ওয়াহদাতুল আদইয়ান’ ও ‘হিওয়ারুল আদইয়ান’ বা ইন্টারফেইথ তথা আন্তঃধর্মীয় সংলাপ : বিধান ও সতর্কতা
সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, ইসলামের দুশমন ও চক্রান্তকারীরা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সময়ে সময়ে মুসলমানদের ঈমান-আকীদাবিধ্বংসী বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়ে থাকে। এগুলোর অন্যতম হলো, ‘ওয়াহদাতুল আদইয়ান’ তথা ‘সর্বধর্ম মিলন’ মতবাদ। এটাকে কখনো বলা হয়, ‘তাওহীদুল আদইয়ান তথা সকল ধর্মের ঐক্য, ‘ওয়াহদাতুদ দ্বীনিল ইলাহী’ তথা ঐশী ধর্মসমূহের ঐক্য, ‘ওয়াহদাতুল কুতুবিস সামাবীয়্যাহ’ তথা আসমানী কিতাবসমূহের ঐক্য ইত্যাদি।
যে নামেই বলা হোক না কেন, এ মতবাদের আকীদা-বিশ্বাস ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কেননা, এর প্রবক্তাদের চিন্তা-চেতনা হলো, কোনো ধর্মকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা যাবে না বা অগ্রহণযোগ্য বলা যাবে না; বরং পৃথিবীর সকল ধর্ম সত্য, এক ধর্ম অন্য ধর্মের চাইতে কোনো অংশে কম নয় এবং মর্যাদার দিক থেকে সব ধর্মই সমান।
যার সারকথা হলো, ইসলাম ধর্মও সঠিক, অন্য ধর্মও সঠিক। এটা যে স্পষ্ট কুফর,তা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।
সুতরাং কোনো আলেম তো দূরের কথা, সাধারণ মুসলমানও যদি ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্ম বাতিল মনে না করে, তাহলে তার ঈমান থাকবে না।
যতদূর জানা যায়, ‘সকল ধর্মই হক ও সঠিক এবং ধর্মের দৃষ্টিতে আসমানী ধর্মসমূহে কোনো বিবেদ নেই।’ ইহুদীদের চটকদার এই ঘৃণ্য চক্রান্তে প্রভাবিত হয়ে মুসলিম- বিশ্বে এই কুফরী মতবাদ প্রচার করা হয়। আল্লাহ তাআলা সকল মুসলিমকে হেফাজত করুন।
আর ‘ঐশী ধর্ম বা আসমানী কিতাবসমূহের ঐক্য’-এর স্লোগান ধোঁকা ও প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। কেননা :
প্রথমত, বর্তমান ইসলাম ধর্ম ও ‘আল-কুরআন’ ব্যতীত অন্য ঐশী ধর্ম ও আসমানী কিতাবসমূহ বিকৃত ও পরিবর্তিত।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কুরআন ও ইসলাম ধর্ম আবির্ভাবের পর পৃথিবীর সকল ধর্ম বাতিল ও রহিত হয়ে গেছে।
হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা রাযি. বলেন,“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সে সত্তার কসম যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, এ উম্মতের যে কেউ আমার ব্যাপারে শুনেছে, সে ইহুদী হোক আর খ্রিষ্টান হোক, অথচ আমি যেই দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, এর ওপর ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে।’
আরেকটা হলো, ‘হিওয়ারুল আদইয়ান’ (১৬) বা ‘ইন্টারফেইথ (interfaith) ডায়ালগ’ তথা ‘আন্তঃধর্মীয় সংলাপ’। এটাকে ‘আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বা ‘আন্তঃধর্মীয় ঐক্য’ও বলা হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৩)
কেউ কেউ ‘ইন্টারফেইথ’ মানেই ‘ওয়াহদাতুল আদইয়ান’ বা ‘সর্বধর্ম মিলন’ মনে করে। ফলে ইন্টারফেইথে কেউ অংশ নেওয়া মানেই তিনি সব ধর্ম মিলিয়ে এক ধর্ম বানাতে চাচ্ছেন এমন মনে করে, অথচ ব্যাপারটা এমন না।
এ ধরনের সংলাপের ব্যাপারে মূলকথা হলো, স্থান-কাল-পাত্র এবং এতে অংশগ্রহণকারীদের বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে এর বিধান নির্ণীত হবে।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, ইসলামে বিধর্মীদের সাথে সদাচরণ ও সহাবস্থানের বিধান রয়েছে এবং মুসলমানরাও তা বিশ্বাস করে। কাজেই এ ধরনের সংলাপ যদি এ-জাতীয় কোনো কারণে হয়, তাহলে এতে অংশগ্রহণে দোষের কিছু নেই।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কারণ, এ ধরনের সংলাপে অংশগ্রহণকারী মুসলিম স্কলাররা নিজেদের বিশ্বাস ও আদর্শ পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারেন না; বরং কেউ কেউ ইনিয়ে-বিনিয়ে অস্বীকৃতি, বিকৃতি বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেন। এমনকি বিধর্মীরা ইসলামবিরোধী কিছু বললে তার প্রতিবাদ বা এ ক্ষেত্রে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও অবস্থান সুস্পষ্ট করতে পারেন না।
যেমন : আন্তঃধর্মীয় সংলাপের এক অনুষ্ঠানে হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি পরস্পরের সম্প্রীতি ঠিক রাখার দাবি জানিয়ে জুমআর দিন প্রতিটি মসজিদের মিম্বার থেকে সকল ধর্মের ভালো দিকগুলো আলোচনা করার আহ্বান জানান। অথচ মুসলমানদের পক্ষে অংশগ্রহণকারী এ সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
এ ধরনের সংলাপের আরও কিছু বাস্তবতা হলো :
১. ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে ইকদামী জিহাদকে অস্বীকার করা হয় কিংবা জিহাদ বা ইসলামের অন্য কোনো কঠোর বিধানের অপব্যাখ্যা করা হয় ৷
এর কারণ হিসেবে বলা হয়, সকল ধর্মের মৌলিক শিক্ষায় কোনো উগ্রতা ও বাড়াবাড়ি নেই। তাই সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে আমাদেরকে প্রত্যেক ধর্মের মৌলিক শিক্ষায় ফিরে যেতে হবে। এখন শান্তি ও সম্প্রীতির সংজ্ঞা নির্ধারণে পশ্চিমাদের বানানো প্রচলিত হিউম্যান রাইটসের মতবাদকে মূল বানানো হয়। ফলে অনেক সময় ইন্টারফেইথ জিহাদকে স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে উগ্রতা বলে দেয়। কাজেই ইন্টারফেইথ যখন বলে, সব ধর্মের অনুসারীরা নিজেদের ধর্মের পাবন্দ হলেই দুনিয়া থেকে উগ্রতা ও হানাহানি দূর হবে, তা ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিছু নয়।
২. শিক্ষাক্রমে সব ধর্ম রাখার প্রস্তাব রাখা হয়।
৩. সূক্ষ্মভাবে ইসলামবিরোধী বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কাফেরদের বিভিন্ন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রজেক্টে অংশগ্রহণ করে কাফেরদের দালালিতে নাম লেখাতে বলা হয়।
৪. ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ বলে সকল ধর্মের স্বীকৃতি বা প্রত্যেক ধর্মই সঠিক হওয়ার কথা শোনা যায়। আবার কখনো অন্য ধর্মগুলোর কুফর সম্পর্কে অস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করা হয়।
৫. ইহুদী-খ্রিষ্টানরা যে চিরস্থায়ী জাহান্নামী, তা অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়।
৬. কোনো মুসলিম কখনোই কাফেরকে একান্ত বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে না পারার কথা চেপে যাওয়া হয় সর্বোপরি কুফরের প্রতি মুসলমানের স্বভাবজাত ঘৃণা যে ঈমানের অংশ, তা এ ধরনের সংলাপের মাধ্যমে মুসলিমদের অন্তর থেকে শেষ করে দিয়ে তাওহীদ-শিরক একাকার করে ফেলার এবং ঈমান-কুফরের সীমানা মুছে দেওয়ার আয়োজন করা হয়।
তথ্য সূত্রঃ
কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১
লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম