ইসলাম

একটি সংশয় নিরসন :“লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ : ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতা; স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা নয়

একটি সংশয় নিরসন :“লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ : ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতা; স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা নয়

কতক সুশীল ও বুদ্ধিজীবী এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা বিভিন্ন টকশো, জনসভা ও সংসদে বলে থাকেন, সকল ধর্মকে এক চোখে দেখতে হবে, কোনো ধর্মকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা যাবে না কিংবা অগ্রহণযোগ্য বলা যাবে না। কারণ, পৃথিবীর সকল ধর্ম সত্য। মানে আমার ইসলাম ধর্মও সঠিক, অন্য ধর্মও সঠিক। এ-জাতীয় বয়ানের প্রবক্তারা এর স্বপক্ষে কুরআন থেকে দলীলও হাযির করে।

তাদের প্রধান দলীল হচ্ছে, ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য। (’সূরা কাফিরুন, (১০১) :৬)

আরেকটি দলীল, ‘অতএব যার ইচ্ছা মুমিন হোক এবং যার ইচ্ছা কাফের হোক। তারা আয়াতের অর্থ ও মর্ম কীভাবে অপব্যাখ্যা ও বিকৃতি করে এসব বক্তব্য দেয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এখানে সবচেয়ে বড় যে ভুল বা প্রতারণা করা হয় তা হলো, ভিন্ন দুটি বিষয়কে একসাথে মিলিয়ে একাকার করে ফেলা।

একটি হচ্ছে, ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতা।

আরেকটি হচ্ছে, ধর্মের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা।

কোনো ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতা কখনো উক্ত ধর্মের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা নয়।

একটি উদাহরণের মাধ্যমে উভয়ের মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট করছি। দুনিয়াতে পরীক্ষার হলে যেভাবে সঠিক উত্তর দেওয়ার সুযোগ ও স্বাধীনতা রয়েছে, তেমনইভাবে ভুল উত্তর দেওয়ারও সমান সুযোগ ও স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু পরীক্ষকের কাছ থেকে একমাত্র সঠিক উত্তরদাতা স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে। ভুল উত্তরদাতা পরীক্ষার হলে পরীক্ষকের কাছ থেকে সুযোগ ও স্বাধীনতা পেলেও কখনো স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

এর সদ্য একটি উদাহরণ হচ্ছে, কওমী সনদ স্বীকৃতি। স্বীকৃতির পূর্বেও কওমী শিক্ষার সুযোগ ও স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু উক্ত শিক্ষার (দরকারি স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও) সরকারি স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। তদ্রূপ প্রত্যেক ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতা আর ধর্মের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা ভিন্ন বিষয়।

দুনিয়া হলো দারুল ইমতিহান বা পরীক্ষার হল, যা এ বইয়ের শুরুতে উল্লেখ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যেহেতু দুনিয়াকে পরীক্ষার হল বানিয়েছেন, তাই পরীক্ষার হলের মতো প্রত্যেককে সুযোগ ও স্বাধীনতা দিয়েছেন। আর এ সুযোগ ও স্বাধীনতার কথা উল্লেখ হয়েছে কুরআনে কারীমের উক্ত দুই আয়াতে।

যেমন : দুনিয়ার পরীক্ষার হলের স্বাধীনতার ইঙ্গিত দিয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘যার ইচ্ছা হয়, (সঠিক উত্তর দিয়ে) মুমিন হও। আর যার ইচ্ছা হয়, ভুল উত্তর দিয়ে) কাফের হও।’

এভাবে এস-এর অর্থ হচ্ছে, এ দুনিয়াতে তোমাদের কুফর ধর্ম ও আমার ইসলাম ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেভাবে পরীক্ষার হলে সঠিক ও ভুল উত্তর প্রদানকারী উভয়কে সুযোগ ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়।

এ কারণেই অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘(সত্য ও সঠিক) ধর্ম গ্রহণে জবরদস্তি নেই।’৩১৬ তথা সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য জবরদস্তি করা যাবে না। কারণ, পরীক্ষার হলে আপনাকে সঠিক ও ভুল উত্তর উভয়টির সুযোগ ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এ সুযোগ ও স্বাধীনতা মানে কখনো কোনো ধর্মের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা নয়। কেননা, আল্লাহ তাআলার কাছে কোন ধর্ম স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা সুস্পষ্ট করে তিনি বলে দিয়েছেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ইসলামই (স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য) দ্বীন-ধর্ম। ’সূরা আলে ইমরান, (৩) : ১১

‘ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন-ধর্ম হিসেবে পছন্দ ও নির্বাচন করলাম। সূরা মায়েদা, (৫) : ৩

পক্ষান্তরে কেউ যদি ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম গ্রহণ করে, তা আল্লাহ তাআলার কাছে স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা তো পাবেই না; বরং এর পরিণতিও জানিয়ে দিয়েছেন।

ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে, তা কখনো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না; বরং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সূরা আলে ইমরান, (৩) : ৮৫

এটা সাধারণ কোনো আকীদা নয়; বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ আকীদা। কেননা, কেউ যদি ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয় বা অন্য ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা যদি কারও কাছে থাকে, তাহলে সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে কাফের হয়ে যাবে।

আর কুফর সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, “যদি তোমরা কুফর অবলম্বন করো, তবে আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর বান্দাদের কাছে কুফর পছন্দ করেন না।

আরও এসেছে, ‘এটাই সেই জাহান্নাম, যার ভয় তোমাদের দেখানো হতো। আজ তোমরা কুফরের কারণে এতে প্রবেশ করো।”

এত সুস্পষ্ট বিবরণ থাকার পরেও তারা ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতাকে ধর্মের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা বলে চালিয়ে দিচ্ছে !

সুতরাং ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ বলে প্রত্যেককে যার যার ধর্ম পালনের সুযোগ ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে; স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া হয়নি।

তথ্য সূত্রঃ

কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১

লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

এই ব্লগটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

খুশি
0
আরও উন্নত হতে পারে
0

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *