শব্দটির ব্যাখ্যাসাপেক্ষে সেটার ওপরও আমল করেছেন। এটাই হানাফীদের মাযহাব। এর দ্বারা এ সংক্রান্ত সকল হাদীসের উপর আমল হয়ে যাচ্ছে। চাই তা সহীহ, যয়ীফ যাই হোক না কেন। সাথে সাথে মুসল্লীগণ নামাযে একাগ্রতাও ধরে রাখতে পারছেন। যেটা নামাযের অন্যতম কাম্য বিষয়। এখন বলুন, বুখারী, মুসলিমে নেই কিংবা আমাদের তাহকীক (?) অনুযায়ী সহীহ নয় এই ধুঁয়া তুলে এক হাদীসের অর্ধেকের ওপর আমল করা উচিত, না এমনভাবে আমল করা উচিত যাতে সকল হাদীসের বাহ্যবিরোধ শেষ হয়ে সবগুলোর উপর একই সঙ্গে আমল হয়ে যায়? তবে হাদীসের এসব সূক্ষ্ম ও খুঁটিনাটি বিষয় অনুধাবনের জন্য সতেজ ও সজীব মস্তিষ্কের প্রয়োজন। ভারবাহী প্রাণীবিশেষের মেজাজ নিয়ে তা সম্ভব নয়।
২. তাকবীরে তাহরীমার সময় নামাযী তার হাত কতটুকু উপরে উঠাবে ? এ বিষয়ক কয়েকটি রেওয়ায়েত দেখুন।
ক.
عن ابن عمر ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يرفع يديه حذو منكبيه اذا افتتح الصلاة.
অর্থঃ হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজী صلى الله عليه وسلم যখন নামায শুরু করতেন উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন।’বুখারী হা.৭৩৫, মুসলিম হা.২২,৩৯০
জানা গেল, তাকবীরে তাহরীমার সময় মুসল্লী হাত কাঁধ বরাবর উঠাবে।
খ.
عن مالك بن حويرث قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا كبر رفع يديه حتى يحاذى بهما اذنيه- وفى رواية حتى يحاذى بهما فروع اذنيه.
অর্থঃ হযরত মালেক ইবনে হুওয়াইরিস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী صلى الله عليه وسلم যখন তাকবীরে তাহরীমা বলতেন, উভয় হাত কান বরাবর উঠাতেন। অন্য বর্ণনায় আছে, উভয় হাত কানের উপরের অংশ বরাবর উঠাতেন। (বুখারী হা.৭৩৭, মুসলিম হা.২৫,৩৯১) এ হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে, মুসল্লীগণ তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত কান বরাবর উঠাবে। দুটি হাদীসই বুখারী, মুসলিমে এসেছে এবং বাহ্যত পরস্পর বিরোধী। সাহাবায়ে কেরামসহ যুগশ্রেষ্ঠ মুজতাহিদগণ দুই হাদীসের সমন্বয়ে বলেছেন, কাঁধ বরাবর হাত উঠানোর হাদীসটি মহিলা নামাযীর জন্য, এটা তাদের পর্দার বিধানের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর কান বরাবর হাত উঠানোর হাদীসটি পুরুষ নামাযীর জন্য। তাদের গঠন প্রকৃতি হিসাবে এটাই মানানসই।
লক্ষ্য করুন, যদি এখানে পুরুষদের জন্য দ্বিতীয় হাদীসটি মা‘মূল বিহি বা আমলযোগ্য সাব্যস্ত করা হলো, কিন্তু তাদের এই আমলের মাধ্যমে প্রথম হাদীসের উপরও আমল হয়ে যাচ্ছে। কেননা কান পর্যন্ত হাত উঠাতে তো কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেই হয়। আবূ দাউদ শরীফের একটি হাদীস যদিও তা বুখারী, মুসলিমের রেওয়ায়েতের সমতুল্য নয় কিন্তু উক্ত ব্যাখ্যাকে দারুনভাবে সমর্থন করছে।
عَنْ وائل بن حجر أَنَّهُ أَبْصَرَ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- حِينَ قَامَ إِلَى الصَّلاَةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى كَانَتَا بِحِيَالِ مَنْكِبَيْهِ وَحَاذَى بِإِبْهَامَيْهِ أُذُنَيْهِ ثُمَّ كَبَّرَ.
অর্থঃ হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি নবিজী صلى الله عليه وسلم কে দেখেছেন, যখন তিনি নামাযে দাঁড়াতেন দুই হাত এমনভাবে উঠাতেন যে, তা কাঁধ বরাবর হয়ে যেত আর তার বৃদ্ধাঙ্গুল দুটি কান বরাবর হয়ে যেত। তার পর তিনি তাকবীরে তাহরীমা বলতেন।’ (আবূ দাউদ হা.৭২৪)
এখন কেউ যদি আহলুল হাদীস বন্ধুদের কথামত কাঁধ বরাবর হাত তুলেন তাহলে স্বয়ং বুখারী, মুসলিমেরই এক হাদীসের উপর আমল করা হবে আর অপর হাদীস প্রত্যাখ্যাণ করা হবে। তাহলে বলুন, হাদীস মানতে হলে মাযহাব মানার কোনো বিকল্প আছে কি?
৩. তাকবীরে তাহরীমা বলার পর হাত কোথায় বাঁধবে ?
দুটি হাদীস লক্ষ্য করুন,
ক.
عن طاؤس قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يضع يده اليمنى على اليسرى ثم يشد بهما على صدره وهو فى الصلاة.
অর্থ: হযরত তাউস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজী صلى الله عليه وسلم নামাযে ডান হাতকে বাঁ হাতের উপর রেখে বুকের উপর শক্ত করে বাঁধতেন।’ (আবূ দাউদ হা.৭৫৯) এ হাদীসকে সঠিক ধরা হলে, বাহ্যত মনে হয় তাকবীরে তাহরীমা বলার পর মুসল্লীদের হাত বুকের উপর থাকবে।
খ.
عن علقمة بن وائل بن حجر عن ابيه قال رأيت النبى الله صلى الله عليه وسلم وضع يمينه على شماله فى الصلوة تحت السرة.
অর্থ: ‘হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. বর্ণণা করেছেন, আমি নবীজীকে নামাযে ডান হাতকে বাঁ হাতের উপর নাভির নিচে বাঁধতে দেখেছি। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা:১/৩৪২)
গ.
عن حجاج بن حسان قال سمعت ابا مجلز او قال سألته قال كيف يصنع؟ قال: يضع باطن كف يمينه على ظاهر كف شماله يجعلها اسفل من السرة.
অর্থ: ‘হযরত হাজ্জাজ ইবনে হাস্সান থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ মিজলায থেকে শুনেছেন অথবা তাকে প্রশ্ন করেছেন, নামাযে হাত কীভাবে বাঁধতে হবে? তিনি বললেন, ডান হাতের তালু বাঁ হাতের পিঠের উপর নাভির নিচে রাখবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হা.৩৯৪২)
ঘ.
عن على قال ان من السنة فى الصلوة وضع الاكف على الاكف تحت السرة.
অর্থ: ‘হযরত আলী রাযি. বলেছেন, নামাযে নবীজীর সুন্নাত হলো, ডান হাতকে বাঁ হাতের উপর নাভির নিচে রাখা।’ (আবূ দাউদ হা.৭৫৬)
এই সকল হাদীসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, তাকবীরে তাহরীমার পর নামাযী হাত নাভির নিচে বাঁধবে। বাহ্যতঃ প্রথম হাদীস এবং পরবর্তী হাদীস তিনটি পরস্পর বিরোধী মনে হচ্ছে। কিন্তু একজন ফকীহ ও মুজতাহিদের সূক্ষ্মদর্শিতা সহজেই এর রহস্য ভেদ করতে সক্ষম। তারা এই দুই প্রকার হাদীসের সমন্বয় সাধনে বলেছেন, বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসটি মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য। কারণ এটা পর্দার অধিকতর নিকটবর্তী। আর দ্বিতীয় হাদীসটি পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য, তাদের গঠন আকৃতির ভিত্তিতে এটাই মুনাসিব। তো এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে উভয় হাদীসের উপরই আমল হয়ে গেল। অথবা প্রথম হাদীসের ব্যাখ্যা হলো, শুধুমাত্র বৈধতা বুঝানোর জন্য নবীজী صلى الله عليه وسلم কখনো কখনো বুকের উপর হাত বাঁধতেন। তবে তার আসল আমল ছিল নাভির নিচে হাত বাঁধা। যেটা দ্বিতীয় হাদীসে এবং হযরত আলী রাযি. ও আবূ মিজলাযের হাদীসে স্পষ্ট ভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আহলুল হাদীস বন্ধুদের কথা মত যদি শুধু বুকের উপর হাত রাখার হাদীসকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে নাভির নিচে হাত বাঁধার হাদীসগুলো আমলবিহীন থেকে যাবে। বরং এ আমলটিকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করা হবে। পক্ষান্তরে ফুকাহায়ে কেরামের মতটি গ্রহণ করলে, নবীজী صلى الله عليه وسلم এর উভয় প্রকার আমলই যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষিত রইল। এ হিসাবে প্রকৃত আহলুস সুন্নাহ হলো, ফুকাহায়ে কেরাম ও তাদের মাযহাব অনুসারীগণ।
৪. নামাযে সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান কী ?
নিম্নের বর্ণনাগুলো লক্ষ্য করুন:
ক.
عن عبادة بن الصامت قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا صلوة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب.
অর্থ: ‘হযরত উবাদা ইবনে সামেত রাযি. বলেন, নবীজী صلى الله عليه وسلم ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতিহা পড়বে না, তার নামায হবে না।’বুখারী হা. ৭৫৬, মুসলিম হা.৩৪,৩৯৪
খ.
عن ابى هريرة وقتادة: واذا قرأ فانصتوا.
অর্থঃ যখন ইমাম সূরা কিরাআত পড়ে তখন তোমরা চুপ থাক।’মুসলিম হা.৬৩,৪০৪
গ.
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من كان له امام فقراءة الامام له قراءة .
অর্থ: নবীজী صلى الله عليه وسلم ইরশাদ করেন, যে মুসল্লীর ইমাম রয়েছে তার ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত।’ (মুআত্তা ইমাম মালেক হা.৬২,৬৩)
প্রথম হাদীস থেকে জানা গেল, নামায সহীহ হওয়ার জন্য সূরা ফাতিহা পড়া জরুরী। দ্বিতীয় হাদীস থেকে জানা গেল, ইমামের সূরা কিরাআত পড়াকালীন মুক্তাদিদের জন্য চুপ থাকাই হলো ইমামের অনুসরণ করা। তাহলে প্রথম হাদীসে বর্ণিত সূরা ফাতিহা পড়ার ব্যাপক বিধান থেকে দ্বিতীয় হাদীস দ্বারা মুক্তাদীর বিধান পৃথক হয়ে গেল। অর্থাৎ ইমামের পিছনে মুক্তাদীকে আর কিরাআত পড়তে হবে না। চাই তা সূরা ফাতিহা হোক বা অন্য কোনো সূরাই হোক। এ বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে তৃতীয় হাদীসটি । যেখানে বলা হয়েছে, যার ইমাম আছে ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত বলে গণ্য হবে। আর যেহেতু সূরা ফাতিহাও কিরাআতের অর্ন্তভুক্ত তাই তাকে আর আলাদা করে সূরা ফাতিহাও পড়তে হবে না। বরং ইমামের ফাতিহাই তার জন্য যথেষ্ট হবে। হাদীস অনুসরণের দাবীদার বন্ধুরা শুধুমাত্র প্রথম হাদীসটি গ্রহণ করে ইমাম মুক্তাদী সকলের জন্য সূরা ফাতিহা পড়া বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছেন। আর অপর দুই হাদীসকে বিলকুল ছেড়ে দিয়েছেন। এটা হাদীসের প্রতি অবজ্ঞা, দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার প্রমাণ বহন করে। পক্ষান্তরে মাযহাবের ইমামগণ নবীজী صلى الله عليه وسلم এর প্রতিটি আমল সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন। তারা চেয়েছেন, একান্ত জাল ও বানোয়াট না হলে বাহ্য বিরোধপূর্ণ হাদীসগুলো দুর্বলসূত্রে বর্ণিত হলেও সেগুলোর মধ্যে এমনভাবে সমন্বয় সাধন করা যাতে কোনো না কোনো পর্যায়ে সকল হাদীসই উম্মতের মধ্যে কার্যতঃ যিন্দা থাকে। আল্লাহ প্রদত্ত মাকবূলিয়্যাতের ফলে তারা সেই চেষ্টায় সফলও হয়েছেন। আর উম্মতে মুসলিমাও তাদের কথা বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রহণ করছেন।
৫. সূরা ফাতিহা শেষে আমীন বলার পদ্ধতি কী ?
ক.
عن وائل بن حجر قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم قرأ غير المغضوب عليهم ولا الضالين فقال امين ومد بها صوته.
অর্থ: ‘হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবীজী صلى الله عليه وسلم কে غير المغضوب عليهم ولا الضالين পড়তে শুনেছি। তারপর তিনি আমীন বলেছেন। আর শব্দটিকে তিনি টেনে দীর্ঘ করে বলেছেন।তিরমিযী হা.২৪৮, আবূ দাউদ হা.৯৩২
এই হাদীস থেকে কেউ কেউ উচ্চ স্বরে আমীন বলার বিধান বের করেছেন। যদিও “মাদ্দা” শব্দের অর্থ উচ্চ আওয়াজ নয়। বরং এর অর্থ হলো, দীর্ঘ স্বরে টেনে পড়া।
খ.
عن علقمة بن وائل عن ابيه انه صلى مع رسول الله صلى الله عليه وسلم حين قال غير المغضوب عليهم ولا الضالين قال امين يخفض بها صوته.
সেই পূর্বোক্ত সাহাবী হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি নবীজী صلى الله عليه وسلم এর সঙ্গে নামায আদায় করলেন, নবীজী صلى الله عليه وسلم যখন غير المغضوب عليهم ولا الضالين পড়লেন, তখন অনুচ্চ স্বরে আমীন বললেন। (মুসতাদরাকে হাকেম হা.২৯১৩)
পূর্বোক্ত দুটি হাদীসই হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. থেকে বর্ণিত। প্রথম হাদীসে তিনি দীর্ঘ স্বরে আমীন বলার কথা উল্লেখ করেছেন। আর দ্বিতীয় হাদীসে তা অনুচ্চস্বরে বলার বর্ণনা দিয়েছেন। এই উভয় বর্ণনা মিলে অর্থ দাঁড়ালো, নবীজী صلى الله عليه وسلم আমীন শব্দটিকে দীর্ঘ স্বরে অনুচ্চ আওয়াজে পড়তেন। আর এই উভয় কথার মধ্যে কোনো সংঘর্ষ নেই। কারণ একটি শব্দকে অনুচ্চ আওয়াযে টেনে পড়া বিলকুল সম্ভব। এটাই হানাফীদের আমল। তারা আমীনকে অনুচ্চ স্বরে টেনে টেনে পড়েন। আর যদি মাদ্দা এর অর্থ উচ্চ স্বর বলা হয়, যেমনটি আহলুল হাদীস ভাইয়েরা বুঝেছেন, তাহলে উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় এভাবে হবে যে, নবীজী صلى الله عليه وسلم উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সূরা ফাতিহার শেষে কখনো কখনো হালকা আওয়াজে আমীন পড়েছেন। এটাই ফুকাহাদের ব্যাখ্যা যা যুক্তিগ্রাহ্য।
কিন্তু আহলে হাদীস ভাইদের মতানুযায়ী যদি সজোরে আমীন বলার হাদীস গ্রহণ করা হয়, তাহলে আস্তে আমীন বলার হাদীস যেটা নবীজী صلى الله عليه وسلم এর স্থায়ী আমল ছিল তাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ফলে হাদীসের আংশিক মেনে বাকিগুলোকে অস্বীকার করা হয়। এটাতো হাদীস মানা নয়। হাদীস মানার নামে হাদীস নিয়ে তামাশার নামান্তর এবং অসংখ্য হাদীস অস্বীকার করে দ্বীন ও ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জঘন্য পথ অবলম্বন। এ ধ্বংসাত্মক পথ থেকে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে হেফাযত করুন। আমীন।
মাযহাবের বিভিন্নতা ও তাকলীদের হাকীকত
সম্প্রতি ‘আহলে হাদীস’ বন্ধুরা মাযহাব ও তাকলীদ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠিয়েছেন। মাযহাব ও তাকলীদ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ সরলমনা মুসলমানদেরকে বিভ্রান্তিতে নিপতিত করছেন। হাদীস মানার কথা বলে এবং বড় বড় কয়েকজন ইমামের উক্তির অপব্যবহার করে মুসলমানদেরকে মাযহাব ও তাকলীদের গণ্ডি থেকে বের করে আনছেন। ইতোমধ্যে অনেক মুসলমান তাদের ধোঁকার শিকার হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাযহাব ও তাকলীদের হাকীকত ও স্বরূপ মুসলমান ভাইদের সামনে তুলে ধরা জরুরী হয়ে পড়েছে, যেন মুসলমান ভাইয়েরা মূল বিষয় সম্পর্কে অবগত হতে পারে এবং তথাকথিত আহলে হাদীস বন্ধুদের ধোঁকার শিকার না হয়।
মাযহাবের বিভিন্নতার কারণ
ইসলামের উৎস মূল কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন শরীফের ছয় হাজার দুইশত ছত্রিশ আয়াতের মধ্য থেকে মাত্র পাঁচশত আয়াত শরী‘আতের হুকুম সম্পর্কীয়। আর হাদীসের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য থেকে মাত্র তিন হাজার হাদীস ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কীয়। অথচ শরী‘আতের মাসআলা মাসাইলের সংখ্যা লক্ষাধিক। তাই সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে যে, কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি সব কিছুর সমাধান সবিস্তার উল্লেখ করা হয়নি। বরং এখানে সামান্য কিছু হুকুম-আহকাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে আর বাকিগুলো মূলনীতি আকারে উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। এই মূলনীতির আলোকে ইসলামী শরী‘আতের বড় বড় আলেমগণ যাদেরকে আমরা মুজতাহিদ বলে থাকি তারা মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি সমস্ত সমস্যার সমাধান সবিস্তার সংকলন করে গেছেন। যারা সাধারণ মুসলমান অর্থাৎ ইসলামী শরী‘আতের উৎস মূল কুরআন-সুন্নাহ পড়তে জানে না, পড়তে জানলেও অর্থ জানে না, অর্থ জানলেও মর্ম বোঝে না, মর্ম বুঝলেও কুরআন-সুন্নাহ থেকে গবেষণা করে মাসআলা-মাসায়েল বের করার যোগ্যতা রাখে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ হলো ‘তোমরা না জানলে যারা জানে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে নাও’।সূরা: নাহল:৪৩, আম্বিয়া:৭
এককথায় বলা যায়, এমন মুসলমান যারা মুজতাহিদ নয় (সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে যে কোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারে না) তারা মুজতাহিদগণের অনুসরণ করে চলবে। এটাই আল্লাহ তা‘আলার হুকুম। আর এমন মুজতাহিদ যারা মানুষের জীবনের প্রায় সমস্ত অধ্যায়ের সমস্যার সমাধান সংকলন করেছেন তারা চারজন। ইমাম আবূ হানীফা রহ., ইমাম মালেক রহ., ইমাম শাফেয়ী রহ. ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.।
সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনদের যুগে এই চারজন ছাড়া আরো অনেক মুজতাহিদ ছিলেন। কিন্তু তারা মানুষের জীবনের সমস্ত অধ্যায়ের সমাধান দিয়ে যাননি কিংবা তাদের সমাধানগুলি পরিপূর্ণরূপে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়নি। তাই এই চারজন মুজতাহিদ কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মুসলমানদের জীবন পরিচালনার যে সবিস্তার সমাধান সংকলন করে গেছেন যাকে এককথায় আমরা মাযহাব বলে থাকি, মুসলমানরা আজ অবধি তাই অনুসরণ করে আসছে। এক পর্যায়ে মুসলিম উম্মাহর মাঝে এ ব্যাপারে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয় যে, যে কোনো মুসলমানের জন্য এই চার মাযহাবের যে কোনো একটি অনুসরণ করা জরুরী। চার মাযহাব মূলত ইসলাম নামক বৃক্ষে আরোহণের চারটি সোপান। যে কেউ এই চার মাযহাবের যে কোনো একটি অনুসরণ করবে, সে পরকালে অবশ্যই মুক্তি পাবে। ইনশাআল্লাহ।
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা উচিত যে, ইসলামের মূল বিষয় অর্থাৎ ঈমান-আকীদা ও ফরয হুকুম-আহকাম নিয়ে চার মাযহাবের মধ্যে কোনো মতানৈক্য নেই। এ ব্যাপারে চারো মাযহাব এক। আর কুরআন-সুন্নাহের মধ্যে যে-সব হুকুম স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে তাতেও কোনো মতানৈক্য নেই। এসব ক্ষেত্রে চারও মাযহাবের হুকুমই এক ও অভিন্ন। ইখতিলাফ বা মতের পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে কেবল শাখা-গত বিষয়ে এবং ঐসব মাসাইলের মধ্যে যা কুরআন-সুন্নাহ এর মধ্যে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়নি।
মাযহাব একাধিক হল কেন?
এখন প্রশ্ন মাযহাব একটি হলে তো হয়, মাযহাব একাধিক হল কেন? সব মুসলমান একই মাযহাবের অনুসারী হত এবং মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও একতা ঠিক থাকতো।
এর জবাব হলো, স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছাই হয়তো এমন ছিল যে, মাযহাব একাধিক সৃষ্টি হোক। তাই তিনি কুরআনের শব্দগুলি এমনভাবে অবতীর্ণ করেছেন যে, সেখান থেকে একাধিক অর্থ বুঝার সুযোগ রেখে দিয়েছেন। এমনিভাবে নবীজী صلى الله عليه وسلم এর ইচ্ছাও এমন ছিল যে, একাধিক মাযহাব সৃষ্টি হোক। তাই অনেক হাদীসের শব্দ এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেখান থেকে একাধিক অর্থ নেওয়া যায়। উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
কুরআনের উদাহরণ
কুরআন শরীফে আল্লাহ তা‘আলা তালাকপ্রাপ্তা
মহিলাদের ইদ্দতের আলোচনায় বলেনঃ
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوء
‘তালাকপ্রাপ্তা মহিলারা তিন “কুরু” ইদ্দত পালন করবে’। (সূরা: বাকারা:২২৮) قُرُوء (কুরু) শব্দের অর্থ আরবী অভিধানে হায়েয ও পবিত্রতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কুরু শব্দের অর্থ যেমনিভাবে হায়েয হয় তেমনিভাবে পবিত্রতাও হয়। আর এই দুই অর্থের সমর্থনে হাদীসও পাওয়া যায়। যেমন হযরত আয়েশা, ইবনে আব্বাস, যায়েদ বিন সাবেতসহ আরো অনেক সাহাবি রাযি. থেকে কুরু শব্দের অর্থ পবিত্রতা বর্ণিত আছে। আবার হযরত আবূ বকর সিদ্দীক, উমর ফারূক, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ সহ আরো অনেক সাহাবা রাযি. ও তাবেঈন থেকে কুরু এর অর্থ হায়েয বর্ণিত আছে। একই শব্দের বিপরীতমুখী অর্থের কারণে এখানে এই মাসআলায় দুই মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম মালেক ও শাফেয়ী কুরু এর অর্থ পবিত্রতা গ্রহণ করে বলেন, এমন তালাকপ্রাপ্তা মহিলা যে ঋতুবর্তী (গর্ভবতী নয়) সে তিন পবিত্রতা ইদ্দত পালন করবে। আর ইমাম আবূ হানীফা ও আহমাদ বিন হাম্বল রহ., কুরু এর অর্থ হায়েয গ্রহণ করে বলেছেন, ঋতুবতী তালাকপ্রাপ্তা মহিলা তিন হায়েয ইদ্দত পালন করবে।বিস্তারিত জানতে তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা বাকারা:২২৮
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী, তাই তিনি অবশ্যই জানতেন যে, কুরআনের এই কুরু শব্দ নিয়ে একাধিক মত বা মাযহাব সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তা‘আলা যদি ইসলামী শরী‘আতের মধ্যে একাধিক মাযহাবের সৃষ্টি না চাইতেন, তাহলে এখানে কুরু শব্দ ব্যবহার না করে তুহুর-হায়েয বা এ জাতীয় অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করে একাধিক অর্থ গ্রহণের সম্ভাবনা বন্ধ করে দিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা সব কিছু জানা সত্ত্বেও তা করেননি। এর দ্বারা একথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, একাধিক মাযহাব সৃষ্টি হওয়ার মধ্যে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
হাদীসের একটি উদাহরণ
খন্দক যুদ্ধ চলাকালীন ইয়াহুদী গোত্র বনী কুরাইযা মুসলমানদের সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে গাদ্দারী করে। তাই খন্দক যুদ্ধ শেষে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বনী কুরাইযার সাথে জিহাদ করার হুকুম আসে। হুকুম আসামাত্র নবীজী صلى الله عليه وسلم সাহাবা রাযি. কে খুব দ্রুত বনীকুরাইযার এলাকায় পৌঁছার হুকুম দেন। সেই হুকুমের শব্দটি ছিল এরূপঃ
لا يصلين أحد العصر إلا في بني قريظة
‘তোমাদের কেউ যেন বনী কুরাইযায় পৌঁছার আগে আসরের নামায না পড়ে’। (বুখারী হা.নং ৩৮৩৯) এই নির্দেশ পেয়ে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. বনী কুরাইযা অভিমুখে নিজেদের সাধ্যমত দ্রুত ছুটলেন। কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও আছরের ওয়াক্তের মধ্যে বনী কুরাইযায় পৌঁছতে পারলেন না। এদিকে পথিমধ্যেই আসরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার অবস্থা। তখন সাহাবা কেরাম রাযি. দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেলেন। একদল নবীজী صلى الله عليه وسلم এর কথার বাহ্যিক অর্থ ধরে বললেন, যেহেতু নবীজী صلى الله عليه وسلم বনী কুরাইযায় না পৌঁছে আসর পড়তে নিষেধ করেছেন, তাই আমরা বনী কুরাইযায় পৌঁছেই মাগরিবের ওয়াক্তে আসর পড়ব। আরেক দল যারা নবীজী صلى الله عليه وسلم কথার মর্ম বুঝেছিলেন তাঁরা বললেন, নবীজী صلى الله عليه وسلم এর ঐ কথার উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বনী কুরাইযায় পৌঁছা। আমরা যেহেতু সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেও আসরের ওয়াক্তে বনী কুরাইযায় পৌঁছতে পারিনি, তাই আমরা আসর কাযা না করে এখনই আসর পড়ে তারপর বনী কুরাইযায় পৌঁছবো। উভয় দল নিজেদের মতানুযায়ী আমল করলেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি. বলেন, বনী কুরাইযার যুদ্ধ শেষে যখন এই ঘটনা নবীজী صلى الله عليه وسلم কে বলা হলো, তখন তিনি কোনো দলের কাজকেই ঠিক বা ভুল বলেননি।সহীহ বুখারী হা.নং ৩৮৩৯
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবীজী صلى الله عليه وسلم এর বাণী ‘তোমাদের কেউ যেন বনী কুরাইযায় পৌঁছার আগে আসরের নামায না পড়ে’ এই বাণীর দুই রকম অর্থ সাহাবায়ে কেরাম বুঝলেন এবং দুই ভাবে আমলও করলেন। আর নবীজী صلى الله عليه وسلم ও কোনো দলের সিদ্ধান্তকে ঠিক আর কোনো দলের সিদ্ধান্তকে ভুল বললেন না। এর দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, নবীজী صلى الله عليه وسلم এর ইচ্ছাও এমন ছিল যে, শরী‘আত মানার ক্ষেত্রে একাধিক মত ও পথ তৈরি হোক। কেননা যদি নবীজী صلى الله عليه وسلم এর ইচ্ছা এমনটি নাই হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই সাহাবায়ে কেরামের দুই দলের এক দলকে বলতেন ‘তোমাদের কাজ ঠিক হয়নি, তোমরা আমার কথা বুঝতে পারনি’। কিন্তু তিনি এমনটি বলেননি। আর তিনি হুকুমটাও এমনভাবে করেছেন যে, তা থেকে দুই রকম অর্থ বোঝার সুযোগও ছিল। অথচ তিনি কথাটা ওভাবে না বলে এভাবেও বলতে পারতেন যাতে দুই রকম অর্থ বুঝার সম্ভাবনা সৃষ্টি হত না । যেমন তিনি এভাবে বলতে পারতেনঃ ‘আসর কাযা করতে হলেও তোমরা বনী কুরাইযায় গিয়েই আসর পড়বে।’ এভাবে বললে সাহাবা কেরাম দুই রকম অর্থ বুঝতেন না। আর দুই মতেরও সৃষ্টি হত না।
যাই হোক কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হলো যে, শরী‘আত মানার ক্ষেত্রে একাধিক মাযহাব সৃষ্টি হওয়া স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা ও নবীজী صلى الله عليه وسلم এর ইচ্ছা ছিল। তাই এই প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর যে, ইসলামে এত দল, এত মত কেন? সাথে সাথে মুসলিম উম্মাহকে যে কোনো এক মত বা মাযহাবের উপর ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করাও আল্লাহ তা‘আলার মর্জির খেলাফ। সালফে সালেহীন মাযহাবের এই ইখতিলাফকে রহমত বলে অভিহিত করেছেন। এবং তারা মুসলিম উম্মাহকে একই মাযহাবের উপর আমল করতে উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করেছেন। নিম্নে এ ব্যাপারে সালফে সালেহীনের কয়েকটি উক্তি উল্লেখ করা হচ্ছেঃ
১. কাসেম বিন মুহাম্মাদ বিন আবূ বকর সিদ্দীক রহ. বলেনঃ ‘আমলের মধ্যে সাহাবায়ে কেরামের ইখতিলাফের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের কল্যাণ করেছেন। এখন যে কেউ কোনো আমল করতে চাইলে সে এ ব্যাপারে প্রশস্ত পথ পেয়ে যায়। সে দেখে যে, তার থেকে উত্তম ব্যক্তি এই আমল করে গেছেন।’জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি:২/৮০
২. হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহ. বলেছেন: ‘সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এর মধ্যে ইখতিলাফ না হওয়াটা আমার নিকট পছন্দনীয় নয়। কারণ, যদি ইখতিলাফ না হত, শরী‘আত মানার পথ একটিই হত, তাহলে এর দ্বারা এক ধরণের সংকীর্ণতা সৃষ্টি হত। অথচ সাহাবায়ে কেরাম যেহেতু প্রত্যেকেই অনুসরণীয় তাই (তাদের মধ্যে ইখতিলাফ হওয়ার ফলে এখন) যে কারো যে কোনো সাহাবীর মতানুযায়ী আমল করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।’
৩. একদা হযরত ইমাম মালেক রহ. কে তখনকার মুসলিম জাহানের খলীফা আবূ জা‘ফর মানসূর বললেন, আমি চাচ্ছি আপনার সংকলিত এই ইলম (মুআত্তা মালেক) কে একমাত্র অনুসরণীয় করবো এবং সেনাবাহিনী ও বিচারক সবাইকে এই অনুযায়ী আমল করতে বলব। অতঃপর কেউ এটার বিরোধিতা করলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব। ইমাম মালেক রহ. বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! একটু ভেবে দেখুন। নবীজী صلى الله عليه وسلم এমন অবস্থায় উম্মতের মধ্য থেকে বিদায় নিলেন যখন মাত্র কয়েকটি এলাকা ইসলামের অধিনে এসেছে। এরপর হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. এর সময়ও ইসলাম তেমন ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়নি। হযরত উমর ফারূক রাযি. এর সময় ইসলাম পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়লো। অনেক দেশ মুসলমানদের করতলগত হল। তখন তিনি বিজিত এলাকার মুসলমানদের ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার জন্য বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করতে বাধ্য হলেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত সেসব এলাকায় ঐসব সাহাবায়ে কেরামের ইলম চর্চা হতে লাগল যাদেরকে ঐ এলাকার মুআল্লিম হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছিল। এখন আপনি যদি সেসব লোককে এমন কোনো বিষয় মানতে বাধ্য করেন যা তাদের নিকট সংরক্ষিত ইলমের পরিপন্থী, তাহলে তারা এটাকে কুফরী মনে করবে। অতএব, আপনি দয়া করে প্রত্যেক শরহবাসীকে তাদের নিকট যে ইলম সংরক্ষিত আছে, সে ইলম অনুযায়ী আমল করতে বলুন। আর আপনার পছন্দ হলে এই কিতাব আপনি নিজের জন্য নিতে পারেন। একথা শুনে খলীফা বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। এই কিতাব আপনি আমার ছেলে মুহাম্মাদের জন্য লিখে দিন।’ (আদাবুল ইখতিলাফ পৃ.৩৬)
৪. ইমাম মালেক রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘ফুকাহা কেরামের ইখতিলাফ এই উম্মতের জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ।’ (আদাবুল ইখতিলাফ পৃ.৩৯)
উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হলো যে, শরী‘আত মানার ক্ষেত্রে একাধিক পথ সৃষ্টি হওয়া কোনো দোষণীয় বিষয় নয়। বরং এটা এই উম্মতের জন্য রহমত এবং এটা উম্মতে মুহাম্মাদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অতএব, একাধিক মাযহাব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা এবং যে এলাকায় যে মাযহাব প্রচলিত আছে সেই এলাকার লোকদেরকে তাদের মাযহাব পরিপন্থী কোনো কিছু মানার আহ্বান করা কুরআন-সুন্নাহ ও সালফে সালেহীনের আমলের পরিপন্থী। তাই যারা এ কাজ করছে, তাদের উচিত আরো একটু গভীরভাবে ভেবে দেখা। তারা কি আসলেই মুসলিম উম্মাহর খায়েরখাহী করছে নাকি মুসলিম উম্মাহকে ফেতনা-ফাসাদ ও সংঘর্ষের পথে নিয়ে যাচ্ছে। ইমাম মালেক রহ. নিজের মাযহাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়েও তিনি সেই সুযোগ গ্রহণ করলেন না, বরং খলীফার কাছে আবেদন করলেন প্রত্যেক এলাকাবাসীকে নিজেরদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়ার জন্য। বর্তমানে যারা হানাফী মাযহাব মাননেওয়ালা মুসলিমদেরকে মাযহাব বিমুখ করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত তারা কি নিজেদেরকে ইমাম মালেক থেকেও বেশি সমঝদার মনে করেন যে, তারা হানাফী মুসলিমদেরকে নিজেদের মনগড়া মাযহাবের প্রতি আহ্বান করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলছেন? আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।
তাকলীদ না করার পক্ষের দলীল ও তার পর্যালোচনা
তাকলীদ না করার পক্ষে যাদের কথা দলীল হিসাবে পেশ করা হয়ে থাকে:
আমাদের আহলে হাদীস বন্ধুরা অতীতের কয়েকজন আলেমের উক্তির অপব্যবহার করে কারো তাকলীদ করাকে নাজায়েয ও শিরক প্রমাণ করতে চায়। তারা সাধারণত যে কয়জন উলামায়ে কেরামের উক্তিকে নিজেদের পক্ষে উল্লেখ করে থাকেন তারা বাস্তবেই ঐ কথা বলেছেন কিনা বা বলে থাকলেও কার জন্য কোন্ প্রেক্ষাপটে বলেছেন, তা আমরা যাচাই করে দেখার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.
তারা সবচেয়ে বেশি যার কথা উল্লেখ করে তিনি হলেন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.। অথচ তাকলীদ জায়েয হওয়ার পক্ষে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এত উক্তি করেছেন যে, তা যদি একত্রিত করা হয়, তাহলে একটি মাঝারি আকৃতির একটি পুস্তক হয়ে যাবে। আমরা তাকলীদ বৈধ হওয়ার পক্ষে তার কয়েকটি উক্তি উল্লেখ করছি:
والذى عليه جماهير الامة ان الاجتهاد جائز فى الجملة والتقليد جائزفى الجملة… والتقليد جائز للعاجز عن الاجتهاد.
‘উম্মাতের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতামত হলো বাস্তবে ইজতিহাদ করা জায়েয আর তাকলীদ করাও জায়েয… যে ব্যক্তি ইজতিহাদ করতে পারে না তার জন্য তাকলীদ করা বৈধ।’ (মাজমূআতুল ফাতাওয়া:২০/২০৩)
ইবনে তাইমিয়া রহ. আরো বলেনঃ
من كان عاجزا عن معرفة حكم الله ورسوله وقد اتبع فيها من هو من اهل العلم والدين ولم يتبين له ان قول غيره ارجح منه فهو محمود يثاب لايذم على ذالك ولايعاقب.
‘যে ব্যক্তি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম-আহকাম জানতে অক্ষম, সে যদি এ ক্ষেত্রে দ্বীনদার কোনো আলেম (মুজতাহিদ)-এর অনুসরণ করে এবং তার পক্ষে এটা জানা সম্ভব না হয় যে, অন্য ইমামের উক্তি তার অনুসরণীয় ইমামের উক্তির চেয়ে প্রাধান্যপ্রাপ্ত, তবুও সে প্রশংসার যোগ্য এবং সে সাওয়াবের অধিকারী হবে, এই তাকলীদের জন্য তাকে তিরস্কার করা যাবে না এবং আখেরাতেও সে শাস্তিযোগ্য সাব্যস্ত হবে না।’ (মাজমূআতুল ফাতাওয়া:২০/২২৫)
ইবনে তাইমিয়া রহ. এই উক্তি দ্বারা এ কথা পরিষ্কার বুঝে আসে যে, যে ব্যক্তি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে হুকুম-আহকাম উদঘাটন করতে অক্ষম তার জন্য উচিত হলো দ্বীনদার কোনো মুজতাহিদের তাকলীদ করা । আর এ কথা স্পষ্ট যে, বর্তমান পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকজন বড় বড় আলেম ছাড়া সবার অবস্থাই এমন যে, তারা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে হুকুম-আহকাম উদঘাটন করার যোগ্যতা রাখে না। তাই ইবনে তাইমিয়া রহ. এর উক্তি অনুযায়ী বর্তমান পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমেরই উচিত কোনো না কোনো মাযহাবের তাকলীদ করা।
ইবনে তাইমিয়া রহ. আরো বলেনঃ
المقلد يقلد السلف اذ القرون المتقدمة افضل مما بعدها.
‘যারা তাকলীদ করবে তাদের জন্য উচিত হলো সালফে সালেহীনের তাকলীদ করা। কারণ পূর্বের শতাব্দী পরবর্তী শতাব্দী থেকে উত্তম।’ (মাজমূআতুল ফাতাওয়া:২০/৯)
ইবনে তাইমিয়া রহ. আরো বলেনঃ
مسائل الاجتهاد من عمل فيه بقول بعض العلماء لم ينكر عليه ولم يهجر واذا كان فى المسألة قولان فان كان الانسان يظهرله رجحان احد القولين عمل به والا قلد بعض العلماء الذين يعتمد عليهم.
‘ইজতিহাদী মাসাইলের মধ্যে যদি কেউ কোনো আলেম (মুজতাহিদ)-এর উক্তি অনুযায়ী আমল করে, তাহলে তাকে কোনো দোষ দেওয়া যাবে না এবং তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। যদি কোনো মাসআলার ক্ষেত্রে দুই ধরনের উক্তি থাকে আর সে যদি এমন হয় যে, তার কাছে কোনো এক উক্তি (দলীলের বিবেচনায়) প্রাধান্য পায়, তাহলে সে সে অনুযায়ী আমল করবে, অন্যথায় যে আলেমের উপর তার আস্থা হয় তার তাকলীদ (অনুসরণ) করবে।’ (মাজমূআতুল ফাতাওয়া:২০/২০৭)
ইবনে তাইমিয়া রহ. এর উপরোক্ত উক্তিসমূহের সারকথা এই যে, তিনি এমন যোগ্যতাসম্পন্ন আলেমকে তাকলীদ করতে নিষেধ করেছেন, যে নিজেই কুরআন-সুন্নাহ ঘেটে পূর্ববর্তী ইমামদের উক্তির মধ্যে থেকে প্রাধান্যপ্রাপ্ত ও অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত নির্ণয় করতে পারে। আর যার এমন যোগ্যতা নেই তাকে তিনি তাকলীদ করতে বলেছেন। অতএব, ব্যাপকভাবে এ কথা বলা যে, ইমাম ইবনে তাইমিয়া তাকলীদকে নাজায়েয বলেছেন তা তাঁর উপর অপবাদ বৈ কিছু নয়।
ইবনুল কাইয়্যিম ও তাকলীদ
আহলে হাদীস ভাইয়েরা তাকলীদ করা যাবে না মর্মে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর উক্তি বেশ জোশের সাথে উল্লেখ করে থাকে। অথচ তাকলীদ সম্পর্কে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর অবস্থান পরিষ্কার নয়। কারণ তিনি ‘ইলামুল মুআক্কিয়ীন’-এ তাকলীদ সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী কথা বলেছেন। তাকলীদ আলোচনার শুরুতেই তিনি বলেনঃ
ذكر تفصيل القول فى التقليد. وانقسامه الى ما يحرم القول فيه والافتاء به والى ما يجب المصير اليه و الى مايسوغ من غير ايجاب.
‘তাকলীদের বিস্তারিত আলোচনাঃ তাকলীদ কখনো হারাম, কখনো ওয়াজিব ও কখনো জায়েয হয়, এই তিন প্রকার তাকলীদের বর্ণনা।’ (ই‘লামুল মুআক্কিয়ীন:২/১৬৮)
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. উপরিউক্ত কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, তাঁর মতে তাকলীদ তিন প্রকারঃ ১. এমন তাকলীদ যা হারাম। হারাম তাকলীদের মধ্যে তিনি আলাদাভাবে তিন প্রকার তাকলীদকে উল্লেখ করেছেনঃ ক. আল্লাহ তা‘আলার হুকুম থেকে বিমুখ হয়ে বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণ। খ.এমন ব্যক্তির তাকলীদ করা যার সম্পর্কে জানা নেই যে, সে বাস্তবে তাকলীদের উপযুক্ত কি না? গ. দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে অনুসৃত ইমামের মতামত কোনো ক্ষেত্রে ভুল প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তার তাকলীদ করা।
এই তিন ধরনের তাকলীদকে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. হারাম বলেছেন। আমরাও এই তিন প্রকার তাকলীদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে তাঁর সাথে একমত। আমরাও বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণকে জায়েয বলি না, আর এমন ইমামের তাকলীদ আমরা করি না বা করতে বলি না যার অবস্থা সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। আর ইমামের কোনো মতামত দলীল প্রমাণের আলোকে ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও সেক্ষেত্রে আমরা তার তাকলীদ করাকে জায়েয মনে করি না। মোটকথা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর এই মতামতের সাথে আমাদেরও কোনো বিরোধ নেই।
এই আলোচনার একটু পরে তিনি বলেনঃ
واما تقليد من بذل جهده فى اتباع ما انزل الله وخفى عليه بعضه فقلد فيه من هو اعلم منه فهذا محمود غير مذموم ومأجور غيرمأزور كما سيأتى بيانه عنده ذكر التقليد الواجب والسائغ ان شاءالله.
‘আল্লাহ তা‘আলা যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ করার ব্যাপারে যে ব্যক্তি নিজ সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে, আর যে বিষয়গুলো নিজে বুঝতে পারে না সে বিষয়ে তার চেয়ে বেশি কারো তাকলীদ করে, তাহলে সে প্রশংসনীয় কাজ করলো তাকে তিরস্কার করা হবে না, সে ছাওয়াব পাবে, গুনাহ হবে না। এর বিস্তারিত বর্ণনা ওয়াজিব ও জায়েয তাকলীদের আলোচনায় আসছে।’ (ই‘লামুল মুআক্কিয়ীন:২/১৬৯)
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর এই উক্তি মূলত ঐ বড় আলেমের জন্য যে নিজে নিজেই কুরআন-সুন্নাহ থেকে হুকুম আহকাম উদঘাটন করতে পারে। যে অংশ তার বুঝে আসে না সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো বড় আলেমের তাকলীদ করে।
আমাদের মতামতও এক্ষেত্রে ইবনুল কাইয়্যিম থেকে ভিন্ন নয়। কারণ এমন আলেম যে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে হুকুম-আহকাম উদঘাটন করতে পারে (যার মধ্যে একধরনের ইজতিহাদের যোগ্যতা এসে গেছে) তার জন্য আমরা নির্দিষ্ট কোনো ইমামের তাকলীদকে জরুরী বলি না।
এতটুকু পর্যন্ত ইবনুল কাইয়্যিম রহ. কথা ঠিক ছিল। কিন্তু এরপর তিনি ৮০-৯০ পৃষ্ঠা ব্যাপী দীর্ঘ আলোচনা করে সব ধরনের তাকলীদকে নাজায়েয ও হারাম প্রমাণের প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। এমন কি এমন সাধারণ মুসলিম যে কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে কিছুই জানে না সেও যদি তাকলীদ করে তাকেও তিনি মূর্খ ও গোমরাহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেনঃ
المقلد ان كان يعرف ما انزل الله على رسوله فهو مهتد وليس بمقلد وان كان لم يعرف ما انزل الله على رسوله فهو جاهل ضال باقراره على نفسه. اعلام الموقعين:٢/١٧٠
এখানে তিনি তাকলীদ ও মুকাল্লিদদের সমালোচনায় এত নিমগ্ন হয়ে গেছেন যে, ইতোপূর্বে ওয়াজিব ও জায়েয তাকলীদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবেন বলে যে ওয়াদা তিনি করেছিলেন, তাও বে-মালুম ভুলে গেছেন। এই দীর্ঘ প্রায় ৯০ পৃষ্ঠার আলোচনায় তিনি ওয়াজিব ও জায়েয তাকলীদ সম্পর্কে কোনো আলোচনাই আর করেন নি।
তাকলীদ সম্পর্কে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর আলোচনা মনোযোগসহ যে-ই অধ্যায়ন করবে, তার জন্য এই ফলাফলে পৌঁছা কষ্টকর হবে না যে, তাকলীদ সম্পর্কে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর মতামত অসম্পূর্ণ ও পরস্পর বিরোধী। কোনো আলেমের অসম্পূর্ণ ও পরস্পর বিরোধী মতামতকে নিজেদের পক্ষের বড় দলীল মনে করা চরম মূর্খতা ছাড়া আর কী হতে পারে! অবশ্য তার কথা দ্বারা এতটুকু প্রমাণিত হয়েছে যে, তার মতে তাকলীদের এমন একটি প্রকার আছে যা জায়েয, আর এমন একটি প্রকারও আছে যা ওয়াজিব। কিন্তু তিনি মুকাল্লিদদের দোষ বর্ণনা করতে গিয়ে সেগুলোর আলোচনা ভুলে গেছেন।
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব ও তাকলীদ
আহলে হাদীস ভাইদের কাছে তাকলীদ না করার ব্যাপারে আরেকজন মান্যবর ব্যক্তি হলেন শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহ.। তাকলীদ করা যাবে না মর্মে তারা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহ. এর উক্তিও দলীল হিসাবে পেশ করে থাকেন। অথচ আমাদের জানা মতে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব নজদী রহ. চার মাযহাবের মধ্য থেকে কোনো মাযহাবের তাকলীদ করতে নিষেধ করেননি। বরং তিনি নিজে, তার পুত্র ও তার সিলসিলার (সালাফী সিলসিলার) অন্যান্য আলেমগণ সবাই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. এর মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব তাঁর উপর উত্থাপিত কিছু অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে বলেনঃ
منها قوله انى مبطل كتب المذاهب الاربعة وانى اقول ان الناس من ست مائة سنة ليسوا على شي ء وانى ادعى الاجتهاد وانى خارج عن التقليد… جوابى عن هذه المسائل ان اقول : سبحانك هذا بهتان عظيم.
‘সে সব অভিযোগের মধ্য থেকে কয়েকটি এইঃ আমি না কি বলি ১. চার মাযহাবের কিতাবসমূহ বাতিল ২. হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে মুসলমানরা ভিত্তিহীন জিনিসের উপর আমল করে আসছে ৩. আমি মুজতাহিদ হওয়ার দাবীদার, আমি তাকলীদ করি না । এসব অভিযোগের জবাবে আমি শুধু এতটুকুই বলবো, আল্লাহর কসম এগুলি সবই আমার উপর আরোপিত অপবাদ বৈ কিছু নয়।’ (আররাসাইলুশ শাখসিয়া:পৃ.৪)
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহ. এর পুত্র শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ যিনি পিতার মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন, তিনি বলেনঃ
ونحن ايضا فى الفروع على مذهب الامام احمد بن حنبل رحمه الله ولا ننكر على من قلد احد الاربعة دون غيرهم لعدم ضبط مذاهب الغير.
‘ফিকহী মাসাইলের ক্ষেত্রে আমরা আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর তাকলীদ করা। আর যে ব্যক্তি চার মাযহাবের মধ্যে থেকে কোনো একটির তাকলীদ করে আমরা তার উপর কোনো অভিযোগ করি না। তবে আমরা (চার মাযহাব ছাড়া) অন্য কোনো মাযহাবের উপর চলতে দেই না কারণ, অন্য মাযহাব সংকলিত ও সংরক্ষিত নয়।’ (আদ্দুরারুস সানিয়্যাহ ফিল আজবিবাতিন নাজদিয়্যাহ:১/২২৭)
শায়েখ মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াহাব রহ. এর সিলসিলার একজন বড় আলেম ও দাঈ শায়েখ মুহাম্মাদ আল উসাইমীন রহ. তাকলীদের দুইটি প্রকার উল্লেখ করতে গিয়ে বলেনঃ
احدها ان يكون المقلد عاميا لا يستطيع معرفة الحكم بنفسه ففرضه التقليد.
‘তাকলীদের একটি প্রকার হলো; তাকলীদকারী এমন সাধারণ লোক হওয়া, যে নিজে নিজে (কুরআন-সুন্নাহ থেকে) বিধান উদঘাটন করতে পারে না, সে ক্ষেত্রে তার ফরয হলো তাকলীদ করা।’ (আল উসূল মিন ইলমিল উসূল:পৃ.৮৭)
সারকথা, নির্ভরযোগ্য সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, সাধারণ মুসলিমদের জন্য চার মাযহাবের যে কোনো এক মাযহাবের তাকলীদ করা জরুরী। তবে কুরআন-সুন্নাহ উপর বিশেষ পাণ্ডিত্যের অধিকারী আলেমের নিকট যদি তার অনুসৃত ইমামের কোনো বিশেষ মাসআলা নিজ গবেষণা অনুযায়ী কুরআন সুন্নাহর অন্য কোনো দলীলের বিরোধী সাব্যস্ত হয়, সে ক্ষেত্রে তার জন্য ঐ মাসআলার মধ্যে চার মাযহাবের মধ্য থেকে অন্য কোনো মাযহাব মানার এখতিয়ার থাকবে। বরং ইমামের মত নিশ্চিতভাবে ভুল প্রমাণিত হলে,তার জন্য ঐ মাসআলায় নিজ গবেষণা অনুযায়ী অন্যমত গ্রহণ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।
আমাদের আহলে হাদীস বন্ধুরা বাংলা বই থেকে দুই একটি হাদীসের অনুবাদ পড়ে নিজেকে কুরআন-সুন্নাহের ব্যাপারে বিশেষ পাণ্ডিত্যের অধিকারী মনে করলে তাদেরকে কিছু বলার মতো ভাষা আমাদের নেই। আহলে হক উলামায়ে কেরাম ৫০-৬০ বছর যাবৎ লাগাতার কুরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন করার পরও নিজেকে ঐ স্তরের বিজ্ঞ আলেম মনে করার সাহস পায় না যাদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ইমামের মতের বিরূদ্ধে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ আহলে হাদীস বন্ধুরা দু‘চারটা হাদীস মুখস্থ করে নিজেকে কেমন যেন সেই পর্যায়ের আলেম ভাবতে শুরু করে দেয়। আল্লাহ তা‘আলার কাছেই সকল অভিযোগ।
আহলে হাদীস বন্ধুরা যদিও তাকলীদ না করার দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে তারা আহলে হাদীস পণ্ডিতদের তাকলীদ করে থাকে। কারণ, আহলে হাদীস পণ্ডিতরা যা বলে দেয় সাধারণ আহলে হাদীস ভাইয়েরা অন্ধের মত তাই মুখস্থ করে বলে বেড়ায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আহলে হাদীস ভাইয়েরা তাদের পণ্ডিতদের তাকলীদ করছে, আর আমরা মাযহাব অনুসারীরা নিজ নিজ ইমামের তাকলীদ করছি। সাধারণ আহলে হাদীস ভাইদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, খাইরুল কুরুনের ইমাম, ইমাম আজম আবূ হানীফা রহ. এর তাকলীদ করা উত্তম নাকি বর্তমান যমানার স্কলার আহলে হাদীস পণ্ডিতদের তাকলীদ করা উত্তম? আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

