ইসলাম

প্রসঙ্গ : ধর্ম যার যার উৎসব সবার

আমাদের দেশে বহুল আলোচিত একটি স্লোগান হলো ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। ওপরের আলোচনা থেকে অনেকটা পরিষ্কার যে, এটার বিধান কী হবে এবং এটা বিশ্বাস করলে বা পালন করলে ঈমানের ক্ষতি হবে কি না?

এরপরও কিছু আলোচনা করি। আমাদের জন্য অন্য ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জায়গায় যাওয়া নিষেধ। কুরআনে কারীমে আল্লাহর নেক বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, অর্থাৎ ‘যারা মুশরিকদের উৎসবে অংশগ্রহণ করে না। (সূরা ফুরকান, (২৫) : ৭২)

ইমাম যাহাবী রাহ. (মৃ. ৭৪৮ হি.) বলেন, ‘আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা, যারা কাফেরদের উৎসব প্রত্যক্ষ করে না এবং উপস্থিত হয় না, তাদের প্রশংসা করেছেন।

এর অর্থ হলো, যে কেউ এটি প্রত্যক্ষ করবে এবং এতে উপস্থিত থাকবে, সে নিন্দনীয় এবং ঘৃণার পাত্র হবে। কারণ, সে মন্দকে প্রত্যক্ষ করছে এবং তা প্রতিহত করতে পারছে না। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ দেখবে, তখন যদি তার সামর্থ্য থাকে তাহলে হাত দ্বারা প্রতিহত করবে, আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে মুখ দ্বারা প্রতিহত করবে, আর যদি সে শক্তিটুকুও না থাকে, তাহলে অন্তর দ্বারা তা ঘৃণা করবে, আর এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।’

তাদের কুফর ও পূজায় সম্মানবোধ দেখিয়ে কিংবা তাদের কুফর ও শিরকে সন্তুষ্ট হয়ে এমন করলে ঈমান চলে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ওই সকল কাফেরদের সাথে বসবেও না, যতক্ষণ না তারা (এসব কুফরী) আলোচনা পরিহার না করে; নতুবা তোমরা তাদের মতোই (কাফেরে পরিণত) হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুনাফিক ও কাফেরদের জাহান্নামে একত্রিত করবেন। (সূরা নিসা, (৪) : ১৪০)

ইমাম কুরতুবী রাহ. (মৃ. ৬৭১ হি.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, ‘এতে বোঝা যায় যে, গুনাহগারদের সাহচর্য পরিত্যাগ করা ওয়াজিব, যখন তাদের দ্বারা গুনাহ সংঘটিত হবে। কেননা, যে তাদের পরিত্যাগ করবে না, সে যেন তাদের কাজে সন্তুষ্ট রয়েছে। আর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফর। আল্লাহ বলেন, “নতুবা তোমরা তাদের মতো হয়ে যাবে।”

সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের আসরে বসবে, কিন্তু তাদের ওপর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে না, সে গুনাহের ক্ষেত্রে তাদের মতোই সমান গুনাহগার হবে। তাই করণীয় হচ্ছে, তাদের অন্যায় কথা ও কাজের প্রতিবাদ করা; আর যদি এতে সামর্থ্য না থাকে, তবে সেখান থেকে উঠে চলে আসা, যাতে এই আয়াতের (কঠিন বিধানের) অন্তর্ভুক্ত হতে না হয়।’

হযরত উমর রাযি. বলেছেন, ‘তোমরা মুশরিকদের উপাসনালয়ে তাদের উৎসবের দিনে প্রবেশ কোরো না। কারণ, (সেই সময়) তাদের ওপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়। ( মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক,হাদীস নং ১৬০৯)

তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর শত্রুদের উৎসব থেকে দূরে থাকো। ( আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী, ১৮৮৬২)

আর বিজাতির উৎসব, সংস্কৃতি ও নিদর্শনাবলির ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদের বলে গণ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৌলিক হেদায়েত দিয়ে ইরশাদ করেন, “যে কেউ যে সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদের বলে গণ্য হবে।(আবু দাউদ হাদীস নং ৪০৩১)

আরেক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির দল ভারী করবে, সে তাদের মধ্যে গণ্য হবে। আর যে কোনো সম্প্রদায়ের কাজের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে, সে উক্ত কাজের অংশীদার বলে ধর্তব্য হবে।

একটি আপত্তি ও তার জবাব :

অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবে অংশগ্রহণের ব্যাপারে একটি আপত্তি তোলা হয় যে, “আমরা তো সেখানে তাদের সাদৃশ্যতা গ্রহণ বা তাদের মতো পূজা করতে যাই না, আমরা একটু আনন্দ করতে যাই।’

এই আপত্তি ও তার জবাব বহু পূর্বে ইমাম যাহাবী রাহ. দিয়েছেন। তিনি লেখেন,‘কেউ যদি বলে, “মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করা তো আমাদের উদ্দেশ্য নয়।”

এর উত্তরে তাকে বলা হবে, কেবল তাদের সাথে উৎসব ও পার্বণে সাযুজ্য গ্রহণ এবং অংশগ্রহণ করাটাই হারাম।… আর তাদের মতো উদ্দেশ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করলে তো কাফের হয়ে যাবে।’

ধর্মীয় স্বাধীনতার মানে এটা নয় যে, সকলে মিলে সকলের ধর্ম সেলিব্রেট ও উইশ করব এবং সকল ধর্মের অনুষ্ঠান ও উৎসব সবাই পালন করব। এতে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য থাকে না এবং এটা সকল ধর্মকে সত্য/সঠিক মনে করার প্রস্তাবনা, যা ইসলামবিদ্বেষীদের চেতনা।

সূরা কাফিরুন নাযিলের শানে নুযুল ও প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ-জাতীয় ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উৎসব পালনের প্রস্তাব করলে আল্লাহ তাআলা এই সূরা নাযিল করে জানিয়ে দেন, ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য পালনীয়, আর আমার ধর্ম আমার জন্য পালনীয়।’

আর অসাম্প্রদায়িকতা মানে এই নয় যে, আপনি আমার মসজিদ ও ঈদগাহে নামাজ দেখতে যাবেন এবং কুরবানীর সময় গরুর গোশত খাবেন। আর আমি আপনার মন্দির ও মণ্ডপে পূজা দেখতে যাব এবং প্রসাদ খাব কিংবা সাগরপাড়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখব, অথবা পূজা উপলক্ষে উইশ করব এবং শুভেচ্ছা-অভিনন্দন জানাব।

এগুলো অসাম্প্রদায়িকতা নয়, বরং অধার্মিকতা। নিরপেক্ষতা নয়, বরং অজ্ঞতা। সরলতা নয়, বরং শিথিলতা। সহনশীলতা নয়, বরং অকৃতজ্ঞতা। সহমর্মিতা নয়, বরং অবাধ্যতা। উদারতা নয়, বরং উদাসীনতা। এগুলো স্পষ্ট হারাম, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঈমান-বিধ্বংসী কাজ।

সহীহ হাদীসে হযরত ছাওবান রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অচিরেই আমার উম্মতের কিছু লোক মূর্তিপূজা করবে, আর কিছু লোক মুশরিকদের সাথে মিশে যাবে।(ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৫২, সহীহ)

বিধর্মী-মুশরিকদের ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি মূর্তিকে সিজদা করার জন্য শুভেচ্ছা জানানোর নামান্তর! আর মূর্তিকে সিজদা করার জন্য শুভেচ্ছা জানানো যিনা করার জন্য শুভেচ্ছা জানানোর চেয়েও মারাত্মক। কারণ, এটা হলো শিরক। আর শিরকের চেয়ে জঘন্য কোনো অপরাধ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় শিরক জঘন্যতম জুলুম ও অপরাধ।(’সূরা লুকমান, (৩১) : ১৩)

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রাহ. (মৃ. ৭৫১ হি.) বলেন, ‘কুফর-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুভেচ্ছা জানানো সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। যেমন : তাদের উৎসব ও উপবাস পালন উপলক্ষে এমন বলা যে, “তোমাদের উৎসব শুভ হোক কিংবা “তোমার উৎসব উপভোগ্য হোক”—এ-জাতীয় কথা।

যদি এ শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা কুফর পর্যন্ত না-ও পৌঁছে, তবু এটি হারামের অন্তর্ভুক্ত। এটা ক্রুশকে সিজদা দেওয়ার জন্য কাউকে শুভেচ্ছা জানানোর পর্যায়ভুক্ত; বরং এটা আল্লাহর কাছে মদপান, হত্যা ও যিনা ইত্যাদির জন্য কাউকে অভিনন্দন জানানোর চেয়ে মারাত্মক ও জঘন্য গুনাহ।

যাদের কাছে ইসলামের যথাযথ মর্যাদা নেই, তাদের অনেকে এ গুনাহতে লিপ্ত হয়ে পড়ে; অথচ তারা এ গুনাহের কদর্যতা উপলব্ধি করে না। যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজ বা বিদআত কিংবা কুফরী কর্মের জন্য কাউকে অভিনন্দন জানায়, সে নিজেকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির সম্মুখীন করে।”

কোনো অপরাধের আয়োজনে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন যুক্তিগতভাবেও নিন্দনীয় কাজ। অথচ যিনা করার জন্য শুভেচ্ছা জানানোকে অপরাধ মনে হলেও এর চেয়ে বড় অপরাধের শুভেচ্ছা জানানোকে কিছুই মনে করা হচ্ছে না! বরং এটাকে অসাম্প্রদায়িকতা ও উদারতা আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

বর্তমান মুসলিম সমাজে কুফর, শিরক ও অবাধ্যতা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এগুলোর প্রতি মুসলিমদের সহজাত ঘৃণাবোধ দূর হয়ে গেছে। অথচ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ব্যাপারে বলেছেন,আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তোমাদের অন্তরে তা সুশোভিত করেছেন। আর তোমাদের কাছে কুফর, গুনাহ ও অবাধ্যতাকে ঘুণিত করেছেন। তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত হয়েছে।

তথ্য সূত্রঃ

কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১

লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

এই ব্লগটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

খুশি
0
আরও উন্নত হতে পারে
0

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *