উমরাহ শব্দের অর্থ জিয়ারত করা, পরিদর্শন করা ও সাক্ষাৎ করা। পবিত্র কাবাগৃহের জিয়ারতই মূলত ওমরাহ। ইসলামের ভাষায় পবিত্র হজের সময় ছাড়া অন্য যেকোনো সময় পবিত্র কাবাঘরের তাওয়াফসহ নির্দিষ্ট কিছু কাজ করাকে ওমরাহ বলা হয়।
উমরার ফজিলত
উমরাহ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। হাদিস শরীফে উমরার বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো-
উমরা করলে গুনাহ মাফ হয়
রাসুলু্ল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘এক উমরার পর আরেক উমরা—উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারাস্বরূপ। আর জান্নাতই হলো কবুল হজের প্রতিদান।’বুখারি: ১৭৭৩
তাই সামর্থ্য থাকলে সুযোগ পেলেই ওমরা করা উচিত।
রমজানে উমরা করলে হজের সওয়াব
পবিত্র রমজান মাসে উমরা পালন করলে হজের সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যায়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) এক আনসারি নারীকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে হজ করতে তোমার বাধা কীসের? ইবনে আব্বাস (রা.) নারীর নাম বলেছিলেন; কিন্তু আমি ভুলে গেছি। ওই নারী বলল, ‘আমাদের একটি পানি বহনকারী উট ছিল; কিন্তু তাতে অমুকের পিতা ও তার পুত্র (অর্থাৎ নারীর স্বামী ও ছেলে) আরোহণ করে চলে গেছেন। আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন পানি বহনকারী আরেকটি উট, যার দ্বারা আমরা পানি বহন করে থাকি। নবী (স.) বলেন, আচ্ছা, রমজান এলে তখন ওমরা করে নিয়ো। কেননা রমজানের একটি উমরা একটি হজের সমতুল্য।’সহিহ বুখারি: ১৭৮২
উমরা করলে রিজিক বাড়ে
অধিক উমরা করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উমরা পালনকারীর রিজিকে বরকত দেন। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা ধারাবাহিক হজ ও উমরা আদায় করতে থাকো। এ দুটি আমল দারিদ্র্য ও গুনাহ বিদূরিত করে দেয়। যেমন—ভাটার আগুনে লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা-জং দূরীভূত হয়ে থাকে।তিরমিজি: ৮১০
হজ ও ওমরাকারী আল্লাহর মেহমান
হজ ও উমরা পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান বা প্রতিনিধি। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, আল্লাহর পথে যুদ্ধে বিজয়ী, হজকারী ও ওমরাকারী আল্লাহর মেহমান বা প্রতিনিধি। আল্লাহ তাদের আহ্বান করেছেন, তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আর তারা তাঁর কাছে চেয়েছেন এবং তিনি তাদের দিয়েছেন।ইবনে মাজাহ: ২৮৯৩; ইবনে হিব্বান: ৩৪০০
হজ-ওমরার সফরে মারা গেলে হজ-ওমরার সমান সওয়াব
হজ-উমরা করার নিয়তে বের হয়ে মারা গেলে হজের সওয়াব পেতে থাকবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে; অতঃপর সে মারা গেছে, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত হজের নেকি লেখা হতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি ওমরার উদ্দেশ্যে বের হয়ে মারা যাবে, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত ওমরার নেকি লেখা হতে থাকবে।’সহিহুত-তারগিব ওয়াত-তারহিব: ১১১৪
হজ-উমরার সফরে প্রতি কদমে কদমে নেকি
হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, যখন তুমি বায়তুল্লাহর উদ্দেশে আপন ঘর থেকে বের হবে, তোমার উটনীর প্রত্যেকবার পায়ের ক্ষুর রাখা এবং ক্ষুর তোলার সঙ্গে সঙ্গে তোমার জন্য একটি করে নেকি লেখা হবে, তোমার একটি করে গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে।সহিহ তারগিব: ১১১২
হজ্ব ও উমরাকারীর দুআ কবুল করা হয়
জাবির রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,হজ্ব ও উমরাকারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি দল তারা দুআ করলে তাদের দুআ কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদেরকে তাদেওয়া হয়(মুসনদে বাযযার, হাদীস : ১১৫৩; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫২৮৮; তবারানী,হাদীস :১৭২১
ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সাললাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী (গাযী), হজ্ব ও উমরা আদায়কারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি দল।তারা দুআ করলে দুআ কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদেরকে তা দেওয়া হয়।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৯৩; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৪৬১৩
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ কক্ষরেছেন-তিন প্রকারের লোক আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি : গাযী, হজ্ব ও উমরাকারী।-সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৯২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১১; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৬৫৩; সুনানে নাসায়ী ৫/১১৩; সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৫/২৬২
উমরার জন্য খরচ করার ফযীলত
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরা করার সময় তাকে তার উমরা সম্পর্কে বলেছেন, তুমি তোমার পরিশ্রম ও খরচ অনুপাতে নেকি পাবে।মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ১৭৭৬; সুনানে দারাকুতনী, ২/২৮৬
আয়েশা রা. হতে অন্য বর্ণনায় আছে রয়েছে তুমি তোমার উমরার সওয়াব তোমার খরচ অনুপাতে পাবে।-মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ১৭৭৭; সুনানে দারাকুতনী, ২/২৮৬
অন্যকে উমরা করানোর ফজিলত
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, নবী (স.)-এর কাছে একজন লোক এসে তার নিজের জন্য একটি বাহন চাইল। কিন্তু তাকে তিনি দেওয়ার মতো কোনো বাহন না পেয়ে তাকে অন্য এক লোকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সেই ব্যক্তি তাকে একটি বাহন দিল। সে এ ঘটনাটি নবী (স.)-এর কাছে এসে বললে তিনি বলেন, সৎকাজের পথপ্রদর্শক উক্ত কাজ সম্পাদনকারীর সমতুল্য।তিরমিজি: ২৬৭০
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সামর্থ্যহীন কাউকে হজ-ওমরা করালে নিজেও হজ-ওমরার সমান সওয়াব লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাই পবিত্র কাবাঘর জেয়ারতের তাওফিক দান করুন। আমিন।
উমরার পূর্বপ্রস্তুতি
ওমরা বিশ্বজুড়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই ইবাদতের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসলমানরা কিবলা কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। হজ্জ পালনের জন্য মূলত একটি নির্দিষ্ট মৌসুম থাকে। সেখানে সামষ্টিক কার্যক্রম একই হলেও ওমরার জন্য তেমন কোনো মৌসুমের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই মুসলিমরা বছরের যেকোনো সময়েই ওমরা করতে পবিত্র শহর মক্কার পথে যাত্রা করতে পারেন। পদ্ধতিগত দিক থেকে এই ইবাদত যথেষ্ট পরিশ্রমের কাজ, যেখানে দরকার পড়ে দৈহিক ও মানসিক সুস্থতার।
চলুন, সৌদিআরবে পবিত্র ওমরা পালনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণের জন্য করণীয়গুলো জেনে নেওয়া যাক।
ওমরায় যাওয়ার জন্য স্বাস্থ্যগত পূর্বপ্রস্তুতি কেন জরুরি
উমরাহ্ শুরুতে কাবা শরীফকে ঘিরে সাতবার প্রদক্ষিণ করা, যাকে তাওয়াফ বলা হয়। যা একটি শ্রমসাধ্য কাজ। তারপর ২ রাকাত নামাজ পড়ে সাফা ও মারওয়া নামক দুটি পাহাড়ে পায়ে হেঁটে সাতবার উঠা-নামা করা হয়, যা সাঈ নামে পরিচিত। এটি ওমরার সবচেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ। এই দুই ক্রিয়াকলাপের জন্য শরীর ও মন উভয় ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহনশীলতার প্রয়োজন হয়। যারা কায়িক শ্রমে অভ্যস্ত নন এবং বার্ধক্যপীড়িতদের জন্য এই কাজগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাছাড়া ওমরা সফরে উচিত যতবেশি পারা যায় নফল তাওয়াফ করা, যা করতে যথেষ্ট শারীরিক পরিশ্রম হয়ে থাকে।
তাই যৌবন বা বার্ধক্যে জীবনের যে সময়েই ওমরার পরিকল্পনা করা হোক না কেন, তার জন্য যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। ফলে আগে থেকে শরীর গঠনের প্রয়াস পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যগত কোনো জটিলতা থাকলে তার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। এছাড়া ওমরার পূর্বপ্রস্তুতি ইবাদতের প্রতি আন্তরিকতা এবং মনোনিবেশ বৃদ্ধির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যকেও সমুন্নত করে।
ওমরাতে যাওয়ার আগে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি
স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন
প্রথমেই নজর দিতে হবে শরীরের দিকে। কেননা অদম্য স্পৃহা থাকার পরেও অনাকাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য জটিলতা তীর্থযাত্রার প্রধান অন্তরায় হতে পারে। তাওয়াফ এবং সাঈর মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজগুলোর জন্য রোগহীন সুগঠিত দেহের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে ফ্লাইটের নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে থেকেই প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি এবং হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে। এতে পায়ের পেশী শক্তিশালী হয় এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। একই সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হবে নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকাকে পরিপূর্ণ রাখতে হবে পুষ্টিকর খাবার দিয়ে। দিনে পানি পান করতে হবে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ গ্লাস। চিনি, ক্যাফেইন, স্যাকারিন যুক্ত জুস, অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি ঘুমের ব্যাপারেও যত্নবান হওয়া উচিত। প্রতিদিন রাতে দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া ও ফজর নামাজের সময় ঘুম থেকে ওঠার রুটিন দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা জরুরি। রাতের ঘুম দুপুর, সন্ধ্যা বা দিনের অন্যান্য সময়ে প্রতিস্থাপন করা যাবে না।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের আবহাওয়ায় যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তির পাশাপাশি এই বিষয়টিও শরীরের উপর প্রভাব ফেলে। সেই আবহাওয়া সহ্য করার মতো শরীরের ন্যূনতম সক্ষমতা রয়েছে কি-না, তা নিশ্চিত হতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য শারীরিক অবস্থা সহনীয় মাত্রায় রয়েছে কি-না তা যাচাই করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রায়ই মেনিনজাইটিস কিংবা মৌসুমী ফ্লুসহ নানা ভ্যাকসিনেশনের প্রয়োজন হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিটি প্রক্রিয়া সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা জরুরি।
মানসিক প্রস্তুতি
ওমরা যেহেতু একটি সমষ্টিগত কার্যক্রম তাই প্রচুর জনসমাগম এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার বিষয়গুলো খুবই স্বাভাবিক। এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার হয় ধৈর্য, মানসিক সহনশীলতা এবং দুশ্চিন্তাহীনতা। এর জন্য ফ্লাইটের অনেক আগে থেকেই মন নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু অনুশীলন পদ্ধতির শরণাপন্ন হতে হবে।
দৈনন্দিন যেকোনো কাজে অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে সংযম বজায় রাখা সবথেকে অপরিহার্য বিষয়। অপেক্ষার সময়গুলো অপ্রয়োজনীয়, হতাশাজনক এবং বিভ্রান্তিকর কাজ করে বিনষ্ট করা যাবে না। পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো মনকে পরম প্রশান্তি দেবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর ঘুম এবং হালকা ব্যায়াম দেহের পাশাপাশি মননশীলতা বিকাশের ক্ষেত্রেও সহায়ক।
ওমরার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় দোয়া শিক্ষা
সহসা এই ইবাদতের সুযোগ হয়ে ওঠে না। সঙ্গত কারণেই ওমরার নিয়মগুলোতে প্রতিদিনের আদায় করা নামাজের মতো অভ্যস্ত থাকা যায় না। তাই পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার সময় অবধারিতভাবে ওমরার সঠিক প্রক্রিয়া জেনে নিতে হবে।
শুরু থেকে শেষ ওমরার প্রতিটি কার্যকলাপের ইতিহাস এবং তাৎপর্য সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের সময় আত্মিক উন্নয়ন ঘটে। এর ফলে ইবাদতের প্রতি আন্তরিকতা ও মনোনিবেশ আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক দোয়াগুলো শিখে তা প্রতিনিয়ত আওড়ানো যেতে পারে। অনুশীলনের সুবিধার্থে মোবাইলে রাখা যেতে পারে দোয়া শিখনের বিভিন্ন অ্যাপ। এগুলোর মধ্যে ‘দোয়া অ্যান্ড জিকির (হিসনুল মুসলিম)’ এবং ‘মুসলিম বাংলা কুরআন হাদিস দুআ’ বেশ সহায়ক দুটি অ্যাপ।
পবিত্র ওমরার জন্য সৌদিআরবে রওনা হওয়ার পূর্বে করণীয়
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নেওয়া
চূড়ান্তভাবে রওনা হওয়ার আগে ব্যাগ গোছানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর তালিকা করে নেওয়া জরুরি। বেশ সময় নিয়ে এই তালিকা করা হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নজর এড়িয়ে যাবে না। পাসপোর্ট, ভিসা ও হোটেল বুকিংয়ের মতো ভ্রমণ নথিগুলো সবার আগে রাখতে হবে। এরপরেই অগ্রাধিকার পাবে ইহরাম পোশাক, নামাজের ম্যাট, আরামদায়ক জুতা এবং ঔষধপত্র। ঔষধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। এগুলোর সঙ্গে স্থান পাবে বিশুদ্ধ পানির বোতল, টিস্যু এবং ব্যান্ড-এইডস। জরুরি অবস্থায় দ্রুত ব্যবহারের জন্য পুরো ভ্রমণে ছোট্ট একটি ব্যাগ সার্বক্ষণিক সঙ্গে রাখা যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের ডিজিটাল কপি রাখা
হজযাত্রীদের ভিসা, পাসপোর্ট, ফ্লাইট টিকিট ও হোটেল রিজার্ভেশনসহ যাবতীয় নথিপত্র স্ক্যান করে অনলাইনে সংরক্ষণ করে রাখা যায়। এতে করে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় ইন্টারনেটের মাধ্যমে এগুলো ব্যবহার করা যাবে। অনলাইনে সংরক্ষণের জন্য গুগল ড্রাইভ বা ড্রপবক্সের মতো বিভিন্ন ধরণের ক্লাউড স্টোরেজ পরিষেবা রয়েছে। এটি আকস্মিক কোনো কাগজপত্র হারানোর ক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিকল্প।
জরুরি যোগাযোগ নাম্বারগুলো সংগ্রহে রাখা
দীর্ঘ যাত্রায় নানা ধরণের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় কিছু ফোন নাম্বার অনেক উপকারে আসে। বিশেষ করে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা এবং দূতাবাস বা কনস্যুলেটের নাম্বারগুলো খুবই প্রয়োজনীয়। এছাড়াও কাছের হাসপাতালের ফোন নাম্বারও সংগ্রহে রাখা উচিত। স্মার্টফোনে রাখার পাশাপাশি অফলাইনেও ব্যবহারের জন্য নাম্বারগুলো একটি ছোট নোটবুকে লিখে রাখতে হবে।
লাগেজে লেবেল দেওয়া
প্রতি বছর ওমরার অনেকগুলো গ্রুপ সৌদি আরব অভিমুখী হওয়ায় কাস্টমসসহ বিভিন্ন জায়গায় লাগেজ অদল-বদলের ঘটনা ঘটে। তাই রওনা হওয়ার পূর্বে লাগেজে ভালোভাবে লেবেল সংযুক্ত করা অপরিহার্য। একটি টেকসই ট্যাগের মধ্যে তীর্থযাত্রীদের পুরো নাম, হোটেলের ঠিকানা এবং বর্তমানে সঙ্গে বহন করা একটি যোগাযোগ নাম্বার থাকবে।
রঙিন ফিতা বা স্টিকারের মতো টোটেমগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে ভিড়ের মধ্যে অনেকগুলো একই রকম ব্যাগের মধ্যে নিজের ব্যাগটিকে আলাদা করে চেনা যাবে। এছাড়া স্যুটকেসের ভিতরে প্রয়োজনীয় নথিগুলোর এক সেট অনুলিপি রাখলে সেগুলো পরবর্তীতে শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে বেশ উপযোগী হয়।
সৌদিআরবে পবিত্র ওমরাকালীন সতর্কতা
পরিশ্রমের ক্ষেত্রে পরিমিতি বজায় রাখা
আগে থেকে ইবাদতের জন্য মনস্থির করা থাকলে ওমরাকালীন পরিশ্রম অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। কিন্তু এরপরেও ওমরার সময় নিজের সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রতিটি প্রক্রিয়ায় নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ছোট ছোট বিশ্রাম নেওয়া উচিত। একটানা না হেঁটে মাঝে মধ্যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করে নিতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য জটিলতায় থাকা ব্যক্তিদের এই পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত।
মূল্যবান জিনিসপত্রের ব্যাপারে সাবধানতা
হজযাত্রীদের টাকা, পাসপোর্ট এবং মোবাইল ফোন রাখার জন্য নিরাপদ মানিবেল্ট বা লুকানো পাউচ ব্যবহার করা উচিত। নগদ টাকা এবং ব্যয়বহুল সামগ্রী যথাসম্ভব চোখের আড়ালে রাখা উচিত। হোটেলের ভেতরে ও আশেপাশে, স্থানীয় মার্কেট থেকে কেনাকাটার সময়েও এই সতর্কতা আবশ্যক।
অনেক সময় নিজের অসাবধানতার কারণেও সঙ্গে বহন করে চলা জিনিসপত্র পড়ে যায়। তাই শুধুমাত্র নিতান্তই দরকারি জিনিস ছাড়া সবকিছু হোটেলে নিরাপদে রাখা উচিত।
যতটা সম্ভব মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলা
অপ্রয়োজনীয় যানজট এড়াতে হজযাত্রীদের নির্ধারিত নামাজ ও তাওয়াফ এলাকার মধ্যে থাকা উচিত। চলাফেরার সময় হুট করে কোথাও কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেই সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত জটলার সৃষ্টি হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রায় ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ধাক্কার ঝুঁকি থাকে। তাই এই জায়গাগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাফেরা বজায় রাখতে হবে। এর জন্য আশেপাশের গতিবিধি সম্পর্কেও সর্বদা সতর্ক থাকা জরুরি।
গ্রুপের সান্নিধ্যে থাকা ও নির্দেশনা অনুসরণ
যেকোনো অপরিচিত পরিবেশে যে গ্রুপ বা সঙ্গীর সঙ্গে ভ্রমণ করা হয়েছে তাদের সান্নিধ্যে থাকাটা অত্যাবশ্যক। বিষয়টি ওমরার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে এখানে বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রীদের সমাগম হওয়ায় আকস্মিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি থাকে। এই সমস্যা সমাধানে গ্রুপের প্রধান একটি সাধারণ মিটিং পয়েন্ট নির্ধারণ করে দিয়ে থাকেন। এই নির্দেশনা অনুসরণ করা ঝামেলাবিহীন ওমরার অভিজ্ঞতারই নামান্তর। এর মধ্যেও যেকোনো সন্দেহ তৈরি হলে মোবাইল কলের মাধ্যমে সংযোগ রাখতে হবে।
যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ওমরা পালনের জন্য দেহ ও মনকে প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। কেননা এখানে একই সঙ্গে দৈহিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহনশীলতার পরীক্ষা দিতে হয়। শরীর ঠিক রাখার জন্য মনোযোগ দিতে হবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার দিকে। অপরদিকে ওমরার আচার-অনুষ্ঠান ও দোয়া শেখা প্রাথমিকভাবে মানসিক প্রস্তুতি দেবে।
উপরন্তু, যাত্রার পূর্বে প্রয়োজনীয় নথি, ওষুধপত্র, ও যোগাযোগ নাম্বার সংগ্রহ, এবং লাগেজ লেবেলিংয়ের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পরিশেষে, সফলভাবে ওমরা পালনের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ভিড় এড়িয়ে চলা, হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং গ্রুপের সান্নিধ্যে থাকাকে গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক।
ইহরামঃ উমরার প্রথম ফরজঃ
ইহরাম কি
اَلْاِحْرَامُ (ইহরাম) শব্দটি حَرَامٌ (হারাম) শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো কোনো জিনিসকে নিজের ওপর হারাম বা নিষিদ্ধ করে নেয়া।
শরীয়তের পরিভাষায় ইহরাম বলা হয় হজ বা উমরার নিয়তে তালবিয়া পড়া কে।
যেহেতু ওমরা পালনকারী ব্যক্তি ইহরামের মাধ্যমে নিজের ওপর স্ত্রী সহবাস, মাথার চুল, হাতের নখ, গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের ক্ষৌর কর্যাদি, সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাই করা পোশাক পরিধান এবং শিকার করাসহ কিছু বিষয়কে হারাম করে নেয়। এজন্য একে ইহরাম বলা হয়।
ইহরামের কাপড় কেন বাঁধতে হয়
নামাজের জন্য যেভাবে তাকবিরে তাহরিমা বাঁধা হয় ঠিক তেমনি হজের জন্য ইহরাম বাধা হয়। আর নামাজে যেমন তাকবিরে তাহরিমার মাধ্যমে স্বাভাবিক সময়ের অন্য হালাল ও বৈধ কাজগুলো নামাজি ব্যক্তির জন্য হারাম হয়ে যায়। ইহরামের মাধ্যমেও হজ ও উমরা পালনকারী ব্যক্তির জন্যও স্বাভাবিক অবস্থার অনেক হালাল কাজও হারাম হয়ে যায়। এ কারণেই হজ ও উমরার ****জন্য ইহরাম ফরজ করা হয়েছে।
পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় আর নারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় শালীন পোশাক পরিধান করাই হলো ইহরাম।
ইহরামের কাপড় বাঁধার পূর্বে পালনীয় কিছু সুন্নাত
১.নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, বগল ও নাভির নিচের চুল পরিষ্কার করা।
আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত,‘নবী (সা.) বলেছেন, মানুষের স্বভাবগত বিষয় হলো পাঁচটি: খাতনা করা, নাভির নীচের পশম কামানো, বগলের পশম উপড়ানো, গোঁফ কাটা এবং (অতিরিক্ত) নখ কাটা। [বুখারী, আস—সহীহ, ৫৮৬০]
ফিকহবিদগণ বলেছেন, এই আমলগুলো ইবাদতের মনোরম পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক। আনাস রা. বলেন,
“আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, নাভীর নিম্নাংশের লোম কামানো এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে এমনভাবে যে, তা যেনো চল্লিশ দিনের বেশি রেখে না দেয়া হয়।” [তিরমিজী, আস—সুনান, ২৭৫৯]
২.গোসল করা:
যায়িদ ইবন সাবিত (রা.) থেকে বর্ণিত,“তিনি দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহরামের উদ্দেশ্যে (সিলাই করা) পোশাক খুলে ফেলেছেন ও গোসল করেছেন।’’ [তিরমিজী, আস—সুনান, ৮৩২]
এই গোসল পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য, এমনকি নিফাস ও হায়েযবতীর জন্যও সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) নারী সাহাবী আসমা বিনত উমাইস (রা.)—কে যুল—হুলাইফায় সন্তান প্রসবের পর বলেন, “আমরা যুল—হুলাইফা নামক স্থানে পৌঁছলে আসমা বিনতে উমাইস (রা.) মুহাম্মাদ ইবন আবূ বকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)—এর নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন, এখন আমি কী করবো? তিনি বলেন, তুমি গোসল করো, এক খন্ড কাপড় দিয়ে পট্টি বাঁধো এবং ইহরামের পোশাক পরিধান করো।” [ইবন মাজাহ, আস—সুনান, ৩০৭৪]
গোসল করা সম্ভব না হলে উযু করা।
উযু গোসল কোনটাই যদি করার সুযোগ না থাকে তাহলেও কোন সমস্যা নেই। এক্ষেত্রে তায়াম্মুম করতে হবে না। কেননা গোসলের উদ্দেশ্য হচ্ছে, পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও দুর্গন্ধমুক্ত হওয়া। তায়াম্মুম দ্বারা এই উদ্দেশ্য হাসিল হয় না।
৩.সুগন্ধি ব্যবহার:
ইহরাম বাঁধার পূর্বে শরীরে, মাথায় ও দাড়িতে উত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহরাম বাঁধার পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন। আইশা (রা.) বলেন, “আমি নবী (সা.)—কে তার ইহরাম বাঁধার পূর্বে এবং কুরবানীর দিন বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পূর্বে কস্তুরী মিশ্রিত সুগন্ধি মেখে দিতাম।” [মুসলিম, আস—সহীহ, ২৭৩১]
৪.সেলাইবিহীন সাদা পরা ও সাদা চাদর গায়ে দেয়া এবং এক জোড়া জুতো বা স্যান্ডেল পায়ে দেয়া।
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমাদের প্রত্যেকে যেনো একটি যেনো একটি লুঙ্গি, একটি চাদর এবং এক জোড়া চপ্পল পরিধান করে ইহরাম বাঁধে।’’ [আহমদ, আল—মুসনাদ, ৪৮৯৯]
সাদা কাপড় পুরুষের সর্বোত্তম পোশাক। তাই পুরুষের ইহরামের জন্য সাদা কাপড়ের কথা বলা হয়েছে। ইহরামের ক্ষেত্রে নারীদের আলাদা কোন পোশাক নেই। শালীন ও ঢিলে—ঢালা, পর্দা বজায় থাকে এ ধরনের যেকোনো পোশাক পরে মহিলা ইহরাম বাঁধতে পারে। ইহরাম অবস্থায় সেলাইযুক্ত কাপড় পরা ও মাথা আবৃত করা পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ হলেও নারীদের জন্য নিষিদ্ধ নয়।
৫.দুই রাকাত সালাত আদায় করা:
উমর (রা.) হতে বর্ণিত, “তিনি বলেন, ‘আকীক উপত্যকায় অবস্থানকালে আমি নবী (সা.)—কে বলতে শুনেছিঃ আজ রাতে আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে একজন আগন্তুক আমার নিকট এসে বললেন, আপনি এই বরকতময় উপত্যকায় সালাত আদায় করুন এবং বলুন, (আমার এ ইহরাম) হাজ্জের সাথে ‘উমরাহ’রও।” [বুখারী, আস—সহীহ, ১৫৩৪]
এসব হাদীসের আলোকে একদল আলিম বলেন, ইহরাম বাঁধার পূর্বে দুই রাক‘আত ইহরামের সালাত আদায় করা সুন্নত। আরেকদল আলেমের মতে ইহরামের জন্য কোন বিশেষ সালাত নেই। তারা বলেছেন, ইহরাম বাঁধার সময় যদি ফরয সালাতের ওয়াক্ত হয়ে যায়, তাহলে হজ ও উমরা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য ফরয সালাত আদায়ের পর ইহরাম বাঁধা উত্তম।
৬. তালবিয়ার শব্দগুলো বেশি বেশি উচ্চারণ করা। কেননা তালবিয়া হজের শ্লোগান। তালবিয়া যত বেশি পাঠ করা যাবে, তত বেশি সওয়াব অর্জিত হবে।
তালবিয়ার আলোচনা
তালবিয়া কি?
তালবিয়া পবিত্র হজ ও ওমরার অন্যতম অনুষঙ্গ। তালবিয়াকে বলা হয় হাজিদের শ্লোগান। এই পবিত্র স্লোগানের মাধ্যমে মূলত প্রভুর দরবারে অনুগত বান্দা হয়ে হাজির হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। ইহরাম পূর্ণ হওয়ার জন্য শুধু নিয়ত করলে হয় না, একইসঙ্গে তালবিয়া পাঠ করা জরুরি। প্রথম বার তালবিয়া পড়া শর্ত। আর তারপর তালবিয়া পড়া সুন্নত। আরাফাতের ময়দান, মিনা-মুজদালিফা হাজিদের তালবিয়ার ধ্বনিতে থাকে মুখরিত।
তালবিয়া (আরবি)
لَبَّيْكَ ا للّهُمَّ لَبَّيْكَ – لَبَّيْكَ لاَ شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ – اِنَّ الْحَمدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ – لاَ شَرِيْكَ لَكَ
তালবিয়ার বাংলা উচ্চারণ
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’
তালবিয়ার অর্থ
‘আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি, হে আল্লাহ! আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি। আমি আাপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি, আপনার কোনো শরিক নেই, আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নেয়ামত এবং সাম্রাজ্য আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই।’ (সূত্র: বুখারি: ১৫৪৯; মুসলিম: ২৮১১)
ভিডিও উচ্চারণঃ https://youtube.com/shorts/yzdGSdcraLk?si=mia55W_PwWw91vwm
তালবিয়ার শব্দপুঞ্জের নিগূঢ় অর্থ
তালবিয়ায় ‘লাববাইক’ শব্দটি চারবার আছে। এটি একাধারে ভক্তি ও ভালবাসা এবং আনুগত্য ও সমর্পণের ভাব ধারণ করে। ‘লা-শারিকা লাক’ শব্দটি আছে দুইবার। এ হচ্ছে সকল প্রকার শিরক ও শরিককে বর্জনের ঘোষণা। আর তৃতীয় বাক্যটি অর্থাৎ ‘ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক’ হচ্ছে তাওহিদের এলান, তাওহিদের দলিল এবং আল্লাহর হামদ ও শোকর।
তালবিয়া পড়ার ফজিলত
সাহল ইবনে সাদ আসসায়েদি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তি যখন তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডানে ও বামে পৃথিবীর শেষপ্রান্ত পর্যন্ত যা কিছু আছে যেমন, গাছপালা, মাটি, পাথর সকল কিছু তালবিয়া পাঠ করতে থাকে। (জামে তিরমিজি: ৮২৮; ইবনে মাজাহ: ২৯২১)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, কোনো মুমিন যখন ইহরামের হালতে দিন কাটাবে তখন সূর্য তার সকল গুনাহ নিয়ে অস্ত যাবে। আর কোনো মুসলিম যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজের তালবিয়া পাঠ করবে তখন তার ডানে-বামে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সবকিছু তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। (জমে তিরমিজি: ৮১০; তারগিব: ১৭০৩
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে কেউ তালবিয়া পাঠ করবে তাকে সুসংবাদ দেওয়া হবে এবং যে কেউ তাকবির বলবে তাকে সুসংবাদ দেওয়া হবে। জিজ্ঞাসা করা হলো- ইয়া রাসুলাল্লাহ! জান্নাতের সুসংবাদ? উত্তরে নবীজি বললেন, হ্যাঁ। (আলমুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৭৭৭৫; তারগিব: ১৭০৭)
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘অমুকের ওপর আল্লাহর অভিশাপ! তারা ইচ্ছা করে হজের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিনের শোভা মিটিয়ে দিল। আর নিশ্চয় হজের শোভা হল তালবিয়া।’ (মুসনাদ আহমদ: ১/২১৭)
তালবিয়া কখন পাঠ করবে
ওমরা পালনকারী ইহরামের শুরু থেকে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ শুরু করার আগ পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করবে। তাওয়াফের আগ মুহূর্তে তালবিয়া বন্ধ করে দেবে। আর হজ পালনকারী ইহরাম বাঁধা থেকে শুরু করে ১০ জিলহজ কোরবানির দিন ‘জামরাতুল আকাবা’য় কঙ্কর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করবে। ফজল ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ না করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতেন।’ (বুখারি: ১৫৪৪)
পুরুষ ও নারীদের তালবিয়া পাঠের নিয়ম
ওমরা পালনকারী ইহরামের শুরু থেকে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ শুরু করার আগ পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করবে। তাওয়াফের আগ মুহূর্তে তালবিয়া বন্ধ করে দেবে। আর হজ পালনকারী ইহরাম বাঁধা থেকে শুরু করে ১০ জিলহজ কোরবানির দিন ‘জামরাতুল আকাবা’য় কঙ্কর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করবে। ফজল ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ না করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতেন।’ (বুখারি: ১৫৪৪)
তালবিয়ার পরিবর্তে অন্য জিকির কি জায়েজ?
তালবিয়ার স্থানে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, কালিমা তাইয়্যিবা বা কোনো জিকির পাঠ করলেও ইহরাম সম্পন্ন হবে। কিন্তু তালবিয়া ছাড়া অন্য কিছু পাঠ করা মাকরুহ। তাই তালবিয়া পাঠ একান্ত অসম্ভব হলে আল্লাহ তাআলার কোনো জিকিরের মাধ্যমে ইহরাম গ্রহণ করবে। (মানাসিক: ১০২; গুনয়াতুন নাসিক: ৭৬; আদ্দুররুল মুখতার, খণ্ড-০২, পৃষ্ঠা-৪৮৩)
বিখ্যাত তাবেয়ি তাউস (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, এক ব্যক্তি তালবিয়ার জায়গায় ‘আল্লাহু আকবর’ বলেছে। তিনি বললেন, তার ইহরাম সম্পন্ন হয়েছে। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ১৪৯৩৫)
পুরুষের ইহরামের কাপড় কেমন হতে হবে?
চাদরের মত দু’টুকরা কাপড় একটি কাপড় লুঙ্গির মতো করে নীচে পরবে। দ্বিতীয়টি চাদর পরার মতো করে শরীরের উপরের অংশে পরবে। কাপড়গুলো সেলাইবিহীন হতে হবে। লুঙ্গির মতো সেলাই করে পরা মাকরুহ। তবে যাদের সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যেমন বৃদ্ধ বা লুঙ্গি পড়ার অভ্যাস নেই এমন ব্যক্তিরা ইহরামের নিচের অংশটি লুঙ্গির ন্যায় সেলাই করে পরতে পারবেন। ( আহকামে হজ, মুফতি শফী রহ, ৩৪)
পরিচ্ছন্ন ও সাদা রং হওয়া মুস্তাহাব। ৩য় আর কোন প্রকার কাপড় গায়ে রাখা যাবে না। যেমন টুপি, গেঞ্জি, জাইঙ্গা বা তাবীজ কিছুই না। তবে শীত নিবারণের জন্য চাদর ও কম্বল ব্যবহার করতে পারবে
উমরার ইহরাম কখন পড়তে হয়?
উমরা পালনের নিয়তে যারা মক্কার উদ্দেশে গমন করেন, তাদের মিকাত (নির্ধারিত স্থান) অতিক্রম করার আগে ইহরামের কাপড় পরে নিতে হয়। ইহরাম বাঁধার স্থানকে মিকাত বলে। উমরার জন্য নির্ধারিত স্থান অতিক্রম করার পূর্বে ইহরাম বাঁধা ফরজ। ইহরাম না পরে মিকাত অতিক্রম করা জায়েজ নয়। তাই উমরা পালনকারীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থেকেই ফরজ কাজ ইহরাম বাঁধতে হয়। অঞ্চলভেদে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহরামের জন্য পাঁচটি স্থানকে ইহরাম বাধাঁর স্থান হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, “নবী (সা.) মদীনাবাসীদের জন্য যুলহুলাইফা, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহ্ফা, নাজদবাসীদের জন্য কারনুল মানাযিল ও ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম মীকাত নির্ধারণ করেছেন। উক্ত মীকাতসমূহ হাজ্জ ও ‘উমরাহ’র উদ্দেশে আগমনকারী সে স্থানের অধিবাসীদের জন্য এবং অন্য কোন এলাকার লোক ঐ সীমানা দিয়ে অতিক্রম করবে তাদের জন্যও। এছাড়াও যারা মীকাতের ভিতরের অধিবাসী তারা যেখান হতে সফর আরম্ভ করবে সেখান হতেই (ইহরাম আরম্ভ করবে) এমন কি মক্কাবাসীগণ মক্কা হতেই।” [বুখারী, আস—সহীহ, ১৫৩০]
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঐ অঞ্চলবাসীর জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ঐ অঞ্চলের লোক ছাড়া যারা অন্যান্য স্থান থেকে এ মিকাতগুলো অতিক্রম করে বাইতুল্লায় আসবে, তাদের জন্যও এগুলো ইহরাম বাধাঁর স্থান। যারা বিমানযোগে উমরা পালনে মক্কায় আসবেন, আকাশ পথে যে মিকাত পড়ে তা অতিক্রম করার পূর্বে ইহরাম বাধঁতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে তারা রওয়ানার পূর্বেই দেশ থেকে ইহরাম বেঁধে রওয়ানা হতে পারেন।
মিকাত তথা ইহরাম বাধাঁর স্থানগুলো কী কী?
হাদীসে ইহরাম বাধাঁর ৫ (পাঁচ) টি স্থানের উল্লেখ রয়েছে। এ গুলোকে মিকাত (ميقات) বলা হয়।
১.যুল—হুলাইফা (ذو الحليفة): মদিনাবাসী ও মদিনার পথে আগমনকারীদের জন্য মিকাত। মসজিদ নববীর দক্ষিণে ৭ কি.মি. এবং মক্কা থেকে উত্তরে ৪২০ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত বর্তমানে স্থানটির নাম ‘আবইয়ারে আলি’ বা ‘বীরে আলি’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ থেকে যারা আগে মদিনায় যাবে, তাঁরা ‘জুল—হুলাইফা’ থেকে ইহরাম বাঁধবেন।
২.আল—জুহফা (الجحفة): সিরিয়া, মিসর ও মরক্কোর অধিবাসী ও সে পথে আগমনকারীদের জন্য ইহরাম বাঁধার স্থান ‘আল—জুহফা’। মক্কা থেকে ২০৪ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত স্থানটি বর্তমান নাম ‘আল—রাবিগ’ নামে পরিচিত।
৩.কারনুল মানাযিল (قرن المنازل): নজদবাসী ও সে দিক থেকে আগতদের জন্য ইহরামের স্থান। মক্কা থেকে ৭৫ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত স্থানটির বর্তমান নাম ‘আস—সায়িল আল—কাবির’ (السائل الكبير)। রাজধানী রিয়াদ থেকে তায়িফ হয়ে যারা মক্কায় আসেন কিংবা মক্কা থেকে তায়িফে করতে যাওয়া হাজ্জীগণ এখান থেকে উমরার ইহরাম বাঁধেন।
৪.ইয়ালামলাম (يلملم): ইয়ামানবাসী ও ঐ দিক থেকে আগতের জন্য ইহরামের নির্ধারিত স্থান ইয়ালামলাম পাহাড়। মক্কা থেকে ১২০ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত স্থানটি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে জলযানের হজযাত্রীদের জন্য মিকাত।
৫.যাতু ইরক (ذات عرق): ইরাকবাসী ও সে পথে আসা হজ্জযাত্রীদের ইহরাম বাধাঁর স্থান। মক্কা থেকে পূর্ব দিকে ১০০ কি.মি. দূরত্বে স্থানটি অবস্থিত। এটি প্রাচ্যবাসী তথা ইরাক, ইরান এবং এর পরবর্তী দেশগুলোর অধিবাসীদের মিকাত। বর্তমানে এ মীকাতটি পরিত্যক্ত। কারণ ঐ পথে বর্তমানে কোন রাস্তা নেই। স্থল পথে আসা পূর্বাঞ্চলীয় হাজীগণ বর্তমানে সাইলুল কাবীর অথবা যুল—হুলাইফা থেকে ইহরাম বাঁধেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত,“নবী (সা.) মদীনাবাসীদের জন্য যুল—হুলাইফা, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহ্ফা, নাজদবাসীদের জন্য কারনুল মানাযিল ও ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম মীকাত নির্ধারণ করেছেন। উক্ত মীকাতসমূহ হাজ্জ ও ‘উমরাহ’র উদ্দেশে আগমনকারী সে স্থানের অধিবাসীদের জন্য এবং অন্য কোন এলাকার লোক ঐ সীমানা দিয়ে অতিক্রম করবে তাদের জন্যও। এছাড়াও যারা মীকাতের ভিতরের অধিবাসী তারা যেখান হতে সফর আরম্ভ করবে সেখান হতেই (ইহরাম আরম্ভ করবে) এমন কি মক্কাবাসীগণ মক্কা হতেই।” [বুখারী, আস—সহীহ, ১৫৩০]
ঐ অঞ্চলের লোক ছাড়া যারা অন্যান্য স্থান থেকে এ মিকাতগুলো অতিক্রম করে বাইতুল্লায় আসবে, তাদের জন্যও এগুলো ইহরাম বাধাঁর স্থান। যারা বিমানযোগে উমরা পালনে মক্কায় আসবেন, আকাশ পথে যে মিকাত পড়ে তা অতিক্রম করার পূর্বে ইহরাম বাধঁতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে তারা রওয়ানার পূর্বেই দেশ থেকে ইহরাম বেঁধে রওয়ানা হতে পারেন।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ
ইহরাম অবস্থায় নারী পুরুষ সকলের জন্য নিষিদ্ধ কাজ
ঝগড়া-বিবাদ সাধারণ অবস্থায়ও নিষিদ্ধ। ইহরাম অবস্থায় তা আরো ভয়াবহ।
সাজ-সজ্জা গ্রহণ করা নিষেধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেছেন, উত্তম হজ পালনকারী ব্যক্তি হলেন তিনি, যিনি এলোকেশী ওধূলিমলিন । [তিরমিযী, ২৯৯৮]
তাই ইহরাম অবস্থায় সব ধরনের সাজ-সজ্জা ত্যাগ করুন। এমনকি চুলে বাশরীরে তেল ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকুন ।
ইহরাম অবস্থায় কাপড় বা শরীরে আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষেধ। তদ্রূপ ইচ্ছাকৃত আতরের ঘ্রাণ, ফল-ফুলের ঘ্রাণ নেওয়া নিষেধ (তবে ফলখাওয়া নিষেধ নয়)। সুগন্ধিযুক্ত তেল, নারিকেল ও সরিষার তেল এবং যয়তুনও তিলের তেলও ব্যবহার করা যাবে না ।
একইভাবে সুগন্ধিযুক্ত সাবান দ্বারা হাত-পা ইত্যাদি ধোয়া যাবে না।পাউডার, স্নো-ক্রীম, পারফিউম ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না । এমনকি পানছাড়া শুধু সুগন্ধি জর্দাও খাওয়া যাবে না। পানের সাথেও এ ধরনের জর্দা খাওয়ামাকরূহ। [সহীহ মুসলিম, ১১৭৭]
নখ কাটা ও শরীরের চুল-পশম উপড়ানো নিষেধ।
পশু-পাখি শিকার করা বা কোনো শিকারীকে সহযোগিতা করা নিষেধ।তবে হাঁস-মুরগীসহ যে কোনো গবাদি পশু-পাখি জবাই করা জায়েয। [সূরামায়েদা ৯৫-৯৬, সহীহ মুসলিম ১১৯৬]
কাপড় বা শরীরে উকুন মারা নিষেধ। [ইবনে আবী শাইবা, ১৫৮৭৬]
ইহরাম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করা, স্ত্রীর সাথে কামভাবসৃষ্টি হয় এমন কথা ও কাজ নিষিদ্ধ। এজন্য একই বিছানায় শোয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। তবে স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি বসা, চলাচলে স্ত্রীর হাত ধরেরাখা নিষেধ নয় । [সূরা বাকারা ২/১৯৭]
পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ কাজ
পুরুষের জন্য শরীরের কোনো অঙ্গের গঠন অনুযায়ী প্রস্তুত করা বা সেলাইকরা পোশাক পরাও নিষেধ। যেমন: পাঞ্জাবি, জুব্বা, শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি,সেলোয়ার, আন্ডারওয়্যার ইত্যাদি । [সহীহ বুখারী, ১৫৪৩]
পুরুষের জন্য মাথা ও চেহারা ঢাকা নিষেধ। অতএব টুপি পরা যাবে নাএবং চাদর, কম্বল, কাঁথা ইত্যাদি দ্বারা মাথা ও মুখ ঢেকে শোয়া যাবে না।[মুআত্তা মুহাম্মাদ, ৪১৮]
[মাসআলা: ইহরাম অবস্থায় কান, ঘাড়, পা ঢাকা যাবে। মাথা ও গাল বালিশেরেখে শোয়া যাবে। তবে পুরো মুখ বালিশের উপর রেখে ঢেকে শোয়া যাবেনা । [মানাসিক, ১২৩-১২৪]
পুরুষের জন্য পায়ের পাতার উপরের অংশ ঢেকে যায় এমন জুতা পরিধান নিষেধ । তাই এমন স্যান্ডেল ব্যবহার করুন যা পরলে পায়ের উঁচু অংশটি খোলা থাকে। আর স্যান্ডেলে সেলাই থাকা বা না থাকায় কিছু যায় আসে না। [সহীহবুখারী, ১৫৪২]
চুল-দাড়ি আঁচড়ানো ও চলে সিঁথি করা নিষেধ ।
নারীর জন্য নিষিদ্ধ কাজ
নারীরা ইহরাম অবস্থায় মাথা ঢেকে রাখবেন। তাদের জন্য শুধু চেহারায়কাপড় লাগানো নিষেধ। [মুআত্তা মুহাম্মাদ ৪১৮]
মহিলারা মেহেদি, লিপস্টিক ইত্যাদি সাজ-সজ্জার প্রসাধনী ঘ্রাণমুক্ত হলেওব্যবহার করতে পারবেন না।_ নারীদের জন্যও ইহরাম অবস্থায় চুলে তেল দেওয়া, সিঁথি করা নিষেধ।তবে তারা চুল বেঁধে রাখতে পারবেন। আর চুল না আঁচড়ানোর কারণে যদি খুব বেশি অস্বস্তি লাগে কিংবা চুলে জট লেগে যায়, তাহলে সাজ-সজ্জার নিয়তছাড়া প্রয়োজনমতো চুল আঁচড়ানো যাবে।
কোনো মহিলা যদি মাসিক স্রাব বা সন্তান প্রসবোত্তর স্রাব অবস্থায় ইহরাম করেন তাহলে তার জন্য শুধু তাওয়াফ, নামায, কুরআন তিলাওয়াত ও মসজিদেপ্রবেশ করা নিষেধ। এছাড়া তিনি উমরার অন্যসব কাজ করতে পারবেন ।
ইহরাম অবস্থায় যে-সব কাজ করা যায়
ইহরাম অবস্থায় মাথা ও মুখ ব্যতীত সম্পূর্ণ শরীর কাঁথা, কম্বল, চাদর ইত্যাদি দিয়ে ঢাকা। মাথা ও গাল বালিশে রেখে শোয়া। তবে সম্পূর্ণ চেহারা বালিশে রেখে উপুড় হয়ে শোয়া যাবে না। (মানাসিক পৃ.১২৩)
ইহরাম অবস্থায় ইহরামের কাপড় ময়লা বা নাপাক না হলেও পরিবর্তন করা। অনেকে মনে করে ইহরামের চাদর খুললেই ইহরাম খুলে যায়। একথা ঠিক নয়। হলক বা তাকসীর তথা চুল মুন্ডানো বা ছোট করার আগ পর্যন্ত ইহরাম খুলবে না। (মানাসিক পৃ.৯৮)
ইহরামের কাপড় ছিড়ে গেলে সেলাই করে পরা। (মানাসিক পৃ. ৯৮)
সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার না করে গোসল করা । তবে ইচ্ছাকৃত শরীরের ময়লা উঠানো যাবে না। (মানাসিক পৃ. ১২০)
সুঘ্রাণযুক্ত ফল-মুল খাওয়া যাবে। তবে ইচ্ছাকৃত ফল বা ফুলের ঘ্রাণ নিবে না। (মানাসিক পৃ. ১২১,১২৪)
ঘ্রাণমুক্ত লিপজেল, ভ্যাসলিন ঠেকাবশত ব্যবহার করা । (কিতাবুল মাসাইল ৩/১৬২)
সেলাইযুক্ত বেল্ট, ব্যাগ ইত্যাদি ব্যবহার করা । (মানাসিক পৃ.১২২)
মাথা ও চেহারা না ঢাকার শর্তে কান ঢাকা। (বর্তমানে কান ঢাকার জন্য ইয়ারফোন আকৃতির যে বস্তু পাওয়া যাচ্ছে তা ইহরাম অবস্থায় ব্যবহার করা যাবে।) (কিতাবুল মাসাইল ৩/১৩৮)
ইহরাম আবস্থায় গৃহপালিত পশু যেমন : হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ইত্যাদি জবাই করা এবং মাছ শিকার করা । (মানাসিক পৃ.১১৯)
ইহরাম অবস্থায় মশা-মাছি, সাপ-বিচ্ছু, পিঁপড়া, পোকা-মাকড়, হিংস্র জানোয়ার মারা। পিঁপড়া কষ্টদায়ক না হলে মারা যাবে না। (মানাসিক পৃ ১২৫, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৫২)
দাঁত উঠানো। ফোঁড়া, বিচি ইত্যাদি গালা, ভাঙ্গা নখ কেটে ফেলা, ব্রাশ করাও যাবে তবে সুগন্ধি পেস্ট ব্যাবহার করা যাবে না। (মানাসিক পৃ.১২২)
ইহরাম অবস্থায় চশমা, ঘড়ি, আংটি, মাফলার ব্যবহার করতে কোনো অসুবিধা নেই। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৮৯,)
ইহরাম সংক্রান্ত জরুরি কিছু প্রশ্নোত্তর
-
ইহরাম অবস্থায় কাপড় পরিবর্তন করা যাবে?
হজ ও ওমরা পালনের জন্য ইহরাম আবশ্যক। ইহরাম না পরে মিকাত অতিক্রম করা জায়েজ নয়। ইহরামের সময় পুরুষেরা সেলাইবিহীন পোশাক পড়েন। নারীরা যেকোনো স্বাভাবিক ঢিলেঢালা পোশাক পরবেন। তাদের ইহরামের জন্য ভিন্ন পোশাক নেই।
হজ-ওমরা পালনকারী ব্যক্তি ইহরামের মাধ্যমে নিজের ওপর স্ত্রী সহবাস, মাথার চুল, হাতের নখ, গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের ক্ষৌর কর্যাদি, সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাই করা পোশাক পরিধান এবং শিকার করাসহ কিছু বিষয়কে হারাম করে নেন।
ইহরাম অবস্থায় অনেক কাজই নিষিদ্ধ। তবে ইহরাম অবস্থায় কোনো ব্যক্তির ইহরামের পোশাক পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি তা করতে পারবেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. ইহরাম অবস্থায় ‘তানয়িম’ নামক স্থানে কাপড় পরিবর্তন করেছিলেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১৫০১০)
বিখ্যাত তাবেয়ি ইবরাহিম নাখাঈ রহ. বলেন, ইহরাম গ্রহণকারী ইহরামের কাপড় পরিধান করার পর যখন ইচ্ছা তা পরিবর্তন করতে পারবেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১৫০১১)
-
ইহরাম অবস্থায় মাস্ক ব্যবহার করা যাবে?
ইহরাম অবস্থায় চেহারা ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ। কেউ যদি ইহরাম অবস্থায় চেহারার এক চতুর্থাংশ বা তার বেশি ১২ ঘণ্টা বা এর বেশি সময় ঢেকে রাখে, তাহলে তার ওপর দম ওয়াজিব হয়। আর ১২ ঘণ্টার কম সময় (এক ঘণ্টার বেশি) ঢেকে রাখলে একটি সদকাতুল ফিতর পরিমাণ দান করা ওয়াজিব হয়।
তাই কেউ যদি ইহরাম অবস্থায় মাস্ক পরে বা অন্য কোনোভাবে চেহারা ঢেকে রাখে তাহলে জরিমানাস্বরূপ তা একটি সদকাতুল ফিতর পরিমাণ বা তার মূল্য গরিব কাউকে দান করতে হবে।
আর এই সদকা যেকোনো জায়গায় আদায় করা যাবে। তবে হেরেম এলাকার দরিদ্রদের দেওয়া উত্তম। (আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৪৩০; আল কাউসার, আলবাহরুর রায়েক ৩/৮)
-
বাংলাদেশের উমরা হাজ্জীরা কখন ইহরাম বাধঁবে?
উমরা পালনকারীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থেকেই ফরজ কাজ ইহরাম বাঁধতে হয়। অঞ্চলভেদে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহরামের জন্য পাঁচটি স্থানকে ইহরাম বাধাঁর স্থান হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ইবন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত,
“নবী (সা.) মদীনাবাসীদের জন্য যুল—হুলাইফা, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহ্ফা, নাজদবাসীদের জন্য কারনুল মানাযিল ও ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম মীকাত নির্ধারণ করেছেন। উক্ত মীকাতসমূহ হাজ্জ ও ‘উমরাহ’র উদ্দেশে আগমনকারী সে স্থানের অধিবাসীদের জন্য এবং অন্য কোন এলাকার লোক ঐ সীমানা দিয়ে অতিক্রম করবে তাদের জন্যও। এছাড়াও যারা মীকাতের ভিতরের অধিবাসী তারা যেখান হতে সফর আরম্ভ করবে সেখান হতেই (ইহরাম আরম্ভ করবে) এমন কি মক্কাবাসীগণ মক্কা হতেই।” [বুখারী, আস—সহীহ, ১৫৩০]
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঐ অঞ্চলবাসীর জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ঐ অঞ্চলের লোক ছাড়া যারা অন্যান্য স্থান থেকে এ মিকাতগুলো অতিক্রম করে বাইতুল্লায় আসবে, তাদের জন্যও এগুলো ইহরাম বাধাঁর স্থান। বাংলাদেশ থেকে যারা বিমানযোগে উমরা পালনে মক্কায় আসবেন, আকাশ পথে যে মিকাত পড়ে তা অতিক্রম করার পূর্বে ইহরাম বাধঁতে হবে। বাংলাদেশ থেকে যাত্রীবাহি বিমানগুলো ‘যুল—হুলাইফা’ ও যাতু ইরক’ এ দুটি মিকাতের আশেপাশে দিয়ে মিকাতে প্রবেশ করে। বিমানে সুন্নাহসম্মত ইহরাম বাধাঁ সম্ভব হয় না এবং কখনো কখনো মিকাত অতিক্রম সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যায় না। সেক্ষেত্রে তারা রওয়ানার পূর্বেই দেশ থেকে ইহরাম বেঁধে রওয়ানা হতে পারেন। বাংলাদেশী উমরাযাত্রীরা নিজ গৃহ থেকে ইহরাম বেধেঁ রাওয়ানা হওয়া সুবিধাজনক।
-
ঢাকা থেকে ইহরামের কাপড় পড়ে বিমানে নিয়ত পড়া যাবে কী?
ঢাকা থেকে ইহরামের কাপড় পড়ে বিমানে নিয়ত বা প্রথম তালবিয়া পড়া যাবে। যারা আকাশ পথে বিমানে ইহরাম বাধঁতে চান তারা বিমান মিকাতের কাছাকাছি পৌছঁলে যখন ক্যাপ্টেনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, তখনই ইহরাম বাঁধতে পারেন। অথবা যারা ঢাকা থেকে সরাসরি পবিত্র নগরী মক্কায় গমন করবে তারা ঢাকা থেকেই ইহরামের কাপড় পড়ে নিয়ত করে যেতে পারেন। আবার ইহরামের কাপড় পরে মিকাতের কাছাকাছি গিয়েও নিয়ত করা যাবে। বিমানে সুন্নাহসম্মত ইহরাম বাধাঁ সম্ভব হয় না এবং কখনো কখনো মিকাত অতিক্রম সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যায় না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশী উমরাকারীগণ মক্কার উদ্দেশে রওয়ানার পূর্বেই ঢাকা থেকে ইহরাম বেঁধে রওয়ানা হতে পারেন। ইহরাম বাধাঁ বলতে দু’টি কাজকে বুঝায়: ইহরামের কাপড় পড়া এবং উমরার ক্ষেত্রে ’লাব্বাইকা ওমরাতান’ আর হজ্জেও ক্ষেত্রে ‘লাব্বাইকা হাজ্জান’ বলে নিয়ত বা প্রথম তালবিয়া পাঠ করা। ঢাকা থেকে কাপড় পরিধান করে বিমান মিকাত অতিক্রম করার পূর্বমূহুর্তে নিয়ত পড়াতেও কোনো সমস্যা নেই।
-
ইহরাম পড়া অবস্থায় সর্বদা ওযু থাকা আবশ্যক কি—না?
ইহরাম অবস্থায় ওযু নষ্ট হয়ে গেলে এতে কোনো সমস্যা নেই। এতে ইহরামের কোনো ক্ষতি হবে না। তবে উমরার ওয়াজিব সমুহের মাঝে তাওয়াফ পবিত্র অবস্থায় আদায় করতে হয়। ফলে তাওয়াফরত অবস্থায় ওযু নষ্ট হলে অবশিষ্ট তাওয়াফ ওযু করে সম্পন্ন করতে হবে।
-
বাংলাদেশ থেকে উমরাকারীগণ যদি নিজ বাড়ী বা ঢাকা এয়ারপোর্টে ইহরাম পরেন কি তা জায়েয হবে?
হ্যাঁ, তা জায়েয আছে। ইহরামের কাপড় মীকাত থেকে পরা সুন্নাত হলেও বিমান বা যানবাহনে উঠার আগেই গোসল করে ইহরামের কাপড় পরে নিতে পারেন। তবে নিয়ত করা উচিৎ মিকাতে পৌঁছে বা এর পূর্বক্ষণে। বিভিন্ন এয়ারলাইনসে ট্রানজিট পেসেন্জার হিসেবে যারা আবুধাবী, দুবাই, কুয়েত, দুহা, বাহরাইন, মাসকাট ও সানআ এয়ারপোর্টে নামবেন তারা সেখানেও পরিচ্ছন্নতা ও অজু—গোসলের কাজ সেরে ইহরামের কাপড় পরে নিতে পারেন। এরপর বিমানে যখন মীকাতে পৌছার ঘোষণা দেবে তখনই নিয়ত করে নেবেন এবং তালবিয়াহ পাঠ শুরু করবেন। তবে ঘোষণা দেয়ার সঙ্গেই নিয়ত করে ফেলবেন। কারণ বিমান খুবই দ্রুত চলে। আপনার নিয়ত করা যেন মিকাতে পৌঁছার আগেই হয়ে যায়। তা না হলে দম দিতে হবে।
-
একবার ইহরাম পড়ে কি একাধিক উমরাহ করা যায়?
না। একবার ইহরাম পড়ে একাধিক উমরার সুযোগ নেই। উমরার চারটি ওয়াজিব কাজ। ইহরাম বাধাঁ, তাওয়াফ করা, সাঈ করা এবং মাথামুণ্ডন বা চুল কেটে হালাল হওয়া। ইহরাম বেেঁধ ৪র্থ কাজটি করার পর ইহরাম আর থাকে না। তাহলে দ্বিতীয় উমরা করার সুযোগ কোথায়? পররবর্তী উমরার জন্য আবার নিকটবর্তী মিকাতে এসে ইহরাম বাধঁতে হবে।
-
মুহরিম ব্যক্তি যে যে প্রাণী হত্যা করতে পারবে
‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত।আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ প্রকার প্রাণী এত ক্ষতিকর যে, এগুলোকে হারামের মধ্যেও হত্যা করা যেতে পারে। (যেমন) কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও হিংস্র কুকুর।(৩৩১৪, মুসলিম ১৫/৯, হাঃ ১১৯৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৭০৭)
-
ইহরাম কতক্ষন পড়ে থাকতে হয়?
চুল কেটে হালাল হওয়ার আগ পর্যন্ত ইহরাম পড়ে থাকতে হবে। হালাল হওয়ার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা—মারওয়ার সা‘ঈ সমাধা করে তোমরা ইহরাম ভঙ্গ করে হালাল হয়ে যাও এবং চুল ছোট কর। [বুখারী, আস—সহীহ, ১৫৬৮]
-
ইহরামের কাপড় পড়ে ঘুমানোর বিধান কি?
ইহরামের কাপড় পরিধান করে ঘুমানো যাবে। বস্তুত দূরদুরান্ত থেকে আগত হজ্জ ও উমরার মুহরিম ক্লান্ত হয়ে ঘুমের ঘোরে চলে যেতে পারেন। এমতাবস্থায় তার ইহরাম খুলে অন্য কাপড় পড়া জায়েজ নয়।
-
কোন মুহরিম ব্যক্তির জন্য ঘুমের সময় মাথা ঢাকা জায়েয আছে কিনা?
“যদি মুহরিম ব্যক্তি নারী হয় তাহলে তার জন্য মাথা ঢাকা বৈধ। আর যদি পুরুষ হয় তাহলে ঘুমের মধ্যে হোক কিংবা জাগ্রত অবস্থায় হোক মাথা ঢাকা বৈধ নয়। তবে তিনি যদি ঘুমের ঘোরে মাথা ঢেকে থাকেন, জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে কাপড় সরিয়ে নেয়া তার উপর ফরজ; কাপড় সরিয়ে নিলে তাকে কোন দম দিতে হবে না। কারণ ঘুমন্ত ব্যক্তি দায়মুক্ত।” [শাইখ সালিহ আল—মুনাজ্জিদ, ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব, ১০৬৫৬২]
-
উমরাহ করার জন্য ইহরামের কাপড় কয়টি নিলে ভাল হয়?
ইহরামে জন্য পুরুষদের দু’টি সেলাইবিহীন কাপড় নিতে হয়, যার একটি লুঙ্গি ও অন্যটি চাদর হিসেবে গায়ে জড়িয়ে নেয়া হয়। েইহরামের কাপড় যে কোনো কারণে অপবিত্র হওয়ার আশংকায় কিংবা সঙ্গত কারণে পরিবর্তনের প্রয়োজন পূরণে হজ্জ বা উমরাকারী অন্তত দুই সেট ইহরামের কাপড় ব্যবস্থা করতে পরেন। এতে করে পরিধান করা ইহরামের কাপড় অপবিত্র হয়ে গেলে সঙ্গে রাখা অন্য সেট পরিধান করতে পারবেন।
-
ইহরামকারীর জন্য ছাতার ছায়া নেয়া কি জায়েয?
সূর্যের উষ্ণতা কিংবা বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ছাতা ব্যবহার করা জায়েজ। অনুরূপ কাজ হাদীসে মাথা ঢেকে রাখার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়বে না। বস্তুত তা মাথা ঢাকা নয়; বরং রোদ—বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশ্রয়। বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা.) অনুরূপ ছায়া গ্রহণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
“উম্মুল হুসায়ন (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে বিদায় হাজ্জ করেছি এবং আমি দেখেছি, তিনি জামরাতুল আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করে সওয়ারীতে চড়ে ফিরে আসেন এবং তার সাথে ছিলেন বিলাল ও উসামা (রা.)। তাদের একজন উটের লাগাম ধরে তা টেনে নিচ্ছিলেন এবং অপরজন সূর্যের তাপের কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মাথার উপর কাপড় ধরে রাখছিলেন।” [মুসলিম, আস—সহীহ, ১২৯৮]
উক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহরাম অবস্থায় হালাল হওয়ার পূর্বে কাপড় দিয়ে ছায়া গ্রহণ করেছেন। ফলে সূর্যের উষ্ণতা কিংবা বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ছাতা ব্যবহার করা জায়েজ।
-
ইহরাম অবস্থায় গোসলের বিধান
ইহরামে প্রবেশ করার পর গোসল করতে কোনো বাধা নেই। কেননা তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত রয়েছে। চাই একবার গোসল করুক বা দু’বার। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে জানাবাতের (নাপাকীর) গোসল করা ওয়াজিব। আর ইহরাম বাঁধার সময় গোসল করা সুন্নাত।
-
ইহরাম অবস্থায় হেডফোন লাগিয়ে তেলাওয়াত শোনা যাবে কি?
ইহরাম বাঁধার পর হজ-ওমরা পালনকারীদের জন্য বেশকিছু কাজ করা নিষেধ। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে ইহরাম বাঁধার পর কানে হেডফোন লাগিয়ে কোরআন তেলাওয়াত শোনা যাবে কিনা?
সাধারণ মুসলিমদের এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিরসনে আলেমরা বলেন, ইহরাম অবস্থায় চেহারা ঢাকা নিষেধ। ইসলামী পরিভাষায় চেহারা বলা হয় মূলত, মুখের ওই অংশ যা অজুতে ধোয়া আবশ্যক। অর্থাৎ কপালের চুল থেকে নিয়ে থিতুর নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি পর্যন্ত অপর কানের লতি পর্যন্ত অংশকে চেহারা বলা হয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, মুখমণ্ডল ও তার উপরের অংশ মাথার অন্তর্ভুক্ত। অতএব ইহরাম গ্রহণকারী থুতনী থেকে উপরের দিকে আবৃত করবে না। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নং: ১৪৪৫২)
আলেমরা বলেন, দুই কান চেহারার অংশের মধ্যে গণ্য হবে না। এইজন্য ইহরামের সময় কান ঢাকা বা কানে হেডফোন লাগিয়ে কোরআন তেলাওয়াত শোনা যাবে। তবে ইহরামের কাপড় পড়া কিংবা নিয়ত করার পর সবসময় সাবধান থাকতে হবে যেন অযাচিত বা অনুচিত কোনও কাজ না হয়ে যায়।
এ সময় অশ্লীল-অসাড় আলাপ-আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং নিজেকে দয়াময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে শপে দিতে হবে। জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, মুখস্ত দোয়ায় মনোযোগী হওয়া জরুরি, কোরআন তেলাওয়াত করা এবং শোনাও যেতে পারে। (মুসনাদে আহমাদ, ৮৪৭৫, বাহরুর রায়েক, ৯/৩, ইরশাদুস সারী, ৮৪,
-
উমরার উদ্দেশ্যে মসজিদুল হারামে (কাবা শরীফ) গমন
মসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ ও দরূদ শরিফ পড়ুন। তারপর এ দুআ পড়ুন-
اللَّهُمُ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَঅর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমার সকল গুনাহ মাফ করে দিন এবং আমার জন্য আপনার রহমতের সবগুলো দরজা খুলে দিন । [ইবনে আবী শাইবা ৩৪৩৩]
তিনটি দুআ একত্রে এভাবেও পড়তে পারেন-
بِسْم الله وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللهِ ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَঅর্থ: আল্লাহর নামে প্রবেশ করছি । দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের উপর। হে আল্লাহ! আমার গুনাহ মাফ করে দিন, আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন। [মুসনাদে আহমাদ ২৬৪১৭]
ডান পা দিয়ে পরিপূর্ণ আদবের সাথে মসজিদে প্রবেশ করুন এবং নফল ইতিকাফের নিয়ত করুন। কাউকে কষ্ট না দিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হোন।
তাওয়াফই হলো মসজিদুল হারামের ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’। এজন্য তাওয়াফের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করলে তাহিয়্যাতুল মসজিদের দু রাকাত পড়তে হবে না ।
সাধারণত মসজিদে হারামে প্রবেশ করে কিছুদূর অগ্রসর হবার পর কাবা শরীফ দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। অবশ্য কোনো কোনো গেইট থেকে (যেমন বাবে আব্দুল আজীজ) বাহির থেকেই কাবা দৃষ্টিগোচর হয়ে যায়। ভেতরে বা বাহিরে যেখানেই কাবা শরীফ দৃষ্টিগোচর হয়, এসময় রাস্তা থেকে সরে সুবিধামত জায়গায় দাঁড়ান। আর চিন্তা করুন, এ তো সেই বাইতুল্লাহ, যার দিকে ফিরে হাজারও মাইল দূর থেকে জীবনভর নামায পড়া হয়। আজ সে ঘর, প্রাণের কাবা আপনার চোখের সামনে। এতটাই কাছে যে, ইচ্ছে করলেই আপনি এর দেওয়াল জড়িয়ে ধরতে পারবেন। জীবনে আপনি হয়ত অনেক সুদৃশ্য ইমারত দেখেছেন। স্থাপত্য শিল্পের অনেক উৎকৃষ্ট নমুনা দেখেছেন। কিন্তু এই সাদামাঠা চৌকোণা ঘরের ভেতর আল্লাহ তাআলা কী যে সৌন্দর্য, কী আকর্ষণ ও মাধুর্য নিহিত রেখেছেন! কেমন চোখ জুড়িয়ে দেয়, মন আপ্লুত করে। দেখে যেন আশ মেটে না। কিছুতেই চোখ ফেরানো যায় না। স্পষ্টই অনুভূত হয়, এ ঘর দেখে চোখের পিপাসা ও হৃদয়ের ক্ষুধা মেটে না। মন চায় আরও দেখি, দেখতেই থাকি। এর কেন্দ্রীয় আকর্ষণ ও গুরুত্ব, এর রূপ ও শোভা, এর মনোহারিত্ব ও জ্যোতির্ময়তা সকল ভাষা-বর্ণনার অতীত। এটা আল্লাহ তাআলার এক মহাবিস্ময়কর নিয়ামত। সমগ্র জগতের আকর্ষণ ও মনোজ্ঞতা এর মধ্যে ঠেসে দেওয়া হয়েছে।
এরপর প্রাণ খুলে দুআ করুন।
এবার উমরাহর তাওয়াফ আদায় করার জন্য ধীরে ধীরে মাতাফের দিকে অগ্রসর হোন।
মাতাফে ও মসজিদে হারামে নামাযরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা প্রসঙ্গে:
মাতাফে নামাযরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে সকলের জন্য অতিক্রম করা জায়েয। আর মাসজিদুল হারামেও প্রয়োজনে নামাযীর সামনে দিয়ে তাওয়াফকারীদের চলাচল করা জায়েয।
তবে মসজিদে হারামে তাওয়াফকারী ব্যতীত অন্যদের চলাচলের বিষয়ে আলিমদের মাঝে দ্বিমত আছে। এজন্য ভিড় না হলে মসজিদুল হারামে নামাযরত ব্যক্তির সিজদার জায়গা এড়িয়ে আরো সামনে দিয়ে চলাচল করাঅধিক সতর্কতার দাবি। [সহীহ ইবনে হিব্বান ৬/১২৮, মুসান্নাফে আব্দুররায্যাক ২/৩৫, মুসনাদে আহমদ ২৭২৪১, আলমুগনী ৩/৮৯]০ বেশি বেশি তালবিয়া পড়তে থাকুন।
তাওয়াফঃ উমরার দ্বিতীয় ফরজঃ
তাওয়াফ কি? এবং এর ফযিলত
তাওয়াফ অর্থ ঘোরা বা প্রদক্ষিণ করা। ইসলামি পরিভাষায় তাওয়াফের নিয়তে হাজরে আসওয়াদের কোনা থেকে শুরু করে পবিত্র কাবাঘরের চারপাশে সাত বার প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলা হয়। তাওয়াফ হজ ও ওমরার অপরিহার্য আমল।
পবিত্র কাবা তাওয়াফ করার ফজিলত
মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম আমল হলো পবিত্র কাবাঘরের তাওয়াফ। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের এই পবিত্র ঘরের তাওয়াফ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন—সুরা হজের একটি আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে ও তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৯)
এখানে প্রাচীন ঘর বলতে পবিত্র কাবাঘরের কথা বলা হয়েছে।
কাবাঘরের তাওয়াফ এতটাই ফজিলতপূর্ণ ইবাদত যে পবিত্র কোরআনে এর তাওয়াফকে সেখানে নামাজের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে তোমারা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১২৫)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম তাওয়াফকারীদের কথা উল্লেখ করেছেন। একইভাবে সুরা হজেও মহান আল্লাহ তাওয়াফকারীদের কথা সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন।
এগুলো দ্বারা বোঝা যায়, পবিত্র কাবাঘরের তাওয়াফ করা নফল নামাজের চেয়েও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। পবিত্র কাবাঘরের তাওয়াফ ছাড়া হজ-ওমরাহ শুদ্ধ হয় না। কোনো কোনো হাদিসে পবিত্র কাবাঘরের তাওয়াফকে নামাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ পবিত্র বাইতুল্লাহর তাওয়াফ নামাজের মতোই মর্যাদাপূর্ণ। তাওয়াফরত অবস্থায় কোনো অনর্থক কথা বলা যাবে না।
সঠিকভাবে পবিত্র বাইতুল্লাহর তাওয়াফে দাস মুক্ত করার সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যায়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করল এবং দুই রাকাত নামাজ পড়ল, তা একটি ক্রীতদাসকে দাসত্বমুক্ত করার সমতুল্য।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৯৫৬)
ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমার ঘরকে পবিত্র রাখবে তাওয়াফকারী, নামাজ কায়েমকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৬)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, বাইতুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করা নামাজ আদায়ের অনুরূপ। তবে তোমরা এতে (তাওয়াফকালে) কথা বলতে পারো। সুতরাং তাওয়াফকালে যে ব্যক্তি কথা বলে সে যেন ভালো কথা বলে। (তিরমিজি, হাদিস : ৯৬০)
একান্ত বলতেই হলে ভালো কথা বলার সুযোগ রয়েছে, অর্থাৎ দোয়া ইত্যাদির বাক্য বলার সুযোগ রয়েছে। এ জন্যই অন্য বর্ণনায় তাওয়াফ অবস্থায় কম কথা বলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাউস (রহ.) থেকে বর্ণিত, এমন এক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন যে, যিনি নবী (সা.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, তিনি বলেন, বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করাও সালাতের মতো। অতএব কথা কমই বলবে। (নাসায়ি, হাদিস : ২৯২২)
অন্য হাদিসে তাওয়াফকারীর প্রতিটি কদমে কদমে গুনাহ মাফ ও সওয়াব লেখার কথা বলা হয়েছে। উমাইর (রহ.) থেকে বর্ণিত, ভিড় ঠেলে হলেও ইবনে উমার (রা.) হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানির কাছে যেতেন (তা স্পর্শ করার জন্য)। রাসুল (সা.)-এর অন্য কোনো সাহাবিকে আমি এরূপ করতে দেখি নাই। আমি বললাম, হে আবু আব্দুর রহমান! আপনি ভিড় ঠেলে হলেও এই দুই রুকনে গিয়ে পৌঁছেন, কিন্তু আমি তো ভিড় ঠেলে রাসুল (সা.)-এর অন্য কোনো সাহাবিকে সেখানে যেতে দেখিনি। তিনি বলেন, আমি এরূপ কেন করব না? রাসুল (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, এই দুটি রুকন স্পর্শ করলে গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায়। (সহিহ, তালিকুল রাগিব : ২/১২০)
আমি তাঁকে আরো বলতে শুনেছি, সঠিকভাবে যদি কোনো লোক বাইতুল্লাহ সাতবার তাওয়াফ করে তাহলে তার একটি দাস আজাদ করার সমান সওয়াব হয়। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৯৫৬)
তাঁকে আমি আরো বলতে শুনেছি, যখনই কোনো ব্যক্তি তাওয়াফ করতে গিয়ে এক পা রাখে এবং অপর পা তোলে আল্লাহ তখন তার একটি করে গুনাহ মাফ করে দেন এবং একটি করে সওয়াব লিখে দেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৯৫৯)
তাই মহান আল্লাহ যাদের বাইতুল্লাহর মেহমান হিসেবে কবুল করেন, তাদের উচিত যত বেশি বেশি সম্ভব তাওয়াফের মাধ্যমে এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বারবার পবিত্র মক্কা-মদিনা জিয়ারতের তাওফিক দান করুন। আমিন।
তাওয়াফের শর্ত, ওয়াজিব ও সুন্নত কার্যাবলী
তাওয়াফের শর্ত
তাওয়াফের জন্য ৬টি শর্ত রয়েছে। এগুলো মধ্যে ৩টি শর্ত সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য। আর ৩টি শর্ত শুধুমাত্র হজের ফরজ রুকন তাওয়াফে জিয়ারাতের জন্যই প্রযোজ্য।
সর্বাবস্থায় পালনীয় ৩ শর্ত
১.মুসলমান হতে হবে।
২.তাওয়াফের নিয়ত অর্থাৎ তাওয়াফের ইরাদা বা ইচ্ছা থাকতে হবে।
২.তাওয়াফ মসজিদে হারামের মধ্যে হতে হবে।
হজের জন্য পলনীয় ৩ শর্ত
১.তাওয়াফে জিয়ারত নির্দিষ্ট সময়ে হওয়া। আর তা হলো ১০ জিলহজ সুর্যোদয়ের পর থেকে ১২ জিলহজ সুর্যাস্তের আগ পর্যন্ত।
২.তাওয়াফ ইহরামের পরে হওয়া।
৩.আর উকুফে আরাফা অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পরে হওয়া (৯ জিলহজ)
তাওয়াফের ওয়াজিব
১. শরীর পবিত্র রাখা, অজু করা। নারীদের জন্য ঋতুস্রাব অবস্থায় তাওয়াফ করা জায়েজ নেই।
২. সতর ঢাকা। অর্থাৎ যেটুকু ঢাকা প্রত্যেক পুরুষ-নারীর জন্য ফরজ।
৩. ‘হাতিমে কা’বার’ বাইরে থেকে তাওয়াফ করা।
৪. হেঁটে তাওয়াফ করা। অক্ষম ব্যক্তি খাটিয়ার মাধ্যমে তাওয়াফ করতে পারেন।
৫. ‘হাজরে আসওয়াদ’ থেকে শুরু করে ডানদিক দিয়ে তাওয়াফ শুরু করা।
৬. এক নাগাড়ে বিরতিহীনভাবে ‘সাতবার চক্কর’ দিয়ে তাওয়াফ পূর্ণ করা।
৭. ‘সাত চক্করে’ এক তাওয়াফ; এটা পূর্ণ হলেই ‘তাওয়াফের’ নামাজ পড়া।
তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী
১. তাওয়াফের শুরুতে ‘হাজারে আসওয়াদ’ এর দিকে মুখ করা।
২. সম্ভব হলে ‘হাজরে আসওয়াদ’ চুম্বন করা। নতুবা হাত দিয়ে দূর থেকে ইশারা করা। আর মুখে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর ওয়ালিল্লাহিল হামদ’ বলা।
৩. হাজের আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে তাকবিরে তাহরিমা’র মতো উভয় হাত সিনা পর্যন্ত তোলা।
৪. যে তাওয়াফের পরে ‘সায়ি’ আছে, তাতে ‘ইজতেবা’ করা। অর্থাৎ ইহরামের চাদরের (উপরের অংশের) দুই মাথা ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের ওপর ফেলে দেওয়া।
৫. ‘সাঈ’-যুক্ত ‘তাওয়াফে’র প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ করা। ওঠাত বীরের মতো হেলে দুলে জোর কদমে (একের পর এক পা ফেলে) চলা।
৬. বাকি চার চক্কর সাধারণ গতিতে (ধীরে ধীরে) সম্পন্ন করা।
৭. প্রত্যেক চক্কর তাওয়াফ শেষ করে এবং শেষ চক্করেরও পরে ‘হাজের আসওয়াদ’কে চুম্বন করা। সম্ভব না হলে দূর থেকে ইশারা করে- ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহ আকবর ওয়ালিল্লাহিল হামদ’ দোয়াটি পাঠ করা এবং ৩ নম্বর নিয়মের মতো দাঁড়িয়ে ইশারা করে ‘তাওয়াফ’ শেষ করা।
তাওয়াফ কত প্রকার
তাওয়াফের ৭টি প্রকার রয়েছে। নিচে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
১. তাওয়াফে কুদুম
মক্কার বাইরে থেকে এসে যে ব্যক্তি ইফরাদ হজ বা কিরান হজ করবেন তার জন্য মক্কায় প্রবেশের পর বায়তুল্লায় গিয়ে প্রথমে তাওয়াফ করা সুন্নত। এটিকে তাওয়াফে লিকা বা সাক্ষাতের তাওয়াফও বলে। এ তাওয়াফ আরাফায় অবস্থানের পূর্বে করতে হবে। এ তাওয়াফে কুদুম হজে তামাত্তুকারী বা শুধু ওমরাকারীর জন্য প্রযোজ্য নয়। মক্কার ভেতরের লোকদের জন্যও এটি প্রযোজ্য নয়।
২. তাওয়াফে ওমরা
যারা শুধু ওমরা করেন কিংবা তামাত্তু হজ করেন তাদের প্রথমে মক্কায় প্রবেশের পর তাওয়াফ করতে হয়। এটি ওমরার ক্ষেত্রে ফরজ। এই ওমরার তাওয়াফে প্রথম ৩ চক্করে রমল অর্থাৎ বীরদর্পে জোরে জোরে হাঁটা সুন্নত। ইহরামের কাপড় ডান বগলের নিচ দিয়ে বাম কাঁধের ওপর রাখা যাকে ইজতিবা বলে, এটা করাও সুন্নত।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত বা হজের তাওয়াফ
১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্বে হজের উদ্দেশ্যে তাওয়াফ করতে হয়। এটি হজের ক্ষেত্রে ফরজ। এ তাওয়াফ না করলে হজ আদায় হবে না। এটি ওমরার হজের মতোই। তবে এ তাওয়াফের পরবর্তী সাঈ আরাফার দিনের পূর্বেই আদায় করে নেওয়ার সুযোগ আছে। যদি অগ্রিম সাঈ করা হয়ে থাকে তাহলে তাওয়াফে জিয়ারতের পর সাঈ করতে হয় না। তাওয়াফে কুদুমের পর অগ্রিম সাঈ করা না হলে তাওয়াফে জিয়ারতের পর সাঈ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তাওয়াফে ইজতিবা ও রমল করতে হবে।
৪. বিদায়ী তাওয়াফ
যারা মক্কার বাইরে থেকে এসে হজ করেন, তাদের হজের পর মক্কা থেকে বের হওয়ার সময়ে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয়। এ তাওয়াফ করা ওয়াজিব। যারা মক্কায় থেকে যাবেন তাদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব নয়। তবে তারাও এ বিদায়ী তাওয়াফ করতে চাইলে করতে পারবেন।
৫. নফল তাওয়াফ
মক্কায় থাকা অবস্থায় যখনই সুযোগ পাওয়া যায় তখনই নফল তাওয়াফ করা যায়। অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় নফল তাওয়াফ করা বেশি বাঞ্ছনীয়। নফল তাওয়াফে ইজতিবা বা রমল নেই। নফল তাওয়াফ ইহরামের কাপড়ে নয়, বরং সাধারণ কাপড়ে হবে। ৭ চক্কর শেষ হলে একটি তাওয়াফ হিসেবে গণ্য হবে। নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, স্ত্রী-সন্তানের জন্য মোটকথা যে কারও পক্ষ থেকে নফল তাওয়াফ করা যায়। এতে যার পক্ষ থেকে তাওয়াফ করা হবে আশা করা যায় তার আমলনামায় এর সাওয়াব লেখা হবে।
৬. মান্নত তাওয়াফ
কেউ যদি তাওয়াফ করার মান্নত করে তাহলে তার জন্য তাওয়াফ করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
৭. তাওয়াফে তাহিয়্যা
মসজিদে প্রবেশের পর মসজিদের সম্মানে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত। আর কাবা ঘরে হাজির হলে মসজিদুল হারামের সম্মানার্থে একটি তাওয়াফ করা মোস্তাহাব। তবে মসজিদে হারামে প্রবেশের পর অন্য কোনো তাওয়াফ করলেও তাতে তাওয়াফে তাহিয়্যা আদায় হয়ে যাবে।
হজ বা ওমরার অংশ হিসেবে বা নফল হিসেবে হোক, প্রতিটি তাওয়াফের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি এমন একটি আচার যা বান্দাকে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি হজযাত্রীর উচিত, মনোযোগ ও নিষ্ঠার সাথে তাওয়াফের ধরণ ও তাৎপর্য অনুধাবন করা এবং ইসলামের অন্যতম পবিত্র ঐতিহ্য ও আহ্বানের দিকে পূর্ণ আনুগত্যের সাথে সাড়া দেওয়া। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি যখন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলে, পাপ থেকে এমনভাবে বের হয়ে গেলে যেমন আজই তোমার মাতা তোমাকে জন্ম দিল।’ (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৯১১০)
ধারাবাহিকভাবে তাওয়াফের নিয়ম
-
১. ইজতিবা করা
মসজিদুল হারাম অতিক্রম করার পর মাতাফ (তাওয়াফের স্থান) শুরু হয়। মাতাফে পৌঁছে পুরুষেরা ইযতিবা করা।
ইযতিবা হল, গায়ে জড়ানো চাদরটি ডান বগলের নীচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর রেখে দেওয়া। ইযতিবার ফলে ডান কাঁধ খোলা থাকবে। তাওয়াফের সাত চক্করেই ইযতিবা অবস্থায় থাকা সুন্নত ।
মাসআলা: পুরুষের জন্য নফল তাওয়াফে এবং যে তাওয়াফের পর সাঈ নেই তাতে ইযতিবা নেই । আর নারীদের জন্য কোনো তাওয়াফেই ইযতিবার বিধান নেই ।
-
২.তাওয়াফের শুরু স্থান
তাওয়াফের আগে তালবিয়া পড়া বন্ধ করে দিতে হবে। এরপর কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত হাজরে আসওয়াদের কোণায় উপস্থিত হতে হবে। সহজে চেনার জন্য হাজরে আসওয়াদ বরাবর মসজিদের কোণায় সবুজ বাতি লাগানো হয়েছে। সবুজ বাতির কাছে পৌঁছে কাবার দিকে ফিরে দাঁড়াতে হবে।
তারপর এভাবে নিয়ত করুন: হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য উমরার তাওয়াফ করছি। আমার জন্য তা সহজ করুন ও কবুল করুন।
-
৩.হাজরে আসওয়াদকে ইসতিলাম (চুম্বন) করা
এরপর হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করতে হবে। সেজন্য হাজরে আসওয়াদের দিকে ফিরে দাঁড়াতে হবে । যদি ভীড়ের কারণে সরাসরি চুম্বন করা কিংবা হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করা সম্ভব না হয় তাহলে হাত দ্বারা হাজরে আসওয়াদকে ইশারা করুন।
এর নিয়ম হচ্ছে, নামাযের তাকবীরে তাহরীমার মতো কান পর্যন্ত হাত ওঠান, যেন হাতের তালু হাজরে আসওয়াদের দিকে থাকে। অতঃপর হাত দ্বারা হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে বলুন
بِسْمِ اللهِ اللهُ أَكْبَرُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِশুধু বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বললেও চলবে। [ফাতহুল বারী ৩/৫৮০]
যদি হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করা সম্ভব হয়, তাহলে এর নিয়ম হলো, হাজরে আসওয়াদের উপর দুই হাত রেখে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলুন । তারপর দুই হাতের মাঝে পাথরের উপর নিঃশব্দে চুমু খাবেন ।
আর যদি হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করতে পারেন, তাহলে হাত দিয়ে স্পর্শ করে হাতের ঐ অংশে চুমু খাবেন ।
উল্লেখ্য,যেহেতু আজকাল হাজরে আসওয়াদে সুগন্ধি লাগানো থাকে এজন্য ইহরাম অবস্থায় হাজরে আওয়াদকে সরাসরি চুম্বন বা স্পর্শ না করাই ভালো।
উপরোক্ত তিন পদ্ধতির যে কোনো পদ্ধতি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন, স্পর্শ বা ইশারা করাকে পরিভাষায় ইসতিলাম বলে।
হাজরে আসওয়াদকে ইসতিলাম করার পর সম্ভব হলে নিম্নোক্ত দুআটি পড়ুন-
اللَّهُمَّ إِيْمَانَا بِكَ وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَاتَّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْঅর্থ: হে আল্লাহ! আপনার উপর পরিপূর্ণ ঈমান রেখে, আপনার প্রেরিত কিতাবকে বিশ্বাস করে এবং আপনার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের অনুসরণে (আমি হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করেছি)। [আলমুজামুল আওসাত ৪৯২]
হাজরে আসওয়াদকে ইসতিলাম করে কাবা শরীফকে বাম দিকে রেখে তাওয়াফ শুরু করুন।
-
৪. পুরুষেরা প্রথম তিন চক্করে রমল করা
যেহেতু এ তাওয়াফের পর সাঈ আছে, তাই প্রথম তিন চক্করে পুরুষেরা রমল করা।
রমল হল, কাঁধ হেলিয়ে দুলিয়ে ছোট ছোট পদে একটু দ্রুত ও বীরদর্পে হাঁটা।
নোট: অধিক ভিড়ের মধ্যে রমল করলে অন্যের কষ্ট হতে পারে। তাই সেদিকে লক্ষ্য রেখে প্রয়োজনে রমল বন্ধ রাখতে পারেন। ফাঁকা পেলে রমল করবেন।
-
রুকনে ইয়ামানী কি?
হাজরে আসওয়াদের আগে বাইতুল্লাহর দক্ষিণ-পশ্চিমে যে কোণ আছে তা রুকনে ইয়ামানী। তাওয়াফ শুরুর পর এখানে পৌঁছে উভয় হাত বা শুধু ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করা সুন্নত।
উল্লেখ্য, রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করা সম্ভব না হলে হাত বা মাথা দ্বারা ইশারা করবেন না। কারণ এখানে শুধু স্পর্শ করাই প্রমাণিত। আর রুকনে ইয়ামানীতে চুমু দেয়া বা তাতে সেজদা করা ঠিক নয়
রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে এই দুআ পাঠ করা উত্তম-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارْ
হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। [সূরা বাকারা, আয়াত : ২০১]
হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে পুনরায় হাজরে আসওয়াদ বরাবর পৌঁছলে এক চক্কর পূর্ণ হবে। প্রথমবারের ন্যায় প্রতিবারই নতুন চক্করের শুরুতে একই নিয়মে হাজরে আসওয়াদে চুমু খেয়ে চক্কর শুরু করুন।
অর্থাৎ, দ্বিতীয় চক্করের শুরুতে হাজরে আসওয়াদের দিকে ফিরে দাঁড়ান। এরপর বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে সম্ভব হলে পূর্বোক্ত নিয়মে সরাসরি বা হাতের ইশারায় চুমু খান । এরপর ওই জায়গা থেকেই কাবা শরীফকে বামে রেখে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত আসুন। এভাবে সাত চক্কর পূর্ণ হলে একটি তাওয়াফ হবে। [সহীহ বুখারী ১৬১৩]
শেষ চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটুন। কারণ, শেষ চার চক্করে রমল না করা সুন্নত । [সহীহ মুসলিম ১২৬২]
-
৫. তাওয়াফের সময় যিকির, তাসবীহ ও দুআতে মশগুল থাকুন
তাওয়াফের সময় যদিও কথা বলা জায়েয, তথাপি প্রয়োজন ছাড়া কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং দুআ কবুলের বিশেষ সময়। এ সময় নিজের ভাষায়ও যেকোনো দুআ করা যায়।
উল্লেখ্য, তাওয়াফের সময় এমন কোনো নির্দিষ্ট দুআ নেই, যা না পড়লে তাওয়াফ হবে না।
তাওয়াফের সময় দেখা যায়, কিছুলোক একসাথে দলবদ্ধ হয়ে উচ্চস্বরে দুআ পড়তে পড়তে তাওয়াফ করেন। এমনটি করা উচিত নয়। কারণ, এভাবে দুআ পড়ার বিষয়টি প্রমাণিত নয়। এটি সুন্নাহ সম্মত নয়। এছাড়াও এতে অন্যদের তাওয়াফের আমলে ব্যাঘাত ঘটে।
তাওয়াফের সপ্তম চক্কর শেষে হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে অষ্টম বারের মতো হাজরে আসওয়াদকে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে সরাসরি চুম্বন/স্পর্শ বা ইশারা করে তাওয়াফ শেষ করুন।
তাওয়াফ শেষে চাদর স্বাভাবিকভাবে পরুন। ডান বগলের নিচ থেকে কাপড় বের করে উভয় কাঁধ ঢেকে নিন। কারণ, ইযতিবা শুধু তাওয়াফের আমল।
মাসআলা: তাওয়াফের সাত চক্কর পূর্ণ করার আগে যদি অযু ভেঙ্গে যায় কিংবা ইঞ্জোর চাপ লাগে, তাহলে নতুন করে অযু করে আসার পর করণীয় হলো-
ক. ইতিপূর্বে তিন চক্কর বা এর কম আদায় করে থাকলে পুনরায় শুরু থেকে সাত চক্কর পূর্ণ করা। কেননা এভাবে করা মুস্তাহাব। তবে এক্ষেত্রে অবশিষ্ট চক্করগুলো আদায় করে নিলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে।
খ. আর যদি তাওয়াফের চার চক্কর বা এর বেশি আদায় করা হয়ে থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে উত্তম হলো অযু করে এসে প্রথম থেকে শুরু না করে অবশিষ্ট চক্করগুলো আদায় করা। তবে এক্ষেত্রেও কেউ যদি পুনরায় প্রথম থেকে সাত চক্করই পূর্ণ করে তাহলে সেটিও সহীহ হবে । [সহীহ বুখারী ১/২২০, ফাতহুল বারী ৩/৫৬৫, কিতাবুল আসল ২/৪০৩]
-
৬. তাওয়াফের দু রাকাত নামায আদায় করুন (ওয়াজিব)
তাওয়াফ শেষে মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে বিলম্ব না করে দু রাকাত নামায আদায় করুন। এ দু রাকাত নামায মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দাঁড়িয়ে আদায় করা মুস্তাহাব।
আর যদি মাকরূহ ওয়াক্ত হয় (যেমন ফযরের ফরযের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কিংবা আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত), তাহলে এ দু রাকাত নামায মাকরূহ ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর আদায় করবেন। আম্মাজান আয়েশা রাযি. বলেন, ফজরের কিংবা আসরের পর তুমি যদি তাওয়াফ করতে চাও তাহলে করে নাও (এতে কোন অসুবিধা নেই), কিন্তু তাওয়াফের দু রাকাত নামায তৎক্ষণাৎ আদায় করো না। বরং সূর্যাস্ত কিংবা সূর্যোদয় হবার পর প্রত্যেক তাওয়াফের জন্য দু রাকাত নামায আদায় কর। [ইবনে আবী শায়বা ১৩৭৩৪, ফাতহুল বারী ৩/৬০১, ৫৯৫]
ভিড়ের কারণে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামায পড়া সম্ভব না হলে হারামের যে কোনো স্থানে পড়া যাবে। [সহীহ বুখারী, ১/২২০]
এরপর প্রাণ খুলে মুনাজাত করুন। কারণ এটি দুআ কবুলের বিশেষ সময়।
-
৭. যমযম পানি পান করুন
তারপর পেট ভরে তৃপ্তির সাথে যমযম পানি পান করুন। শুরুতে বিসমিল্লাহ ও শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলুন এবং কিবলামুখী হয়ে তিন শ্বাসে পান করুন। [মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৯১১১, ইবনে মাজাহ ৩০৬১, আলমাউসূআতুল ফিকহিয়্যা আলকুওয়াইতিয়্যা ১/৯০]
পান করার আগে বা পরে এই দুআ পড়া উত্তম-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَاسِعًا وَشِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءِ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী ইলম, প্রশস্ত রিযিক ও সকল রোগ-ব্যাধি থেকে পরিত্রাণ প্রার্থনা করছি। [মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৯১১২, সুনানে দারাকুতনী ২/২৮৮]
হাদীস শরীফে এসেছে, যমযম পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয় আল্লাহ তাআলা তা পূর্ণ করেন। [মুসনাদে আহমাদ, ১৪৮৪৯]
সাধারণ অবস্থায় যমযম পানি দাঁড়িয়ে ও বসে দুভাবেই পান করা জায়েয। তবে কোন পদ্ধতিটি উত্তম, বিজ্ঞ আলিমদের মাঝে এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যমযম পানি দাঁড়িয়ে পান করেছেন’ [নাসাঈ ২৯৬৪] এ হাদীসের ভিত্তিতে বহু ফকীহ ও মুহাদ্দিস যমযম পানি দাঁড়িয়ে পান করাকে উত্তম ও আদব বলেছেন। পক্ষান্তরে কোনো কোনো ফকীহ ও মুহাদ্দিসের মতে রাসূলের দাঁড়িয়ে যমযম পান করার বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। তাদের মতে এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে— যমযম কূপের পাড়ে বসার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকা এবং জায়গাটি ভেজা ও সাঁতস্যতে হওয়া, দাঁড়িয়ে পান করাও যে জায়েয তা বোঝানো, ভীড়ের কারণে ইত্যাদি।
এজন্য সাধারণ অবস্থায় যমযম পানি বসে পান করা তাদের সিদ্ধান্ত।
যেহেতু উপর্যুক্ত দুটি মতের কোনোটিই অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত ও সুনিশ্চিত নয়, তাই এক্ষেত্রে কোনো একটি মতকে চূড়ান্তরূপে গ্রহণ করে অন্যটিকে বাতিল মনে করা উচিত নয় । বরং যার যেভাবে সুবিধা সেভাবে আমল করবেন, পাশাপাশি ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করবেন।
-
৮. মুলতাযামে উপস্থিতি (মুস্তাহাব)
হাজরে আসওয়াদ ও বাইতুল্লাহ শরীফের দরজার মধ্যবর্তী দেয়ালকে মুলতাযাম বলে। উত্তম হলো, যমযম পানের পর সহজে সম্ভব হলে মুলতাযামে এসে বাইতুল্লাহর দেয়ালের সাথে বুক ও ডান গাল লাগিয়ে দিয়ে এবং ডান হাত উপরের দিকে উঠিয়ে বাইতুল্লাহ শরীফকে জড়িয়ে ধরা এবং অনুনয়-বিনয় ও কান্নাকাটির সাথে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা । [সুনানুল কুবরা,বায়হাকী, ৯৭৬৬]
কিন্তু যেহেতু বর্তমানে বাইতুল্লাহর দেয়ালে চতুর্দিকে একজন মানুষের উচ্চতা সমপরিমাণ আতর লাগানো থাকে, আর ইহরাম অবস্থায় আতর লাগানো নিষেধ, তাই ইহরাম অবস্থায় মুলতাযামসহ কাবা শরীফের কোথাও স্পর্শ করবেন না।
এছাড়াও প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে অন্যকে কষ্ট না দিয়ে মুলতাযামে উপস্থিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। এজন্যও মুলতাযামে উপস্থিত হতে না পারলে কোনো অসুবিধা নেই।
আর নারীগণ মুলতাযামে আসার কোনো চেষ্টাই করবেন না। কারণ পুরুষের ভিড়ে নারীদের প্রবেশ কিছুতেই সমীচীন নয়।
-
৯. নারীদের তাওয়াফ
নারীরা তাওয়াফের ক্ষেত্রে পর্দার প্রতি খেয়াল রাখুন। মনে রাখবেন, পর্দার বিধান সব সময়ের জন্যই ফরয । বিশেষত তাওয়াফের মত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় এ বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা চাই । অতএব
১.কিছুতেই পুরুষের ভিড়ে ঢুকে তাওয়াফ করতে যাবেন না। বরং তাওয়াফের জন্য এমন সময় নির্বাচন করুন যে সময় ভিড় তুলনামূলক কম থাকে ৷
প্রয়োজনে কাবা ঘরের একেবারে পাশ দিয়ে তাওয়াফ না করে কিছুটা দূর দিয়ে পুরুষদের সারির পেছনে তাওয়াফ করুন এবং সতর্কতার সাথে পরপুরুষ থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। এ প্রসঙ্গে আম্মাজান আয়েশা রাযি. সহ খাইরুল কুরূনের নারীদের আমল সামনে রাখুন । সহীহ বুখারীতে রয়েছে ইবনে জুরাইজ বলেন, আমি (আতা রহ.-কে) জিজ্ঞেস করলাম, সাহাবীযুগে নারীরা কি পুরুষদের সাথে মিশে তাওয়াফ করতেন? আতা রহ. বললেন, নারীরা পুরুষদের সাথে মিশে তাওয়াফ করতেন না । আয়েশা রাযি. বরং পুরুষদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পিছন দিক থেকে তাওয়াফ করতেন, তাদের মাঝে মিশে যেতেন না । এক মহিলা আয়েশা রাযি.-কে বললেন, চলুন, হে উম্মুল মু’মিনীন ! আমরা হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করে আসি। তিনি বললেন, ‘(যদি যেতেই আমি হয় তাহলে) তুমি নিজ দায়িত্বে যাও’ (অর্থাৎ একথা মনে করে যেওনা যে, এভাবে যাওয়ার পক্ষে)। আর তিনি যেতে অস্বীকার করলেন। তারা রাতের বেলা পরিপূর্ণ পর্দা করে এমনভাবে বের হয়ে তাওয়াফ করতেন যে, তাদেরকে চেনা যেত না। আর সে সময় পুরুষরাও থাকত। তবে উম্মুল মু’মিনীনগণ বায়তুল্লাহর ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে সকল পুরুষদের বের করে না দেওয়া পর্যন্ত তারা দাঁড়িয়ে থাকতেন । [বুখারী ১৬১৮]
২. এমনিভাবে হাজরে আসওয়াদের কাছে যাবেন না। সন্দেহ নেই, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা ফযীলতপূর্ণ আমল। কিন্তু সেজন্য পর্দার ফরয বিধান লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। তাই বর্তমানে মেয়েদের জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে যাওয়ার চিন্তা করাও কঠিন মনে হয়।
-
১০. হাজরে আসওয়াদ ও তার ফযীলত:
হাজরে আসওয়াদ বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বরকতময় পাথর। বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায়, এতে জান্নাতি পাথরের অনেক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান এবং শুরুতে এটি সাদা রংয়ের ছিল। কিন্তু মানুষের গুনাহ তাকে কালো বানিয়ে দিয়েছে।
তাওয়াফের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদে ইসতিলাম করেছেন । এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হলো ।
১. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাজরে আসওয়াদ জান্নাত হতে অবতীর্ণ এবং তা দুধের মত সাদা বর্ণের ছিল । কিন্তু আদম সন্তানের গুনাহ তাকে কালো বর্ণে পরিণত করেছে। [তিরমিযী ৮৭৭]
২. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের ইয়াকৃত (পাথর) হতে দুটো ইয়াকূত। আল্লাহ তাআলা এ দুটির আলোকপ্রভা নিস্প্রভ করে দিয়েছেন । এ দুটির প্রভা যদি তিনি নিস্তেজ করে না দিতেন তাহলে তা পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে যা কিছু আছে সব আলোকিত করে দিত । [তিরমিযী ৮৭৮]
৩. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে বলেন, আল্লাহর কসম! এই পাথরকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন এভাবে উঠাবেন যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। যে ব্যক্তি যথাযথভাবে তাকে ইসতিলাম করবে এই পাথর তার জন্য কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট সাক্ষ্য প্রদান করবে। [তিরমিযী ৯৬১]
৪. হযরত উমর রাযি. হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তা চুম্বন করে বললেন, আমি ভালোকরেই জানি, তুমি একখানা পাথর বৈ কিছু নও। তুমি কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। যদি না আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমায় চুম্বন করতে দেখতাম, তাহলে আমিও তোমাকে কখনো চুম্বন করতাম না। [বুখারী ১৫৯৭, মুসলিম ১২৭০]
উল্লেখ্য যে, অনেক আলেমের মতে, হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হওয়া, সাদা থেকে কালো হওয়া এবং এর আলো থাকা এ বিষয়গুলো রূপকার্থে বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য হাজরে আসওয়াদের গুরুত্ব, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা।
-
সংশ্লিষ্ট মাসআলা
মাসআলা ১: সকল তাওয়াফের পর দু রাকাত নামায আদায় করা ওয়াজিব। অতএব নফল তাওয়াফের পরও এ দু রাকাত নামায আদায় করতে হবে । কেউ কেউ মনে করেন, এ দু রাকাত নামায শুধু ফরয ও ওয়াজিব তাওয়াফের পরই পড়তে হয় । এ ধারণা ভুল।
মাসআলা ২: তাওয়াফ পরবর্তী দু রাকাত নামায বিনা ওজরে বিলম্বে পড়া মাকরূহ। অনেকে একাধিক তাওয়াফের পর একসাথে এ নামায আদায় করে থাকেন। বিনা ওযরে এমনটি করা মাকরূহ। তবে মাকরূহ ওয়াক্ত এসে গেলে তখন এ দু রাকাত নামায পড়বে না। বরং মাকরূহ ওয়াক্ত শেষ হবার অপেক্ষা করবে। [ইবনে আবী শাইবা ৯০১২, রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৯]
মাসআলা ৩: তাওয়াফ ও সাঈর সময় কত চক্কর হয়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ হলে কম সংখ্যাটি ধরে সাত চক্কর পূর্ণ করে নিবেন। [ইবনে আবী শাইবা ১৩৫২৪] গণনার সুবিমুনাওয়ারায় উপস্থিতি। কারণ এখানেই শুয়ে
উমরার প্রথম ওয়াজিব সাফা-মারওয়ায় সাঈ করাঃ
সাঈ কি?
হজ ও ওমরার গুরুত্বপূর্ণ আমল সাফা-মারওয়ায় সায়ী করা। সায়ী শব্দটি আরবি। অর্থ- দ্রুত চলা ও চেষ্টা করা। ইসলামি শরিয়তে সাফা-মারওয়া দুই পাহাড়ের মাঝে বিশেষ রীতিতে সাতবার প্রদক্ষিণ করাকে সায়ী বলা হয়।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তিই বাইতুল্লাহর হজ করবে বা ওমরা করবে তার জন্য এ দুটোর প্রদক্ষিণ করাতে কোনও গুনাহ নেই। কোনও ব্যক্তি স্বত:স্ফূর্তভাবে কোনও কল্যাণকর কাজ করলে আল্লাহ অবশ্যই গুণগ্রাহী (এবং) সর্বজ্ঞ। (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৫৮)
হজ ও ওমরায় সাফা-মারওয়া সায়ি করা ওয়াজিব। কেউ তা করতে ভুলে গেলে বা ইচ্ছাকৃত না করলে তার ওপর কাফফারা হিসেবে দম ওয়াজিব হবে।
সাফা থেকে শুরু করে মারওয়াতে পৌছলে এক চক্কর হবে। এরপর মারওয়া থেকে সাফায় আসলে দ্বিতীয় চক্কর হবে। এভাবে সাফা-মারওয়ার মাঝে সাত চক্কর দিতে হবে।[সহীহ মুসলিম ১২১৮],
সাঈ করার সময় অনেকে মনে করেন, সাফা থেকে মারওয়া হয়ে আবার সাফাআসলে এক চক্কর হয়। এটি ভুল । কারণ এখানে দুই চক্কর পূর্ণ হয়ে যায়।
জরুরি মাসায়িলক. তাওয়াফের পর দেরি না করে সাঈ করা সুন্নত । অবশ্য ওযরের কারণে দেরিহলে কোনো সমস্যা নেই ।খ. সাঈ পায়ে হেঁটে করা ওয়াজিব, পায়ে হেঁটে সাঈ করা সম্ভব হওয়া সত্ত্বেওহুইল চেয়ারে সাঈ করলে দম ওয়াজিব হবে। তবে পুনরায় পায়ে হেঁটে সাঈকরে নিলে দম মাফ হয়ে যাবে। অসুস্থতা বা বার্ধক্যের কারণে যদি পায়ে হেঁটেসাঈ করা সম্ভব না হয়, তাহলে হুইল চেয়ারে সাঈ করা যাবে।গ. অযু অবস্থায় সাঈ করা এবং সাঈর সময় কাপড় পাক থাকা মুস্তাহাবমহিলাদের জন্য হায়েয-নেফাস থেকে পবিত্র অবস্থায় এবং পুরুষের জন্য গোসলফরয হলে গোসল করে পবিত্র হয়ে সাঈ করা সুন্নত। হায়েয-নেফাস ও গোসলফরয অবস্থায় সাঈ করা মাকরূহ। তবে কেউ করলে তা আদায় হয়ে যাবে।কারণ সাঈর জন্য পবিত্র থাকা, অযু থাকা কিংবা কাপড় পবিত্র থাকা শর্ত নয়।
সাঈর রোকন,শর্ত,ওয়াজিব ও সুন্নাতসমূহ
সায়ির আসল রোকন
সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী নির্দিষ্ট পথে হেঁটে যাওয়া। কেউ যদি এই নির্ধারিত পথ ব্যতীত অন্যদিকে গিয়ে হাঁটে, তবে তার সায়ী শুদ্ধ হবে না।
সায়ী আদায়ের শর্তাবলি
১. সায়ী নিজ উদ্যোগেই করতে হবে। কেউ শারীরিকভাবে অক্ষম হলে বাহনে উঠেও তা করতে পারেন, তবে অন্য কেউ তার পক্ষে সায়ী সম্পন্ন করতে পারবে না, যদি না অজ্ঞান বা অতিরিক্ত অসুস্থ হন।
২. কমপক্ষে চার চক্কর তাওয়াফ শেষ হওয়ার পরই সায়ী শুরু করা উচিত। এর আগে সায়ী শুরু করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
৩. ইহরাম অবস্থায় থেকে সায়ী করা আবশ্যক। ইহরাম ছাড়া সায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. সায়ী শুরু করতে হবে সাফা পাহাড় থেকে। মারওয়া থেকে শুরু করলে প্রথম চক্কর হিসাব হবে না।
৫. অধিকাংশ চক্কর সম্পন্ন করতে না পারলে সায়ী অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
৬. হজের সায়ী অবশ্যই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
সায়ীর ওয়াজিব বিষয়সমূহ
১. তাওয়াফ শেষ করে সায়ি শুরুর সময় শরীর ও কাপড় অপবিত্রতা থেকে পরিষ্কার থাকতে হবে।
২. সাফা থেকে শুরু করে মারওয়াতে শেষ করা আবশ্যক।
৩. শারীরিক সক্ষমতা থাকলে পায়ে হেঁটে সায়ি করতে হবে। অকারণে বাহনে চললে দম (বিকল্প কাফফারা) আদায় করতে হবে।
৪. মোট সাতটি চক্কর সম্পূর্ণ করা জরুরি। চারটি ফরজ ও বাকি তিনটি ওয়াজিব। কেউ যদি শেষের তিনটি না করে, তবে প্রতি চক্করের পরিবর্তে নির্ধারিত পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য বা এর মূল্য সদকা করতে হবে।
৫. ওমরার সময় ইহরাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল রাখা ফরজ।
৬. সাফা-মারওয়ার মাঝের সম্পূর্ণ পথ অতিক্রম করাই সায়ির অপরিহার্য অংশ।
সায়ীর সুন্নত দিকসমূহ
১. হাজরে আসওয়াদের ইস্তিলাম করে মসজিদ থেকে সায়ির দিকে রওনা হওয়া উত্তম।
২. তাওয়াফ শেষ করার পরপরই সায়ি শুরু করলে সুন্নতের প্রতি আমল হয়।
৩. সাফা ও মারওয়ার উঁচু স্থানে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দোয়া করা।
৪. প্রতিটি চক্কর ধারাবাহিকভাবে শেষ করা সুন্নত।
৫.সেই তাওয়াফের সায়ি করা উচিত যা পবিত্রতা সহকারে সম্পন্ন হয়েছে এবং কাপড় ও স্থান পবিত্র ছিল।
৬. সবুজ বাতির মধ্যবর্তী অংশে দ্রুত পায়ে হাঁটা (পুরুষদের জন্য সুন্নত আমল)।
সাঈর জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো করুন
হাজরে আসওয়াদে ইসতিলাম করুন
সাঈর জন্য সাফায় গমনের সময় পুনরায় বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার,লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে ইসতিলাম (হাজরে আসওয়াদে চুম্বন বা ইশারা)করুন। সাঈর শুরুতে এভাবে ইসতিলাম করা সুন্নত
হাজরে আসওয়াদ বরাবর সবুজ বাতির নিকট থেকে বা এর বরাবর দূরে থেকেও ইশারার মাধ্যমে ইসতিলাম করতে পারবেন। এজন্য মাতাফে নামা জরুরি নয়। [সহীহ মুসলিম, ১২১৮]
সাঈর নিয়ত করুন
তারপর সাঈর নিয়ত করে মনে মনে এভাবে বলুন, হে আল্লাহ, আমি আপনারসন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সাঈ করছি। আমার জন্য তা সহজ করুন এবং কবুল করুন।
সাফা পাহাড়ে উঠুন
এরপর মসজিদে হারামের বাবুস সাফা দিয়ে (মাতাফ থেকে মাসআ Masa/লেখাটি অনুসরণ করলেই পেয়ে যাবেন) সাফা পাহাড়ে উঠুন।
সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী হলে এই আয়াতে কারিমা পড়ুন-إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ
অর্থ: নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত । [বাকারা ১৫৮]
তারপর বলুন- أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللهُ بِهِ অর্থ: আমি শুরু করছি যেভাবে আল্লাহ তাআলা শুরু করেছেন। [সহীহমুসলিম ১২১৮]
সাফায় উঠার পর সেখান থেকে কাবার দিকে ঘুরে দাঁড়ান। সম্ভব হলে কাবা দেখুন। তিনবার আল্লাহু আকবার বলুন। এরপর তিনবার এই দুআ পড়ুন-لا إلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَريكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَىكُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَالْأَحْزَابَ وَحْدَهُ
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তার কোনো শরীক নেই । রাজত্বএকমাত্র তাঁরই এবং তিনিই সমস্ত প্রশংসার অধিকারী। তিনি সকলকিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি তাঁরওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) সাহায্য করেছেন এবং শত্রুদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাস্তকরেছেন। [সহীহ মুসলিম, ১২১৮]
তারপর দরূদ শরীফ পড়ুন এবং হাত তুলে প্রাণ খুলে দুআ করুন। এটি দুআ কবুলের সময়।
এরপর ডানদিকের রাস্তা দিয়ে সোজা মারওয়ার দিকে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা শুরু করুন।
সাঈর সময় বিশেষ করে সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে সম্ভব হলে নিম্নোক্ত দুআটি পড়ুন,رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمْ
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন।আপনি মহাপরাক্রমশালী, সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। [ইবনে আবীশাইবা ১৫৮০৭] ·
উল্লেখ্য, পুরো সাঈর সময় নির্দিষ্ট কোনো দুআ নেই । বরং এসময় কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত যে কোনো দুআ পড়া যাবে এবং নিজ মাতৃভাষায়ও দুআ করা যাবে।
সবুজ বাতির স্থানে
সাফা মারওয়ার মাঝখানে যে স্থানজুড়ে সবুজ বাতি জ্বলে থাকে, সে স্থানটুকু পুরুষেরা মধ্যম গতিতে দৌড়ে অতিক্রম করুন।
তবে মহিলারা এখানেও স্বাভাবিকভাবে হেঁটে অতিক্রম করবেন।
মারওয়ায় পৌছলে সাঈর এক চক্কর পূর্ণ হল। এখানে এসেও কাবার দিকে ফিরে দাঁড়ান । সাফায় যেভাবে যেসব যিকর ও দুআ করেছিলেন এখানেও তাই করণীয় । এটিও দুআ কবুলের স্থান। [সহীহ মুসলিম, ১২১৮]
এরপর পুনরায় সাফার উদ্দেশ্যে রওনা করুন। সাফায় পৌঁছে আগের মত কাবার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে দুআ করুন। এবার দ্বিতীয় চক্কর পূর্ণ হল।
এরপর মারওয়া পৌঁছলে তৃতীয় চক্কর পূর্ণ হবে। এভাবে সাত চক্কর পূর্ণ করুন এবং প্রতি চক্করেই দুআ করুন। সপ্তম চক্কর মারওয়ায় শেষ হবে ।এখানেই সাঈর কাজ শেষ ।
উমরার দ্বিতীয় ওয়াজিব মাথার চুল কাটার মাধ্যমে উমরার ইহরাম ত্যাগ করাঃ
মাথার চুল কাটা
উমরা পূর্ণ করার জন্য সাফা-মারওয়ায় সাঈ করার পর মাথার চুল কাটতে হবে। চুল কাটার দ্বারাই ইহরাম শেষ হবে এবং উমরার আমল পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।
পুরুষেরা নিকটস্থ সেলুনে গিয়ে মাথা মুণ্ডাবেন। হোটেলে গিয়েও মুণ্ডাতে পারেন। তবে রাস্তায় চুল কাটবেন না।
হাজীগণ সাঈ করার পর ইহরাম অবস্থায় নিজের ও অন্যের চুল কাটতে পারবেন।
আর নারীরা পুরো মাথার চুলের অগ্রভাগ থেকে কমপক্ষে আঙ্গুলের এক কর (এক ইঞ্চি) পরিমাণ কাটবেন। অবশ্য মাথার এক চতুর্থাংশ থেকে যদি এ পরিমাণ কেটে নেন তাহলেও হালাল হয়ে যাবেন।
চুল কাটা সংক্রান্ত জরুরি মাসায়িল
১. পুরুষদের জন্য মাথা মুণ্ডানো সুন্নত । তবে মাথার চুল ছোটও করতে পারেন। চুল ছোট করতে চাইলে পুরো মাথার কিংবা অন্তত মাথার এক চতুর্থাংশের চুল কমপক্ষে আঙ্গুলের এক কর (এক ইঞ্চি) পরিমাণ ছোট করতে হবে ।
২. মনে রাখতে হবে, মারওয়ার ওখানে কেউ কেউ হালাল হবার জন্য হাতে গোনা কয়েকটিমাত্র চুল কেটে থাকেন। এমনটি করা যাবে না। কেননা, এত অল্প পরিমাণ চুল কেটে হালাল হওয়া যায় না ৷
৩. আগে থেকে চুল এক কর বা এর চেয়ে ছোট থাকলে হালাল হওয়ার জন্য চুল ছোট করলে যথেষ্ট হবে না; বরং মাথা কামাতে হবে।
৪. চুল কাটার সময় সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করা যাবে না। চুল কাটার দ্বারা উমরার কাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। এখন থেকে সেলাই করা স্বাভাবিক কাপড় পরতে পারবেন এবং বৈধ সব কাজ করতে পারবেন।অবশ্য হারামের এলাকায় সাধারণভাবে নিষিদ্ধ কাজ যেমন-যুদ্ধ করা,শিকার করা ও গাছ কাটা তখনও নিষিদ্ধই থাকবে।
মক্কা শরীফে অবস্থানকালীন করণীয়, মসজিদে হারামে জানাযার নামায , জুমা আদায় ও একাধিক উমরা আদায় প্রসঙ্গে আলোচনাঃ
মক্কা শরীফে অবস্থানকালীন করণীয়
১. পুরুষগণ পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে হারামে আদায় করুন। এখানে এক রাকাতে একলক্ষ গুণ সওয়াব হয়। [মুসনাদে আহমদ ১৪৬৯৪, ইবনে মাজাহ ১৪০৬]
আর নারীগণ বাসায় নামায পড়বেন, কারণ তাদের জন্য সেখানেও বাসায় নামায পড়া উত্তম। হাদীস শরীফে এসেছে, উম্মে হুমাইদ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমি আপনার সাথে নামায পড়তে ভালবাসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি জানি তুমি আমার সাথে নামায পড়তে পছন্দ কর। তবে তোমার জন্য গৃহাভ্যন্তরের প্রকোষ্ঠে নামায পড়া উত্তম ঘরে নামায পড়ার চেয়ে এবং ঘরে নামায পড়া উত্তম বাড়ির ভেতর নামায পড়ার চেয়ে এবং বাড়ির ভেতর নামায পড়া উত্তম এলাকার মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে। আর এলাকার মসজিদে নামায পড়া উত্তম আমার মসজিদে (অর্থাৎ মসজিদে নববীতে) এসে নামায পড়ার চেয়ে।
বর্ণনাকারী বলেন, তিনি (উম্মে হুমাইদ) নির্দেশ দিলেন, অতঃপর তার জন্য গৃহাভ্যন্তরে অন্ধকার কোণে নামাযের জন্য জায়গা বানানো হল। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই নামায পড়েছেন। [মুসনাদে আহমাদ, ২৭০৯০]
এই হাদীস অনুসারে মহিলাদের জন্য নিজ হোটেলে বা বাসায় নামায পড়াই উত্তম হবে। মক্কা নগরীর বরকত তো তারা সর্বাবস্থায়ই পাবেন। অধিক আনুগত্য প্রদর্শনের বিশেষ সওয়াব ও বরকতও ইনশাআল্লাহ তারা পেয়ে যাবেন।
তবে তাওয়াফ করার জন্য মসজিদে হারামে গেলে জামাতে শরীক হয়ে যাবেন এক্ষেত্রে পুরুষরা তাদেরকে মহিলাদের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিবেন। পুরুষের সাথে অথবা পুরুষদের কাতারে কিছুতেই দাঁড়াবেন না। এভাবে দাঁড়ানো নাজায়েয।
২. মসজিদে হারামেও পুরুষরা মহিলার পাশে বা সরাসরি পেছনে নামায আদায় করা থেকে বিরত থাকবেন। তবে নামায অবস্থায় কোনো মহিলা যদি পাশে এসে নামাযে শরিক হয়ে যায় কিংবা সামনে দাড়িয়ে যায়, তাহলে পুরুষের নামায নষ্ট হবে না। [হজ ও উমরাহ, পৃষ্ঠা-৫৯ (মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া)
৩.বাইতুল্লাহ শরীফের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকাও সওয়াবের কাজ। তাই ইশক-মুহাব্বতের সাথে গুনাহ মাফের আশায় আবেগভরা চোখে বেশি বেশি তাকিয়ে থাকুন ।
আতা ও তাউস রহ বলেন, বাইতুল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকা ইবাদত । [ইবনে আবি শাইবা ১৪৯৮৪]
৪.হারাম শরীফে পুরো কুরআন মাজীদ কমপক্ষে একবার খতম দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন । এজন্য প্রতিদিনের একটি রুটিন বানিয়ে নিন।
৫.কোনো প্রয়োজনে মসজিদে হারামের বাহিরে এলে কিংবা তাওয়াফ করতে গেলে জায়নামায বিছিয়ে কিংবা কারো সাহায্যে জায়গা ধরে রাখবেন না । এটি গুনাহের কাজ। তাই প্রয়োজন সেরে যেখানে জায়গা পাবেন সেখানে বসে যাবেন। অন্যের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাবার চেষ্টা করবেন না।
৬.নারীরা আপাদমস্তক ঢেকে পরপুরুষ থেকে পর্দা করুন।
৭.মসজিদে হারামে উচ্চস্বরে কথা বলা, গল্পগুজব করা থেকে বিরত থাকুন ।
৮.সকল গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকুন। বিশেষ করে কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এখানে নেক আমলের সওয়াব যেমন বেশি তেমনি গুনাহের ক্ষতি ও ভয়াবহতাও অনেক বেশি।
পরামর্শ: মাতাফে যে সময় নারী-পুরুষের ভিড় কম থাকে সে সময় তাওয়াফ করে নিন। তাহলে নজর হেফাজত করা সহজ হবে।
৯.নিয়মানুযায়ী হাজরে আসওয়াদ, রুকনে ইয়ামানী, কাবার দরজা ও মুলতাযাম ছাড়া কাবা শরীফের অন্য কোনো জায়গা স্পর্শ করা, রুমাল-টুপি ঘষা বরকত ও সাওয়াবের কাজ বলে কুরআন-সুন্নাহয় কোনো প্রমাণ নেই। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাকা চাই ।
১০.মানুষ কিংবা প্রাণীর ছবি তোলা, ভিডিও করা থেকে বিরত থাকুন । কারণ মোবাইল ফোনে ছবি তোলা যদি কারো মতে জায়েযও হয়ে থাকে, তবুও হারামের মর্যাদা পরিপন্থি হবার বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এতে আপনার উমরার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
১১.সময়-সুযোগ পেলে মক্কা মুকাররামার ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শন করে নিতে পারেন। জাবালে নূর, জাবালে সাওর, মাকবারায়ে মা‘লাত (জান্নাতুল মুআল্লা) সহ বরকতময় সুপ্রসিদ্ধ স্থানগুলো যিয়ারত করে নিতে পারেন।
মসজিদে হারামে জুমা আদায়
হাম্বলী মাযহাবে এক মত অনুসারে জাওয়ালের আগেই জুমার ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। সম্ভবত এ কারণেই হারামাইন শরীফে জাওয়ালের (অর্থাৎ যোহরের ওয়াক্ত শুরু হবার) বেশ আগেই জুমার প্রথম আযান হয়ে যায়। আবার যোহরের ওয়াক্ত শুরু হবার পরপরই জুমার দ্বিতীয় আযান দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে খুতবা শুরু হয়ে যায়। ফলে ওয়াক্ত হবার পর জুমার সুন্নত আদায়ের সুযোগ পাওয়া যায়
না। এ প্রসঙ্গে দুটি কথা-
ক. হারামাইন শরীফে জুমার প্রথম আযানের পর আপনি তাহিয়্যাতুল মসজিদ সহ বিভিন্ন নফল নামায পড়তে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন মাকরূহ ওয়াক্তে (জাওয়ালের সময়) নামায পড়া না হয়। কেননা এ সময় নামায পড়া হারাম ।
খ. আর জুমার পূর্ববর্তী সুন্নত ফরযের পর আদায় করে নিবেন। এক্ষেত্রে ফরযের পর প্রথমে জুমার পরবর্তী চার রাকাত সুন্নত পড়বেন। এরপর পূর্বের চার রাকাত সুন্নত আদায় করে নিবেন। [দারুল ইফতা, জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন, ফতোয়া নং ১৪৪২০৩২০০৩১৩, কিফায়াতুল
মুগতাযী ৪/২৪৮-২৫০]
একাধিক উমরা আদায়
কেউ কেউ একবার উমরা আদায় করার পর পুনরায় উমরা আদায়ের লক্ষ্যে তানঈমে অবস্থিত মসজিদে আয়েশা থেকে ইহরাম করে একাধিক উমরা আদায় করেন । অথচ এক সফরে নবীজি ও সাহাবীদের থেকে একাধিক উমরা করার কোনো নযীর পাওয়া যায় না । তাই অনেক আলিমের মতে নফল উমরার চেয়ে নফল তাওয়াফ অধিক উত্তম। এজন্য এভাবে নফল উমরা না করে তাওয়াফ বেশি করা কাম্য।
বিখ্যাত তাবিয়ী আতা ইবনে আবি রাবাহ রহ. বলেন, উমরার জন্য বাইতুল্লাহ থেকে বের হওয়ার চেয়ে তাওয়াফ আমার নিকট অধিক প্রিয়। [ইবনে আবী শাইবা ১৬০৮৭]
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি সরকার নিয়ম করেছে যে, কেবল হজ-উমরার ফরয তাওয়াফ মাতাফে নেমে আদায় করা যাবে, নফল তাওয়াফের জন্য মাতাফে নামা যাবে না। এজন্য আবেগের বশবর্তী হয়ে কেউ কেউ ইহরামের চাদর পরিধান করে নফল তাওয়াফ মাতাফে গিয়ে আদায় করেন।
যদিও তারা এমনটি বাইতুল্লাহ শরীফের মহব্বতের আবেগ থেকে করেন, এটি যেহেতু নিয়মের বিরোধিতা সদৃশ, তাই বিশেষ কোন উপলক্ষ্য ছাড়া এমনটি করা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু তবে মাতাফে নেমে তাওয়াফ করার প্রবল আগ্রহ হলে এরচেয়ে বরং মসজিদে আয়েশা থেকে ইহরাম করে নফল উমরা করে নেওয়াই ভালো।
মক্কা মুকাররামার ঐতিহাসিক স্থানসমূহঃ
সাফা-মারওয়া
মক্কা পাহাড়ের শহর। মক্কার উঁচু পাহাড় জাবালে নূরে উঠলে দেখা যায় পাহাড় আর পাহাড়। কাবা ঘরের তিন দিকেই পাহাড়। কাবা ঘর থেকে পূর্ব দিকে দুটি উঁচু পাহাড় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পূর্বদিকে দাঁড়িয়ে কাবার দিকে তাকালে বামের পাহাড়টি সাফা পাহাড় আর ডানের পাহাড়টি মারওয়া পাহাড়।
হজরত হাজেরা (আ.) তার পুত্র হজরত ইসমাঈলকে (আ.) রেখে পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। সাফা থেকে একবার গিয়েছেন মারওয়ায়, আবার মারওয়া থেকে সাফায়। এভাবে সাতবার দৌড়েছেন। এ দৌড়ানো আল্লাহর খুব পছন্দ হয়েছে। তাই আল্লাহর মেহমানদের জন্য দুই পাহাড়ের মধ্যে হাঁটা ও দৌড়ানো ওয়াজিব করে দিয়েছেন।
বর্তমানে সাফা ও মারওয়া পাহাড় কেটে হাজিদের চলাচলের পথ সহজ করে দেওয়া হয়েছে। তিন তলা পথ করে দেওয়া হয়েছে ভিড় কমানোর জন্য। সাফা-মারওয়া পাহাড়ের সামান্য চিহ্ন এখন দেখা যায়। সাফা পাহাড়কে কাচ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সাফা ও মারওয়া উভয় পাহাড়ের ওপর থেকে কাবা দেখা যেত। এ দুই পাহাড়ের ওপর দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়।
আল্লাহতায়ালার নির্দশনসমূহের মধ্যে সাফা-মারওয়া পাহাড় দুটি অন্যতম। আল্লাহতায়ালা হজরত ইবরাহিমকে (আ.) হজের যেসব আনুষ্ঠানিকতা শিখিয়েছিলেন, তার মধ্যে সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাঈ করা বা দৌড়ানো ছিল অন্যতম। সাফা-মারওয়াকে হজের রোকন করার রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য ও শিক্ষা।
সাফা-মারাওয়া এই দুই পাহাড়ে হজরত হাজেরা (আ.) সাত বার প্রদক্ষিণ করেছিলেন। হজ-ওমরাপালনকারীদের জন্য সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানো, হজরত হাজেরার দৌড়ানোই ছিল মূল উৎস। হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন হজরত হাজেরা (আ.) ও তার শিশুপুত্রকে খাদ্যসামগ্রী ছাড়া জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে রেখে গিয়েছিলেন এবং তাদের সঙ্গে আনা খাদ্যসামগ্রী শেষ হয়ে যায়। তখন খাদ্যাভাবে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর প্রাণ ওষ্ঠাগত। হজরত হাজেরা (আ.) অত্যন্ত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে জনমানবহীন মরু অঞ্চলের এ পবিত্র পাহাড় দুটির মধ্যে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন। এক পর্যায়ে মধ্যবর্তী স্থানে স্বীয় আঁচল ছড়িয়ে দিয়ে শুধুমাত্র মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।
অবশেষে মহান আল্লাহ হজরত হাজেরার (আ.) দুঃখ-কষ্ট, চিন্তা, দুর্ভাবনা দূর করে দেন। জনমানবহীন অঞ্চলকে মানুষের জন্য আবাসযোগ্য করেছেন। খাদ্য ও পানীয় দিয়ে তাদের সাহায্য করেছেন। বিশ্ববাসীর জন্য শ্রেষ্ঠ ইবাদতের স্থান নির্বাচন করেছেন। যা ছিল মহান আল্লাহর অপার রহমত ও করুণা। হজরত হাজেরার (আ.) প্রার্থনার এ শিক্ষাকেই আল্লাহ সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেই হজের আনুষ্ঠানিকতায় সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাঈকে আবশ্যক করে দিয়েছেন। আর তার কাছে কাকুতি-মিনতির সঙ্গে দোয়া করার, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার শিক্ষাই হলো সাফা-মারওয়ার মূল তাৎপর্য। এ কারণে আলেমরা বলেন, অত্যন্ত আবেগ ও বিনয়ের সঙ্গে সাফা-মারওয়ায় সাঈ করতে। মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের অভাব-অনটন, প্রয়োজন এবং অসহায়তার কথা পেশ করতে।
মনের সব জটিলতা-কুটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে সুপথ প্রাপ্তির প্রার্থনা জানানো। জীবনের সব পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। হজরত হাজেরার (আ.) স্মৃতিবিজড়িত সাফা-মারওয়ার কার্যাবলির তাৎপর্য হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করা এবং পালন করা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেভাবে হজরত হাজেরাকে (আ.) তিনি বিপদমুক্ত করে সাহায্য করেছিলেন। আল্লাহতায়ালা হজ-ওমরাপালনকারীসহ মুসলিম উম্মাহকে সব ধরনের বিপদাপদ থেকে মুক্ত করুন। আমিন।
জমজম কূপ
জমজম কূপ। মক্কার মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি কূপ বিশেষ।
পবিত্রতা ও বৈশিষ্ট্যে জমজম কূপের পানি পৃথিবীর সকল পানির চেয়ে উত্তম। কাবা ঘরের ফজিলতের সঙ্গে জমজম কূপের মাহাত্ম্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাবাঘরের ইতিহাস ও জমজম কূপ একের সঙ্গে অন্যটি গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ইতিহাসের সঙ্গে জমজম কূপের ইতিহাস বর্ণনা রয়েছে।
আল্লাহতায়ালার হুকুমে হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন শিশু ইসমাঈলসহ বিবি হাজেরাকে মক্কায় রেখে আসেন, তার কিছুদিন পর জমজম কূপের আবির্ভাব হয়। হজরত ইবরাহিম (আ.) দুধের শিশু ইসমাইল ও বিবি হাজেরাকে মাত্র এক মশক পানি এবং একটি থলেতে সামান্য কিছু খেজুর দিয়ে গেলেন। হাজেরা (আ.) মক্কার নির্জন ভূমিতে কয়েকদিন পর্যন্ত ওই পানি ও খেজুর খেলেন এবং ইসমাঈলকে বুকের দুধ পান করালেন। কিন্তু এক সময় মশকের পানি ও খেজুর ফুরিয়ে এল। তিনি তখন এক চরম অসহায়তার মধ্যে নিপতিত হলেন। তার শিশু সন্তানটিও ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করতে লাগলো। হজরত হাজেরা (আ.) তখন আদরের দুলালকে দুধ পানে সমর্থ হলেন না। এমতাবস্থায় তৃষ্ণাকাতর মা পানির খোঁজে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দ্রুতবেগে দৌঁড়াতে লাগলেন। পরপর সাতবার দৌঁড়ানোর পরও কোনো পানি না পেয়ে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। আল্লাহতায়ালা মা হাজেরার দোয়া কবুল করেন। তখন পুত্রের কাছে গিয়ে দেখলেন আল্লাহর কুদরতে তার দুই পায়ের নিচে একটি পানির ফোয়ারা জেগে উঠেছে এবং তা ক্রমশ উথলে উঠছে ও প্রবাহিত হতে চাচ্ছে। হজরত হাজেরা (আ.) তখন অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং চারদিকে পাড় বেঁধে পানি থামানোর চেষ্টা করলেন। তিনি পানিকে থামার নির্দেশ দিয়ে উচ্চস্বরে বলছিলেন ‘জমজম’ অর্থাৎ থেমে যাও। হজরত হাজেরার উচ্চারিত সে শব্দেই পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্র এ কূপের নাম হয়ে যায় ‘জমজম’।
পরবর্তীতে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায় মক্কায় মানববসতির সূচনা করে। তারা জমজম কূপের নিয়ন্ত্রণ করতো। ঠিক ওভাবেই জুবহাম গোত্রের লোকেরা জমজম কূপের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। জুবহাম গোত্রের লোকেরা হজরত হাজেরা (আ.)-এর সঙ্গে চুক্তিসাপেক্ষে জমজম কূপের পানি পান করতো। কালক্রমে তারা মক্কাঘরের পবিত্র মালামাল লুণ্ঠন ও চুরি করতে লাগলো। তারা নানা পাপাচারে লিপ্ত হলো। ফলে আল্লাহর হুকুমে এক সময় জমজম কূপের পানি শুকিয়ে গেল। সংস্কারের অভাবে একসময় জমজম কূপের স্থান ভরাট হয়ে যায়। মানুষ এই কূপের বরকত ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর সূচনাতে হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর একজন দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী পুরুষের নেতৃত্বে কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কুরাইশরা ফিরে পায়। তাদের চতুর্দশ পুরুষ খাজা আবদুল মুত্তালিব জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা। তখন আবদুল মুত্তালিব জমজম কূপ অনুসন্ধানে আগ্রহী ও উদ্যোগী হন এবং তার এক পুত্র যায়েদকে সঙ্গে নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে জমজম কূপের নিশানা খুঁজে পান এবং কূপটি দেখতে পান।
স্বপ্নের চিহ্ন অনুযায়ী তিনি তার পুত্র হারেসকে সঙ্গে নিয়ে কূপ খননকার্য শুরু করেন এবং বাস্তবেই জমজম কূপ আবিষ্কারে সক্ষম হন। তখন থেকে আবার মানুষ এ কূপের যত্ন নিতে শুরু করেন। জমজম কূপ পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্রতম, বরকতময় কূপ। এর পানি পৃথিবীর সর্বোত্তম ও সুস্বাদু পানি।
বিভিন্ন হাদিসে এ পানির কল্যাণের কথা উল্লেখ আছে। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, জমজমের পানি যে নিয়তে (নেক উদ্দেশ্যে) পান করা হয় তা পূরণ হয়। জমজমের অশেষ কল্যাণ ও বরকতের কথা অনেক হাদিসে রয়েছে। হজরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জমজমের পানি সম্পর্কে বলেছেন, যে তা হচ্ছে বরকতময় এবং তৃপ্তিদায়ক। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পৃথিবীর সর্বোত্তম পানি হচ্ছে জমজমের পানি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে পানি উত্তোলন করতেন এবং পান করতেন। জমজমের পানি শুধু তৃষ্ণাই নিবারণ করে না, এর মধ্যে ক্ষুধাও নিবারণের যোগ্যতা রয়েছে। এ পানি মানুষের শরীরের স্বস্তিও প্রবৃদ্ধি করে এবং হজমে সহায়তা করে। এছাড়া জমজমের পানির বাহ্যিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ পানি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত। জমজম কূপের আরো একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ থেকে লাখ লাখ লিটার পানি উত্তোলন করলেও এর পানিতে কখনো স্বল্পতা দেখা যায় না।
জমজম কূপ মূলত মহান আল্লাহতায়ালার এক কুদরতের নিদর্শন। মক্কায় হজ ও উমরা করতে আসা লাখ লাখ মানুষ প্রতিবছর লাখ লাখ টন পানি পান করে ও বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু কখনও পানির স্বল্পতা দেখা যায়নি। বস্তুত একথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, জমজম কূপ মানুষের জন্য বিশেষ করে হাজিদের জন্য আল্লাহর এক অপূর্ব নেয়ামত ও বরকতময় উপহার।
বাদশাহ আবদুল আজিজ বিন সউদ জমজমের পূর্ব ও দক্ষিণে পানি পান করানোর জন্য দুটি স্থান নির্মাণ করেন। দক্ষিণ দিকে ৬টি এবং পূর্বদিকে ৩টি টেপ লাগানো হয়।
বর্তমানে কাবা ঘরের ২১ মিটার দূরে অবস্থিত এই কূপটি থেকে ২০ লক্ষাধিক ব্যারেল পানি উত্তলিত হয়। এই কূপটি বর্তমানে আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে। এই কূপের পানি বণ্টনের জন্য ১৪০৩ হিজরিতে সৌদি বাদশাহের এক রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী হজ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইউনিফাইড ‘জামাজেমা দফতর’ গঠিত হয়। এই দফতরে একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্টসহ মোট ১১ জন সদস্য ও ৫ শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।
মক্কা জাদুঘর
মুসলিম ঐতিহ্যের অপরূপ নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে। মক্কা জাদুঘরে মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী স্থান মক্কা-মদিনার কিছু ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। হজে বা ভ্রমণে গেলে ঘুরে দেখতে পারেন মক্কা জাদুঘর। সেখানে দেখতে পাবেন ছবিগুলো।
কাবা শরিফের কাছেই মক্কা জাদুঘর। এতে প্রবেশ করতে কোনো চার্জ দিতে হয় না। মক্কা জাদুঘরের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত।
এ জাদুঘরে আছে সৌদি আরবের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। দেখতে পারবেন সেখানকার পোশাক-পরিচ্ছদ, আসবাবপত্র, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি।
পানির কূপ জমজম এবং জমজম কূপ থেকে পানি তোলার যন্ত্রপাতিও রয়েছে। দেখতে পারবেন প্রাচীন ধাতব মুদ্রা। এখানে রয়েছে হাতে লেখা পবিত্র কোরআন শরিফ।
মক্কা জাদুঘরে রয়েছে পবিত্র মাকামে ইব্রাহীমের পদযুগলের ছাপ। রয়েছে কাবা শরিফের বহু বছরের পুরাতন দরজার লক।
আরো দেখবেন হাজরে আসওয়াদ পাথরের ক্যাসিং। সেইসঙ্গে পবিত্র কাবা শরীফের পুরাতন নকশার বেশকিছু চিত্র।
এছাড়া পবিত্র কাবা শরিফের পুরনো দরজার গিলাফও রয়েছে। রয়েছে দেখার মতো অনেক কিছুই। তাই সৌদি আরবে ঘুরতে গেলে জাদুঘরটি দেখতে ভুলবেন না।
মক্কা লাইব্রেরি
মসজিদে হারামের পাশে সাফা-মারওয়া পাহাড়ের সাঈর স্থান থেকে পূর্ব দিকে গেলে একটি হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি। বাড়ির জানালাগুলো কাঠের তৈরি। বর্তমানে এটি মক্কা লাইব্রেরি। অনেকেই মনে করেন, এ বাড়ির পবিত্র ভিটিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা আবদুল্লাহর ঘর অবস্থিত। বাবা আবদুল্লাহর এ ঘরেই প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে এ ঘরেই বসবাস করতেন। যদিও এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাড়ির দেওয়ালে লাগানো একটি নোটিশ বোর্ডেও বাংলাসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় লেখা রয়েছে, ‘হে মুসলিম ভাই! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঠিক জন্ম স্থানের ওপর কোনো বিশুদ্ধ দলিল নেই। অতএব, এ স্থান থেকে বরকত গ্রহণ করা কিংবা এটাকে সালাত ও দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা শরিয়াভাবে জায়েজ নয়।’ তবুও মক্কা নগরীতে এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত। তাই হজ করতে আসা মানুষ এ বাড়িটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এখানে সবসময় দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। ২০১৯ সালে হজের সফরে একদিন আসরের নামাজের পর গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশের হাজিরা দল বেঁধে মক্কা লাইব্রেরিতে ছুটে আসছেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হাজিরা লাইব্রেরির চারপাশ ঘুরেফিরে দেখছেন।
সৌদি সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় এ লাইব্রেরির তত্ত্বাবধায়ন করছে। বিশ্বের নামিদামি পাঠাগারগুলোর মধ্যে মক্কা লাইব্রেরি অন্যতম। লাইব্রেরির প্রসপেক্টাস থেকে জানা যায়, সৌদির বিখ্যাত শায়েখ আব্বাস কাত্তান ১৩৭০ হিজরিতে ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যয়ে এটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এর সংগ্রহে রয়েছে পাঁচ লক্ষাধিক বই। এর মধ্যে ৮ হাজারের অধিক মুদ্রিত-অমুদ্রিত পা-ুলিপি রয়েছে। দুর্লভ পা-ুলিপি আছে প্রায় ৫ হাজারের মতো।
এ লাইব্রেরির বেশ কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। লাইব্রেরির বিশাল হলরুমে রয়েছে এক লাখেরও বেশি সংকলন। এর পরিষেবা বিভাগটি সাধারণ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত। যে কোনো আগ্রহী পাঠক এখানকার মনোরম পরিবেশে এসে অধ্যয়ন করতে পারেন। লাইব্রেরির পা-ুলিপি বিভাগ নির্ধারিত করা হয়েছে গবেষকদের জন্য। গবেষণার জন্য এখানে প্রায় ৬৮৪৭টি মূল পা-ুলিপি রয়েছে। সেই সঙ্গে ৩৫৮টি অনারবি এবং ২৩১৪টি ফটোকপি পা-ুলিপিও রয়েছে। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রশিক্ষণ বিভাগ, ইলেকট্রনিক লাইব্রেরি বিভাগ, মাইক্রো ফিল্ম বিভাগ, ফটো মাইক্রো ফিল্ম বিভাগ, হারামাইন স্টল, নারী বিভাগসহ আরও অনেক সুবিধা।
জাবালে নুর
মক্কায় কাবা শরিফের কাছেই জাবালে নুর বা হেরা পর্বত। এ পর্বতে ওঠানামা বেশ কঠিন। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়মিত এ পর্বতে ওঠানামা করতেন। জাবালে নুর পর্বতে উঠতে লাগে সোয়া ঘণ্টা, আর নামতে লাগে আধা ঘণ্টা। মহানবী (সা.) এ পাহাড়ে ধ্যান করতেন। পবিত্র কোরআন প্রথম নাজিল হয়েছিল এখানে। আরবিতে জাবাল মানে পাহাড়, জাবালে নুর অর্থ নুরের পাহাড়। পাহাড়ে কিছু অংশে পাকা সড়ক রয়েছে। কিছু গাড়ি সে পর্যন্ত যায়। এরপর শুরু হয়েছে পাহাড় কেটে তৈরি সিঁড়ি। এখানে সাইনবোর্ডে লেখা আছে, জাবালে নুরের উচ্চতা ৫৬৫ মিটার; অর্থাৎ আধা কিলোমিটারের বেশি উচ্চতা। পাকা সড়ক পর্যন্ত দুপাশে দোকানপাট ও বাড়িঘর গড়ে উঠেছে।
এঁকেবেঁকে সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে। কিছু কিছু জায়গায় সিঁড়ি বেশ খাড়া। কিছু দূর উঠে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসার জায়গা করা হয়েছে। পথে পানি, চা ও ঠান্ডা পানীয় বিক্রি হয়।
রাসুল (সা:) এর স্মৃতিময় সাওর পর্বত
সওর পাহাড়। ইসলাম ধর্মে এই পাহাড়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি মক্কা শরিফ থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।মক্কায় কাফেরদের হাতে নির্যাতিত হয়ে প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) এই পর্বতের একটি গুহায় তিনদিন লুকিয়ে ছিলেন। এই পাহাড়ের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭৪৮ মিটার আর পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রায় ৪৫৮ মিটার ওপরে। গুহাটি পাহাড়ের ওপরে এক পাশে অবস্থিত, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ১.২৫ মিটার এবং সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৩.৫ ও ৩.৫ মিটার।
নবুয়তের অষ্টম বছর মক্কার লোকেরা ইসলাম ও মুসলমান তথা প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে চরমভাবে বিরোধীতা শুরু করে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ ছিল যে, প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের অধিকাংশ অনুসারীকে মদিনাসহ অনেক অঞ্চলে হিজরতের নির্দেশ দেন। আর তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন।
অবশেষ ৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মক্কা থেকে রাতের বেলা হিজরতের পর প্রথম মনজিল ছিল জাবালে সাওর এর এ গুহা। যেখানে প্রকাশ পেয়েছিল ৩টি অলৌকিক ঘটনা। যে কারণে মক্কার শত্রুবাহিনী এ গুহাকে সন্দেহ পোশণ করেনি
কুরাইশদের হত্যার পরিকল্পনায় আল্লাহর সাহায্য
হিজরতের আগে মক্কার ইসলাম বিদ্বেষীরা ‘দারুন নাদওয়া’ বৈঠকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিরতরে হত্যার পরিকল্পনা করে। তিনি যখন রাতে নিজ বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আল্লাহ তখন তাকে হিজরতের নির্দেশ দেন।
হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তার বিছানায় রেখে প্রিয় সঙ্গী হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। আল্লাহ তাআলা সশস্ত্র কুরাইশ বাহিনীর সামনে দিয়ে সঙ্গী আবু বকরকে নিয়ে নিরাপদে মক্কার ৪ মাইল উত্তরে সাওর পাহাড়েরর একটি গুহায় আশ্রয় নেন।যেখানে সে রাতে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিরতরে হত্যার জন্য তাঁর ঘরের চারদিকে শত্রুবাহিনীর টগবগে যুবকরা অপেক্ষা করছিল। অথচ তাদের চোখের সামনে দিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন, তারা টেরই পায়নি।
সুবহানাল্লাহ!সকাল হয়ে গেলে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে ঢুকে বিছানায় গিয়ে দেখতে পান যে, হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু শুয়ে আছেন। তাঁর হিজরতের বিষয়টি শুনতে পেয়ে কুরাইশ বাহিনীর টগবগে যুবকরা তাদের পিছু নেয়।
কুরাইশ বাহিনী পিছু নেবে এটি বুঝতে পেরেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গী আবু বকরসহ সাওর পর্বতের গুহায় তিনদিন অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।মাকড়সা ও কবুতরের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য।
এদিকে মক্কার শত্রুবাহিনী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে খুঁজতে খুঁজতে সাওর পাহাড়ের গুহার সন্নিকটে এসে উপস্থিত। যেখানে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু গুহায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেন। আর এ গুহায় অবস্থান গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা এ সময় শত্রুবাহিনী থেকে তাদের রক্ষা করেন।
আল্লাহর হুকুমে ওই গুহার মুখে মাকড়সা এমনভাবে বাসা বেঁধে রাখে। আর কবুতর এমনভাবে বাসা বেঁধে তাতে ডিমে তা দিতে থাকে। যাতে কোনো মানুষ প্রবেশের চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে না।
কুরাইশ শত্রুরা গুহার কাছে এসে মাকড়সার বাসা এবং কবুতরের ডিমে তা দেয়ার বিষয়টি দেখে তার মনে করেন যে এ গুহায় কোনো মানুষের প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তাই তারা গুহায় প্রবেশ না করে চলে যায়।
এটি ছিল সাওর পর্বতের গুহার তৃতীয় অলৌকিক ঘটনা। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধুকে হেফাজত করেছিলেন।যার ফলে ৩ দিন, ৩ রাত অবস্থানের পর সাওর পর্বতের গুহা থেকে সফলভাবে নিরাপদে পবিত্র নগরী মদিনায় হিজরত করতে সক্ষম হন।
জান্নাতুল মুআল্লা কবরস্থান (মক্কা)
কাবা শরীফের প্রায় ১ কি.মি. উত্তরে কোরায়েশ বংশের প্রাচীন কবরস্থান জান্নাতুল মুআল্লা অবস্থিত। এই কবরস্থানের উত্তর প্রান্তে দেওয়াল পরিবেষ্টিত এলাকায় উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কোবরা (রাঃ) এবং রাসুল করিম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম এর দুই পুত্র হযরত কাসিম (রাঃ) ও হযরত আবদুল্লাহর (রাঃ) (তৈয়ব, তাহের) কবর শরীফ রয়েছে।
মক্কার কবরস্থানের মর্যাদার ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এটি কতইনা উত্তম কবরস্থান’ (আল বাজ্জার) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন: রাসুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম একদিন সানিয়ার, সানিয়া গোরস্থানের সামনে দাঁড়িয়েছেন, তখন এতে কোন কবর ছিলনা। তারপর তিনি বললেন: ‘আল্লাহ এই যমিন থেকে কিংবা হারাম থেকে ৭০ হাজার লোককে হাশরের ময়দানে উঠাবেন, যারা বিনা হিসাবে বেহেশতে যাবে; তাঁরা প্রত্যেকেই ৭০ হাজার লোকের জন্য সুপারিশ করবেন, তাঁদের চেহারা পূর্ণিমার রাত্রের চাঁদের মত উজ্জ্বল হবে। আবু বকর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম, তাঁরা কারা? রাসুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, তাঁরা হচ্ছে ‘অপরিচিত’ আশ্চর্যজনক লোক।
মক্কার কবরস্থানের আরেকটি বিশেষ মর্যাদা হল, এতে অনেক সাহাবী, তাবেয়ী, উলামায়ে কেরাম এবং বুজুর্গানে দ্বীন শায়িত আছেন। ৩৯ জন পুরুষ ও ৬ জন মহিলা সাহাবায়ে কেরামকে এই গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
মসজিদে জিন
জ্বিনের মসজিদ বা মসজিদুল জ্বিন। মক্কা-মদিনার দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। মসজিদটিকে মক্কার প্রাচীনতম মসজিদগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলির একটি। মসজিদুল হারাম থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে জান্নাতুল মুয়াল্লার কাছে এই মসজিদের অবস্থান। মসজিদটি এমন জায়গায় নির্মিত হয়েছে যেখানে জ্বিনদের একটি দলের সঙ্গে নবীজির (স.) সাক্ষাৎ হয়েছিল।
তারা নবীজি (স.)-এর প্রতি ঈমান এনেছিল এবং তাঁর প্রতি বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) করেছিল। এটিকে মসজিদুল হারাস বা গার্ডের মসজিদও বলা হয়। ‘হারাস’ অর্থ পাহারা দেওয়া। আর এই স্থান থেকে বহিরাগতদের গমনাগমন পাহারা দিত মক্কার অধিবাসীরা। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মুসল্লি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদ পরিদর্শনে আসেন।
প্রকৃতপক্ষে ১৭ শ খ্রিস্টাব্দে এখানে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড মসজিদ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান সৌদি রাজপরিবার এই মসজিদের আধুনিকায়ন করেছে এবং তাতে মিনার যুক্ত করেছে। এখন মসজিদটিতে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
ঐতিহাসিকরা লেখেন, তায়েফ থেকে ফেরার সময় মহানবী (স.) নাখলা নামক স্থানে কয়েক দিন অবস্থান করেন। সেখানে আল্লাহ তাআলা জ্বিনদের দুটি দলকে তাঁর কাছে পাঠান। পবিত্র কোরআনের সুরা জ্বিন-এ এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘অতঃপর তারা (নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল) আমরা এক বিস্ময়কর কোরআন শুনেছি, যা সঠিক ও নির্ভুল পথ প্রদর্শন করে। তাই আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি…।’ (সুরা জিন: ১-২)
এছাড়াও সুরা কাহফের ২৯-৩১ আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে। মানুষের ইসলামবিমুখতার বিপরীতে জ্বিনদের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে সান্ত্বনা প্রদান করেন। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা-১৪৬)
মসজিদে নামিরা
অবস্থান : আরাফাত ময়দানের কাছে।
তাৎপর্য : মসজিদে নামিরাহ সৌদি আরবের মক্কা প্রদেশের ওয়াদি উরানায়, আরাফাতের কাছে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি হজের সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থান, কারণ এখানে আরাফাতের দিনে (৯ জিলহজ) জোহর ও আসর নামাজ একসঙ্গে জামাতে আদায় করা হয় এবং খুতবা প্রদান করা হয়।
বিশেষত্ব : মসজিদটি আংশিকভাবে আরাফাতের বাইরে, তাই উকুফের জন্য আরাফাতের মধ্যে থাকতে হয়। মসজিদটি আব্বাসীয় খিলাফতের সময় (নবম শতাব্দী) নির্মিত হয়। সৌদি শাসনামলে এটির বৃহৎ সম্প্রসারণ হয়, যার ফলে এটি ১৮ হাজার বর্গমিটারে বিস্তৃত হয় এবং হাজার হাজার মুসল্লি ধারণ করতে পারে। সম্প্রসারণে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন রিয়াল ব্যয় হয়েছে।
আরাফার ময়দান
মসজিদে হারাম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে হারামের সীমানার বাইরে অবস্থিত একটা বিশাল ময়দান হল আরাফাত। ‘আরাফাত’ শব্দের অর্থ পরিচিতি।
রাসুল (সা.) অসংখ্য হাদিসে আরাফার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হজই হলো আরাফা।’ এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, আরাফা ময়দানে অবস্থান করা ছাড়া হজ পূর্ণ হয় না।
এক বর্ণনামতে, হযরত আদম ও হাওয়া (আ.)-এর জান্নাত থেকে পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবতরণের পর এ ময়দানে দুজনের মধ্যে সাক্ষাত ও পরিচিতি ঘটেছিল বলে এ ময়দানকে আরাফার ময়দান বলা হয়।
হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে হজের বিভিন্ন কার্যক্রম ও বিধিবিধান এই স্থানে এসে হজরত জিবরাইল (আ.) শেখান। তখন ইব্রাহিম (আ.) বলেন, ‘আরাফতু’ অর্থাৎ আমি বুঝেছি। সেই সূত্র ধরে এই পবিত্র স্থানের নাম রাখা হয় আরাফা। স্বয়ং রাসুল (সা.) হিজরি দশম সালে আরাফা ময়দানে অবস্থান করেছেন এবং এখানেই তিনি বিদায় হজের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। সেদিনই আরাফা ময়দানে ইসলামের পূর্ণতার ঘোষণা আসে। আল্লাহতায়ালা ওই দিনই কোরআনের এই আয়াত নাজিল করেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম।’ (সুরা মায়েদা ৩) অতএব আরাফা শুধু একটি পাহাড় বা নির্দিষ্ট স্থান নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক তীর্থভূমি, যা ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রতীক।
‘তরীকুল মুশাত’ (হাঁটা পথ) দিয়ে আরাফাতের দূরত্ব মক্কা থেকে আরাফাত ১৭ কিলোমিটার।
আরাফার ময়দানের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত মসজিদের নাম ‘মসজিদে নামিরা’। মসজিদের পশ্চিম পাশে ‘নামিরা’ নামে ছোট একটি পাহাড় রয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতেই মসজিদটির এ নামকরণ হয়েছে। আরাফার দিন ৯ যিলহজ এ পাহাড়ের পাদশেষে নবীজীর তাঁবু স্থাপিত হয় এবং এ পাহাড়ের নিকটবর্তী ‘উরানা’ উপত্যকায় তিনি বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দেন এবং নামাজের ইমামতি করেন।
মসজিদে নামিরা থেকে দেড় কিলোমিটার পূর্ব দিকে আরাফার ময়দানের পূর্ব দিকে রয়েছে ‘জাবালে রহমত’। এটি কঠিন পাথরের চাঁই বিশিষ্ট ছোট একটি পাহাড়। পাহাড়টি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৬৫ মিটার উঁচু। যার উপরিভাগে একটি চতুস্কোণী উঁচু পিলার রয়েছে। এ পাহড়ের পাদদেশে আরাফার দিন নবীজি দ্বি-প্রহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুআ-মুনাজাতে মশগুল থাকেন।
মুযদালিফার ময়দান
মসজিদে হারাম থেকে পূর্ব দিকে হাঁটা পথে ৭.২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খোলা ময়দানটি হল ‘মুযদালিফা’। যা মিনার সঙ্গে লাগোয়া এবং হারামের সীমানার মধ্যে অন্তর্গত।
‘মুযদালিফা’ অর্থ নিকটবর্তী বা রাতের অংশ। সম্ভবত ময়দানটি মিনার নিকটবর্তী হওয়ায় বা হাজীরা এখানে রাতের এক অংশে আগমন করেন বিধায় এ নামকরণ হয়েছে।
মুযদালিফার ময়দানের এক প্রান্তে রয়েছে ‘মসজিদে মাশআরে হারাম’। নবীজী আরাফা থেকে এসে এ মসজিদের কেবলার দিকের স্থানে মাগরিব ও ইশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন।
মিনা
মসজিদে হারাম থেকে পূর্ব দিকে পায়ে হাঁটা পথ (সুড়ং পথ) দিয়ে ৪ কিলোমিটার দূরে পাহাড় ঘেরা ময়দানের নাম ‘মিনা’।
‘মিনা’ শব্দের অর্থ প্রবাহিত হওয়া। হাজীগণ এখানে কুরবানী করেন, এতে রক্ত প্রবাহিত হয়। এ হিসাবে এর নামকরণ হয়েছে মিনা।
মিনা ময়দানের পশ্চিম দিকে রয়েছে ‘মসজিদে খায়েফ’। এ মসজিদে নবীজী সহ অনেক নবী নামাজ পড়েছেন এবং এখানে ৭০ জন নবীর কবর রয়েছে।
মিনা ময়দানের পশ্চিম প্রান্তে শয়তানের উদ্দেশ্যে কংকর নিক্ষেপের ৩টা স্থান রয়েছে, এগুলোকে বলা হয় ‘জামারাত’ (তথা ছোট শয়তান, মেঝো শয়তান ও বড় শয়তান)।
হজের সময় হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর সামনে শয়তান দৃশ্যমান হওয়ায় তিনি এ ৩টি স্থানে পর্যায়ক্রমে ৭টি করে মোট ২১টি কংকর নিক্ষেপ করেন। ফলে শয়তান সরে যায়।
তাৎপর্য : হজের সময় হাজিরা ১০, ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ এখানে অবস্থান করেন। এখানে জামারায় পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি ও তাশরিকের দিনগুলো পালন করা হয়। মিনায় জামারাতে পাথর নিক্ষেপের পর হাজিরা কোরবানি দেন, যা ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর ত্যাগের স্মরণে। এটি হজের ফরজ আমলগুলোর একটি।
বিশেষত্ব : এটি তাঁবুর শহর নামে পরিচিত, কারণ হাজিরা এখানে তাঁবুতে থাকেন।
জাবালে রহমত
অবস্থান : আরাফাত ময়দানে।
তাৎপর্য : এই পাহাড়টিকে ‘রহমতের পাহাড়’ বলা হয়। হাজিরা এখানে দাঁড়িয়ে দোয়া করেন, কারণ এটি আরাফাতের কেন্দ্রীয় অংশ। ৯ জিলহজ, হজের দিন লাখ লাখ হাজি এই পাহাড় ও তার চারপাশে সমবেত হন এবং দোয়া ও ইবাদতে লিপ্ত থাকেন। এখানে হজরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর মিলন হয়েছিল বলে কথিত আছে।
বিশেষত্ব : এটি হজের সময় দোয়ার জন্য বিশেষ স্থান।
মসজিদে খায়েফ
অবস্থান : মিনা প্রান্তর।
তাৎপর্য : এটি মিনার একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এখানে রাসুল (সা.) হজের সময় নামাজ পড়েছিলেন। হজের সময় হাজিরা এখানে নামাজ আদায় করেন।
বিশেষত্ব : এটি হজের আনুষ্ঠানিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
মক্কার ঐতিহাসিক মসজিদে আয়েশা বা মসজিদে তানঈম
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. এখান থেকে উমরার ইহরাম বেঁধে উমরা করেছিলেন। পরে সেখানে একটি বিশাল মসজিদ গড়ে উঠে। মসজিদটি ইসলামি শিল্পনৈপুণ্যের এক অনুপম নিদর্শন। এজন্য এটিকে মসজিদে আয়েশা রা. বলা হয়।
মসজিদে তানঈম পবিত্র কাবা থেকে পাঁচ মাইল দূরে আল-হিল অঞ্চলে মসজিদ ও তনিম একটি মসজিদ, এটি মক্কার নিকটে তনিমে, এটি হারামের সীমানা, সুতরাং হজযাত্রীরা ইহরাম বাধতে পারেন। এটি মিকাত নয় তাই এখানে ইহরাম পরা বাধ্যতামূলক নয়।
বিদায় হজের সময় হজরত রাসূলুল্লাহ সা. উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)কে তার ভাই হজরত আবদুর রহমান (রা.)-এর সঙ্গে হারামের বাইরে এখান থেকে ওমরার ইহরাম বাঁধার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
এটি বেশ বড় মসজিদ যা গোছল, অজু ও পরিবর্তনের সুবিধাসমূহ, জন্য এবং যারা নিয়মিত নামাজ পড়তে আসে তাদের জন্য।
মক্কা থেকে এখানে আসতে বাস ভাড়া ২ রিয়াল, আর ট্যাক্সি ভাড়া ৫ রিয়াল। সারাক্ষণ নফল ওমরার ইহরামের জন্য আসা হাজিদের ভিড় থাকে। বিশাল এই মসজিদের দু’টি মিনার ও একটি গম্বুজ অনেক দূর থেকে দেখা যায়। মসজিদটি খেজুর গাছ দ্বারা পরিবেষ্টিত।
জাবালু আবি কুবাইস
মক্কা নগরীর ঐতিহাসিক স্থান আবু কুবাইস পাহাড়। আরবি ভাষায় বলা হয় জাবালু আবি কুবাইস। পাহাড়টির উচ্চতা ১২০ মিটার। এটি সাফা পাহাড়ের পূর্বপাশে অবস্থিত।
আবু কুবাইস নামক এক ব্যক্তি এই পাহাড়ে প্রথম বাড়ি তৈরি করায় পাহাড়ের এই নামকরণ করা হয়। জাহেলি যুগে আবু কুবাইস পাহাড়কে আমিন বা আমানতদার বলা হতো। সুনানে তাবারানির এক বর্ণনা অনুসারে জান্নাত থেকে হাজরে আসওয়াদ পাথর এনে ৪০ বছর আবু কুবাইস পাহাড়ের ওপর রাখা হয়েছিল। অতঃপর ইবরাহিম (আ.) পাথরটি কাবার দেয়ালে স্থাপন করেন।
তাবেঈন মুজাহিদ (রহ.) বলেন, পৃথিবীর পাহাড়গুলোর মধ্যে আল্লাহ সর্বপ্রথম জাবালে আবু কুবাইস সৃষ্টি করেন। বর্তমানে আবু কুবাইস পাহাড়ের একাংশ কেটে পূর্ব চত্তরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আর কিছু অংশের ওপর রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে।
তায়েফ
সৌদি আরবে অবস্থিত তায়েফ নগরী। যার দূরত্ব পবিত্র মক্কা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ফুট। পুরো শহরটিই গড়ে উঠেছে পাহাড়ের ওপর। মক্কা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে তায়েফ যেতে।
মক্কায় যখন তাপমাত্রা ৪০-৪২ তখন তায়েফে মাত্র ২৫-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর এখন তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি। ঐতিহাসিক তায়েফ শহরের দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।
ইতিহাসের পাতায় তায়েফ নানা কারণে আলোচিত। এ তায়েফের বনি সাকিফ গোত্রে নবী করিম (সা.) দুধমাতা হযরত হালিমা সাদিয়ার ঘরে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। আবার নবুওয়ত প্রাপ্তির পর হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে তায়েফ গিয়েছিলেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণের পরিবর্তে নবীকে অত্যাচার ও নিগ্রহ করেছেন। ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তায়েফে প্রায় ১০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তারপর ফিরে গেছেন তায়েফবাসীর নানা নির্যাতন সহ্যকরে। এরপরও মোহাম্মদ (স:) তায়েফ বাসীর জন্য দোয়া করে গেছেন।
রবি শস্য ও নানা ফল-ফলাদির জন্য তায়েফ বিখ্যাত। তায়েফে উৎপন্ন আঙ্গুর, কমলা, আনার ইত্যাদি অতি দামী ফলফলাদি মিষ্টি ও পুষ্টিতে ভরপুর। বিশেষ করে তায়েফের আঙ্গুর বিখ্যাত। এছাড়া তায়েফে উৎপাদিত সবজি সৌদি আরবের চাহিদার প্রায় ৩০ভাগ পূরণ করে। আর এ গুলো উৎপাদন করেন বাংলাদেশী রেমিটেন্স যোদ্ধারা।
এছাড়া তায়েফকে বলা হয়,ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের লীলাভূমি। চমৎকার সাজানো-গোছানো শহর। শহড়জুড়ে রয়েছে নানা ভাস্কর্য।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস মসজিদ তায়েফ শহরে অবস্থিত। এটিই তায়েফের কেন্দ্রীয় মসজিদ, এখানে তার মাজারও অবস্থিত। হযরত আব্দুল্লা ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হলেন, রাইসুল মোফাচ্ছেরিন-অর্থাৎ এ দুনিয়াতে যত মুফাস্সিল তফসিল কারক রয়েছেন সবার প্রধান হিসেবে তিনি আজীবন থাকবেন।
হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যদি কখনও কোরআন,হাদিস,এর ব্যাখ্যার ব্যাপারে কোন সমস্যায় পড়তেন যেগুলো কোরান হাদিসে সরাসরি ছিল না, তার ব্যাখ্যা তিনি আব্দুল্লা ইবনে আব্বাস এর কাছ থেকেই নিতেন।
মসজিদ সংলগ্ন একটি লাইব্রেরি আছে। সেটা অবশ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে সেখানে প্রাচীন অনেক কিতাবের সংগ্রহ আছে। বর্তমানে এর ভেতরে এবং মাজারে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। তার কিছু অভ্যন্তরীন কারণও রয়েছে। তারপরও হজ এবং উমরাহতে আসা হাজিরা এ মসজিদটি দেখতে এ তায়েফ শহরে আসেন।
হযরত আলী (রা:) এর মসজিদ এর একটু সামনেই সেই বিখ্যাত বুড়ির বাড়ি। এটিও তায়েফ শহরে অবস্থিত। আর বুড়ির বাড়ির পাশে ছিল একটি বড়ই গাছ, সাথে ছিল একটা মসজিদ যেখানে মোহাম্মদ (স:) নামাজ পড়তেন, আর দুষ্ট বুড়ি রাস্তায় কাঁটা দিয়ে রাখতেন। সেই বুড়ির বাড়িটি এখনো সাদা মাটাই রয়ে গেছে।
হজ ও ওমরায় আসা হাজিরা এ বাড়িটি দেখতে আসেন।তবে এখন ভেতরে প্রবেশে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কারণ অনেকে সেখানে গিয়ে বিভিন্ন নিয়ত করে তাবিজ কবজ দোয়া ও পরিস্কার পরিছন্ন করে,যা সেদেশের মানুষ বিদআত বলে মনে করেন। ঐতিহাসিক হলেও এখানে নেই কোন সাইনবোর্ড, নেই কোন বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও।
এই বুড়ির বাড়ির পেছনে রয়েছে একটি পাহাড়।যে পাহাড়ে একটি বড় পাথর এখনো ঝুলে আছে। ইসলাম প্রচারে আসা মোহাম্মদ (স:) কে তায়েফ বাসি রক্তাক্ত করে ফেলতেন, তখন ফেরেস্তারা এ পাথরটি ফেলে তায়েফকে ধ্বংস করে ফেলতে চেয়েছিলেন।
এছাড়াও মসজিদ আল কুহ, মসজিদে আদমসহ আরো বেশ কিছু মসজিদ, হুজুর সা:-এর দুধ মা হালিমার বাড়ি, দৃষ্টি নন্দন পার্ক, হোটেল রেস্তোরা, স্কুল ও হাসপাতাল দিয়ে সমৃদ্ধ এ তায়েফ শহর।
তায়েফের ইহুদী বুড়ির বাড়ি
হযরত আলী (রা:) এর মসজিদ এর একটু সামনেই সেই বিখ্যাত বুড়ির বাড়ি। এটিও তায়েফ শহরে অবস্থিত। আর বুড়ির বাড়ির পাশে ছিল একটি বড়ই গাছ, সাথে ছিল একটা মসজিদ যেখানে মোহাম্মদ (স:) নামাজ পড়তেন, আর দুষ্ট বুড়ি রাস্তায় কাঁটা দিয়ে রাখতেন। সেই বুড়ির বাড়িটি এখনো সাদা মাটাই রয়ে গেছে।
হজ ও ওমরায় আসা হাজিরা এ বাড়িটি দেখতে আসেন।তবে এখন ভেতরে প্রবেশে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কারণ অনেকে সেখানে গিয়ে বিভিন্ন নিয়ত করে তাবিজ কবজ দোয়া ও পরিস্কার পরিছন্ন করে,যা সেদেশের মানুষ বিদআত বলে মনে করেন। ঐতিহাসিক হলেও এখানে নেই কোন সাইনবোর্ড, নেই কোন বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও।
তায়েফ গেলে করণীয়
হজের সফরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত ‘তায়েফ শহরটি অনেকেই যিয়ারত করতে যান। যেহেতু তায়েফ মীকাতের বাইরে, এজন্য সেখান থেকে ফেরার সময় মীকাত থেকে অবশ্যই ইহরাম করতে হবে এবং মক্কায় ফিরে উমরাহ আদায় করে হালাল হতে হবে ।
তায়েফ থেকে মক্কা গমনকারীদের মীকাত হলো ‘করনুল মানাযিল’। বর্তমানে তায়েফ থেকে ফেরার দুটি পথ রয়েছে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ ও পরিচিত পথে (যে পথে বাস সহ অধিকাংশ গাড়ী চলাচল করে) মীকাতের অবস্থান- ‘আসসাইলুল কাবীর’ এলাকায়। আর অপর পথে মীকাত ‘হাদাত এলাকায় অবস্থিত এবং এ পথে মীকাত অঞ্চলে ‘মীকাতে ওয়াদিয়ে মাহরিম’ নামে একটি মসজিদ রয়েছে।
উল্লেখ্য, কেউ যদি ইহরাম করা ছাড়াই মক্কায় ফিরে যান, তাহলে তিনি একটি ওয়াজিব লঙ্ঘন করলেন । এক্ষেত্রে তাকে পুনরায় মীকাতে এসে ইহরাম করতে হবে । যদি মীকাতে ফিরে এসে ইহরাম না করেন, তাহলে দম দেওয়া লাগবে।
জি’রানা থেকে ইহরাম প্রসঙ্গে
অনেকে মনে করেন তায়েফ থেকে ফেরার পথে ‘জি’রানা মসজিদ’ থেকে
ইহরাম করতে হবে। এটি একটি ভুল ধারণা। কেননা জি’রানা মীকাত নয় ৷ বরং হিলু (হারাম ও মীকাতের মধ্যবর্তী অঞ্চল) এর একটি অংশ। সুতরাং তায়েফ থেকে ফেরার পথে জি’রানা মসজিদ’ থেকে ইহরাম করলে সেটি ধর্তব্য হবে না। বরং পুনরায় ‘করনুল মানাযিল’ এ ফিরে গিয়ে কিংবা অন্য যে কোনো মীকাত থেকে ইহরাম করতে হবে। অন্যথায় দম দেওয়া ওয়াজিব হবে।
মদীনা মুনাওয়ারাঃ
যিয়ারতে মাদীনা
উমরাহ সফরের একটি বড় সৌভাগ্য হল মদিনা মুনাওয়ারায় উপস্থিত। কারণ এখানেই শুয়ে আছেন রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটি হচ্ছে আল্লাহর নবীর ‘হারাম’। রাসূলের পায়ের পরশে এখানের ধূলিবালি ধন্য। এখানের হাজিরি নবী-প্রেমিক সৌভাগ্যবানদের কপালেই জোটে।
আজ আপনি প্রিয় নবীর দরবারে আসার সৌরভময় আদেশ পালন করতে যাচ্ছেন। তাই বেশি বেশি দরুদ পড়ুন এবং আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বাড়িয়ে দিন।
পাশাপাশি দৃঢ় সংকল্প করুন, বাকি জীবন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ মোতাবেক অতিবাহিত করবেন এবং তাঁর আনীত দীনের প্রচার-প্রসারে সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।
মদীনা তাইয়্যিবাহ প্রবেশের পূর্বে পবিত্র এ নগরীর গুরুত্ব-মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্মরণ করে নিন। অতঃপর আদবের সাথে প্রবেশ করুন।
মদীনা মুনাওয়ারায় প্রবেশের সময় এই দুআ পড়ুন-
رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِيْ مِن لدُنْكَ سُلْطَانًا نَصِيرًا
অর্থ: হে প্রতিপালক! আমাকে যেখানে প্রবেশ করাবেন, কল্যাণের সাথে প্রবেশ করান এবং যেখান থেকে বের করবেন কল্যাণের সাথে বের করুন এবং আমাকে আপনার নিকট থেকে বিশেষভাবে এমন ক্ষমতা দান করুন, যার সাথে (আপনার) সাহায্য থাকবে। [সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৮০]
মদীনা তায়্যিবাহ ও নবীজির দুআ
মদীনা তায়্যিবার সাথে আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিল প্রাণের বন্ধন। তাই তো নবীজির পাক যবানে মদীনা মুনাওয়ারার জন্য কত যে দুআ বের হয়েছে!! প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয় নিংড়ানো এসব দুআ আরশের অধিপতি কবুল তো করেছেনই, উপরন্তু আপন হাবীবের সম্মানে নিজে পবিত্র এ শহরের নাম রেখেছেন ‘তাবা’ (তাবা মানে পবিত্র ও পরম প্রশান্তিময়) (মুসলিম ১৩৮৫]।
মদীনা তায়্যিবাহ নামে যেমন “তাবা’, বাস্তবেও তা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য বরকতময় এক শান্তির নিবাস।
পবিত্র এ শহরকে নবীজি কত বেশি ভালোবাসতেন এবং তার জন্য নবীজি কী কী দুআ করেছেন, এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা পাবেন হাদীসের কিতাবে ‘মদীনার ফযীলত’ অধ্যায়ে । ‘মাদীনাতুর রাসূল’ এর সৌভাগ্যবান যিয়ারতকারীর খেদমতে আমরা সেসব হাদীসের এক ঝলক এখানে তুলে ধরছি।
১. আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহ ! মক্কাতে আপনি যে বরকত দান করেছেন, মদীনাতে এর দ্বিগুণ বরকত দান করুন। [বুখারী ১৮৮৫]
২. আনাস রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর থেকে ফিরে আসার পথে যখন মদীনার প্রাচীরগুলো দেখতে পাতেন, তখন তিনি ভালবাসার কারণে মদীনার উদ্দেশ্যে তাঁর উটকে দ্রুত চালাতেন। যদি উট ব্যতীত অন্য কোন বাহনে থাকতেন তাহলে তাকে দ্রুত চালাতেন।[বুখারী ১৮৮৬]
৩. সহীহ বুখারীর এক বর্ণনায় আছে, মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আসার পর আবু বকর রাযি. ও বিলাল রাযি. জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করলেন,
اللَّهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا الْمَدِينَةَ كَحُبْنَا مَكَّةَ أَوْ أَشَدَّ اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي صَاعِنَا، وَفِي مُدَّنَا، وَصَحْحْهَا لَنَا وَانْقُلْ حُمَّاهَا إِلَى الْجُحْفَةِ
হে আল্লাহ! মদীনাকে আমাদের নিকট মক্কার মত বরং তার চেয়েও বেশি প্রিয় করে দাও। হে আল্লাহ! আমাদের ‘সা’ ও মুদ -এ বরকত দান করুন এবং আমাদের জন্য মদীনাকে স্বাস্থ্যকর বানিয়ে দিন। আপনি মদীনার জ্বরের প্রকোপকে জুহফায় স্থানান্তরিত করে দিন। [বুখারী ১৮৮৯]
মদীনা তায়্যিবার আদব পরিপন্থি কথা-কাজের ভয়াবহতা
মদীনা মুনাওয়ারা একদিকে যেমন পবিত্র ও বরকতময়, অপরদিকে অত্যন্ত নাজুক ও স্পর্শকাতর শহর। পবিত্র এ নগরীর আদব পরিপন্থী সামান্য কথা-কাজে নেকির পূঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া লাগতে পারে ।
এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত হাদীসগুলো সামনে রাখুন
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মদীনার আয়ির নামক পাহাড় থেকে সাওর পর্যন্ত হারাম (পবিত্র ও সম্মানিত)। যদি কেউ এ অঞ্চলে (দীনের নামে) নতুন কোনো কিছু দাবি করে কিংবা কোনো বিদআতীকে আশ্রয় দেয় তাহলে তার উপর আল্লাহর, ফেরেশতাদের ও সকলের মানুষের লানত । সে
ব্যক্তির কোন ফরয এবং নফল ইবাদত আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। [বুখারী ১৮৭০]
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে কেউ মদীনাবাসীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে, সে এমনভাবে গলে যাবে যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। [বুখারী ১৮৭৭
৩. হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মদীনা কামারের হাপরের ন্যায়, যা তার আবর্জনা ও মরীচিকাকে দূর করে এবং খাঁটি ও নির্ভেজালকে পরিচ্ছন্ন করে। [বুখারী ১৮৮৩]
৪. সুফিয়ান ইবনে আবি জুহাইর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইয়ামান বিজিত হবে, তখন একদল লোক সওয়ারী হাকিয়ে পরিবার-পরিজন সহ মদীনা ত্যাগ করে চলে যাবে, অথচ মদীনা তাদের জন্য উত্তম ছিল, যদি তারা বুঝত। সিরিয়া বিজিত হবে, তখনও একদল লোক সওয়ারী করে নিজ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে যাবে, অথচ মদীনা তাদের জন্য মঙ্গলজনক ছিল. যদি তারা তা বুঝত। এমনিভাবে ইরাক বিজিত হবে,তখন একদল লোক পরিবার নিয়ে চলে যাবে, কিন্তু তাদের জন্য মদীনাই ছিল উত্তম, যদি তারা তা বুঝত। [বুখারী ১৮৭৫, মুসলিম ১৩৮৮]
তাই আমাদের কর্তব্য মদীনা তায়্যিবার প্রতিটি ধূলিকণাকে পরম ভক্তি ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখা। কারণ, এখান থেকেই আমি-আপনি সবাই দীন- দুনিয়ার সকল কল্যাণের চাবি-কাঠি লাভ করেছি। এখান থেকেই শিখেছি মনুষ্যত্ব । এখান থেকে হাত ধরে মুক্তি দেওয়া না হলে আল্লাহ পানাহ, না জানি আমাদের কতজন থাকত প্ৰতিমালয়ে, কতজন হত অগ্নিকুণ্ডের সেবায়েত কতজন যাতায়াত করত গীর্জায় । এ ভূমির অসিলায়ই তো আমরা রক্ষা পেয়েছি। সুতরাং এ শহরের কোনো কিছুর সমালোচনা থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকুন।
এ প্রসঙ্গে এ ঘটনাটিও মনে রাখুন, একবার এক বুজুর্গব্যক্তি মদীনা তায়্যিবায় আসলেন। খাবারের সময় তার সামনে দই পরিবেশন করা হলো। দই খেয়ে তার পছন্দ হলো না। তিনি বলে ফেললেন, মদীনার দই সুস্বাদু নয়, এরচেয়ে বরং আমাদের দেশের দই বেশি স্বাদের। ঘটনাচক্রে সে রাতেই তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখলেন। নবীজি তাকে বললেন,এখানকার দই ভালো না লাগলে এক কাজ করো, যে জায়গার দই পছন্দ হয় সেখানে চলে যাও। [ঘটনাটি হযরত মাওলানা মুফতী শফী রহ. এর বরাতে তাঁরই সুযোগ্য সন্তান মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহ উদ্ধৃত করেছেন । বিস্তারিত দেখুন, ইনআমুল বারী ৫/৪৭৩]
মদীনায় অবস্থান ও মৃত্যুর ফযীলত
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যার পক্ষে মদীনায় মৃত্যুবরণ করা সম্ভব, সে যেন মদীনায় মৃত্যুবরণ করে। কেননা যে ব্যক্তি মদীনায় মৃত্যুবরণ করবে আমি তার জন্য সুপারিশ করব। [তিরমিযী ৩৯১৭]
এজন্য সাহাবা-তাবেয়ীন সহ হাজারো-লাখো ওলী আল্লাহ ও নেককার বান্দাগণ জীবনভর মদীনায় মৃত্যুবরণের দুআ করে গেছেন । হযরত উমর রাযি. এর ভাষায়-
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ، وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ رَسُولِكَ صلى الله عليه وسلم.
হে আল্লাহ! আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদাত লাভের তাওফীক দান করুন এবং আমার মৃত্যু তোমার রাসূলের শহরে (মদীনায়) প্রদান করুন। [বুখারী ১৮৯০]
মসজিদে নববীর ফযীলত
হাদীসে আছে, মসজিদে নববীতে এক রাকাত নামায পড়া মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্য মসজিদে এক হাজার রাকাত আদায় করার চেয়ে উত্তম [বুখারী ১১৯০, মুসলিম. ১২৯৪]
সুনানে ইবনে মাজাহ-র এক বর্ণনায় আছে, মসজিদে নববী ও বাইতুল মাকদিসে নামায পড়লে পঞ্চাশ হাজার রাকাতের সওয়াব পাওয়া যায়। এ বর্ণনাটি অতিশয় যঈফ ও শায (বিচ্ছিন্ন), যা বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের নিকট অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ের। যদিও কোনো কোনো লেখক তা ফযী-লতের হাদীস বিবেচনায় উল্লেখ করে থাকেন। [বিস্তারিত দেখুন, কিফায়াতুল মুগতাযী ৩/২৬০, হাদীস নং ১৪১৩, ইবনে মাজাহ, শায়খ শুআইব আরনাউত এর টীকা দ্রষ্টব্য]
নবীজির রওজা শরীফে
মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছে হোটেলে সামানপত্র রেখে উত্তমরূপে গোসল করুন। প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নিয়ে নিন।
তারপর মসজিদে নববীর উদ্দেশ্যে রওনা দিন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পেশের উদ্দেশ্যে পুরুষেরা মসজিদে নববীর বাবুস সালাম’ নামক দরজা দিয়ে প্রবেশ করুন।
মসজিদে প্রবেশের সময় ডান পা দিয়ে প্রবেশ করুন এবং এ দুআ পড়ে নিন-
بِسْمِ اللهِ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
অর্থ: আল্লাহর নামে প্রবেশ করছি। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের উপর। হে আল্লাহ! আমার গুনাহ মাফ করে দিন, আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন। [মুসনাদে আহমাদ ২৬৪১৭]
মসজিদে প্রবেশ করে দু রাকাত দুখুলুল মসজিদ পড়ে নিন।
কবর শরীফের দিকে অত্যন্ত আদব ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে কাউকে কষ্ট না দিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হোন এবং বেশি বেশি দরুদ পড়ুন।
কবর শরীফের সামনে সোনালী গ্রিলের বেষ্টনি রয়েছে। বেষ্টনির মাঝে প্রথম যে ছিদ্র আছে তার বরাবর দাঁড়ালে নবীজির চেহারা মুবারক সামনে হবে। ছিদ্রের কিছুটা উপরে আরবীতে- هنا السلام على رسول الله
(অর্থাৎ এখানে নবীজির প্রতি সালাম দিন) লেখা আছে।
নবীজির কবর মুবারকের সামনে দাঁড়িয়ে বিনয় ও আদবের সাথে সালাম পেশ করুন।
কিবলার দিকে পিঠ করে নবীজির দিকে ফিরে অত্যন্ত বিনয় ও আদবের সাথে সালাত ও সালাম পেশ করুন। এ সময় হাত বাঁধবেন না এবং দুআর মত হাত উঠাবেন না।
সালাত-সালাম পেশ করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাক্য জরুরি নয়। তবে এভাবে বলতে পারেন-
اَلصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ
আরো যারা সালাম পেশ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, তাদের পক্ষ থেকেও নবীজির নিকট সালাম পেশ করুন।
তাদের পক্ষ থেকে এভাবে বলুন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি সালাম।
এ সময় জালি / বেষ্টনির ভেতরে দেখার চেষ্টা বা উঁকি দেওয়া অনুচিত এবং ছবি তোলা বা ভিডিও করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। কবর শরীফের নিকট এহেন কাজ খুবই গর্হিত।
নবীজির ডান পাশে প্রথমে হযরত আবু বকর রাযি ও তারপর হযরত উমর রাযি এর কবর। প্রথম ছিদ্র বরাবর দাঁড়িয়ে নবীজিকে সালাম পেশ করার পর সামান্য ডানে সরে এসে দ্বিতীয় ছিদ্রের সামনে এসে দাঁড়ান। ছিদ্রের উপর আরবীতে ابو بكر رضي الله عنه লেখা দেখবেন। হযরত আবু বকর রাযি. কে এভাবে সালাম পেশ করুন- اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا خَلِيْفَةَ رَسُوْلِ اللهِ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ، جَزَاكَ اللهُ عَنَّا خَيْرَ الْجَزَاءِ
তারপর ডান দিকে দুই ফুটের মত এগিয়ে তৃতীয় ছিদ্রের সামনে দাঁড়ান ছিদ্রের উপর আরবীতে লেখা আছে- عمر رضي الله عنه এখানে দাঁড়িয়ে হযরত উমর রাযি. কে এভাবে সালাম পেশ করুন- السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ ، جَزَاكَ اللَّهُ عَنَّا خَيْرَ الْجَزَاءِ
কবর শরীফের সামনে ভিড় থাকে এবং ভিড়ের কারণে সাধারণত দাঁড়ানোর সুযোগ হয় না। তাই ধাক্কাধাক্কি না করে যতটুকু পড়া সম্ভব পড়ে ধীর পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে যাবেন। কুরআন মাজীদের নির্দেশ অনুযায়ী নবীজির সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা ও শোরগোল করা নিষেধ।
মদীনা শরীফে অবস্থানকালীন করণীয়
পুরুষগণ পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে নববীতে আদায় করুন। এখানে এক রাকাতে একহাজার রাকাতের সওয়াব হয়। বিশেষত মসজিদে নববীর ঐ অংশে জামাতে নামায আদায় করতে খুব মন চায়, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ নামায আদায় করেছেন। (যদিও বর্তমানে এ অংশে সাধারণ মুসল্লিদের জন্য সবসময় প্রবেশের সুযোগ থাকে না) । আর নামায ছাড়া অন্য সময়ও মসজিদে নববীতে হাজির থেকে ইবাদাত ও তিলাওয়াতে সময় কাটাতে পারেন।
আর নারীগণ বাসায় নামায পড়বেন, কারণ তাদের জন্য সেখানেও বাসায় নামায পড়া উত্তম। তবে মসজিদে নববীতে হাজির হয়ে গেলে এবং নামাযের সময় এসে গেলে জামাতে শরীক হয়ে যাবেন।
উল্লেখ্য, মসজিদে নববীতে নারীদের প্রবেশপথ ও নামাযের জায়গা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দূর দেশ থেকে বারবার যেহেতু যাওয়া সম্ভব হয় না, তাই দিনে যতবার সম্ভব নবীজির কবর শরীফে উপস্থিত হয়ে সালাম পেশ করতে পারেন। তবে প্রতিবারই লক্ষ্য রাখতে হবে যেন অন্তরের ভক্তি-ভালোবাসা বজায় থাকে এবং আদব ও ইহতিরাম রক্ষা করা হয়।
এ সময় বেশি বেশি দরূদ শরীফ পাঠ করুন। বহু হাদীসে দরূদ শরীফের অনেক শব্দ-বাক্য উল্লিখিত হয়েছে। এখানে পড়ার সহজার্থে একটি সংক্ষিপ্ত দরূদ উল্লেখ করা হলো— اللَّهُمَّ صَلِّ عَلى مُحَمَّدٍ وَسَلِّمْ
মসজিদে হারামের ন্যায় মসজিদে নববীতেও ইতিকাফের নিয়তে যতবেশি সম্ভব সময় অবস্থান করুন। তিলাওয়াত-যিকির ও নফল ইবাদতে মশগুল থাকুন। আফসোস, আমরা মসজিদে নববীতে অতিরিক্ত সময় দিতেই চাই না !
মদীনা তায়্যিবায় পুরো কুরআন মজীদ কমপক্ষে একবার খতম দেওয়ার চেষ্টা করুন।
মসজিদে নববীতে বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখানোর উদ্দেশ্যে সারাদিনে একাধিক হালকা (মজলিস) হয় । যাদের তিলাওয়াত বিশুদ্ধ নয় তারা অবশ্যই চেষ্টা করুন, কোনো এক হালকায় অংশগ্রহণ করার। এছাড়াও যদি কাফেলায় এমন সহযাত্রী থাকেন যিনি বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন তাহলে তার কাছ থেকেও শিখে নিন।
আর যারা বিশুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে পারেন, তারা দীনের মৌলিক ও বুনিয়াদী বিষয়গুলো নির্ভরযোগ্য কোনো আলিমের কাছ থেকে শেখা শুরু করে দিন।
মদীনা তায়্যিবায় অবস্থানকালে দরূদ শরীফ, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকর-আযকারের পর যে সময় বাঁচবে, তা হাদীস শরীফ এবং সীরাত ও শামায়িল (নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত) পাঠে ব্যবহার করা হলে অত্যন্ত বরকতপূর্ণ কাজ হবে। হাদীস ও সীরাতের কিতাবে বর্ণিত ঘটনাবলীর এক বিরাট অংশ এই পবিত্র ভূমিতেই ঘটেছে। এখানে সেসব ঘটনার পাঠ ও সীরাত অধ্যয়ন হৃদয়ে ভাবাবেগ জন্মাবে এবং আত্মারও অভাবনীয় উৎকর্ষ সাধন ঘটাবে। যারা বাংলা জানেন তারা নবীয়ে রহমত (মাওলানা আবুল
হাসান আলী নদবী রহ. রচিত ও মাকতাবাতুল হেরা কর্তৃক প্রকাশিত) গ্রন্থটি নিয়মিত একটু একটু করে পাঠ করতে পারেন।
মসজিদের নববীর রিয়াজুল জান্নায় উপস্থিত হবার চেষ্টা করুন ।
রিয়াজুল জান্নায়
নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিম্বরের পূর্ব পাশ থেকে কবর শরীফের দেয়াল (জালি) পর্যন্ত মাঝখানের জায়গাটি ‘রাওয়া’ বা রিয়াজুল জান্নাহ’। এ স্থানের বিষয়ে হাদীসে এসেছে, এটি জান্নাতের বাগানসমূহের মাঝে একটি বাগান । [সহীহ বুখারী ১১৯৫]
প্রথমে অভিজ্ঞজনদের কাছ থেকে রিয়াজুল জান্নায় প্রবেশের অনুমতির নিয়ম জেনে নিন ।
অনুমতি পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে রিয়াজুল জান্নায় উপস্থিত হন। আগে রিয়াজুল জান্নাহ সহজে চেনা যেত, যেহেতু পুরো মসজিদের কার্পেটের চেয়ে এখানের কার্পেটের রং ভিন্ন হত। কিন্তু এখন পুরো মসজিদের কার্পেটের রং একরকম করে ফেলা হয়েছে। এজন্য চিনতে অসুবিধা হলে অভিজ্ঞ কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিবেন।
অন্যকে কষ্ট না দিয়ে এখানে খুশু-খুযুর সাথে দু রাকাত নামায পড়ে নিন এবং সম্ভব হলে দুআ করুন। এটি দুআ কবুলের জায়গা।
যদি ফযর কিংবা আসরের পর রিয়াজুল জান্নায় প্রবেশ করেন, তাহলে এ সময় নফল নামায পড়বেন না।
মা-বোনরাও রিয়াজুল জান্নাহ যিয়ারাত করতে পারবেন। তাদের যিয়ারাতের জন্য সময় ও জায়গা নির্ধারিত। তাই তারা নির্দিষ্ট সময় জেনে নিয়ে সে সময়ে মসজিদের নির্ধারিত গেট দিয়ে প্রবেশ করে রিয়াজুল জান্নায় উপস্থিত হবেন।
স্থানীয় কিংবা অভিজ্ঞ কোনো নারী যদি সাথে থাকেন তাহলে যিয়ারাত অনেক সহজ হয়ে থাকে। অপবিত্র অবস্থায় থাকলে মসজিদে যাবেন না।
এসময় নবীজির কবর শরীফ যেহেতু কাছ থেকে দেখা যায়, সেজন্য সুবিধামত জায়গায় দাঁড়িয়ে নবীজির প্রতি সালাম পেশ করতে পারেন।
মদীনা মুনাওয়ারায় ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহঃ
মসজিদে নববী
মদিনা শহরের যে স্থানে সবথেকে বেশি হাজীদের সমাগম ঘটে তার মধ্যে মসজিদে নববী প্রথম স্থানে রয়েছে। পৃথিবীতে মসজিদুল হারাম এর পরেই মসজিদে নববীর অবস্থান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এই মসজিদটি নির্মান করেছেন এবং নিজে এর নির্মান কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। নবীজীর মদিনায় হিজরতের পর এই মসজিদটি নির্মান করা হয়েছিল। মুহাম্মদ (স.) এর কবর জিয়ারত করার উদ্দেশ্যেই সকল হাজীরা মসজিদে নববীতে এসে উপস্থিত হয়। মসজিদের সবুজ গম্বুজ বিশিষ্ট কক্ষে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.), হযরত উমর (রা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) এর রওজা মোবারক অবস্থিত। সবুজ গম্বুজ বিশিষ্ট এই কক্ষটি আয়িশা (রা.) এর ঘর ছিল। মুসুল্লিরা সাধারনত হজ্জের শুরুতে বা শেষে মসজিদে নববী-তে এসে অবস্থান করেন।
বাকীউল গারকাদ (জান্নাতুল বাকী কবরস্থান) জিয়ারত করুন
মসজিদে নববীর পূর্ব পাশের বারান্দার (খালি আঙ্গিনা) পরই মদীনার কবরস্থান জান্নাতুল বাকী। একে বাকীউল গারকাদ বলা হয়। আমাদের এ উপমহাদেশে তা জান্নাতুল বাকী নামে প্রসিদ্ধ । এখানে হযরত খাদীজা ও মায়মুনা রাযি. ছাড়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল স্ত্রী, সন্তান এবং খলীফা হযরত উসমান রাযি. সহ বহু সাহাবী-তাবেয়ী ও মহামনীষীগণ শায়িত আছেন ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসতেন। তাই জান্নাতুল বাকী যিয়ারত করুন। জান্নাতুল বাকীতে প্রবেশ করে সকল কবরবাসীর উদ্দেশ্যে এভাবে বলুন- اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بكُمْ لاحِقُوْنَ، نَسْئَلُ اللهَ لَّنَا وَلَكُمُ الْعَافِيةَ، جَزَاكُمُ اللهُ عَنَّا خَيْرَ الْجَزَاءِ
ইসলামের প্রথম মসজিদ- মসজিদে কুবায় হাজির হোন
মদীনা মুনাওরায় বহু ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে। তার মধ্যে মসজিদে কুবা অন্যতম। মসজিদে নববী থেকে প্রায় ৪ কি.মি. দক্ষিণ-পশ্চিমে মসজিদে কুবা অবস্থিত। এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মসজিদ। হিজরতের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে মদীনার প্রবেশদ্বার ‘কুবা’ এলাকায় অবস্থান করেন । তখন তিনি সর্বপ্রথম এ মসজিদ নির্মাণ করেন।
আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুবায় আসতেন। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো আরোহণ করে। এখানে এসে তিনি দু রাকাত নামায পড়তেন । [সহীহ মুসলিম, ১৩৯৯]
এ হাদীসের কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, নবীজি প্রতি শনিবারে কুবায় আসতেন এবং নবীজির অনুসরণে হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি. প্রতি শনিবারে কুবায় আসতেন।
আরেক হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি ঘর থেকে অযু করে কুবা মসজিদে আসবে এবং দু রাকাত নামায পড়বে, সে এক উমরার অনুরূপ সাওয়াব লাভ করবে। [ইবনে মাজাহ, ১৪১২]
তাই, মদীনার সফরে আপ্রাণ চেষ্টা করুন, নবীজির স্বহস্তে নির্মিত ও পদধূলি মাখা বরকতময় এ মসজিদে এসে দু রাকাত নামায আদায় করার ।
বদর প্রান্তর
মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে পাহাড় ঘেরা এক প্রান্তর। ডিম আকৃতির সুবিশাল সেই প্রান্তরের প্রস্থ প্রায় সাড়ে চার মাইল। আগে থেকেই একটি ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা ছিল এর। ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বাণিজ্য পথ গেছে এই পাহাড় ঘেরা জায়গাটির ওপর দিয়েই। বণিকদের কাফেলা যাওয়ার সেই স্থানেই আবার মিলেছে মক্কা ও মদিনা থেকে আসা দুটি পথ। এখান থেকে লোহিত সাগরও নিকটবর্তী। স্থানটির নামকরণ ‘বদর’ করার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা জানা যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যটি হলো, বদর বিন ইয়াখলাদ নামে এক ব্যক্তি এখানে একটি কূপ খনন করেছিলেন। কূপের পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ। কথিত আছে, সেখানকার পানিতে চাঁদের প্রতিফলন ঘটত। যেহেতু চাঁদকে আরবিতে বদর বলা হয়, তাই উভয় দিকের সূত্র মিলিয়ে এই স্থানের নাম বদর রাখা হয়েছিল। ২ হিজরির ১৭ রমজান (১৩ মার্চ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি প্রথম যুদ্ধ। এতে মুসলমানরা জয়লাভ করে।
খন্দক
খন্দক ফারসি শব্দ। এর অর্থ পরিখা। মদিনার তিনদিকে ঘরবাড়ি ও খেজুর বাগান থাকায় তা প্রাচীর-বেষ্টনীর ন্যায় নিরাপদ ছিল, কিন্তু উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক ছিল উন্মুক্ত।
প্রখ্যাত সাহাবি হযরত সালমান ফারসি (রা.)-এর পরামর্শ ও মজলিসে শুরার সিদ্ধান্তে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার উন্মুক্ত দিকে পাঁচ হাত গভীর এক পরিখা খনন করেন বিধায় একে পরিখা বা খন্দকের যুদ্ধ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা আহযাবের ২০ নং আয়াতে ‘আহযাব’ নামকরণ স্বীকৃত হয়েছে।
আরব উপদ্বীপে শান্তি ও স্বস্তির আবহ সৃষ্টি হয়েছিল। সর্বত্র সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ বিরাজমান ছিল। কিন্তু ইহুদিদের শাখাগোত্র বনু নাজিরকে নিজেদের দুষ্কর্ম ও চক্রান্তের কারণে নানা প্রকার অপমান ও লাঞ্ছনার স্বাদ গ্রহণ করেছিল, তখনো তাদের বোধোদয় হয়নি।
মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে খায়বার যাওয়ার পর মুসলিম ও মূর্তিপূজকদের মধ্যে যে সামরিক টানাপোড়েন চলছিল তার ফলাফল কী দাঁড়ায় তা দেখার জন্য তারা অপেক্ষমান থাকে। কিন্তু যখন তারা দেখল যে, পরিস্থিতি ক্রমেই মুসলমানের অনুকূলে যাচ্ছে এবং তাদের শাসনক্ষমতা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে, তখন তারা হিংসার আগুনে জ্বলেপুড়ে মরতে লাগল এবং নানা প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।
শেষবারের মতো মুসলমানদের এমন এক চরম আঘাত হানার জন্য তারা প্রস্তুতি শুরু করে দিল, যাতে তাদের জীবনপ্রদীপ চিরতরে নিভে হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু মুসলমানের সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলা করার সাহস তাদের ছিল না, তাই অত্যন্ত বিপজ্জনক পন্থা অবলম্বন করল।
কুরাইশরা বদরে নিরঙ্কুশভাবে পরাজিত হয়। উহুদে মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করতে না পারা, আর চ্যালেঞ্জ দিয়েও মুসলমানদের মোকাবিলায় পরবর্তী বছরে বদরে না এসে কাপুরুষ বলে পরিগণিত হয়। তাদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্যে উহুদের চেয়েও ভয়ংকর অবস্থা করার মানসে প্রস্তুত হয়। কিন্তু কীভাবে সম্ভব এ পরিস্থিতি তৈরি করা-এর পথ বের করে দিল খায়বারে আশ্রয় গ্রহণকারী ইহুদিরা।
উহুদের পাদদেশে
মসজিদে নববীর প্রায় পাঁচ কি.মি. উত্তরে উহুদ পাহাড় অবস্থিত। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ কি.মি। ঐতিহাসিক এ পাহাড়ের পাদদেশে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বরকতময় এ পাহাড় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এটা এমন পাহাড়, যে আমাদেরকে ভালোবাসে এবং আমরাও তাকে ভালোবাসি।[মুসনাদে আহমদ, ১২৫১০]
এ পাহাড়ের কাছেই শুহাদায়ে উহুদ আরাম করছেন। এখানে শুয়ে আছেন সাইয়েদুস শুহাদা হযরত হামযাহ রা., হযরত হানযালা রা., হযরত মুসআব বিন উমায়ের রাযি. সহ উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী সত্তর জন সাহাবী। এখানে এসে সকল শহীদদের কবর যিয়ারাত করুন এবং সালাম পেশ করুন।
মসজিদ আল কিবলাতাইন
ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ মসজিদ হলো মসজিদ আল কিবলাতাইন৷ মদিনায় অবস্থিত এই মসজিদটির সাথে জড়িয়ে আছে কুরআনের বিশেষ কিছু আয়াত নাজিলের ইতিহাস। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এই মসজিদে যখন জামাআতের সাথে নামাজ আদায় করতে থাকেন তখন কিবলা পরিবর্তন করার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আয়াত নাজিল হয়।
আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তখনই জেরুজালেম এর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে মক্কার দিকে কিবলা করা হয়। এজন্যই মসজিদটির নামকরণ হয়েছে মসজিদ আল কিবলাতাইন। মসজিদটির ১ টি গম্বুজ ও ১ টি মিনার আছে। এই মসজিদে একসাথে দুই হাজার মুসুল্লি জামাআতে সালাত আদায় করতে পারবে। মক্কায় হজ্জ করতে আসা হাজীগন মসজিদে নববী পরিদর্শনের সময় মসজিদ আল কিবলাতাইন পরিদর্শন করতে ভুল করেন না।
আল গামামাহ মসজিদ
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এর স্মৃতি বিজড়িত মদিনার প্রাচীন ঐতিহ্য সম্বলিত মসজিদ হলো আল গামামাহ মসজিদ। খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজের রাজত্বকালে ৮৬ থেকে ৯৩ হিজরি মধ্যে মসজিদটি নির্মান করা হয়েছিল। মুহাম্মদ (স.) ৬৩১ সালে এই মসজিদে ঈদের সালাত আদায় করেছিলেন৷ পূর্বে এই মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ ছিল, তবে এখন মসজিদটিকে পুনরায় সকল মুসুল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। মদিনার প্রাচীন নিদর্শন সমূহের মধ্যে আল গামামাহ মসজিদ বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
বাদশা ফাহাদ কোরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স
পৃথিবীর সবথেকে জনপ্রিয় কোনআন প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান বাদশা ফাহাদ কোরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স যা সৌদি আরবের মদিনা শহরে অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর কমপক্ষে প্রায় ১ মিলিয়ন কপি কুরআন প্রিন্ট করে। আরবি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় কুরআন মুদ্রন করা হয় এই প্রিন্টিং কমপ্লেক্সে।
তাছাড়াও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবনী, বিভিন্ন তাফসির, হাদিস ও ইসলামিক বই মুদ্রন করা হয় এখানে। কখনও মদিনা শহরে যাওয়ার সৌভাগ্য হলে অবশ্যই এই প্রিন্টিং কমপ্লেক্স থেকে ঘুরে আসা উচিত। একসাথে হাজার হাজার কুরআন ছাপা হওয়ার দৃশ্য নিজ চোখে দেখা- এই সৌভাগ্য কজনের আছে।
মসজিদে জুমা
মদিনা শহরের মসজিদে কুবা থেকে ৯০০ মিটার উত্তরে এবং মসজিদে নববীর ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে মসজিদে জুমা অবস্থিত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) মদিনা শহরে এসে প্রথম এখানে জুমুআার সালাত আদায় করেছিলেন পরবর্তীতে এখানে মসজিদটি নির্মান করা হয়। হাজীদের মূল আকর্ষণের একটি বিশেষ মসজিদ হলো মসজিদে জুমা। মদিনার মুনাফিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এই মসজিদটার পাশে আরেকটি মসজিদ স্থাপন করেছিল যা ‘মসজিদে জিরার’ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে এই মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয় যার ধ্বংসস্তূপ এখনও সেখানেই রয়েছে।
জীন পাহাড়
সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত ওয়াদি আল বাইদা বা ওয়াদি আল জিন। পাহাড়টি সৌদি নাগরিকদের কাছে এই নামেই পরিচিত। তবে বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে এটি জিন পাহাড় নামে পরিচিত। পাহাড়টি ঘিরে অনেকে অলৌকিক বা রহস্যময় কিছু খোঁজেন। কেউ আবার চুম্বকের আকর্ষণের কারণে এমনটি ঘটছে বলে মনে করেন। এই পাহাড় নিয়ে বেশ কয়েকবার গবেষণা হয়েছে, তবে নিশ্চিত কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি।
কথিত ওয়াদি আল জিনের অবস্থান মদিনা শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। মদিনা থেকে বের হয়ে কিছু খেজুর বাগান পার হয়ে যেতে হয় এলাকাটিতে। খেজুর বাগানের পর পাহাড়ি পথ। এই এলাকার পাহাড়গুলোও ব্যতিক্রম। ন্যাড়া পাহাড়, পাহাড়ের ওপর ধারালো সূচের ন্যায় ফলা ফলা মাটি দাঁড়িয়ে আছে।
পাহাড়টির রহস্যময় দিক হলো, এখানে ড্রাইভারের স্পর্শ ছাড়াই গাড়ি নিজে নিজে এগিয়ে চলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গতি বেড়ে যায়। ড্রাইভারকে শুধু স্টিয়ারিং ধরে রাখতে হয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাস-ঐহিত্যের স্মৃতিচিহ্ন। দেশটিতে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের অসংখ্য নির্দশন। রাসূল সা.-এর হাদিস বর্ণনা, ওহী নাজিলের স্থানগুলো এখনো সৌদি আরবে অবস্থিত। স্বভাবতই রহস্যঘেরা পাহাড়টির সঙ্গে ধর্মীয় কোনো আবহ খোঁজার চেষ্টা করেন অনেকে। তবে পাহাড়টি নিয়ে কোরআন হাদিসে সরাসরি কিছু বর্ণিত হয়নি। ইসলামী চিন্তাবিদেরাও বিষয়টি নিয়ে বিশেষ কোনো মন্তব্য করেননি।
কেউ কেউ ধারণা করেন, রাসূল সা.-এর কাছে জিনেরা এই পাহাড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তবে বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। বরং রাসূল সা. তায়েফ থেকে ফেরার পথে মক্কায় একটি পাহাড়ের কাছে জিনদের সঙ্গে রাসূল সা.-এর সাক্ষাতের বিষয়টি প্রমাণিত।
বর্তমানে এই অঞ্চলটি সৌদি আরবের অন্যতম পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা এখানে ভ্রমণে আসেন। হজ, ওমরাপালনকারীরাও পাহাড়টি ঘুরে দেখেন। সৌদি নাগরিকেরা ছুটির দিনগুলো এখানে মরুভূমিতে তাবু টানিয়ে অবকাশ যাপন করেন।
পাহাড়টিতে রহস্যময় কিছু অবস্থিত নাকি এই অঞ্চলে অতিরিক্ত চম্বুকের আকর্ষণের কারণে এমন হয়ে থাকে তা অমীমাংসিত। তবে সৃষ্টির অপার রহস্যের নির্দশন বহন করছে এই পাহাড়।
আল-শাজারাহ মসজিদ
মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে ১২ কিমি দূরত্বে। যুল হুলাইফাতে অবস্থিত মিকাত। নবীজি মক্কা যাওয়ার পথে এ মসজিদে সালাত আদায় করতেন। এখানেই মদিনাবাসীদের ইহরাম বাঁধতে হয়। মসজিদে শাজারাহ মানে হলো গাছের মসজিদ। মক্কায় ওমরাহ বা হজ করার জন্য মুসলমানদের একাধিক মিকাতের (যেখানে ইহরাম স্থাপন করা হয়) একটি। আবের আলি হচ্ছে একটি স্থানের নাম যেখানে মসজিদে শাজারাহ রয়েছে। যুল হুলাইফা মদিনা থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
মসজিদে বেলাল
নবীজির প্রিয় সাহাবি হজরত বেলাল (রা.)-এর নামে পবিত্র ভূমি মদিনা মুনওয়ারায় একটি মসজিদ রয়েছে। যা মসজিদে বেলাল (রা.) বা বেলাল মসজিদ নামে পরিচিত। বেলাল মসজিদ সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি মসজিদ। নবীজির হাতে গড়া মসজিদে নববীর দক্ষিণ পাশেই এর অবস্থান। মসজিদে নববী থেকে মাত্র ৫ মিনিটেই জান্নাতুল বাকির সীমানা দিয়ে পায়ে হেঁটে বেলাল মসজিদে সহজেই যাওয়া যায়।
কাহফে খুজায়া
কাহফে খুজায়া একটি বিশেষ গুহা, যা প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর একটি দুঃখময় ঘটনার সাক্ষী। কাহফে খুজায়া গুহাটি মদিনা শহরে অবস্থিত। খন্দকের যুদ্ধের সময় মহানবী (স.) এই গুহার ভেতরে আহত অবস্থায় এসে বিশ্রাম করেছিলেন। নবী প্রেমী মুসল্লিগন মদিনায় আসলে কাহফে খুজায়া গুহাটি নিজ চোখে দেখতে যান।
সালমান ফারসি (রা.)-এর বাগান
সালমান ফারসি (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) আমাকে বললেন, ‘হে সালমান, তুমি (তোমার মালিকের সঙ্গে দাসত্ব মুক্তির ব্যাপারে) চুক্তি করো।’ আমি তার সঙ্গে ৩০০ খেজুরগাছের চারা ফলদায়ক হওয়া পর্যন্ত গর্তে পানি দেওয়া এবং চল্লিশ উকিয়া আদায় করার বিনিময়ে চুক্তি করলাম। এরপর নবীজি সাহাবিদের বললেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো।’ সাহাবিরা আমাকে খেজুরগাছ (চারা) দিয়ে সাহায্য করলেন। এক ব্যক্তি ৩০টি চারা দিলেন, আরেকজন ২০টি। অন্যজন ১৫টি, আরেকজন ১০টি চারা দিলেন। অর্থাৎ প্রত্যেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে সাহায্য করলেন। এক পর্যায়ে আমার ৩০০ চারা হয়ে গেল। এরপর নবীজি আমাকে বললেন, ‘হে সালমান, তুমি যাও এবং এগুলো রোপণ করার জন্য গর্ত খনন করো। যখন শেষ করবে, তখন আমার কাছে আসবে। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করব।’ যে বাগানের কথা হাদিসে এসেছে, সে খেজুর বাগানটি এখনও রয়েছে। সে বাগানটিই দেখতে যান হাজিরা।
মসজিদ আল-ইজাবা
মসজিদ আল-ইজাবা। মদিনার ‘বুস্তানুল সাম্মাম’-এর কাছে দোয়া কবুলের এ মসজিদটি অবস্থিত। এ মসজিদে অবস্থানকালে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের করা দোয়া কবুল হয়েছিল।
এ মসজিদটি বনি মুয়াবিয়া কিংবা আল-মুবাহালাহ নামেও সমধিক পরিচিতি। দোয়া কবুল হওয়ার কারণে এটি মসজিদ আল-ইজাবাহ বা দোয়া কবুলের মসজিদ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
মসজিদের এ জায়গার মালিক ছিলেন মদিনার আল-আওস গোত্রের হজরত মুয়াবিয়া ইবনে মালিক ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু।
মসজিদে আবু বকর (রা.)
এটি মসজিদে গামামাহর উত্তরে অবস্থিত। হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা থাকাকালে এ মসজিদে ঈদের সালাত পড়াতেন। তাই এটি মসজিদে আবু বকর (রা.) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

