ইসলাম

বিদআত : পরিচিতি ও মূলনীতি:

বিদআত দুই প্রকার : ১. কুফরী বিদআত, ২. ফিসকী বিদআত।

প্রথম প্রকার হচ্ছে, যা পাওয়া গেলে ঈমান ভঙ্গ হয় ও কাফের হয়ে যায়। আর দ্বিতীয় প্রকার হলো, যা করলে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ থেকে খারেজ হয়৷ এতক্ষণ প্রথম প্রকার আলোচিত হয়েছে। এখন দ্বিতীয় প্রকার নিয়ে আলোচনা করা হবে।

দ্বীন-ধর্ম থেকে কোনো কিছু বিয়োজন ও কমানোকে বলা হয় ‘ইলহাদ’। আর সংযোজন ও বাড়ানোকে বলা হয় ‘বিদআত’। এটা আকীদা ও আমল উভয় ক্ষেত্রে হতে পারে। যদিও আমরা ‘বিদআত’ শব্দ থেকে সাধারণত আমলের ক্ষেত্রটাকে বুঝে থাকি।

ইসলামী শরীয়তে ছাড়াছাড়ির যেমন অবকাশ নেই, তেমনইভাবে বাড়াবাড়িরও কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তরকারিতে যেমন লবণ বেশি হলে খাওয়া যায় না, তেমনই দ্বীনের মধ্যে বৃদ্ধি করলেও তা গ্রহণযোগ্য হয় না।

সহীহ হাদীসে এসেছে, ‘বিদআত হলো পথভ্রষ্টতা, আর পথভ্রষ্টার পরিণাম হলো জাহান্নাম। (নাসায়ী,৭২৭৭, সনদ সহিহ)

বিদআত পরিচিতির জন্য চারটি মূলনীতি

প্ৰথম মূলনীতি

এটা কয়েকটা পয়েন্ট আকারে বুঝতে হবে :

১. সুন্নাহ ও শরীয়তের বিরোধিতা বা বিদআত থেকে বাঁচতে হলে কুরআন-সুন্নাহ উভয়টাকে গ্রহণ করতে হবে এবং কুরআন – সুন্নাহর স্বীকৃত ব্যাখ্যা বিশেষত কুরআনের তাফসীর উক্ত শাস্ত্রের আলোকে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,‘তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ পর্যন্ত এ বস্তুদ্বয়কে আঁকড়ে ধরবে, পথভ্রষ্ট হবে না—কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলুল্লাহ।( ইমাম আহমদঃ আল মুসনাদ- ৩: ৩৯৩ (১০৭৪৭)। আবু ইয়ালা-২:৬ (১০১৭)/ ৯:(১০২৩)/ ৪৭:(১১৩৫)। ইমাম আহামাদ ইবনে হাম্বলঃ ‘মুসনাদে আহমদ’,৩য় খন্ড, ১৭ ও ২৬ পৃষ্ঠা। ৪.ইবনে আবি শাইবাহ, আবু ইয়ালা, ইবনে সা’দ)

আর কুরআনের মনগড়া তাফসীর প্রসঙ্গে সহীহ হাদীসে এসেছে,‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মনগড়া তাফসীর করবে, তার স্থান জাহান্নাম ছাড়া বৈকি।(তিরমিজি,২৯৫০)

মূলনীতির এ পয়েন্ট গ্রহণ করলে হাদীস অস্বীকারকারী-আহলে কুরআন, কাদিয়ানী, হিজবুত তাওহীদ, বেরেলভী, লা-মাযহাবী ও মাওলানা মওদুদী সাহেবসহ প্রায় ব্যক্তি ও ফেরকার বিকৃতি ও ভ্রান্তি ধরতে পারবেন।

২. সহীহ হাদীস ও আমলযোগ্য হাদীস থেকে গৃহীত হলে তা বিদআত হবে না। মূলনীতির এ পয়েন্ট বলে দেয় যে, সুন্নী – বেরেলভী বন্ধুরা বিভিন্ন আকীদা – আমল সহীহ হাদীস থেকে গ্রহণ না করার কারণে শরীয়তে বৃদ্ধি করে বিদআতে লিপ্ত হয়। যেমন : নবীকে সৃষ্টি না করলে কিছুই সৃষ্টি করা হতো না বা নবী নূরের তৈরি কিংবা “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বললে আঙুলে চুমা খাওয়া ইত্যাদি।

আর আহলে হাদীস/লা-মাযহাবী বন্ধুরা আমলযোগ্য হাদীস থেকে গ্রহণ না করার কারণে সহীহ হাদীসের নামে ফিতনা সৃষ্টি করে। যেমন : বুকের ওপর হাত বাঁধার হাদীস। কারণ, বুকের ওপর হাত বাঁধার হাদীসমতে ১১০০ হিজরী পর্যন্ত কেউ আমল করেনি।

৩. চার খলীফার সুন্নাহতে পাওয়া গেলে তা বিদআত হওয়া তো দূরের কথা; বরং মান্য করা ওয়াজিব। ইরবায ইবনে সারিয়া রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার পর তোমাদের যারা বেঁচে থাকবে তারা বহু ইখতিলাফ-মতানৈক্য দেখতে পাবে।তখন তোমরা আমার সুন্নাহ ও আমার হেদায়েতের পথের পথিক খলীফাগণের সুন্নাহকে সর্বশক্তি দিয়ে ধারণ করবে। আর সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় থেকে দূরে থাকবে। কারণ, সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত। আর সকল বিদআত গোমরাহী।(মুসনাদে আহমদ, ১৭১৪৫,)

মূলনীতির এ পয়েন্টের আলোকে বিদআত বলা যাবে না হযরত আবু বকর রাযি.-এর জময়ে কুরআন, হযরত উমর রাযি.-এর চালুকৃত জামাআত সহকারে বিশ রাকাত তারাবীহ এবং হযরত উসমান রাযি.-এর জারিকৃত জুমআর দ্বিতীয় আজান, অনেক আহলে হাদীস মানে না।

৪. সাহাবায়ে কেরামের তাআমুলে পাওয়া গেলে তা বিদআত হবে না; বরং তা অনুসরণ করা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও জান্নাতী হওয়ার আলামত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,‘অগ্রগামী মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণ এবং যে সমস্ত মুসলমান নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। (সূরা তাওবা, আয়াত : ১০০)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতী আর জাহান্নামী লোকের পরিচয় তুলে ধরে বলেন, ‘বনী ইসরাঈল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। কিন্তু সব দলই জাহান্নামী, শুধু এক দল হবে জান্নাতী। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর রাসূল! সেই এক দলে কারা থাকবেন? বললেন, যারা আমার এবং আমার সাহাবীদের মত ও পথের পথিক হবে। (তিরমিজি, ২/৯২, হাদীস নং,২৮৩২,)

মূলনীতির এ পয়েন্টের কারণে বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হয় না আমলের বিভিন্ন পদ্ধতি, যা চার মাযহাবে রয়েছে। যথা : রফয়ে ইয়াদাইন করা বা না করা ও আমীন জোরে বা আস্তে বলা ইত্যাদি, যা অনেক আহলে হাদীস স্বীকার করে না।

এভাবে অস্পষ্ট বিধানের ব্যাখ্যা সাহাবায়ে কেরাম থেকে গ্রহণ করা বিদআত নয়। যেমন : কমপক্ষে এক মুষ্টি পরিমাণ লম্বা দাড়ি রাখা ওয়াজিব হওয়া। সবিস্তারে জানতে দেখুন বান্দার ‘দাড়ি ও তার পরিমাণ’ বইটি।

৫. অনেকের মতে, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগের অধিকাংশ আহলে হক থেকে যদি কোনো কাজ বা আমলের সমর্থন পাওয়া যায় কিংবা জানা সত্ত্বেও কারও থেকে নিষেধ পাওয়া না যায়, তবে তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে না।

এই দুই যুগের সমর্থন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণ হলো, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে উত্তম হলো, আমার যুগের লোক। অতঃপর তাবেয়ীদের যুগ। এরপর তাবে-তাবেয়ীদের যুগ। ( বুখারী, হাদীস নং,৩৬৫০)

তিন থেকে নিয়ে পাঁচ পর্যন্ত মূলনীতির পয়েন্টগুলোর আলোকে বেরেলভীদের বিভিন্ন কাজ ও রসম বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হয়। কেননা, এগুলোর কার্যকারণ, যৌক্তিকতা ও উদ্বুদ্ধকারী বিষয় থাকা সত্ত্বেও চার খলীফার সুন্নাহ বা সাহাবায়ে কেরামের আমল কিংবা তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগের লোকদের থেকে সমর্থন পাওয়া যায় না।

৬. কোনো বিষয়ের ওপর উলামায়ে উম্মতের ইজমা হলে তা বিদআত হবে না; বরং তা অনুসরণ করা ওয়াজিব।

৭. শর্তসাপেক্ষ উসূলের আলোকে ইজতিহাদ ও কিয়াসকৃত মাসআলাকে বিদআত না বলা চাই। যদিও সাহাবায়ে কেরাম থেকে নিয়ে চার মাযহাবে কিছু মাসআলায় জায়েয-নাজায়েযের মতভেদ হয়েছে।

বেরেলভী বা বিদআতীরা শর্তসাপেক্ষ উসূলের আলোকে ইজতিহাদ-কিয়াস না করার কারণে কিংবা ইজতিহাদ ও বিদআতের মাঝে পার্থক্য করতে না পারায় আমলের নামে বিদআতে লিপ্ত হয়। সামনে এর ব্যাখ্যা লক্ষ করুন।

দ্বিতীয় মূলনীতি

ইবাদতের নিয়তে নতুন যে আমল বা পদ্ধতি করছি/করতে চাচ্ছি, এটার কার্যকারণ, যৌক্তিকতা ও উদ্বুদ্ধকারী নবী ও সাহাবা যুগে ছিল কি না? এখানে দুই অবস্থা :

এক. সেই যুগে ছিল না, বরং পরবর্তী যুগে সৃষ্ট বা আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন : প্লেনে নামাজ পড়া, রোযা অবস্থায় ইনজেকশন দেওয়া, ব্যাংক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন পদ্ধতি ইত্যাদি। এগুলোর ক্ষেত্রে বিদআতের প্রয়োগ হবে না; বরং ইজতিহাদ ও কিয়াসের মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ, হালাল-হারাম নির্ধারিত হবে।

দুই. নবী ও সাহাবী যুগে এর কার্যকারণ, যৌক্তিকতা ও উদ্বুদ্ধকারী ছিল। কিন্তু এরপরও তারা সেই কাজ বা আমল করেননি। যেমন : জুমআর দ্বিতীয় আজানের ওপর ইজতিহাদ-কিয়াস করে ঈদের নামাজের জন্য আজান দেওয়া। এখানে আজানের কারণ হচ্ছে ঈদের নামাজ। তো ঈদের আজানের কারণ হলো ঈদের নামাজ, যা সে যুগে ছিল; এরপরও আজান ছিল না।

এ দ্বিতীয়টার হুকুম বোঝার জন্য এর প্রকার বুঝতে হবে। এটা দুই ভাগে বিভক্ত :

১. যে আমলটি করতে চাচ্ছি এর কার্যকারণ, যৌক্তিকতা ও উদ্বুদ্ধকারী যে বিষয়টি সে যুগে ছিল, তা পালনের পদ্ধতি নির্ধারিত। যেমন : আজানের আগে সালাত ও সালাম বলার আমলটি করতে চাচ্ছি। এখন এই সালাত ও সালামের কার্যকারণ ও যৌক্তিকতা হচ্ছে আজান। তো সে যুগে আজানের নির্ধারিত পদ্ধতি রয়েছে, যেটাতে আজানের আগে সালাত ও সালাম বলার আমল নেই। সুতরাং আজান সে যুগে ছিল, কিন্তু সালাত ও সালামের আমলটি ছিল না।

এই প্রকারের হুকুম হচ্ছে, উক্ত নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ভিন্নভাবে আদায় করা বিদআত। কাজেই সে যুগে যে সকল ইবাদত পালনের নির্ধারিত পদ্ধতি রয়েছে, এর থেকে বাড়ানো বিদআত।

২. যে আমলটি করতে চাচ্ছি এর কার্যকারণ ও উদ্বুদ্ধকারী যে বিষয়টি সে যুগে ছিল, তা পালনের পদ্ধতি নির্ধারিত নয়। যেমন : জিকির করা, দরূদ শরীফ পড়া, দাওয়াত- তাবলীগের কাজ করা, ওয়াজ করা, দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা ইত্যাদি। এগুলোর জন্য সে যুগে সুনির্ধারিত কোনো পদ্ধতি ছিল না। সুতরাং এগুলো বৈধ যেকোনো পদ্ধতিতে পালন ও আমল করা যাবে।

কিন্তু এগুলো পালনের জন্য ইজতিহাদ-কিয়াসের মাধ্যমে হোক বা স্বপ্নযোগে হোক কিংবা কাশফ-ইলহামের মাধ্যমে হোক, একটা নির্ধারিত সময় কিংবা নির্ধারিত পদ্ধতিকেই আবশ্যকীয় মনে করা বা একটা নির্ধারিত পদ্ধতিতে করলেই শুধু সওয়াব পাওয়া যাবে মনে করা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে।

উল্লেখ্য, কিছু সাহাবী ও পরবর্তী ইমাম বলেছেন, জিকির, দরূদ পাঠ, দুআ, সালাম, মুসাফাহা, মুআনাকা ইত্যাদির জন্য নির্ধারিত সময়-দিন বা পদ্ধতি আবশ্যকীয় করে নেওয়া বিদআত। এভাবে নামাজের পর কিংবা ঈদের নামাজের পর সালাম-মুসাফাহা আবশ্যকীয় করে নেওয়া বিদআত বলেছেন।

এ বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়, যে আমল বা বিষয় পালন করতে সাধারণত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয় না বা লম্বা সময় দিয়ে তা অর্জন করতে হয় না, এগুলোর ক্ষেত্রে কোনো সময়-দিন বা পদ্ধতি নির্ধারিত করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে।

কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাবলীগওয়ালারা যে একটা নির্ধারিত পদ্ধতিকে আবশ্যকীয় মনে করে। এভাবে কওমী মাদরাসাগুলো যে দ্বীনী ইলম শিক্ষার জন্য একটা পদ্ধতিকে আবশ্যকীয় মনে করে। তাহলে এগুলো কি বিদআত হবে না?

উত্তর :

একটা হচ্ছে, মূল দাওয়াত-তাবলীগের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিকে আবশ্যকীয় মনে করা। অর্থাৎ এটা ছাড়া আর কোনো পদ্ধতিতে করা যাবে না বা করলে দাওয়াত- তাবলীগের কাজ করার যে সওয়াব রয়েছে, তা পাওয়া যাবে না, এটা মনে করলে অবশ্যই বিদআত।

আরেকটা হচ্ছে, আমার সাথে বা আমার দলে দাওয়াত-তাবলীগের কাজ করতে হলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে করতে হবে এবং তাবলীগের কাজ করার যে সওয়াব রয়েছে, তা এ পদ্ধতিতে করলেও পাওয়া যাবে, এটা বিদআত নয়। কারণ, এটা নির্ধারণকারীর দৃষ্টিতে এ যুগের জন্য অধিক ফলপ্রসূ হওয়া ও ব্যবস্থাপনার কারণে করা হয়। যেমনটা তাবলীগ জামাআতে করা হয়ে থাকে।

অনুরূপ দ্বীনী ইলম শিক্ষা করার বিষয়টি। অর্থাৎ কওমী মাদরাসা ও এর নিসাবকে দ্বীনী ইলম শিক্ষা করার একমাত্র পদ্ধতি মনে করা এবং ভিন্ন পদ্ধতিতে তা করা যাবে না কিংবা করলে দ্বীনী ইলম শিক্ষা করার যে সওয়াব রয়েছে তা হবে না—এমন মনে করলে বিদআত হবে।

তবে অধিক ফলপ্রসূ ও ব্যবস্থাপনাগত কারণে যদি এটাকে আবশ্যকীয় মনে করে থাকে এবং ইলম শিক্ষার সওয়াব এ পদ্ধতিতে করলেও পাওয়া যাবে মনে করে, তাহলে বিদআত হবে না।

তাসাওউফের সকল আমল ও শোগল সম্পর্কেও একই কথা। আত্মশুদ্ধি বা আত্মাকে উত্তম গুণে গুণান্বিত করা শরীয়তের নির্দেশ। উক্ত নির্দেশ পালনের জন্য কারও পক্ষ থেকে একটা পদ্ধতিকে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এটাকে শরীয়ত কর্তৃক একমাত্র সুনির্ধারিত ও আদিষ্ট পন্থা মনে করা হয় না।

মোটকথা, দ্বিতীয় অবস্থার যে দুই প্রকার উল্লেখ করা হয়েছে, এতে প্রথম প্রকারে কোনো ধরনের ইজতিহাদ-কিয়াসের সুযোগ নেই। আর দ্বিতীয় প্রকারে (ইজতিহাদ- কিয়াসের মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনোভাবে হোক) একটা নির্ধারিত সময় কিংবা নির্ধারিত পদ্ধতিকে শরীয়তের আবশ্যকীয় বিষয় মনে করা বা উক্ত পদ্ধতিতে করলেই সওয়াবের কারণ মনে করা বিদআত।

সুতরাং প্রতি জুমআর নামাজের পর দরূদ শরীফ পড়ার জন্য মিলাদ-কিয়ামের প্রচলিত নির্দিষ্ট পদ্ধতি বিদআত।

তবে হ্যাঁ, কখনো কোথাও যদি বিশেষ কোনো সওয়াবের নিয়ত ছাড়া এবং শরীয়ত কর্তৃক সুনির্ধারিত ও আদিষ্ট পন্থা মনে করা ব্যতীত এমন কেউ করে, তাহলে বিদআত হবে না।

তৃতীয় মূলনীতি

এরপরও কোনো আমল বা বিষয়ে বিদআত হবে কি হবে না, এ নিয়ে সংশয় হতে পারে। তখন উসূল হচ্ছে, যে আমলটি সুন্নাত বা বিদআত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়, তা বর্জনীয়। কেননা, শরীয়তের দাবি হলো, সুন্নাত মোতাবেক আমল করার সাথে সাথে বিদআত থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা। তাই যে আমলের ব্যাপারে এই সন্দেহ হবে যে, এটা কি সুন্নাত না বিদআত, সেই আমলকেও বর্জন করবে।

একাধিক ইমাম সুস্পষ্টভাবে তা বলেছেন, যা হানাফী ফিকহের অনেক ফতোয়ার কিতাবে রয়েছে।

ইমাম সারাখসী রাহ. (মৃ. ৪৮৩ হি.) বলেন, ‘যে আমলটি সুন্নাত কিংবা বিদআত হওয়া নিয়ে দ্বিধা হয়, তা ছেড়ে দেবে। কেননা, বিদআত বর্জন করা আবশ্যকীয়, কিন্তু সুন্নাত অনুযায়ী আমল করা জরুরি নয়।

আল্লামা মাহমুদ ইবনে মাজাহ বুখারী রাহ. (মৃ. ৬১৬ হি.) বলেন, ‘যে বিষয়টি সুন্নাত কিংবা বিদআত হওয়াটা নিশ্চিত নয়, তা আমল করার চেয়ে বর্জন করা উত্তম।’

ইবনুল হুমাম রাহ. (মৃ. ৮৬১ হি.) লেখেন, ‘যে আমলটি সুন্নাত কিংবা বিদআত হওয়া নিয়ে দ্বিধা হয়, তা বর্জনীয়। কেননা, সুন্নাত অনুযায়ী আমল করা জরুরি নয়, কিন্তু বিদআত বর্জন করা আবশ্যকীয়। একই বক্তব্য ‘বাদায়িয়ুস সানায়ী’, ‘আল-বাহরুর রায়েক’, ‘ফাতাওয়া শামী’ ও ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’-তেও রয়েছে।

চতুৰ্থ মূলনীতি

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে কেউ দ্বীন-শরীয়ত নয় এমন কিছুকে আমাদের এই দ্বীন-শরীয়তে আবিষ্কার করলে, তা পরিত্যাজ্য।'(বুখারী, হাদীস নং,২৬৯৭,মুসলিম,হাদীস নং,১৭১৮)

এ হাদীস জানিয়ে দিচ্ছে, কোনো বিষয় বা কাজ তখনই পরিত্যাজ্য হবে তথা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে, যখন দ্বীন-শরীয়ত মনে করে নতুন কিছু আবিষ্কার করা হবে। কাজেই দুনিয়াবি হিসেবে নব-আবিষ্কৃত বিষয়, যেমন : মোবাইল, বিমান ও মাইক ইত্যাদি বিদআত নয়।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, ‘সাহাবীদের এক কাফেলা একবার সফরে বের হন। পথিমধ্যে তারা আরবের একটি গোত্রের এলাকায় পৌঁছালে তাদের মেহমান হতে আবেদন করেন, কিন্তু গোত্রবাসী তাদের মেহমানদারী করতে অসম্মতি জানায়। এ সময় গোত্রপ্রধানকে সাপ বা বিচ্ছু দংশন করে এবং গোত্রবাসী বিষ নামানোর জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো কাজ হয় না।

অবশেষে তারা সাহাবীদের কাছে এসে বলল, আমাদের গোত্রপ্রধান দংশিত হয়েছেন, আমরা সব ধরনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু ফল হচ্ছে না। তোমাদের কাছে কি কিছু আছে?

এক সাহাবী বললেন, হাঁ, আমি ঝাড়ফুঁক জানি, কিন্তু আমরা তোমাদের কাছে মেহমানদারীর আবেদন করেছি, তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছ।

অতঃপর তিনি বলেন,“আল্লাহর শপথ, তোমরা বিনিময় নির্ধারণ করার আগ পর্যন্ত আমি কোনো প্রকার ঝাড়ফুঁক করব না। অবশেষে তারা এক পাল ছাগল দিতে সম্মত হলো। সে সাহাবী সূরা ফাতেহা পড়ে ওই ব্যক্তির গায়ে ফুঁ দিতে লাগলেন। ধীরে ধীরে সে এমন সুস্থ হয়ে গেল, যেন সে এইমাত্র বাঁধনমুক্ত হলো এবং এমনভাবে হাঁটতে লাগল যেন তার কোনো কষ্টই নেই। অতঃপর তারা তাদের ওয়াদাকৃত বিনিময় দিল। তখন একজন সাহাবী বললেন, এগুলো আমরা ভাগ করে নিই। তখন যে সাহাবী ঝাড়ফুঁক করেছেন তিনি বললেন, না, নবীজীকে জিজ্ঞেস করা ছাড়া তা হবে না। তিনি যা বলেন তা-ই করব। তারা নবীজীর কাছে আসার পর পুরো ঘটনা বলেন। তখন নবীজী বলেন,তোমাদের কে বলল, এটি জাহেলী ঝাড়ফুঁক! তোমরা যা করেছ ঠিকই করেছ। যাও, এগুলো তোমাদের মাঝে বণ্টন করে নাও আর আমাকেও এক অংশ দিয়ো ৷ (সহিহ বুখারী,হাদীস নং,৫৭৪৯)

খারিজা ইবনুস সালত তার চাচা থেকে বর্ণনা করেন, ‘তার চাচা একদা এক গোত্রের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন, এক লোক উন্মাদ হয়ে গেছে। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তখন ওই লোকের পরিবার খারিজার চাচার কাছে এসে বলল, আমরা শুনেছি তোমাদের রাজা (নবীজী) নাকি উত্তম কিছু নিয়ে এসেছেন।

তাই তোমার কাছে কি এ ব্যক্তির চিকিৎসার কিছু আছে?’ ‘তখন আমি তিন দিন তাকে সূরা ফাতেহা পড়ে ফুঁ দিলাম। এতে লোকটি সুস্থ হয়ে গেল এবং তারা একশটি ছাগল হাদিয়া দিল। তিনি নবীজীর কাছে এসে ঘটনা শোনালেন। নবীজী বললেন, এ ছাগল তুমি খাও। অন্যরা বাতিল ঝাড়ফুঁক করে খায়, এগুলো তো তুমি সত্য ঝাড়ফুঁক করে পেয়েছ। ( মুসনাদে আহমদ হাদীস নং,২১৩৬)

এ হাদীসদ্বয় থেকে প্রতীয়মান হয়, দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে কুরআন পড়ে বা খতম করে কিছু নেওয়া বা টাকার লেনদেন করা অবৈধ নয় এবং তা বিদআতও নয়।

সুতরাং কোনো বিষয় বা কাজ তখনই বিদআত হিসেবে গণ্য হবে, যখন এতে এ শর্ত পাওয়া যাবে যে, দ্বীন-শরীয়ত মনে করে নতুন কিছু আবিষ্কার করা হবে।

অথবা ধর্মীয় বিষয় দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে না হয়ে আখিরাতের উদ্দেশ্যে করা হবে। কাজেই দুনিয়াবি হিসেবে নব-আবিষ্কৃত বিষয়, যেমন : মোবাইল ইত্যাদি বিদআত নয়। কেননা, তা দ্বীন-শরীয়ত মনে করে আবিষ্কার করা হয়নি। এভাবে দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করাও বিদআত নয়। কেননা, বিষয়টি ধর্মীয় হলেও আখিরাতের উদ্দেশ্যে করা হয় না; বরং রহমত ও বরকতের উদ্দেশ্যে করা হয়।

বিদআতী ও বিদআতের শিকার ব্যক্তির মাঝে তারতম্য মনে রাখতে হবে, বিদআত অনেক ব্যক্তি ও ঘরানার মধ্যেই আছে। কিন্তু দ্বীনী বিষয়ে অপব্যাখ্যা করা যাদের শিআর ও বৈশিষ্ট্য, বিদআতের প্রতি আনুকূল্য যাদের মানহাজ, বিদআতের প্রতি পক্ষপাতই যাদের মেজায, বিদআতই যাদের খুসূসিয়্যত,বিদআতই যাদের স্বতন্ত্র ফেরকা হওয়ার ভিত্তি, বিদআতের কারণে যাদের আলাদা পরিচিতি এবং যাদের আকীদা-আমলে বিদআতের ছড়াছড়ি, বিদআতের এশায়াত যাদের ঐতিহ্য, তারা আর যে সকল ব্যক্তি ও ঘরানা সাধারণত সুন্নাহ অনুসরণ এবং সাহাবা ও সালাফের তরীকা মানার চেষ্টা করে, তবে কিছু ক্ষেত্রে বিদআতের শিকার হয়ে যায়, উভয় এক পর্যায়ের নয়।

তবে কিছু ক্ষেত্রের বিদআতগুলোকেও অবশ্যই বিদআত মানতে হবে এবং সেগুলো থেকেও দূরে থাকতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিদআতমুক্ত আমল ও জীবনধ করুন।

তথ্য সূত্রঃ

কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১

লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

এই ব্লগটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

খুশি
0
আরও উন্নত হতে পারে
0

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *