আল-ওয়ালা ওয়াল বারা : কারও সাথে বন্ধুত্ব ও সম্পর্কচ্ছেদের বিধান
মুসলমানদের জন্য একটি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো, ঈমানের ভিত্তিতে কারও সাথে বন্ধুত্ব করা এবং সম্পর্কচ্ছেদ করা। অথচ অনেক মুসলিম ভাই তা জানেই না।
কারও সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব হবে ঈমানের ভিত্তিতে, সম্পর্ক ছিন্ন হবে ঈমানের ভিত্তিতে। অমুসলিমদের কাছে ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ধর্ম, বর্ণ, বংশ, ভাষা ও রাজনৈতিক দল ইত্যাদি বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে জাতীয়তা নির্ধারিত হয়, আর এই জাতীয়তাই তাদের কাছে বন্ধুত্ব ও সম্পর্কচ্ছেদ এবং পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার মানদণ্ড হয়ে থাকে।
কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটা জাহিলিয়াত। কেননা, ইসলাম বলে, সকল মুমিন এক জাতি, তারা যে শ্রেণি-পেশারই হোক, যে বংশেরই হোক, যে দেশেরই হোক, যে ভাষারই হোক। ইসলামের শিক্ষায় বন্ধুত্ব ও সম্পর্কচ্ছেদের মানদণ্ড ঈমান। আর পরস্পর সহযোগিতার মানদণ্ড ভালো কাজ ও খোদাভীরুতা।
মনে রাখতে হবে, মুমিন ও বিশ্বাসীদের বন্ধু আল্লাহ তাআলা। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদের বন্ধু, যারা ঈমান আনে।’সূরা বাকারা (২) : ২৫৭
তো যেই বিশ্বাসীর বন্ধু আল্লাহ তাআলা, সেই বিশ্বাসীর বন্ধু খোদ আল্লাহকে অবিশ্বাসকারী কীভাবে হতে পারে? কাজেই অবিশ্বাসী ও কাফেররা কখনো মুমিনের বন্ধু হতে পারে না।
সুতরাং মুমিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু মুমিন। যার ঈমান নেই, তার সাথে কোনো মুমিনের অন্তরঙ্গতা হতে পারে না, সে আন্তরিক বন্ধু হতে পারে না। কাফের ও অমুসলিমদের সাথে এরূপ সম্পর্ক স্থাপন মারাত্মক গুনাহ; বরং কুফরের প্রতি মুগ্ধ হয়ে কাফেরকে বন্ধু বানানো ঈমান ভঙ্গের কারণ ও নিঃসন্দেহে কুফর।
আবার সহীহ বুখারীর হাদীসে এসেছে, ‘কেউ যদি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে (অন্যায়ভাবে) হত্যা করে, তাহলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯১৪)
বলাবাহুল্য, কারও সাথে সম্পর্কচ্ছেদের অর্থ তার ওপর জুলুম করা নয়, বিপদগ্রস্ত হলে সহযোগিতার হাত না বাড়ানো নয় এবং তাকে মাজলুম অবস্থায় দেখে চুপ থাকা নয়; বরং সামর্থ্য থাকলে বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা এবং জুলুম থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসতে হবে। কাজেই এ বিষয়ে বিধান জানা জরুরি।
অমুসলিম ও কাফেরদের সাথে সম্পর্ক ও আচরণের চার অবস্থা :
১. মুওয়ালাত তথা বন্ধুত্ব। ২. মুদারাত তথা বাহ্যিক সদাচরণ ও সৌজন্যমূলক আচরণ। ৩. মুওয়াসাত তথা সহানুভূতি, অনুগ্রহ ও উপকার সাধন। ৪. মুআমালাত তথা লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য
প্রথমটার ব্যাখ্যা : মুওয়ালাত তথা বন্ধুত্ব
কাফেরদের সাথে মুওয়ালাত-বন্ধুত্ব করা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহুদী-খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না। তারা একে অন্যের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যকার যে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, সেও তাদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। সূরা মায়েদা, (৫) : ৫১
অন্যত্র বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আমার দুশমন ও তোমাদের দুশমনকে এমন মিত্র বানিয়ো না যে, তাদের কাছে ভালোবাসার বার্তা পৌঁছাতে শুরু করবে…।’সূরা মুমতাহিনা, (৬০) : ১
ব্যাখ্যা : ولي (বহুবচনে اولياء)-এর অর্থ করা হয়েছে ‘মিত্র’। এর দ্বারা এমন বন্ধুত্ব ও আন্তরিক ভালোবাসাকে বোঝানো হয়, যার ফলে দুজন লোকের জীবনের লক্ষ্য ও লাভ-লোকসান অভিন্ন হয়ে যায়। মুসলিমদের এ-জাতীয় সম্পর্ক কেবল মুসলিমদের সাথেই হতে পারে। অমুসলিমদের সাথে তা কখনো হতে পারে না।
এ আয়াতদ্বয়ে কঠোরভাবে তা নিষেধ করা হয়েছে। এই একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সূরা নিসার ১৩৯ ও ১৪৪, সূরা মায়েদার ৫৭ ও ৮১, সূরা তাওবার ২৩ ও সূরা মুজাদালার ২২ নং আয়াতসমূহে।
এখন প্রশ্ন থেকে যায়, ইসলাম কাফেরদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন এত কঠোরভাবে নিষেধ করে কেন? কোনো অবস্থাতেই এরূপ সম্পর্ক জায়েয না রাখার রহস্য কী?
এর একটি বিশেষ কারণ হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন একটি উদ্দেশ্যমূলক জীবন। মানুষের খাওয়া-দাওয়া, ওঠা-বসা, নিদ্রা-জাগরণ, এমনকি জন্ম-মৃত্যু সবই একটি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত। এসব কাজকর্ম যতক্ষণ সেই উদ্দেশ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ হবে, ততক্ষণই তা সঠিক ও বিশুদ্ধ। পক্ষান্তরে এই উদ্দেশ্যের বিপরীত হয়ে গেলেই তা অশুদ্ধ।
আল্লাহ তাআলার ইবাদতই যখন মানবজীবনের লক্ষ্য, তখন জগতের কাজ- কারবার, রাজ্য-শাসন, রাজনীতি ও পারিবারিক সম্পর্ক সবই এ লক্ষ্যের অধীন।অতএব যে মানব এ লক্ষ্যের বিরোধী, সে মানবতার প্রধান শত্রু। সহীহ হাদীসে বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি (কাউকে) আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য দুশমনী করে, আল্লাহর জন্য দান করে এবং আল্লাহর জন্য দান থেকে বিরত থাকে, সে নিশ্চিত তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছে।(আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬৮১)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় বন্ধুত্ব ও শত্রুতাকে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করে দেয়, সে স্বীয় ঈমানকে পূর্ণতা দান করে।
এতে বোঝা গেল, স্বীয় ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, শত্রুতাকে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করে দিলেই ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। অতএব মুমিনের আন্তরিক বন্ধুত্ব এমন ব্যক্তির সাথেই হতে পারে, যে এই উদ্দেশ্য হাসিলে তার সঙ্গী এবং আল্লাহর অনুগত। এ কারণে কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে কাফেরদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব স্থাপনকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ওরা কাফেরদেরই অন্তর্ভুক্ত।(‘সূরা মায়েদা, (৫) : ৫১)
শায়খুল ইসলাম শাব্বীর আহমদ উসমানী রাহ. (মৃ. ১৩৬৯ হি.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘কাফেরদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব ও ওঠাবসার কারণে ক্রমান্বয়ে প্রভাবিত হয়ে ওদের ধর্ম অবলম্বন করে ফেলতে পারে। আর তা না হলেও অন্তত কুফরের নিদর্শন ও শিরকের রীতিনীতিতে যে ঘৃণা ও অসন্তুষ্টির মনোভাব থাকা অপরিহার্য, তাতে শৈথিল্য দেখা দিতে পারে। যদি এমনই ঘটে, তবে এহেন মুসলমানদের ক্ষেত্রেও (সে তাদের মধ্যে গণ্য হবে)-এর প্রয়োগ হতে পারে। যেমন : হাদীসে এই বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করে বলা হয়েছে, “যে যাকে (দুনিয়াতে) ভালোবাসবে, সে (পরকালে) তারই সাথে থাকবে।”( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১৬৮)
আয়াতটির শেষাংশে বলা হয়েছে, “নিশ্চয় আল্লাহ জালেমদের হেদায়েত দান করেন না।” অর্থাৎ যারা ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে নিজেদের প্রতি ও মুসলমানদের প্রতি অন্যায় করে এবং মুসলমান জাতির পরাজিত ও পরাভূত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে, এমন দুর্ভাগা, অবাধ্য ও ধোঁকাবাজ সম্প্রদায় সম্পর্কে এই আশা বৃথা যে, ওরা কখনো হেদায়েতের রাস্তায় আসবে।’
কাজেই ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের খাতিরে কাফেরদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্বে লিপ্ত হয়ে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করা যাবে না। আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক অন্তরের সাথে। অন্তরের অবস্থা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
সুতরাং বাস্তবে কেউ কাফেরের সাথে বন্ধুত্ব রেখে মুখে তা অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু সবার অন্তরের গোপন ভেদ সম্পর্কে যেহেতু আল্লাহ তাআলা ওয়াকিফহাল, তাই অস্বীকৃতি ও অপকৌশল তাঁর সামনে অচল।
দ্বিতীয় প্রকারের ব্যাখ্যা : মুদারাত তথা বাহ্যিক সদাচরণ
কাফেরদের সাথে বাহ্যিক সদাচরণ ও সৌজন্যমূলক আচরণ নিম্নোক্ত তিন অবস্থায় বৈধ। যথা : ক. তাদের অনিষ্টতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য। খ. তাদের হেদায়েতের আশায়। গ. তাদের মেহমানদারী করার উদ্দেশ্যে এবং প্রতিবেশী হলে।
তবে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে তথা সম্পদ কিংবা সম্মান কামনায় বৈধ নয়। বিশেষত এর মাধ্যমে যদি দ্বীনী ক্ষতির আশঙ্কা বোধ হয়, তবে কোনোক্রমেই জায়েয নয়।
ইরশাদ হয়েছে,’মুমিনগণ যেন মুমিনদের ছেড়ে কাফেরদেরকে (নিজেদের) মিত্র না বানায়। যে এরূপ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে তাদের (জুলুম) থেকে বাঁচার জন্য যদি আত্মরক্ষামূলক কোনো পন্থা অবলম্বন করে, সেটা ভিন্ন কথা। সূরা আলে ইমরান, (৩) : ২৮
কাজেই তাদের থেকে কোনো রকমের অনিষ্টের আশঙ্কা হলে বাহ্যিক সদাচরণ ও সৌজন্যমূলক ব্যবহার ও নমনীয়তা প্রদর্শন করা যাবে।
আর কাফেরের হেদায়েতের আশায় সদাচরণ ও নমনীয় ব্যবহার করার দলীল হলো, সূরা আবাসায় উল্লেখিত আল্লাহ তাআলার বাণী : sajat ‘আপনি তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছেন।’(সূরা আবাসা ,৮ে০/৬)
আর মেহমান অবস্থায় কাফেরকে সম্মান করার দলীল হলো নিম্নোক্ত হাদীস :‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু সাকীফকে মসজিদে অবস্থান গ্রহণের সুযোগ প্রদান করেছিলেন, যাতে তাদের অন্তর নমনীয় হয়।(’আবু দাউদ, হাদীস নং ৩০২৮)
আর নিজের উপকার বা নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে তথা সম্মান কামনায় কিংবা সম্পদ লাভের আশায় তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও সৌজন্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ হওয়ার দলীল হলো : আল্লাহ তাআলার ইরশাদ, ‘তারা কি তাদের কাছে শক্তি খোঁজে? (অথচ) সমস্ত শক্তি তো আল্লাহর কাছে।(’সূরা নিসা, (৪) : ১৩১)
তৃতীয় প্রকারের ব্যাখ্যা : মুওয়াসাত তথা কল্যাণকামিতা ও উপকার সাধন
যে কাফের মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত (তথা আহলে হারব), তাদের প্রতি সহানুভূতি, কল্যাণকামিতা, অনুগ্রহ ও উপকার করা কোনোক্রমেই বৈধ নয়।
তবে যে কাফের যুদ্ধরত নয়, তার সাথে সৌজন্যমূলক ব্যবহার ও তার উপকার করা কেবল জায়েযই নয়, বরং এটাই কাম্য। যেমন : কুরআন মাজীদে সূরা মুমতাহিনায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে,‘ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন।(’সূরা মুমতাহিনা, (৬০) : ৮)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নীতিও এটা ছিল যে, এরূপ লোকদের সাথে তিনি সর্বদা সদয় আচরণ করেছেন।
চতুর্থ প্রকারের ব্যাখ্যা : মুআমালাত তথা লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য
অমুসলিমদের সাথে লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ইজারা, চাকরি, শিল্প ও কারিগরি বিষয়ে সম্পর্ক স্থাপন জায়েয এবং এমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতামূলক চুক্তি বা ব্যবসায়িক কারবারও করা যেতে পারে, যাকে অধুনা পরিভাষায় ‘মৈত্রী চুক্তি’ বলে।
তবে শর্ত হচ্ছে, এরূপ চুক্তি ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি ও স্বার্থবিরোধী হতে পারবে না এবং তাতে শরীয়তের পরিপন্থী কোনো কর্মপন্থা অবলম্বন করা যাবে না।
সুতরাং ব্যবসা-বাণিজ্য, ইজারা, চাকরি, শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্থাপন করা সব অমুসলমানের সাথে জায়েয। তবে মুসলমানদের ক্ষতি হলে জায়েয নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খোলাফায়ে রাশেদীন ও অন্যান্য সাহাবী কর্তৃক গৃহীত কর্মপন্থা এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। ফিকাহবিদগণ এ কারণেই যুদ্ধরত কাফেরদের হাতে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র বিক্রয় করা নিষিদ্ধ করেছেন এবং শুধু স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমতি দিয়েছেন। তাদের চাকরি প্রদান করা অথবা তাদের কলকারখানা বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সবই জায়েয।
আয়েশা রাযি. বলেন, *রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ইহুদী হতে কিছু খাদ্যদ্রব্য কিনেছিলেন এবং তার কাছে নিজের বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। (’সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫১৩; মুসলিম হাদীস, নং ১৬০৩)
হযরত আনাস রাযি. বলেন,‘এক ইহুদী কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করত। সে অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তখন সে মুসলমান হয়ে গেল।(”সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৫৬, ৫৬৫৭)
এ আলোচনা থেকে জানা গেল যে, আন্তরিক বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা কোনো কাফেরের সাথে কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়। তবে অনুগ্রহ, সহানুভূতি ও উপকার সাধন যুদ্ধরত কাফের ছাড়া সবার বেলায় জায়েয। এমনইভাবে বাহ্যিক সদাচরণ ও সৌজন্যমূলক আচরণ সবার সাথেই জায়েয রয়েছে; তবে এর উদ্দেশ্য অতিথির আতিথেয়তা কিংবা অমুসলিমকে ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত করা অথবা তাদের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করা হতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ হয়ে জগতে আগমন করে অমুসলিমদের সাথে যেরূপ অনুগ্রহ, উপকার সাধন ও সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছেন, তার নযির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে যে শত্রুরা তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছিল, তিনি স্বয়ং তাদের সাহায্য করেন।
এরপর মক্কা বিজিত হলে সব শত্রু তাঁর করতলগত হয়ে যায়। কিন্তু তিনি এ কথা বলে সবাইকে মুক্ত করে দেন যে, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।
অর্থাৎ আজ তোমাদের শুধু ক্ষমাই করা হচ্ছে না; বরং অতীত উৎপীড়নের কারণে তোমাদের কোনোরূপ অভিযোগ ও ভর্ৎসনা করা হবে না।(সূরা ইউসুফ ১২/৯২)
অমুসলিম যুদ্ধবন্দি হাতে আসার পর তিনি তাদের সাথে এমন ব্যবহার করতেন, যা অনেক পিতাও পুত্রের সাথে করেন না। কাফেররা তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছিল,
কিন্তু তাঁর হাত প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কখনো উত্থিত হয়নি। অমুসলিম বনু সাকীফের প্রতিনিধি দলকে তিনি মসজিদে নববীতে অবস্থান করতে দেন, যা ছিল মুসলমানের দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ সম্মানের স্থান। হযরত উমর রাযি. মুসলমানদের মতো অমুসলিম দরিদ্র জিম্মিদেরও সরকারি ধনাগার থেকে ভাতা প্রদান করতেন।
খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের কাজ-কর্মের মধ্যে এ-জাতীয় অসংখ্য ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো ছিল অনুগ্রহ, সৌজন্য ও লেনদেনমূলক ব্যবহার, যা নিষিদ্ধ বন্ধুত্ব নয় ।
এ ব্যাখ্যা থেকে জানা গেল যে, ইসলামে অমুসলিমদের জন্য কতটুকু উদারতা ও সদ্ব্যবহারের শিক্ষা রয়েছে।
তথ্য সূত্রঃ
কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১
লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম