হযরত আদম আ. সম্পর্কে মওদুদীর ভ্রান্ত মন্তব্য ও তার পর্যালোচনা

হযরত আদম (আ.) সম্পর্কে মওদূদী সাহেব লিখেছেন

হযরত আদম আলাইহিস সালাম মানবিক দুর্বলতায় আক্রান্ত ছিলেন। তিনি শয়তানী প্রলোভন হতে সৃষ্ট তড়িৎ জযবায় আত্মভোলা হয়ে নিজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে আনুগত্যের উচ্চ শিখর হতে নাফরমানীর অতল গহ্বরে গিয়ে পড়েন।তাফহীমুল কুরআন, উর্দু, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১২৩

উক্ত বক্তব্যে হযরত আদম (আ.)-এর ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, তিনি মানবিক দুর্বলতার কারণে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আল্লাহর আনুগত্য থেকে নাফরমানির অতল গহ্বরে পতিত হয়েছিলেন। বিশেষত “নিজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন” এবং “আনুগত্যের উচ্চ শিখর হতে নাফরমানীর অতল গহ্বরে গিয়ে পড়েন”এই ভাষাগুলো একজন নবী ও রাসূলের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ও আপত্তিজনক।

প্রথমত, “মানবিক দুর্বলতায় আক্রান্ত” কথাটি দিয়ে হযরত আদম (আ.)-এর মর্যাদা ও ঘটনার প্রকৃতিকে সাধারণ মানুষের দুর্বলতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সঠিক নয়। কুরআন তাঁর ঘটনাকে মূলত ভুলে যাওয়া ও শয়তানের প্ররোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন

আর অবশ্যই এর আগে আমি আদমের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলাম; কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন এবং আমি তাঁর মধ্যে দৃঢ় সংকল্প পাইনি।সূরা ত্ব-হা: ১১৫

অতএব কুরআনের ভাষায় “ভুলে যাওয়া” এসেছে; কিন্তু “নিজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা” এমন কোনো কুরআনিক অভিব্যক্তি নয়, যার মাধ্যমে নবীর মর্যাদাকে সাধারণ মানুষের মানসিক দুর্বলতার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

দ্বিতীয়ত

নিজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেনসূরা ত্ব-হা: ১২০

আর হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) যখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন, তখন তাঁরা আল্লাহর কাছে তাওবা করলেন

হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।সূরা আল-আ‘রাফ: ২৩

এখানে একজন নবীর আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে যাওয়ার চিত্র নেই; বরং ভুলের পরপরই আল্লাহর কাছে ফিরে আসার চিত্র রয়েছে।

তৃতীয়ত, “আনুগত্যের উচ্চ শিখর হতে নাফরমানীর অতল গহ্বরে গিয়ে পড়েন”এই বাক্যটিই সবচেয়ে বেশি পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ “অতল গহ্বরে পতন” কথাটি এমন একটি গুরুতর নৈতিক পতনের ধারণা সৃষ্টি করে, যা হযরত আদম (আ.)-এর ব্যাপারে কুরআনের পরবর্তী বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন

অতঃপর তাঁর প্রতিপালক তাঁকে মনোনীত করলেন, তাঁর তাওবা কবুল করলেন এবং তাঁকে হেদায়াত করলেন।সূরা ত্ব-হা: ১২২

যদি ঘটনাটিকে এমনভাবে বোঝানো হয় যে আদম (আ.) আনুগত্যের উচ্চ শিখর থেকে নাফরমানীর অতল গহ্বরে পতিত হয়েছিলেন, তাহলে প্রশ্ন আসে আল্লাহ কেন একই ঘটনার পর তাঁকে “মনোনীত করলেন”, “তাওবা কবুল করলেন” এবং “হেদায়াত করলেন”?

চতুর্থত, কুরআন হযরত আদম (আ.)-কে আল্লাহর মনোনীত বান্দা হিসেবে ঘোষণা করেছে

নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীমের বংশ এবং ইমরানের বংশকে সমগ্র বিশ্বের ওপর মনোনীত করেছেন।সূরা আলে ইমরান: ৩৩

অতএব তাঁর ব্যাপারে এমন শব্দচয়ন করা উচিত, যা তাঁর নবুওয়াত, নির্বাচন ও আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্তির মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পঞ্চমত, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কুরআন হযরত আদম (আ.)-এর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাকে গোপন করেনি। বরং আল্লাহ বলেছেন

আর আদম তাঁর প্রতিপালকের অবাধ্য হলেন, ফলে তিনি পথভ্রষ্ট হলেন।সূরা ত্ব-হা: ১২১

কিন্তু এর পরের আয়াতেই আল্লাহ বলেন

অতঃপর তাঁর প্রতিপালক তাঁকে মনোনীত করলেন, তাঁর তাওবা কবুল করলেন এবং তাঁকে হেদায়াত করলেন।সূরা ত্ব-হা: ১২২

সুতরাং আয়াতের একটি অংশ নিয়ে এমন কঠোর চিত্র তৈরি করা যাবে না, যাতে পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর ক্ষমা, নির্বাচন ও হেদায়াতের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায়।

সারকথা হলো, হযরত আদম (আ.)-এর দ্বারা আল্লাহর নির্দেশের খেলাফ যে ঘটনা ঘটেছিল, তা কুরআনে স্বীকৃত। কিন্তু সেই ঘটনাকে “নিজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে” “নাফরমানীর অতল গহ্বরে” পতনের মতো ভাষায় উপস্থাপন করা কুরআনের সামগ্রিক বক্তব্যের যথাযথ প্রতিফলন নয়। কুরআন তাঁকে ভুলকারী ও তাওবাকারী বান্দা হিসেবে তুলে ধরেছে এবং একই সঙ্গে তাঁর তাওবা কবুল, নির্বাচন ও হেদায়াতের ঘোষণা দিয়েছে। তাই নবীর মর্যাদা রক্ষা করে কুরআন-সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ বর্ণনার আলোকে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করাই সঠিক পদ্ধতি।

আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা হলো সমস্ত নবী রাসুল নিষ্পাপ। এটি কোরআন, হাদিস, উম্মতের ঐকমত্য সিদ্ধান্ত ও অকাট্য যুক্তির আলোকে প্রমাণিত। তবে কিছু আয়াতে যে  নবীদের তাওবা, ইস্তেগফার কবুল করা সংক্রান্ত এসেছে,তার মানে হলো বৈধতার সীমায় অবস্থান করে নবীরা যদি নিজস্ব ইজতিহাদ বা চিন্তার ভিত্তিতে কোনো অনুত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, আল্লাহ তাআলা সেটিও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন।

যুগে যুগে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। সব নবী ও রাসুল নিষ্পাপ ছিলেন। কোনো নবীকে গুনাহগার বা কোনো কাজে আল্লাহর অবাধ্য মনে করলে ইমান নষ্ট হয়ে যাবে।

কাজি আয়াজ (রহ.) লিখেছেন : নবীগণ মাসুম তথা নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহ ঐকমত্য রয়েছে।

সুরা বাকারার ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ

وَ قُلۡنَا یٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَ زَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ وَ کُلَا مِنۡہَا رَغَدًا حَیۡثُ شِئۡتُمَا ۪ وَ لَا تَقۡرَبَا ہٰذِہِ الشَّجَرَۃَ فَتَکُوۡنَا مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۳۵﴾

এবং আমি আদমকে হুকুম করলাম যে তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাকো এবং ওখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তিসহ খেতে থাকো, কিন্তু এই গাছের নিকটবর্তী হয়ো না। অন্যথায় তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।

فَاَزَلَّہُمَا الشَّیۡطٰنُ عَنۡہَا فَاَخۡرَجَہُمَا مِمَّا کَانَا فِیۡہِ ۪ وَ قُلۡنَا اہۡبِطُوۡا بَعۡضُکُمۡ لِبَعۡضٍ عَدُوٌّ ۚ وَ لَکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مُسۡتَقَرٌّ وَّ مَتَاعٌ اِلٰی حِیۡنٍ ﴿۳۶﴾

শয়তান তাদের উভয়কে ওখান থেকে পদস্খলিত করেছিল। পরে তারা যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল, তা থেকে তাদের বের করে দিল এবং আমি বললাম, তোমরা নেমে যাও, তোমরা পরস্পর একে অপরের শত্রু হবে এবং তোমাদের সেখানে কিছুকাল অবস্থান করতে হবে ও লাভ সংগ্রহ করতে হবে।

নবীগণ পাপ থেকে বিমুক্ত ও পবিত্র।

চার ইমাম ও উম্মতের সম্মিলিত অভিমতেও নবীগণ ছোট-বড় যাবতীয় পাপ থেকে মুক্ত ও পবিত্র। এ ধরনের ঘটনাবলি সম্পর্কে উম্মতের সর্বসম্মত অভিমত এই যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা অনিচ্ছাকৃত কারণে নবীদের দ্বারা এ ধরনের কাজ সংঘটিত হয়ে থাকবে। কোনো নবী (আ.) জেনেশুনে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহপাকের হুকুমের পরিপন্থী কোনো কাজ করেননি। এ ত্রুটি ইজতেহাদগত ও অনিচ্ছাকৃত এবং তা ক্ষমাযোগ্য।

সুতরাং আদম (আঃ) এর বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের আকীদা রাখতে হবে যে সেটি গুনাহ নয়।

এটি ইজতিহাদগত বিষয় ছিলো।

একটি কথা আছে “নিকটস্থ মুহাব্বত ওয়ালা লোকের উনুত্তম কাজকেও ত্রুটি ধরা হয়,তাই এটাকে এটার জন্য আদম আঃ তওবা করছিলেন।

এটি মুহাব্বতের বহিঃপ্রকাশ ছিলো।

What's your reaction?