উমরাহ করার পূর্ণাঙ্গ নিয়ম

উমরাহ শব্দের অর্থ জিয়ারত করা, পরিদর্শন করা ও সাক্ষাৎ করা। পবিত্র কাবাগৃহের জিয়ারতই মূলত ওমরাহ। ইসলামের ভাষায় পবিত্র হজের সময় ছাড়া অন্য যেকোনো সময় পবিত্র কাবাঘরের তাওয়াফসহ নির্দিষ্ট কিছু কাজ করাকে ওমরাহ বলা হয়।

উমরাহ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। হাদিস শরীফে উমরার বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো-


উমরা করলে গুনাহ মাফ হয়

রাসুলু্ল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘এক উমরার পর আরেক উমরা—উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারাস্বরূপ। আর জান্নাতই হলো কবুল হজের প্রতিদান।’বুখারি: ১৭৭৩

তাই সামর্থ্য থাকলে সুযোগ পেলেই ওমরা করা উচিত।

রমজানে উমরা করলে হজের সওয়াব

পবিত্র রমজান মাসে উমরা পালন করলে হজের সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যায়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) এক আনসারি নারীকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে হজ করতে তোমার বাধা কীসের? ইবনে আব্বাস (রা.) নারীর নাম বলেছিলেন; কিন্তু আমি ভুলে গেছি। ওই নারী বলল, ‘আমাদের একটি পানি বহনকারী উট ছিল; কিন্তু তাতে অমুকের পিতা ও তার পুত্র (অর্থাৎ নারীর স্বামী ও ছেলে) আরোহণ করে চলে গেছেন। আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন পানি বহনকারী আরেকটি উট, যার দ্বারা আমরা পানি বহন করে থাকি। নবী (স.) বলেন, আচ্ছা, রমজান এলে তখন ওমরা করে নিয়ো। কেননা রমজানের একটি উমরা একটি হজের সমতুল্য।’সহিহ বুখারি: ১৭৮২

উমরা করলে রিজিক বাড়ে

অধিক উমরা করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উমরা পালনকারীর রিজিকে বরকত দেন। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা ধারাবাহিক হজ ও উমরা আদায় করতে থাকো। এ দুটি আমল দারিদ্র্য ও গুনাহ বিদূরিত করে দেয়। যেমন—ভাটার আগুনে লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা-জং দূরীভূত হয়ে থাকে।তিরমিজি: ৮১০

হজ ও ওমরাকারী আল্লাহর মেহমান

হজ ও উমরা পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান বা প্রতিনিধি। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, আল্লাহর পথে যুদ্ধে বিজয়ী, হজকারী ও ওমরাকারী আল্লাহর মেহমান বা প্রতিনিধি। আল্লাহ তাদের আহ্বান করেছেন, তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আর তারা তাঁর কাছে চেয়েছেন এবং তিনি তাদের দিয়েছেন।ইবনে মাজাহ: ২৮৯৩; ইবনে হিব্বান: ৩৪০০

হজ-ওমরার সফরে মারা গেলে হজ-ওমরার সমান সওয়াব

হজ-উমরা করার নিয়তে বের হয়ে মারা গেলে হজের সওয়াব পেতে থাকবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে; অতঃপর সে মারা গেছে, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত হজের নেকি লেখা হতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি ওমরার উদ্দেশ্যে বের হয়ে মারা যাবে, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত ওমরার নেকি লেখা হতে থাকবে।’সহিহুত-তারগিব ওয়াত-তারহিব: ১১১৪

হজ-উমরার সফরে প্রতি কদমে কদমে নেকি

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, যখন তুমি বায়তুল্লাহর উদ্দেশে আপন ঘর থেকে বের হবে, তোমার উটনীর প্রত্যেকবার পায়ের ক্ষুর রাখা এবং ক্ষুর তোলার সঙ্গে সঙ্গে তোমার জন্য একটি করে নেকি লেখা হবে, তোমার একটি করে গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে।সহিহ তারগিব: ১১১২


হজ্ব ও উমরাকারীর দুআ কবুল করা হয়

জাবির রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,হজ্ব ও উমরাকারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি দল তারা দুআ করলে তাদের দুআ কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদেরকে তাদেওয়া হয়(মুসনদে বাযযার, হাদীস : ১১৫৩; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫২৮৮; তবারানী,হাদীস :১৭২১

ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সাললাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী (গাযী), হজ্ব ও উমরা আদায়কারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি দল।তারা দুআ করলে দুআ কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদেরকে তা দেওয়া হয়।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৯৩; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৪৬১৩

আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ কক্ষরেছেন-তিন প্রকারের লোক আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি : গাযী, হজ্ব ও উমরাকারী।-সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৯২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১১; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৬৫৩; সুনানে নাসায়ী ৫/১১৩; সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৫/২৬২


উমরার জন্য খরচ করার ফযীলত

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরা করার সময় তাকে তার উমরা সম্পর্কে বলেছেন, তুমি তোমার পরিশ্রম ও খরচ অনুপাতে নেকি পাবে।মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ১৭৭৬; সুনানে দারাকুতনী, ২/২৮৬

আয়েশা রা. হতে অন্য বর্ণনায় আছে রয়েছে তুমি তোমার উমরার সওয়াব তোমার খরচ অনুপাতে পাবে।-মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ১৭৭৭; সুনানে দারাকুতনী, ২/২৮৬

অন্যকে উমরা করানোর ফজিলত

হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, নবী (স.)-এর কাছে একজন লোক এসে তার নিজের জন্য একটি বাহন চাইল। কিন্তু তাকে তিনি দেওয়ার মতো কোনো বাহন না পেয়ে তাকে অন্য এক লোকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সেই ব্যক্তি তাকে একটি বাহন দিল। সে এ ঘটনাটি নবী (স.)-এর কাছে এসে বললে তিনি বলেন, সৎকাজের পথপ্রদর্শক উক্ত কাজ সম্পাদনকারীর সমতুল্য।তিরমিজি: ২৬৭০

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সামর্থ্যহীন কাউকে হজ-ওমরা করালে নিজেও হজ-ওমরার সমান সওয়াব লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাই পবিত্র কাবাঘর জেয়ারতের তাওফিক দান করুন। আমিন।

ওমরা বিশ্বজুড়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই ইবাদতের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসলমানরা কিবলা কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। হজ্জ পালনের জন্য মূলত একটি নির্দিষ্ট মৌসুম থাকে। সেখানে সামষ্টিক কার্যক্রম একই হলেও ওমরার জন্য তেমন কোনো মৌসুমের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই মুসলিমরা বছরের যেকোনো সময়েই ওমরা করতে পবিত্র শহর মক্কার পথে যাত্রা করতে পারেন। পদ্ধতিগত দিক থেকে এই ইবাদত যথেষ্ট পরিশ্রমের কাজ, যেখানে দরকার পড়ে দৈহিক ও মানসিক সুস্থতার।

চলুন, সৌদিআরবে পবিত্র ওমরা পালনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণের জন্য করণীয়গুলো জেনে নেওয়া যাক।


ওমরায় যাওয়ার জন্য স্বাস্থ্যগত পূর্বপ্রস্তুতি কেন জরুরি

উমরাহ্‌ শুরুতে কাবা শরীফকে ঘিরে সাতবার প্রদক্ষিণ করা, যাকে তাওয়াফ বলা হয়। যা একটি শ্রমসাধ্য কাজ। তারপর ২ রাকাত নামাজ পড়ে সাফা ও মারওয়া নামক দুটি পাহাড়ে পায়ে হেঁটে সাতবার উঠা-নামা করা হয়, যা সাঈ নামে পরিচিত। এটি ওমরার সবচেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ। এই দুই ক্রিয়াকলাপের জন্য শরীর ও মন উভয় ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহনশীলতার প্রয়োজন হয়। যারা কায়িক শ্রমে অভ্যস্ত নন এবং বার্ধক্যপীড়িতদের জন্য এই কাজগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাছাড়া ওমরা সফরে উচিত যতবেশি পারা যায় নফল তাওয়াফ করা, যা করতে যথেষ্ট শারীরিক পরিশ্রম হয়ে থাকে।

তাই যৌবন বা বার্ধক্যে জীবনের যে সময়েই ওমরার পরিকল্পনা করা হোক না কেন, তার জন্য যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। ফলে আগে থেকে শরীর গঠনের প্রয়াস পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যগত কোনো জটিলতা থাকলে তার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। এছাড়া ওমরার পূর্বপ্রস্তুতি ইবাদতের প্রতি আন্তরিকতা এবং মনোনিবেশ বৃদ্ধির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যকেও সমুন্নত করে।


ওমরাতে যাওয়ার আগে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি

স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন

প্রথমেই নজর দিতে হবে শরীরের দিকে। কেননা অদম্য স্পৃহা থাকার পরেও অনাকাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য জটিলতা তীর্থযাত্রার প্রধান অন্তরায় হতে পারে। তাওয়াফ এবং সাঈর মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজগুলোর জন্য রোগহীন সুগঠিত দেহের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে ফ্লাইটের নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে থেকেই প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি এবং হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে। এতে পায়ের পেশী শক্তিশালী হয় এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। একই সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হবে নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকাকে পরিপূর্ণ রাখতে হবে পুষ্টিকর খাবার দিয়ে। দিনে পানি পান করতে হবে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ গ্লাস। চিনি, ক্যাফেইন, স্যাকারিন যুক্ত জুস, অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি ঘুমের ব্যাপারেও যত্নবান হওয়া উচিত। প্রতিদিন রাতে দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া ও ফজর নামাজের সময় ঘুম থেকে ওঠার রুটিন দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা জরুরি। রাতের ঘুম দুপুর, সন্ধ্যা বা দিনের অন্যান্য সময়ে প্রতিস্থাপন করা যাবে না।


স্বাস্থ্য পরীক্ষা

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের আবহাওয়ায় যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তির পাশাপাশি এই বিষয়টিও শরীরের উপর প্রভাব ফেলে। সেই আবহাওয়া সহ্য করার মতো শরীরের ন্যূনতম সক্ষমতা রয়েছে কি-না, তা নিশ্চিত হতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য শারীরিক অবস্থা সহনীয় মাত্রায় রয়েছে কি-না তা যাচাই করতে হবে।

আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রায়ই মেনিনজাইটিস কিংবা মৌসুমী ফ্লুসহ নানা ভ্যাকসিনেশনের প্রয়োজন হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিটি প্রক্রিয়া সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা জরুরি।


মানসিক প্রস্তুতি

ওমরা যেহেতু একটি সমষ্টিগত কার্যক্রম তাই প্রচুর জনসমাগম এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার বিষয়গুলো খুবই স্বাভাবিক। এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার হয় ধৈর্য, মানসিক সহনশীলতা এবং দুশ্চিন্তাহীনতা। এর জন্য ফ্লাইটের অনেক আগে থেকেই মন নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু অনুশীলন পদ্ধতির শরণাপন্ন হতে হবে।

দৈনন্দিন যেকোনো কাজে অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে সংযম বজায় রাখা সবথেকে অপরিহার্য বিষয়। অপেক্ষার সময়গুলো অপ্রয়োজনীয়, হতাশাজনক এবং বিভ্রান্তিকর কাজ করে বিনষ্ট করা যাবে না। পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো মনকে পরম প্রশান্তি দেবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর ঘুম এবং হালকা ব্যায়াম দেহের পাশাপাশি মননশীলতা বিকাশের ক্ষেত্রেও সহায়ক।


ওমরার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় দোয়া শিক্ষা

সহসা এই ইবাদতের সুযোগ হয়ে ওঠে না। সঙ্গত কারণেই ওমরার নিয়মগুলোতে প্রতিদিনের আদায় করা নামাজের মতো অভ্যস্ত থাকা যায় না। তাই পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার সময় অবধারিতভাবে ওমরার সঠিক প্রক্রিয়া জেনে নিতে হবে।

শুরু থেকে শেষ ওমরার প্রতিটি কার্যকলাপের ইতিহাস এবং তাৎপর্য সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের সময় আত্মিক উন্নয়ন ঘটে। এর ফলে ইবাদতের প্রতি আন্তরিকতা ও মনোনিবেশ আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক দোয়াগুলো শিখে তা প্রতিনিয়ত আওড়ানো যেতে পারে। অনুশীলনের সুবিধার্থে মোবাইলে রাখা যেতে পারে দোয়া শিখনের বিভিন্ন অ্যাপ। এগুলোর মধ্যে ‘দোয়া অ্যান্ড জিকির (হিসনুল মুসলিম)’ এবং ‘মুসলিম বাংলা কুরআন হাদিস দুআ’ বেশ সহায়ক দুটি অ্যাপ।


পবিত্র ওমরার জন্য সৌদিআরবে রওনা হওয়ার পূর্বে করণীয়

প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নেওয়া

চূড়ান্তভাবে রওনা হওয়ার আগে ব্যাগ গোছানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর তালিকা করে নেওয়া জরুরি। বেশ সময় নিয়ে এই তালিকা করা হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নজর এড়িয়ে যাবে না। পাসপোর্ট, ভিসা ও হোটেল বুকিংয়ের মতো ভ্রমণ নথিগুলো সবার আগে রাখতে হবে। এরপরেই অগ্রাধিকার পাবে ইহরাম পোশাক, নামাজের ম্যাট, আরামদায়ক জুতা এবং ঔষধপত্র। ঔষধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। এগুলোর সঙ্গে স্থান পাবে বিশুদ্ধ পানির বোতল, টিস্যু এবং ব্যান্ড-এইডস। জরুরি অবস্থায় দ্রুত ব্যবহারের জন্য পুরো ভ্রমণে ছোট্ট একটি ব্যাগ সার্বক্ষণিক সঙ্গে রাখা যেতে পারে।


গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের ডিজিটাল কপি রাখা

হজযাত্রীদের ভিসা, পাসপোর্ট, ফ্লাইট টিকিট ও হোটেল রিজার্ভেশনসহ যাবতীয় নথিপত্র স্ক্যান করে অনলাইনে সংরক্ষণ করে রাখা যায়। এতে করে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় ইন্টারনেটের মাধ্যমে এগুলো ব্যবহার করা যাবে। অনলাইনে সংরক্ষণের জন্য গুগল ড্রাইভ বা ড্রপবক্সের মতো বিভিন্ন ধরণের ক্লাউড স্টোরেজ পরিষেবা রয়েছে। এটি আকস্মিক কোনো কাগজপত্র হারানোর ক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিকল্প।


জরুরি যোগাযোগ নাম্বারগুলো সংগ্রহে রাখা

দীর্ঘ যাত্রায় নানা ধরণের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় কিছু ফোন নাম্বার অনেক উপকারে আসে। বিশেষ করে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা এবং দূতাবাস বা কনস্যুলেটের নাম্বারগুলো খুবই প্রয়োজনীয়। এছাড়াও কাছের হাসপাতালের ফোন নাম্বারও সংগ্রহে রাখা উচিত। স্মার্টফোনে রাখার পাশাপাশি অফলাইনেও ব্যবহারের জন্য নাম্বারগুলো একটি ছোট নোটবুকে লিখে রাখতে হবে।


লাগেজে লেবেল দেওয়া

প্রতি বছর ওমরার অনেকগুলো গ্রুপ সৌদি আরব অভিমুখী হওয়ায় কাস্টমসসহ বিভিন্ন জায়গায় লাগেজ অদল-বদলের ঘটনা ঘটে। তাই রওনা হওয়ার পূর্বে লাগেজে ভালোভাবে লেবেল সংযুক্ত করা অপরিহার্য। একটি টেকসই ট্যাগের মধ্যে তীর্থযাত্রীদের পুরো নাম, হোটেলের ঠিকানা এবং বর্তমানে সঙ্গে বহন করা একটি যোগাযোগ নাম্বার থাকবে।

রঙিন ফিতা বা স্টিকারের মতো টোটেমগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে ভিড়ের মধ্যে অনেকগুলো একই রকম ব্যাগের মধ্যে নিজের ব্যাগটিকে আলাদা করে চেনা যাবে। এছাড়া স্যুটকেসের ভিতরে প্রয়োজনীয় নথিগুলোর এক সেট অনুলিপি রাখলে সেগুলো পরবর্তীতে শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে বেশ উপযোগী হয়।


সৌদিআরবে পবিত্র ওমরাকালীন সতর্কতা

পরিশ্রমের ক্ষেত্রে পরিমিতি বজায় রাখা

আগে থেকে ইবাদতের জন্য মনস্থির করা থাকলে ওমরাকালীন পরিশ্রম অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। কিন্তু এরপরেও ওমরার সময় নিজের সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রতিটি প্রক্রিয়ায় নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ছোট ছোট বিশ্রাম নেওয়া উচিত। একটানা না হেঁটে মাঝে মধ্যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করে নিতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য জটিলতায় থাকা ব্যক্তিদের এই পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত।


মূল্যবান জিনিসপত্রের ব্যাপারে সাবধানতা

হজযাত্রীদের টাকা, পাসপোর্ট এবং মোবাইল ফোন রাখার জন্য নিরাপদ মানিবেল্ট বা লুকানো পাউচ ব্যবহার করা উচিত। নগদ টাকা এবং ব্যয়বহুল সামগ্রী যথাসম্ভব চোখের আড়ালে রাখা উচিত। হোটেলের ভেতরে ও আশেপাশে, স্থানীয় মার্কেট থেকে কেনাকাটার সময়েও এই সতর্কতা আবশ্যক।

অনেক সময় নিজের অসাবধানতার কারণেও সঙ্গে বহন করে চলা জিনিসপত্র পড়ে যায়। তাই শুধুমাত্র নিতান্তই দরকারি জিনিস ছাড়া সবকিছু হোটেলে নিরাপদে রাখা উচিত।


যতটা সম্ভব মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলা

অপ্রয়োজনীয় যানজট এড়াতে হজযাত্রীদের নির্ধারিত নামাজ ও তাওয়াফ এলাকার মধ্যে থাকা উচিত। চলাফেরার সময় হুট করে কোথাও কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেই সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত জটলার সৃষ্টি হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রায় ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ধাক্কার ঝুঁকি থাকে। তাই এই জায়গাগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাফেরা বজায় রাখতে হবে। এর জন্য আশেপাশের গতিবিধি সম্পর্কেও সর্বদা সতর্ক থাকা জরুরি।


গ্রুপের সান্নিধ্যে থাকা ও নির্দেশনা অনুসরণ

যেকোনো অপরিচিত পরিবেশে যে গ্রুপ বা সঙ্গীর সঙ্গে ভ্রমণ করা হয়েছে তাদের সান্নিধ্যে থাকাটা অত্যাবশ্যক। বিষয়টি ওমরার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে এখানে বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রীদের সমাগম হওয়ায় আকস্মিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি থাকে। এই সমস্যা সমাধানে গ্রুপের প্রধান একটি সাধারণ মিটিং পয়েন্ট নির্ধারণ করে দিয়ে থাকেন। এই নির্দেশনা অনুসরণ করা ঝামেলাবিহীন ওমরার অভিজ্ঞতারই নামান্তর। এর মধ্যেও যেকোনো সন্দেহ তৈরি হলে মোবাইল কলের মাধ্যমে সংযোগ রাখতে হবে।

যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ওমরা পালনের জন্য দেহ ও মনকে প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। কেননা এখানে একই সঙ্গে দৈহিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহনশীলতার পরীক্ষা দিতে হয়। শরীর ঠিক রাখার জন্য মনোযোগ দিতে হবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার দিকে। অপরদিকে ওমরার আচার-অনুষ্ঠান ও দোয়া শেখা প্রাথমিকভাবে মানসিক প্রস্তুতি দেবে।

উপরন্তু, যাত্রার পূর্বে প্রয়োজনীয় নথি, ওষুধপত্র, ও যোগাযোগ নাম্বার সংগ্রহ, এবং লাগেজ লেবেলিংয়ের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পরিশেষে, সফলভাবে ওমরা পালনের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ভিড় এড়িয়ে চলা, হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং গ্রুপের সান্নিধ্যে থাকাকে গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক।

What's your reaction?

সোশ্যাল কমেন্ট এখনো চালু হয়নি — পাশের “সাইট কমেন্ট” ট্যাবে মতামত দিন।