হযরত উমর (রা.) এর ঘটনা সম্পর্কে মওদূদীর ভ্রান্ত বক্তব্য

মওদূদী লিখেছেন,

“নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের সময় ব্যক্তিসম্মানের কু-মনোবৃত্তি হযরত উমর (রাঃ)-কে পরাভূত করেছিল।”তর্জুমানুল কুরআন, রবিউস সানি, ১৩৫৭ হিজরি।

এর সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাটি হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর হযরত উমর (রা.) অত্যন্ত বিচলিত হয়ে বলছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করেননি। পরে হযরত আবু বকর (রা.) এসে সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করলে হযরত উমর (রা.) বাস্তবতা উপলব্ধি করেন এবং নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামের ওপর যে শোক নেমে এসেছিল, তা ছিল অকল্পনীয়। তাঁদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তাঁদের নবী ও রাসূল ﷺ তাঁদের সামনে থেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।

সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করার পর হযরত উমর (রা.) দাঁড়িয়ে বলছিলেন,“আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করেননি।”

তিনি আরও বলছিলেন,“আল্লাহ তাঁকে অবশ্যই পুনরায় উঠাবেন এবং তিনি কিছু লোকের হাত-পা কেটে দেবেন।”সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৬৬৭–৩৬৬৮।

পরবর্তীতে হযরত উমর (রা.) নিজেই এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন,

“আল্লাহর কসম! আমার মনে এ ছাড়া আর কিছুই আসেনি।”সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৬৬৭–৩৬৬৮।

এরপর হযরত আবু বকর (রা.) এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চেহারা মোবারক দেখলেন এবং তাঁকে চুম্বন করলেন। তারপর মানুষের সামনে এসে বললেন,

“যে ব্যক্তি মুহাম্মদ ﷺ-এর ইবাদত করত, সে জেনে রাখুক, মুহাম্মদ ﷺ ইন্তেকাল করেছেন। আর যে আল্লাহর ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।”

এরপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,“মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে?” সূরা আলে ইমরান: ১৪৪।

হযরত উমর (রা.) বলেন,“আল্লাহর কসম! আমি যখন আবু বকরকে এই আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন আমার পা আমাকে বহন করতে পারল না এবং আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। তখন বুঝতে পারলাম যে, নবী ﷺ ইন্তেকাল করেছেন।”সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৪৫২।

এই ঘটনার মাধ্যমে হযরত উমর (রা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও প্রকাশ পায় তিনি সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর নিজের পূর্বের অবস্থানে জেদ ধরে থাকেননি। কুরআনের আয়াত শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা হলো, হযরত উমর (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহাবি এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা। তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ একাধিক সহীহ হাদীসে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,“আমার পূর্ববর্তী উম্মতগুলোর মধ্যে এমন লোক ছিল, যাদের অন্তরে সঠিক বিষয়ের অনুপ্রেরণা দেওয়া হতো। আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ থাকে, তবে সে উমর।” সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৬৮৯।

আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,“শয়তান যখন উমরকে কোনো পথে চলতে দেখে, তখন সে উমরের পথ ছেড়ে অন্য পথ গ্রহণ করে।”সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৬৮৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৩৯৬।

সুতরাং এমন একজন মহান সাহাবির কোনো একটি ঘটনা ব্যাখ্যা করার সময় তাঁর নিয়ত ও চরিত্র সম্পর্কে কথা বলার ক্ষেত্রে কুরআন-হাদীসের সীমারেখা অতিক্রম করা উচিত নয়।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো,রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের সময় হযরত উমর (রা.)-এর আচরণ কি সত্যিই “ব্যক্তিসম্মানের কু-মনোবৃত্তি” দ্বারা পরিচালিত ছিল?

সহীহ বুখারীর বর্ণনাতে আমরা দেখতে পাই হযরত উমর (রা.) নিজেই বলেছেন,“আল্লাহর কসম! আমার মনে এ ছাড়া আর কিছুই আসেনি।”সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৬৬৭–৩৬৬৮।

অর্থাৎ তাঁর নিজের বর্ণনায় সেই মুহূর্তে তাঁর মনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকাল না করার ধারণাটিই প্রবল ছিল। তিনি কোথাও বলেননি যে, নিজের সম্মান রক্ষা, ক্ষমতা ধরে রাখা, নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদার কারণে তিনি এমন অবস্থান নিয়েছিলেন।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবু বকর (রা.) যখন কুরআনের আয়াত পাঠ করলেন, তখন হযরত উমর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করলেন।

তিনি বলেন,“আমার পা আমাকে বহন করতে পারল না এবং আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। তখন বুঝতে পারলাম যে, নবী ﷺ ইন্তেকাল করেছেন।” সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৪৫২।

এখানে যদি তাঁর মূল সমস্যা ব্যক্তিসম্মানের অহংকার হতো, তাহলে কুরআনের আয়াত শোনার পরও তিনি নিজের কথায় অটল থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং কুরআনের দলিল সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সত্য মেনে নিয়েছেন।

এটি অহংকারের আচরণ নয়; বরং দলিলের সামনে আত্মসমর্পণের আচরণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,হযরত উমর (রা.)-এর অন্তরের নিয়ত সম্পর্কে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। কারণ অন্তরের নিয়ত আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। কোনো ব্যক্তির প্রকাশ্য আচরণ থেকে তার অন্তরের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট “কু-মনোবৃত্তি” ছিল—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি দেওয়া অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

এখানে সহীহ হাদীস আমাদের তাঁর অন্তরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ‘ব্যক্তিসম্মানের কু-মনোবৃত্তি’ বলে কোনো তথ্য দেয় না। বরং হাদীস তাঁর নিজের বক্তব্যই সংরক্ষণ করেছে“আমার মনে এ ছাড়া আর কিছুই আসেনি।”

তাই হাদীসের স্পষ্ট বক্তব্য বাদ দিয়ে তাঁর অন্তরের মধ্যে একটি বিশেষ নিন্দনীয় প্রবণতা আরোপ করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

বরং ঘটনাটির স্বাভাবিক প্রেক্ষাপট হলো,রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের আকস্মিক সংবাদে হযরত উমর (রা.) প্রচণ্ড শোক ও মানসিক আঘাতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যে, তিনি প্রথম মুহূর্তে ইন্তেকালের বাস্তবতা গ্রহণ করতে পারেননি।

কুরআনও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মানবিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেছে,“নিশ্চয়ই তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।”সূরা আয-যুমার: ৩০।

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকাল ছিল আল্লাহর নির্ধারিত বাস্তবতা। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম সেই মুহূর্তে যে প্রচণ্ড শোকের মধ্যে ছিলেন, তা ইতিহাসের অন্যতম গভীরতম শোকের ঘটনা।

হযরত উমর (রা.) সেই শোকের মুহূর্তে বাস্তবতা মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু যখন কুরআনের আয়াত তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল, তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা গ্রহণ করলেন।

আর এখানেই মওদূদীর বক্তব্যের বড় সমস্যা। একটি সাময়িক আবেগপূর্ণ অবস্থাকে “ব্যক্তিসম্মানের কু-মনোবৃত্তি” বলে ব্যাখ্যা করার জন্য যে প্রমাণ প্রয়োজন, সহীহ হাদীসে তার কোনো ভিত্তি নেই।

বরং হাদীসের বর্ণনা তাঁর প্রতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে,তিনি শোকে বিচলিত হয়েছিলেন, কিন্তু কুরআনের দলিল আসার পর সত্যকে গ্রহণ করেছিলেন।

সুতরাং হযরত উমর (রা.)-এর সেই মুহূর্তকে তাঁর ব্যক্তিগত অহংকার বা “ব্যক্তিসম্মানের কু-মনোবৃত্তি” হিসেবে চিহ্নিত করা একটি ভ্রান্ত ও প্রমাণহীন ব্যাখ্যা। কুরআন-হাদীসের আলোকে এটিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালে তাঁর গভীর শোক ও তীব্র আবেগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বোঝাই অধিক সঙ্গত।

হযরত উমর (রা.)-এর মর্যাদা, তাঁর ঈমান ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাক্ষ্যপ্রাপ্ত ফজিলত বিবেচনায় নিয়ে তাঁর সম্পর্কে এমন নেতিবাচক অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য আরোপ করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইনসাফপূর্ণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

১২ রবিউল আউয়াল ১০ হিজরীতে যখন রাসূল সা. ইন্তিকাল করলেন তখন মুসলমানদের মধ্যে নেমে এলো শোকের ছায়া।

এমন সংবাদ অনেক সাহবীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। হযরত ওমর রা. এমন ঘটনা মেনে নিতে পারছিলেন না।

তিনি তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং  বলতে লাগলেন, মুনাফিকেরা দাবী করছে যে, রাসূল সা. ইন্তিকাল করেছেন।

তিনি ইন্তিকাল করেন নি; বরং আল্লাহর সাথে দেখা করতে গিয়েছেন। যেমন গিয়েছিল নবী মুসা আ.।

যে বলবে রাসূল ইন্তিকাল করেছেন আমি তার হাত-পা কেঁটে ফেলবো।

হযরত আবু বকর রা. সে সময় মদীনার বাহিরে ছিলেন। এমন সংবাদ পাওয়ার পর তিনি তাড়াতাড়ি রাসূলের ঘরে আসলেন।

এরপর গেলেন আয়েশার ঘরে। সেখানে রাসূল সা. বিছানায় শোয়া। তাকে একটি ইয়ামেনী চাদর দিয়ে ডেকে রাখা হয়েছিল।

আবু বকর রা. চাদর সরিয়ে রাসূলের চেহারা মোবাকরে চুমু দিলেন। আর বললেন, আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক।

আল্লাহ আপনার জন্য যেই মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার স্বাদ আপনি পেয়ে গেছেন। এরপরে আপনার আর কোনো মৃত্যু হবে না।

রাসূলের ইন্তিকালের পর আবু বকরের ভাষণ

এরপর আবু বকর রা. বাহিরে বের হয়ে দেখলেন ওমর রা. তখনো কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি তাকে বললেন, শান্ত হও ওমর।

আবু বকর রা. মসজিদের মিম্বারে উঠলেন। এরপর বলতে শুরু করলেন, হে লোকসকল! যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতো তারা জেনে রাখ, তিনি মারা গেছেন।

আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতো তারা জেনে রাখ, আল্লাহ চিরঞ্জিব। তার কোনো মৃত্যু নেই।

এরপর তিনি সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াত তেলওয়াত করলেন,

وَ مَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ ۚ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِهِ الرُّسُلُ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مَّاتَ اَوۡ قُتِلَ انۡقَلَبۡتُمۡ عَلٰۤی اَعۡقَابِکُمۡ ؕ وَ مَنۡ یَّنۡقَلِبۡ عَلٰی عَقِبَیۡهِ فَلَنۡ یَّضُرَّ اللّٰهَ شَیۡئًا ؕ وَ سَیَجۡزِی اللّٰهُ الشّٰکِرِیۡنَ

আর মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে ? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, এই আয়াত শোনার পর আমাদের মনে হলো এমন আয়াত যেন আমরা জানতাম না। মাত্র নাজিল হয়েছে।

আর ওমর রা. বললেন, আল্লাহর কসম! আবু বকর যখন এই আয়াত তেলওয়াত করলেন তখন আমার মাথা ঘোরাতে লাগলো।

আমার পা নিয়ন্ত্রণ হারালো। আমি জমিনে পড়ে গেলাম। তখনই আমার বিশ্বাস হলো যে, রাসূল সা. এর ইন্তিকাল হয়েছে।

তথ্যসুত্র

জীবন ও কর্ম: ওম রা.। খন্ড ১। পৃষ্ঠা ১৩৭-১৮২

What's your reaction?