ভুল বা অপব্যাখ্যার ব্যাপারে শরী‘আতের নির্দেশ

মুফতি মনসূরুল হক

শাইখুল হাদিস ও প্রধান মুফতি, জামিয়া রাহমানিয়া ঢাকা

হিদায়াত কি

আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে দুটি রাস্তা চালু করেছেন, একটি হিদায়াত এবং জান্নাতের রাস্তা। আর অপরটি গোমরাহী এবং জাহান্নামের রাস্তা। পবিত্র কুরআনে পাকে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا

‘আর আমি তাকে [মানুষকে] পথ দেখিয়েছি, হয়তো সে কৃতজ্ঞ হয়েছে, অথবা অকৃতজ্ঞ । [সূরা দাহর; ৩]

হিদায়াত আল্লাহ তা‘আলার এমন এক নেআমাত, যা আমাদের মৃত্যু পর্যন্ত চাইতে থাকতে হবে। হিদায়াতের অনেক অর্থ আছে। যেমনঃ এর একটি অর্থ হলো জান্নাতের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া।

আরেকটি অর্থ হলো, জান্নাতের পথে চলার এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাতে কায়েম থাকার তাওফীক দান করা। আম্বিয়া ‘আলাইহিমুস সালামকে আল্লাহ তা‘আলা কেবল মানুষকে জান্নাতের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তারা কাউকে হাতে ধরে জান্নাতের রাস্তায় উঠিয়ে দিতে সক্ষম ছিলেন না; বরং এ ক্ষমতা আল্লাহ তা‘আলা রেখেছেন নিজের হাতে। কোনো নবী-রাসূল কিংবা কোনো পীর-মাশায়েখের হাতে রাখেননি। পবিত্র কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ

‘(হে রাসূল!) সত্যি কথা হলো, আপনি নিজে যাকে ইচ্ছা করবেন তাকে হিদায়াতপ্রাপ্ত করতে পারবেন না; বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াতপ্রাপ্ত করেন। কারা হিদায়াত কবুল করবে তা তিনিই ভালো জানেন।’ (সূরা কাসাস:৫৬)

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে জান্নাতের রাস্তায় চলার জন্য তাওফীক দান করেছেন। এখন মৃত্যু পর্যন্ত যেন এই জান্নাতের রাস্তার উপর কায়েম থাকতে পারি, এর জন্য দু‘আ করতে থাকতে হবে। ইবলিশ যেন ধোঁকা দিয়ে আমাদেরকে এই পথ থেকে সরাতে না পারে। কারণ হিদায়াত এমন নাযুক বিষয় যে, একটু অসতর্ক হলেই ছুটে যেতে পারে।

কুরআন-হাদীসে এতদসংশ্লিষ্ট অনেক ঘটনা রয়েছে। এমন অনেক বুযুর্গ ছিলেন, যারা হাত তুললেই দু‘আ কবুল হয়ে যেত। অথচ একটু দুনিয়ামুখী হওয়ার কারণে আল্লাহ তার থেকে হিদায়াতের নেয়ামতকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। তার জিহ্বা এক হাত বড় হয়ে বের হয়ে গিয়েছিল এবং অবশেষে তার মুত্যু বেঈমান অবস্থায় হয়েছে!

আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী না। যে ব্যক্তি-ই দুনিয়ার দিকে ঝুঁকেছে, আল্লাহ তার নিকট থেকে হিদায়াতকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। এমন একটি-দুটি ঘটনা নয়, বরং অনেক ঘটনা কুরআন-হাদীসে রয়েছে। এবং পরবর্তী যমানারও এমন ঘটনা রয়েছে।

বাদশা আকবরের দরবারে একজন বড় আলেম ছিলেন, যিনি আরবীতে কুরআনের ত্রিশ পারার তাফসীর লিখেছিলেন নুকতাবিহীন অক্ষর দিয়ে। আরবীতে নুকতাবিহীন অক্ষরের সংখ্যা কম। তারপরেও এ ব্যক্তি এতো জ্ঞানী ছিলেন যে, এমন নুকতাবিহীন শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরী করে তাফসীর লিখেছেন।

চিন্তার বিষয় যে, লোকটা কতো বড় জ্ঞানী! কিন্তু দেখা গেল পরবর্তীতে, সে হিদায়াতের উপর কায়েম ছিল না। যদিও তার তাফসীরগ্রন্থ এখনো আছে..!

আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করেন, আমীন।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব

মানবজাতিকে জান্নাতের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে অনেক নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। কুরআনে আল্লাহ পাক চার স্থানে বয়ান করেছেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে দিয়ে দীন কায়েম করার জন্য চারটি দায়িত্ব পুরা করিয়েছেন। সকল নবীরা (আ.) দীন কায়েমের জন্য এই চার কাজ করেছেন। ১. দাওয়াত ও তাবলীগ; ২. তালীমে কিতাব; ৩. তালীমে সুন্নাহ; ৪. আত্মশুদ্ধি।

এতদসংশ্লিষ্ট কুরআনে কারীমের নির্দেশনা কুরআনে মোট চার স্থানে এসেছেঃ প্রথম পারার ১৯ নং পৃষ্ঠায়, দ্বিতীয় পারার ২ নং পৃষ্ঠায়, চতুর্থ পারার ১০ নং পৃষ্ঠায়, ২৮তম পারার সূরা যুমার।

আগে এক নবীর (আ.) পরেই আরেকজন নবী এসেছেন। সকালে কোন নবী দুনিয়া থেকে চলে গেছেন, তো বিকালে আরেকজন নবীর আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু আমাদের নবীর পরে আর কোন নবী আসেন নাই, আসবেন না। তিনি-ই আখেরী নবী। এই জন্য এই নবীওয়ালা কাজ পুরো উম্মতকে দেয়া হয়েছে।

আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের ওয়ারিস হিসাবে উলামায়ে কেরামের দায়িত্বও এই চারটি। যার ব্যাখ্যা হলো যে, একজন আলেমের জন্য উক্ত চার দায়িত্বের অধীনে নিম্নোক্ত ছয়টি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করা এবং জনসাধারণকে শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক।

১. ঈমান শিক্ষা করা। ২. ইবাদত সুন্নত অনুযায়ী করা।

৩. আয়-রোজগার, উপার্জন হালাল রাখা।

৪. মাতা-পিতা সহ বান্দার হক আদায় করা।

৫. অন্তরের রোগের চিকিৎসা করা অর্থাৎ আত্মশুদ্ধি করা.

৬. আখিরী নবীর উম্মত হিসেবে যে দায়িত্ব এসেছে সেই কাজ করা অর্থাৎ দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত করা।

নিজের পরিচিত মহলে এইকাজ করতে হবে আবার সারা পৃথিবীজুড়ে এই কাজ করতে হবে। উলামাদের দায়িত্ব এই ৬টি বিষয় সাধারণ লোকদেরকে ভালোভাবে বুঝানো এবং শিক্ষা দেয়া।

এ ছয়টি বিষয় শিক্ষা করা এবং জনসাধারণকে শিক্ষা দেওয়া ছাড়াও উলামায়ে কেরামের আরো একটি দায়িত্ব আছে, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে পাকের মধ্যে বলেছেন।

يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله ينفون عنه تحريف الغالين وتأويل الجالين وانتحال المبطلين

এই ইলম (কুরআন-হাদীস) কে ধারণ করবে, প্রত্যেক উত্তরসূরীদের মধ্যে হতে ঐ সকল (উলামায়ে কেরাম), যারা আস্থাভাজন হিসাবে স্বীকৃত। তারা এ ইলম থেকে বাড়াবাড়ির শিকার ব্যক্তিদের বিকৃতিসাধন, অজ্ঞদের অপব্যাখ্যা এবং বাতিলপন্থিদের কারচুপিকে রোধ করবে। (মুকাদ্দামা; আত্তামহীদ লি ইবনে আব্দিল বার; ১/৫৯)

অর্থাৎ উলামাদের আরেকটি দায়িত্ব হলোঃ কেউ যদি ইসলামের ক্ষতি করতে আসে, ইসলামের নামে কেউ কোন কিছুর ভুল প্রচার করে বা ইসলামের কোন বিষয় ভুল ব্যাখ্যা করে, তাহলে এই ভুল যে ব্যক্তি করলো তাকে বলতে হবে যে, তার এই কাজ ভুল। সে যেন এ ভুল কথা/কাজ থেকে ফিরে আসে এবং জনগণকে জানিয়ে দেয় যে, আমার অমূক কথাটি ভুল ছিলো।

সহীহ কথা এরূপ- এটাকে বলা হয় ‘রুজু’ করা। তাকে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পরেও যদি সে ব্যক্তি ‘রুজু’ না করে, তাহলে জনগণকে ঐ ব্যক্তির ভুলের ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। স্পষ্ট জানিয়ে দিতে হবে এটা ইসলামের পরিপন্থি, এটা সঠিক না। জনসাধারণকে তাদের ঈমান-আমল হিফাযতের নিমিত্তে এ সতর্কীকরণ উলামায়ে কেরামের জন্য জরুরী।

এ হাদীসের ব্যাখ্যা এটাই যে, যারা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির শিকার, তাদের প্রতিহত করা উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। তাদের ভুল ব্যাখ্যা, ভুল তাফসীরের ব্যাপারে জনগনকেও জানিয়ে দেয়া উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। এই সতর্কীকরণ গীবতের অন্তর্ভূক্ত নয়। এ কারণেই উলামায়ে কেরাম কুরআন-হাদীসের অপব্যাখ্যাকারী শিয়া এবং কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি জনসাধারণকে জানিয়ে থাকেন।

আল্লামা তাহির আল বুখারী রহ. তার ফাতাওয়া গ্রন্থ “খুলাসাতুল ফাতাওয়া”-তে লিখেছেন- “আন নাওয়াযিল”-এ নাসির রহ. [বলখের বিখ্যাত হানাফী ফকীহ]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে, একজন ব্যক্তি অপর আরেকজন ব্যক্তির নিকট যে কিনা বাতিল আকিদা বিশ্বাস লালনা করে, এই নিয়তে যাতায়াত করে যেন তাকে তার গলদি (ভুল) থেকে বের করে আনতে পারে এবং এই গমনাগমনকারী ব্যক্তি সুপরিচিত এবং ঐ সমস্ত লোকদের অন্তর্ভূক্ত যাদেরকে অনুসরণ করা হয়; (উত্তরে তিনি জানান) সেক্ষেত্রে এমন ব্যক্তির জন্য এরূপ (বাতিল আকীদার) লোকদের নিকট গমনাগমন পছন্দনীয় নয়। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৩৫)

হানাফীর প্রসিদ্ধ ফকীহ আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. (মুত্যু: ৯৭০ হিঃ) তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল আশবাহ ওয়ান নাযায়ির”-তে ইমাম আবু হানিফা রহ. কর্তৃক তাঁর প্রিয় শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কে উপদেশ বর্ণিত হয়েছে-

যখন তুমি বুঝবে যে, কোনো ব্যক্তি [দীনী বিষয় ব্যতিত] দোষী, তখন এটি কারো সামনে উল্লেখ করো না। বরং তার জন্য ভালো কামনা কর এবং দীনী কোনো ব্যাপার ছাড়া তার অন্য বিষয়ে তার ভালো গুনসমূহ মানুষের সামনে বর্ণনা কর। কিন্তু তুমি যদি বুঝতে পারো যে, তিনি দীনী ব্যাপারে কোনো গলদ কাজের সাথে জড়িত (যেমন যদি তার কোনো কুফরী আকিদা থাকে) তাহলে তার ব্যাপারটি তুমি মানুষের নিকট জানাও, যাতে মানুষ তাকে অনুসরন না করে এবং তার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে পারে। [আল আশবাহ ওয়ান নাযায়ির; ২/৭১২)

কাজেই উলামায়ে কেরামের জন্য মাওলানা সা‘আদ সাহেবের ভুলসমূহ উম্মাতের সামনে স্পস্ট করে তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া দীনী দৃষ্টিকোণ থেকেই আবশ্যক।

উলামায়ে কেরাম মাওলানা সা‘আদ সাহেবের বিরোধিতা কেন করছেন?

বর্তমানে উলামায়ে কেরাম বিশেষ করে উলামায়ে দেওবন্দ মাওলানা সা‘আদ সাহেবের অপব্যাখ্যার ভুল ধরছেন এবং তাকে জনসম্মুখে ভুল স্বীকার করে রুজু করতে বলেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, তিনি দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও এ কাজটি করছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে উলামায়ে কেরাম দীনী দায়িত্ব পালনার্থে এবং সাধারণ মুসলমানদের ঈমান রক্ষার্থে তার অপব্যাখ্যাগুলো সঠিক ব্যাখ্যা সহকারে জনগণের সামনে পেশ করেছেন।

এটা উলামায়ে কেরাম তাদের দীনী দায়িত্বের কারণেই করেছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, মাওলানা সা‘আদ সাহেবের অনুসারীরা এটাকে গীবত মনে করছে। তার ভক্তরা বলে বেড়াচ্ছে যে, “উলামাদের তেল বেশী হয়ে গেছে। আমরা যেহেতু রমযানে মাদরাসায় চাঁদা দেইনি, তাহলে মাদরাসা চলে কিভাবে? নিশ্চয়ই ইহুদীরা টাকা দিয়েছে, নাউযুবিল্লাহ!”

এই যে উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে সা‘আদ সাহেবের অনুসারীরা বিদ্বেষমূলক কথাগুলো বলে বেড়াচ্ছে, এটা কি কোন দীনী কাজ? এর দ্বারা কি দীনের কোনো উপকার হচ্ছে? কখনোই না। সত্যিকার অর্থে এটাই গীবত। এই কথাগুলো যারা বলছে, গীবত ও ফেতনা সৃষ্টি করার কারণে তাদের ঈমানের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। তাদের তাওবা করে সঠিক রাস্তায় ফিরে আসা উচিৎ।

উলামাদের সতর্কীকরণ গীবতের অন্তর্ভূক্ত নয়

আমরা উলামারা যা বলছি এগুলো দীনের স্বার্থে। জনগণের ঈমান হেফাজতের জন্য বলছি। আমাদের উদ্দেশ্য নিম্নোক্ত আয়াত এবং হাদীসের উপর আমল করা।–মিশকাত

إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

নিজ সাধ্যমত সংস্কার করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই। আর আমি যা কিছু করতে পারি, তা কেবল আল্লাহর সাহায্যেই পারি। (সূরা হুদ; আয়াত ৮৮)

يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله ينفون عنه تحريف الغالين وتأويل الجالين وانتحال المبطلين

এই ইলম (কুরআন-হাদীস) কে ধারণ করবে, প্রত্যেক উত্তরসূরীদের মধ্যে হতে ঐ সকল (উলামায়ে কেরাম), যারা আস্থাভাজন হিসাবে স্বীকৃত। তারা এ ইলম থেকে বাড়াবাড়ির শিকার ব্যক্তিদের বিকৃতিসাধন, অজ্ঞদের অপব্যাখ্যা এবং বাতিলপন্থীদের কারচুপিকে রোধ করবে। (মুকাদ্দামা; আত্তামহীদ লি ইবনে আব্দিল বার; ১/৫৯)

কাজেই মাওলানা সা‘আদ সাহেবের ভুল ব্যাখ্যার ব্যাপারে জনগণকে সাবধান করা গীবতের অন্তর্ভূক্ত নয়। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ফেরাউন, কারুন, আবু লাহাব, আবু যাহেলের নিন্দা কেন করেছেন? তাহলে কি আল্লাহ গীবত করেছেন, নাউযুবিল্লাহ।

আল্লাহতো আমাদেরকে ঈমান শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং কুফর থেকে বাঁচানোর জন্য এই সমস্ত ঘটনা বর্ননা করেছেন। বতর্মানেও উলামায়ে কেরাম মুসলমানদের ঈমান হেফাজতের জন্য, ঈমান রক্ষা করার জন্য কুরআন-হাদীসের আলোকে সা‘আদ সাহেবের ভুলগুলো শুধরানো ও জনসাধারণকে অবহিত করতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাওলানা সা‘আদ সাহেবের সাথে উলামায়ে কেরামের ব্যক্তিগত কোন দুষমনি বা শত্রুতা নেই। তার খান্দান অনেক উঁচু খান্দান। লাখো লোক তার খান্দানের মাধ্যমে হিদায়াত পেয়েছেন। এর অর্থ এই না যে, তার খান্দানের সকল লোকই সুনিশ্চিতভাবে কেয়ামত পর্যন্ত হকের উপর থাকবেন এবং সঠিক কিংবা ভুল-যাই তারা বলবেন, তা আমাদের মানতে হবে..!

হযরত নূহ আ. এর ছেলে কাফের ছিলো, ইবরাহীম আ. এর পিতা কাফের ছিলো, নবীর খান্দানের হওয়া সত্ত্বেও তারা হক ছিলো না। ঠিক তেমনি মাওলানা সা‘আদ সাহেবের খান্দান অনেক উঁচু, কিন্তু দীনের ব্যাপারে তার দেয়া ব্যাখ্যা অনেক হক্কানী আলেমের কাছে সহীহ প্রমাণিত হয়নি। কাজেই তিনিও বর্তমানে হকের উপর নেই।

দু’চারজন নামধারী আলেম আছে, যারা সা‘আদ সাহেবের পক্ষে কথা বলছে। এরা কারা? যাঁচাই করে দেখা গেছে এরা এক যমানায় কাকরাইলের সাথে সম্পর্ক রাখতো। এখন নেই। কারণ তাদের কু-কর্মের কারণে কাকরাইল থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কাকরাইলে যখন কোন আরব মেহমান আসতো, ছলে-বলে তাদেরকে নিজেদের সাথে নিয়ে গিয়ে এই নামধারী আলেমরা আরব মেহমানদের থেকে চাঁদা কালেকশন করতো। কাকরাইলের মুরুব্বিরা যখন জানতে পারলেন তখন এই নামধারী আলেমদের কাকরাইল থেকে বের করে দিলেন।

এই বহিষ্কৃত লেবাসধারী আলেমরাই এখন মাওলানা সা‘আদ সাহেবের ভুলগুলোর পক্ষে সাফাই গাইছে। এই লেবাসধারী আলেমদের যথেষ্ট ইলমও নেই। তাই এদের কথা না শুনে শীর্ষস্থানীয় আলেমরা কি বলে তা শুনতে হবে। দারুল উলুম দেওবন্দ কি বলে তা শুনতে হবে। যতদিন তিনি দারুল উলূমের আস্থা অর্জন করতে না পারবেন, ততদিন আমরা এই ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করতে থাকবো, যেন তার ভুল ব্যাখ্যার দরুন কেউ গোমরাহ না হয়।

এ সতর্কীকরণ আমাদের দায়িত্ব। এ দায়িত্বকে ‘গীবত’ বলে মিথ্যা প্রচারণা করা অত্যান্ত দুঃখজনক। মনে রাখতে হবে, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রাণপুরুষ মাওলানা ইলয়াস রহ .বলেন,

“একজন সাধারণ মুসলমান সম্পর্কেও কোন কারণ ছাড়া বদগুমানী (খারাপ ধারণা পোষণ করা)

নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করে। আর উলামায়ে কেরামের উপর প্রশ্ন উত্থাপন (বদগুমানী করা) তো এর চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক ও ভয়ংকর’।

এরপর বলেন, ‘আমাদের তাবলীগের এই তরীকায় মুসলমানকে ইজ্জত করা এবং উলামায়ে কেরামকে ইহতিরাম করা বুনিয়াদী এবং মৌলিক বিষয়। প্রত্যেক মুসলমানকে ইসলামের কারণে ইজ্জত করতে হবে। আর উলামায়ে কেরামকে ইলমে দীনের কারণে অত্যন্ত সম্মান করা কর্তব্য’।

এরপর বলেন, ‘ইলম এবং যিকিরের কাজ এখনও আমাদের মুবাল্লিগদের আয়ত্তে আসেনি। এটা নিয়ে আমার খুব চিন্তা হয়। আর এর তরীকা এটাই যে, এই সাথীদেরকে আহলে ইলম এবং আহলে যিকিরগণের নিকট পাঠানো হবে যেন এরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে তাবলীগও করে এবং তাঁদের ইলম ও সাহচর্য দ্বারা উপকৃতও হয়’। [মাওলানা মনযূর নোমানী কৃত মালফূযাতে মাওলানা ইলয়াস; মালফূয নং ৫৪]

হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.বলেন, যে ব্যক্তি উলামাদের সঙ্গে বিদ্বেষ রাখে, কবরের মধ্যে তার চেহারা কেবলার দিক থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। যদি বিশ্বাস না হয়, কবর খুঁড়ে দেখে নিও!

সা‘আদ সাহেবের ভুলসমূহ

মাওলানা সা‘আদ সাহেবের প্রতি উলামায়ে কেরামের আস্থা না থাকার মৌলিক কারণ তিনটিঃ

১. দীনের বিভিন্ন বিষয়ের মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।

২. তাবলীগের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তাবলীগ ব্যতীত দীনের অন্যান্য মেহনতকে (যেমন, মাদরাসা শিক্ষা, খানকাহ, ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদি) হেয় এবং গুরুত্বহীন সাব্যস্ত করা।

৩. পূর্ববর্তী মুরব্বীদের কাজের উসূল থেকে সরে যাওয়া।

দীনের বিভিন্ন বিষয়ের মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রসঙ্গ

তার অপব্যাখ্যার একটি দৃষ্টান্ত হলো যে, তিনি বলেছেন, ہدایت اگر اللہ کے ہاتھ میں ہوتی تو اللہ تعالیٰ نے نبیوں کو کیوں بھیجا؟

হিদায়াত যদি আল্লাহর হাতেই থাকতো, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা নবীদেরকে পাঠালেন কেন!

অর্থাৎ তিনি বলতে চাচ্ছেন যে, হিদায়াত আল্লাহর হাতে নেই; বরং নবীদের হাতে! প্রশ্ন হলো, হিদায়াত যদি নবীর হাতে হয়, তবে নবীজী কেনো তার চাচা আবু তালেবকে হিদায়াত দিয়ে ইসলামে দীক্ষিত করতে পারলেন না? হযরত নূহ আ. কেন নিজ সন্তানকে হিদায়াত দিতে পারলেন না? হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আ. কেন নিজ পিতাকে হিদায়াত দিতে পারলেন না..?

তাবলীগ ব্যতীত দীনের অন্যান্য মেহনতকে (যেমন, মাদরাসা শিক্ষা, খানকা, ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদি) গুরুত্বহীন প্রমাণ প্রসঙ্গ

১. দীনের অন্যান্য মেহনতের প্রতি তার অবজ্ঞার একটি দৃষ্টান্ত হলো, তিনি বলেন, মসজিদ ভিত্তিক যে দীনী কাজ হয়ে থাকে, শুধুমাত্র এটাই দীনের আসল মেহনত। এর বাইরে দীনের নামে যত মেহনত চলছে, সবই মানুষের বানানো মেহনত।

প্রশ্ন হলো, তিনি যে নিজে নিজামুদ্দীন মাদরাসায় পড়েছেন- তা কি বেকার ছিলো? প্রত্যেক বড় বড় তাবলীগী মারকাযের সাথে মাদরাসা শিক্ষা চালু আছে, এগুলো কি বানোয়াট মেহনত?

২. দীনের অন্যান্য মেহনতের প্রতি তার অবজ্ঞার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, তিনি বলেন,

اجرت لیکر قرآن پاک پڑھانا فاحشہ عورت کی اجرت کے مانند ہے، فاحشہ عورت ان سے پہلے جنت میں چلی جاوے گی۔

কুরআন পড়িয়ে বিনিময় নেয়া পতিতার বিনিময়ের মতো। এমন লোকের আগে পতিতারা জান্নাতে যাবে।

অর্থাৎ যে সমস্ত আলেম দীনি খেদমত করে বেতন নেয়, ঐ আলেমরা যিনাকারিনীর আগে জাহান্নামে যাবে। এই কথাটা হাদীসে আছে সত্য। কিন্তু এই হাদীসের তাফসীর কী, তা বুঝতে হলে ইলম লাগবে। উনি যে ব্যাখ্যা করেছেন তা ভুল। কেননা, এই হাদীস কেবল বেআমল আলেমদের ব্যাপারে বলা হয়েছে অর্থাৎ যাদের কোন আমলতো নেই, আবার হালাল-হারামের যাঁচাই-বাঁছাই না করে নাজায়েয ভাবে পয়সা নেয়। যারা দীন বিক্রি করে দুনিয়া কামাই করে।

একটা উদাহরণ দিচ্ছি।

যেমন: মূর্দারের জন্য কুরআন খতম করে টাকা নেয়া হারাম। এখন কোন আলেম যদি এমন কাজ করে তাহলে এমন আলেমদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে, যিনাকারীরা এই শ্রেণীর আলেমদের আগে বেহেশতে যাবে।

এটা হলো হাদীসের সঠিক ব্য্যাখ্যা। এখন এই হাদীসটি যদি সাধারণদের মজমায় বলা হয় (টঙ্গির ময়দানে বলা হয়) এবং এর সঠিক ব্যাখ্যা না করে দেয়া যে, আলেম বলতে কোন শ্রেণীর আলেমের কথা বলা হয়েছে, তাহলে কি এটা ফিতনা সৃষ্টি করা হলো না?

সাধারণ মানুষ ভেবে নিবে আমাদের সব আলেমরাইতো বিনিময় নিচ্ছে। ইমামতি করে, মুয়াজ্জিন হয়ে, মাদরাসায় পড়িয়ে। কাজেই সবাই এ হাদীসের অন্তর্ভূক্ত। তাদের আগে পতিতারা জান্নাতে যাবে..! (নাউযুবিল্লাহ)

মাওলানা সা‘আদ সাহেব প্রথমতঃ এ হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন যে, তিনি হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেননি। যদ্দরুণ সাধারণ শ্রোতা এখন এমন মনে করছে যে, যে সকল উলামায়ে কেরাম মাদরাসায় দীনী খেদমত করে বেতন নিচ্ছেন, তারাও এ হাদীসের অন্তর্ভূক্ত..! (নাউযুবিল্লাহ)

দ্বিতীয়তঃ এ হাদীসটি উলামাদের খাস মজলিসে বলার হাদীস, কিন্তু তিনি সেখানে না বলে এ হাদীস জনসাধারণের আম মজমার মধ্যে বলেছেন, যা একেবারেই নির্বুদ্ধিতা কিংবা উলামায়ে কেরামের প্রতি সুস্পষ্ট বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ!

মাওলানা সা‘আদ সাহেবের এ জাতীয় বক্তব্যের কারণে এখন, তাবলীগের মেহনতের দ্বারা জনগণ উলামা বিদ্বেষী হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়; বরং উলামাদের গালী দেনেওয়ালা, উলামাদের ভুল ধরনেওয়ালা, উলামাদের জামার কলার ধরে মারনেওয়ালা লোক পয়দা হচ্ছে।

৩. দীনের অন্যান্য মেহনতের প্রতি তার অবজ্ঞার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, তিনি বলেন,

جو دعوت میں لگ کر بھی اپنی اصلاح کے لئے کسی بزرگ کی صحبت کی ضرورت محسوس کر رہاہے اس نے دعوت کو سمجھا ہی نہیں۔

‘‘লোকেরা প্রশ্ন করে, তোমার ইসলাহী সম্পর্ক কার সাথে? তোমরা তাদের বলবে, আমার ইসলাহী সম্পর্ক দাওয়াতের সাথে। যে ব্যক্তি দাওয়াতের কাজে জুড়ে থেকেও নিজের ইসলাহের জন্য কোনো বুযর্গের সোহবতের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, সে দাওয়াতের কাজ বোঝেইনি

আশ্চর্যের বিষয় হলো, একদিকে তিনি আত্মশুদ্ধিকে পৃথক নববী কাজ হিসাবে মানতে চাইছেন না, যা অপব্যাখ্যার শামিল। অপরদিকে নিজে অন্যদের আত্মশুদ্ধির আজীব পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন! তার কাছে যে বায়আত হতে আসে, তার হাত নিজের হাতে রেখে তাকে বলতে বলেন, “বলো আমি অমুকের কাছে হাত রেখে, মাওলানা ইলয়াস রহ. এর নিকট বায়আত হলাম”।

বায়াত করাচ্ছেন যিন্দা লোক, আর মুরীদ হচ্ছেন মূর্দা লোকের হাতে। যিনি শতবছর আগে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। চৌদ্দশত বছরে এমন আযীব বায়আত কেউ করেননি। কেননা, আপনারা আমার হাতে বায়আত হলেন, কিন্তু মুরীদ হলেন খাযা মাঈনুদ্দিন চিশতী রহ. এর। এটা কী সম্ভব?

তিনি কবর থেকে আপনাদের সবক দিবেন কিভাবে? আপনাদের আত্মসংশোধন করবেন কিভাবে? মৃত মানুষ কারো উপকার কিংবা অপকার করতে পারে-এমন আকীদা-বিশ্বাস রাখা তো স্পষ্ট শিরক! কাজেই বায়আতের এ আজীব তরীকা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং তার মনগড়া!

মনে রাখতে হবে যে, নবী আ. উলামাদের জন্য যে ৪ কাজ রেখে গেছেন তার প্রত্যেকটা জরুরী। চারটা কাজকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন: দুনিয়াবী শিক্ষার লাইনে- প্রাইমারী স্কুল জরুরী, হাইস্কুল জরুরী, কলেজ জরুরী, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ও জরুরী। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা যদি মনে করেন যে, ‘প্রাইমারীতে কোন লেখা-পড়াই হয় না, কাজেই এটার দরকার নাই’, তাহলে দুনিয়াবী শিক্ষাই বন্ধ হয়ে যাবে।

ঠিক তেমনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ৪ কাজ রেখে গেছেন, তার কোনটিকে গুরুত্বহীন প্রকাশ করলে, কিংবা কম গুরুত্ব দিলে দীন মিটে যাবে। একজন আলেম যখন কথা বলবেন তখন চারটি বিষয়েই কথা বলবেন। আমাদের সকলের দায়িত্ব এই ৪ বিষয়ে ইলম হাসিল করা এবং একই সাথে এই ৪ কাজ করা।

তা‘লীমে কিতাব তথা আল্লাহর দেয়া হুকুম আহকাম জানা। তা‘লীমে সুন্নাহ তথা আল্লাহর হুকুম পুরা করার জন্য হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সুন্নাত বলে গেছেন, তা শিখে আমল করা। তাবলীগ তথা অন্যদের নিকট আল্লাহর হুকুম এবং নবীজির তরীকা পৌঁছে দেওয়া। এর পাশাপাশি তাযকিয়া তথা হক্কানী আল্লাহওয়ালা পীর-মাশায়েখের কাছে গিয়ে অন্তরের দশটি রোগ দূর করে আত্মশুদ্ধি করা।

এই চারটা যখন এক সাথে হবে, তখন একজন মানুষ পরিপূর্ণ দীনদার হবে। এর একটাও যদি বাদ যায়, তাহলে কারো পক্ষে পরিপূর্ণ দীনদার হওয়া সম্ভব না। আর দীনের সাথে এ আংশিক সম্পৃক্ততার মুহুর্তে কেউ যদি দীনের ব্যাখ্যা করতে যায়, তবে এ ব্যাখ্যা হবে প্রান্তিকতাপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ।

যেমন: ছয় অন্ধ ব্যক্তি হাতি দেখে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে ঠিক তেমন। যাদের কারোটাই সহীহ হয়নি। ঠিক তেমনি কেউ যদি ৪টা কাজের কোন একটা বাদ দিয়ে বা গুরুত্বহীন প্রমাণ করে দীনের ব্যাখ্যা দেয়, তবে তার ব্যাখ্যাও হবে এই অন্ধদের হাতি দেখার মতো।

অন্ধদের বয়ান দ্বারা যেমন হাতির পরিপূর্ণ ছবি মানস্পটে চিত্রায়িত করা সম্ভব নয়। তেমনি তা‘লীমে কিতাব, তা‘লীমে সুন্নাহ, দাওয়াত ও তাযকিয়া তথা নববী দায়িত্ব চার কাজের সাথে সম্পৃক্ত নয়-এমন ব্যক্তির বয়ান দ্বারাও দীনের পরিপূর্ণ সমঝ অর্জন করা সম্ভব নয়। সে বয়ান দ্বারা শ্রোতা হিদায়াত তো কখনোই পাবে না; উপরন্তু গোমরাহ হবে!

মাওলানা সা‘আদ সাহেব কেবল দাওয়াতকে এমন জোর দিয়েছেন যে, দীনের অন্যান্য মেহনত সব জবাই হয়ে গেছে। মাদরাসার দীনী শিক্ষার মেহনত জবাই হয়ে গেছে, খানকার আত্মশুদ্ধির মেহনত জবাই হয়ে গেছে, ওয়াজ-মাহফিলে বয়ানের মেহনতও জবাই হয়ে গেছে। এভাবে কখনো মানুষের জীবনে হিদায়াত আসবে না; বরং মানুষ উলামা বিদ্বেষী হয়ে দীন থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাবে।

অথচ দাওয়াত ও তাবলীগের প্রাণপুরুষ মাওলানা ইলয়াস রহ. এর মেহনত দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলো, জনসাধারণকে উলামায়ে কেরামের সাথে জুড়ে দেওয়া। হযরতজী স্বয়ং ইরশাদ ফরমান:

فرمایا: اپنی اس تحریک کے ذریعہ ہر جگہ کے علماءاور اہل دین اور دنیا داروں میں میل ملاپ اور صلح وآشتی کرانا چاہتے ہیں۔

“আমি এই ‘তাহরীকের’ মাধ্যমে প্রত্যেক জায়গায় উলামায়েকেরাম ও বুযুর্গানে দীন এবং দুনিয়াদারদের মাঝে মেলামেশা ও সৌহার্দ্য ভালবাসা ও সম্পৃীতি সৃষ্টি করতে চাই। [মালফুযাত ১০২ নং মালফুয]

সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী রহ. বলেন, “মাওলানা [ইলয়াস রহ.] একদিকে উলামায়ে কেরামকে দাওয়াতের মাধ্যমে আওয়ামের কাছে যাওয়ার এবং আওয়ামের প্রতি দরদী হওয়ার তাগিদ করতেন। অন্যদিকে আওয়ামকে উদ্বুদ্ধ করতেন, যেন তারা উলামায়ে কেরামের কদর ও মর্যাদা বুঝে এবং উসূল ও আদব রক্ষা করে তাঁদের খেদমতে হাজির হয় এবং প্রয়োজনীয় ইলম হাসিল করে। তাদেরকে তিনি উলামায়ে কেরামের যিয়ারত ও মুলাকাতের সাওয়াব এবং তাঁদের খেদমতে হাজির হওয়ার উসূল-আদব শেখাতেন।

উলামায়ে কেরামকে দাওয়াত দেওয়ার, তাঁদের থেকে ফায়দা হাসিল করার এবং তাঁদেরকে কাজে যুক্ত করার হিকমত ও পদ্ধতি বলতেন। উলামায়ে কেরামের কোন কথা বা কাজ বুঝে না এলে এর সুব্যাখ্যা গ্রহণ এবং সুধারণা পোষণের অভ্যাস তাদের মাঝে গড়ে তুলতেন। তাদেরকে তিনি উলামায়ে কেরামের খেদমতে পাঠাতেন এবং ফিরে আসার পর অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেন যে, কীভাবে গিয়েছ? কী করেছ? কী বলেছ? (ইত্যাদি। অতঃপর প্রয়োজনে) তাদের (আপত্তিকর) সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সংশোধন করতেন।

এভাবে কারবারী শ্রেণীকেও উলামায়ে কেরামের এত কাছে নিয়ে এসেছিলেন যে, বিগত বহু বছরে (সম্ভবত খেলাফত আন্দোলনের পরে) এমনটি কখনো দেখা যায়নি। [সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী কৃত গ্রন্থ ‘মাওলানা ইলয়াস আওর উনকী দীনী দাওয়াত: পৃ. ১২৩]

দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতে কি কেবল দাওয়াত দেয়া উদ্দেশ্য? নাকি দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসে তা‘লীম দেয়া উদ্দেশ্য? দাওয়াত দিয়ে মসজিদে এনে তাকে কি আবার দাওয়াত দিবো, নাকি তাকে তা‘লীম দিবো? মসজিদে এনে তাকে তা‘লীম দিবো। তা‘লীম দিয়ে তার কালিমা ঠিক করবো, তার ফাতিহা ঠিক করবো, তার নামাযের রুকু সিজদা ঠিক করবো। তাহলে উদ্দেশ্য কি দাওয়াত না তা‘লীম? নিঃসন্দেহে তা‘লীম। যদি তা‘লীম না-ই থাকে, তাহলে দাওয়াত দিয়ে এনে কী করবো? এভাবে কি শুধু দাওয়াতের দ্বারা দীন টিকবে, যদি তা‘লীম না থাকে?

এ কারণেই মাওলানা ইলয়াস রহ. মেওয়াতীদের প্রতি লেখা এক চিঠিতে লেখেন, “মেরে দোস্তো! তোমাদের (আল্লাহর পথে) বের হওয়ার খোলাসা তিন জিনিসকে যিন্দা করা; যিকির, তা‘লীম এবং তাবলীগ। অর্থাৎ তাবলীগের জন্য বের হওয়া যেন তাদেরকে যিকির এবং তা‘লীমের প্রতি আরও বেশি গুরুত্ববান করে। [‏সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী রহ.কৃত ‘মাকাতিবে হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ.; পৃ.১৩৮, মেওয়াতীদের প্রতি লিখিত ১ নং চিঠি]

হজরতজী আরো ইরশাদ ফরমান; ‘আমাদের এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হল; সমস্ত মুসলমানদেরকে جميع ما جاء به النبي صلى الله عليه وسلم শেখানো (অর্থাৎ ইসলামের পুরা ইলমী এবং আমলী নেযামের সাথে উম্মতকে সম্পর্কযুক্ত করে দেওয়া।) এটা তো হল আমাদের মূল উদ্দেশ্য’।

এরপর হযরত বলেন, رہی قافلوں کی یہ چلت پھرتاور تبلیغی گشت سو یہ اس مقصد کے لئے ابتدائی ذریعہ ہے، اور کلمہ نماز کی تلقین و تعلیم گویا ہمارے پورے نصاب کی “الف بے تے ” ہے۔

বাকি রইল জামাতের চলাফেরা এবং গাশত করা এটা তো হল মূল মাকসাদে পৌঁছার একটি প্রাথমিক স্তর। আর কালিমা এবং নামায শিক্ষা সেটা হল আমাদের পুরা নেসাবের আলিফ, বা, তা-এর শিক্ষা করার মত’।

তিনি আরো বলেন, ‘আর এটাও পরিস্কার কথা যে, আমাদের এই কাফেলা সম্পূর্ণ কাজ করতে পারবে না। বরঞ্চ তাদের থেকে এতুটুকুই হতে পারে যে, সব জায়গায় গিয়ে নিজেদের চেষ্টা-মেহনতের মাধ্যমে উম্মতের মাঝে একটি আলোড়ন ও চেতনা সৃষ্টি করে দিবে এবং সমাজের উদাসীন (তথা দীন সম্পর্কে বেখবর) লোকদেরকে সেখানকার স্থানীয় দীনদার লোকদের সাথে সম্পর্ক করে দিবে। এবং দীন ও ইসলাম নিয়ে চিন্তা ফিকিরকারী স্থানীয় উলামায়ে কেরাম এবং নেককার লোকদেরকে সাধারণ মানুষের ইসলাহ ও সংশোধনের কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে..।’ মাওলানা মনযূর নো‘মানী কৃত ‘মালফূযাতে হযরত মাওলানা ইলয়াস; মালফূয নং২৪]

পূর্ববর্তী মুরব্বীদের কাজের উসূল থেকে সরে যাওয়া প্রসঙ্গ

‘পূর্ববর্তী মুরব্বীদের কাজের উসূল থেকে সরে যাওয়া’ প্রসঙ্গে দৃষ্টান্ত হলো, মাওলানা সা‘আদ সাহেব দাওয়াত ও তাবলীগের মধ্যে মনগড়া নতুনত্ব সৃষ্টি করেছেন। আগে ছিলো আড়াই ঘন্টার মেহনত হবে। ঘরে ঘরে গিয়ে দাওয়াত দেয়া হবে। কিন্তু উনি তা পাল্টে দিয়ে নতুন এনেছেন দাওয়াত, তালীম, ইস্তেকবাল। যারা বাহিরে ঘুরাফেরা করে, তাদেরকেই শুধু দাওয়াত দেয়া।

উনি ফাতাওয়া দিয়েছেন যে, ঘরে ঘরে গিয়ে নাকি দাওয়াত দেয়া ঠিক নয়! অথচ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের ঘরে, মজলিসে, বাজারে গিয়ে গিয়ে দাওয়াত দিতেন!

মুন্তাখাবে হাদীস কিতাবটি তৈরি করেছেন হযরতজি মাওলানা ইউসুফ রহ.। যিনি দাওয়াত ও তাবলীগের দ্বিতীয় হযরতজী। এই কিতাব হাদীসের কিতাব। খুব ভালো কিতাব। কিন্তু ইউসুফ রহ. নিজে এই কিতাব লিপিবদ্ধ করার পরেও তিনি এই কিতাবকে সাধারণদের জন্য পাঠ উপযোগী মনে করেননি।

অথচ মাওলানা সা‘আদ সাহেব এই কিতাবের তরজমা করিয়ে জনসাধারণের জন্য পাঠ্য সাব্যস্ত করেছেন। যদ্দরুন সাধারণ মানুষ হাদীস পড়ে পড়ে নিজে নিজে মাসআলা বের করে এবং দীনের বিভিন্ন কাজের মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। এমনকি উলামায়ে কেরামকেও অজ্ঞ ভাবতে আরম্ভ করে..!

মাওলানা সা‘আদ সাহেবের বিভ্রান্তির সূচনা

সা‘আদ সাহেবের প্রতি উল্লিখিত তিনটি কারণেই উলামায়ে কেরাম তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। এই ভুলগুলো আরো আগে থেকে উলামাদের বলা উচিৎ ছিলো, কেননা এই ভুলগুলো তিনি অনেক আগে থেকে করে আসছেন। কিন্তু ইজতিমার ময়দানে যারা তার বয়ানের তরজমা করার দায়িত্বে থাকতো, তারা হেকমতের সাথে তার এই ভুল ব্যাখ্যার তরজমা করতো না; বরং এড়িয়ে যেত।

আমি নিজে সরাসরি কাকরাইলের মুরব্বীদেরকে জিজ্ঞেস করেছি। আপনারা তার ভুলগুলো কি করতেন? তরজমা যিনি করেন, তিনি উত্তর দিয়েছেন, ‘আমরা তার ভুলগুলো সাধারণদের মজমায় তরজমা করতাম না। আমরা শুধু সঠিক অংশটুকু বলে দিতাম, গলদ অংশের তরজমা করতাম না।’

কিন্তু কাকরাইলের উলামায়ে কেরামসহ ভারত, পাকিস্তান, আরব ও বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামের বৃহৎ অংশ এখন মাওলানা সা‘আদ সাহেবের বিরুদ্ধে এই জন্য রূখে দাঁড়িয়েছেন যে, এখন তাকে ইসলাহ করার জন্য সরাসরি দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ফতোয়া দেয়া হয়েছে যে, আপনার এই এই ভুল আছে।

আপনার প্রথম ভুল হলো মনগড়া তাফসীর করা। আপনার দ্বিতীয় ভুল হলো, আপনি যে বয়ান করেন এর মধ্যে দাওয়াত ছাড়া দীনের অন্যান্য কাজগুলোর ক্ষতি হয়, আপনি জনসাধারণের সামনে দীনের অন্য কাজগুলোকে খাটো করে দেখান। আপনার তৃতীয় ভুল হলো, আপনি আগের তিন মুরুব্বির কাজকে পাল্টে দিয়ে নিজের মনের মতো এই কাজকে ভুল পথে চালাচ্ছেন।

What's your reaction?

সোশ্যাল কমেন্ট এখনো চালু হয়নি — পাশের “সাইট কমেন্ট” ট্যাবে মতামত দিন।