প্লাবনের ঘটনায় হযরত নূহ (আ.) সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদা হলো, হযরত নূহ (আ.) আল্লাহ তাআলার মহান নবী ও রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর জাতিকে দীর্ঘকাল যাবৎ তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন এবং শিরক ও কুফর থেকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর জাতির কাছে স্পষ্ট সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। কুরআনে তাঁর দাওয়াতের ভাষা উল্লেখ করে বলা হয়েছে
“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য একজন স্পষ্ট সতর্ককারী যাতে তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত না করো।”সূরা হূদ: ২৫–২৬
হযরত নূহ (আ.) অত্যন্ত দীর্ঘ সময় তাঁর জাতির মধ্যে দাওয়াতের কাজ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর অবশ্যই আমি নূহকে তার জাতির কাছে পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তিনি তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন।” সূরা আল-আনকাবূত: ১৪
তিনি রাত-দিন, প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর জাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “সে বলল, হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমি আমার জাতিকে রাত-দিন আহ্বান করেছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নই বৃদ্ধি করেছে।”সূরা নূহ: ৫–৬
অবশেষে যখন তাঁর জাতি ঈমান আনতে অস্বীকার করল এবং অবাধ্যতায় অটল থাকল, তখন আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ (আ.)-কে নৌকা নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং মহাপ্লাবনের মাধ্যমে কাফিরদের ধ্বংস করেন। আল্লাহর নির্দেশে নূহ (আ.) এবং তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনরা নৌকায় আরোহণ করেন এবং আল্লাহ তাঁদেরকে রক্ষা করেন।
কুরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে“অতঃপর আমি তাকে এবং নৌকার আরোহীদের রক্ষা করলাম এবং এটিকে সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি নিদর্শন করলাম।” সূরা আল-আনকাবূত: ১৫
প্লাবনের সময় হযরত নূহ (আ.)-এর একজন অবিশ্বাসী পুত্রও নৌকায় উঠতে অস্বীকার করেছিল। নূহ (আ.) তাকে ঈমানদারদের সঙ্গে নৌকায় উঠতে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু সে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার কথা বলে। শেষ পর্যন্ত প্রবল ঢেউ তাদের উভয়ের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে যায় এবং সে ডুবে যায়। সূরা হূদ: ৪২–৪৩
এ ঘটনা থেকে আহলে সুন্নাতের আকীদার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয় নবীর নিকট আত্মীয় হওয়া মুক্তির নিশ্চয়তা নয়; ঈমান ও নেক আমলই নাজাতের মূল কারণ। হযরত নূহ (আ.)-এর পুত্র হওয়া সত্ত্বেও সে ঈমান না আনার কারণে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পায়নি।
আর হযরত নূহ (আ.) নিজে আল্লাহর নবী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত দৃঢ় ও নিষ্ঠাবান ছিলেন। কুরআন তাঁকে “কৃতজ্ঞ বান্দা” হিসেবে উল্লেখ করেছে, “নিশ্চয়ই সে ছিল একজন কৃতজ্ঞ বান্দা।” সূরা আল-ইসরা: ৩
রাসূলুল্লাহ ﷺ কিয়ামতের দিন হযরত নূহ (আ.) সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি পৃথিবীবাসীর প্রতি প্রেরিত প্রথম রাসূল। মানুষ তাঁর কাছে সুপারিশের জন্য যাবে এবং বলবে যে, আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীবাসীর প্রতি প্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। সহীহ বুখারী: ৪৪৭৬; সহীহ মুসলিম: ১৯৩
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিতে হযরত নূহ (আ.) ছিলেন আল্লাহর নির্বাচিত মহান রাসূল, তাওহীদের দাওয়াতদাতা এবং তাঁর জাতির জন্য দীর্ঘকাল সতর্ককারী নবী। প্লাবনের ঘটনা তাঁর নবুওয়াতের সত্যতা, আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্য এবং মুমিনদের জন্য আল্লাহর সাহায্যের এক মহান নিদর্শন। তাঁর সম্পর্কে এমন কোনো ভাষা ব্যবহার করা সমীচীন নয়, যা তাঁকে দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্যুত, জাহিলিয়াতের প্রভাবে আক্রান্ত বা নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করে।
হযরত নূহ (আ.) সম্পর্কে মওদূদীর বক্তব্য
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে মওদূদী লিখেছেন,
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম চিন্তাধারার দিক থেকে দ্বীনের চাহিদা হতে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে জাহিলিয়াতের জযবা স্থান পেয়েছিল।তাফহীমুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৪, ৩য় সংস্করণ, ১৯৬৪ ইং.
এই বক্তব্যের মাধ্যমে হযরত নূহ (আ.)-এর একটি বিশেষ ঘটনার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর চিন্তাধারাকে “দ্বীনের চাহিদা থেকে দূরে” এবং তাঁর মধ্যে “জাহিলিয়াতের জযবা” স্থান পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মওদূদীর বক্তব্যের কুরআন-হাদীসের আলোকে পর্যালোচ
মওদূদীর বক্তব্যটি মূলত হযরত নূহ (আ.)-এর অবিশ্বাসী পুত্রকে নিয়ে তাঁর দোয়ার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এই ঘটনাটি বুঝতে হলে কুরআনের সম্পূর্ণ বর্ণনা দেখতে হবে।
মহাপ্লাবনের সময় হযরত নূহ (আ.) তাঁর পুত্রকে ঈমানের দিকে আহ্বান করেছিলেন
হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ করো এবং কাফেরদের সঙ্গে থেকো না।সূরা হূদ: ৪২
অর্থাৎ নূহ (আ.) তাঁর পুত্রের প্রতি পিতৃসুলভ মমতা দেখালেও তাকে কাফেরদের সঙ্গে থাকতে বলেননি; বরং ঈমান ও নাজাতের দিকে আহ্বান করেছেন।
কিন্তু তাঁর পুত্র বলল
আমি এমন এক পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে।সূরা হূদ: ৪৩
এরপর সে ডুবে গেল।
তখন নূহ (আ.) বললেন,
হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র তো আমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, আর আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য।সূরা হূদ: ৪৫
এখানেই মওদূদীর বক্তব্যের মূল পর্যালোচনার বিষয়।
আল্লাহ তাআলা নূহ (আ.)-কে বললেন
হে নূহ! নিশ্চয়ই সে তোমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়; নিশ্চয়ই তার কর্ম অসৎ।সূরা হূদ: ৪৬
এরপর নূহ (আ.) নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বললেন,
হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আপনার কাছে প্রার্থনা করা থেকে আমি আপনার আশ্রয় চাই। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।সূরা হূদ: ৪৭
এই আয়াতগুলো থেকে দেখা যায়, নূহ (আ.) আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করেননি। আল্লাহ তাআলা যখন তাঁকে বিষয়টি জানিয়ে দিলেন, তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের দোয়া থেকে ফিরে এলেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
এখন প্রশ্ন হলো এ ঘটনাকে কি “চিন্তাধারার দিক থেকে দ্বীনের চাহিদা হতে দূরে সরে যাওয়া” এবং “জাহিলিয়াতের জযবা” বলা যায়?
কুরআনের সামগ্রিক বর্ণনা তা সমর্থন করে না।
কারণ নূহ (আ.) তাঁর পুত্রকে কাফেরদের সঙ্গে থাকতে নিষেধ করেছেন। তাঁর দোয়ার ভিত্তিও ছিল আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং তাঁর পরিবারের ব্যাপারে তাঁর ধারণা। আল্লাহর হুকুম পরিষ্কার হওয়ার পর তিনি বিনা দ্বিধায় নিজের অবস্থান সংশোধন করেছেন।
বরং আল্লাহ তাআলা নূহ (আ.) সম্পর্কে বলেন
নিশ্চয়ই সে ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা।সূরা আল-ইসরা: ৩
আর অন্যত্র আল্লাহ তাঁকে সালাম ও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেছেন
হে নূহ! আমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি এবং তোমার সঙ্গে যারা আছে তাদের প্রতি শান্তি ও বরকত।সূরা হূদ: ৪৮
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কুরআন নূহ (আ.)-কে এমন একজন রাসূল হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যিনি তাঁর জাতিকে দীর্ঘ ৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েছেন,
আর অবশ্যই আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর সে তাদের মধ্যে পঞ্চাশ বছর কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিল।সূরা আল-আনকাবূত: ১৪
এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তাওহীদের দাওয়াত থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে যাননি।
আল্লাহ বলেন
সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য একজন স্পষ্ট সতর্ককারী—তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো।সূরা নূহ: ২–৩
অতএব, একজন রাসূল যিনি শত শত বছর ধরে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন, তাঁর একটি ঘটনায় আল্লাহর কাছে করা দোয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর চিন্তাধারায় “জাহিলিয়াতের জযবা” স্থান পেয়েছিল এভাবে সাধারণীকরণ করা অত্যন্ত আপত্তিকর।
হ্যাঁ, কুরআন নূহ (আ.)-এর দোয়াটি সংশোধন করেছে এবং তিনি নিজেও সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু এটিকে নবীর অন্তরে জাহিলিয়াতের আদর্শ বা চিন্তাধারা প্রবেশ করার অর্থে নেওয়া কুরআনের বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সুতরাং হযরত নূহ (আ.)-এর ঘটনাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হলে বলতে হবে—তিনি আল্লাহর মনোনীত রাসূল, তাওহীদের মহান দাওয়াতদাতা এবং কৃতজ্ঞ বান্দা। তাঁর পুত্রের ব্যাপারে তিনি যে দোয়া করেছিলেন, আল্লাহ তাআলা তা সংশোধন করে দেওয়ার পর তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা মেনে নিয়েছিলেন। অতএব সেই ঘটনাকে “জাহিলিয়াতের জযবা” বলে চিহ্নিত করা নবীর মর্যাদা ও কুরআনের সামগ্রিক উপস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


