ইসলাম

ঈমান-আকীদা সংরক্ষণ ফরজ

মুমিন হওয়ার পর ঈমান-আকীদা হেফাজত করা ফরজ এবং ঈমান বিনষ্টকারী বিশ্বাস, কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ, অনেক বেশি আমলকারীও ঈমানবিহীন হতে পারে। হযরত আলী রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে একদল লোকের আবির্ভাব হবে, যাদের কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ ও রোযা তোমাদের চেয়ে ভালো ও বেশি হবে। (কিন্তু) তারা ইসলাম থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেমন তীর তার লক্ষ্যস্থল ভেদ করে বের হয়ে যায়।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রাযি. বলেন, ‘এমন এক সময় আসবে, যখন লোকেরা একত্রিত হয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করবে, অথচ তাদের মাঝে কেউ মুমিন থাকবে না!’

আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সকালের মুমিন সন্ধ্যায় ঈমানহারা কিংবা সন্ধ্যার ঈমানদার সকালে ঈমানছাড়া। দুনিয়ার সামান্য স্বার্থে নিজের দ্বীনকে ছেড়ে দেবে।

এ জন্য প্রখ্যাত হানাফী ফকীহ ইবনে আবিদীন শামী রাহ. (মৃ. ১২৫২ হি.) কোন কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা একজন মুমিনের জন্য ফরজে আইন–এর তালিকায় ইউসুফ রূমীর (মৃ. ১৮৬ হি.) ‘তাবয়ীনুল মাহারিম’ কিতাব থেকে উল্লেখ করে বলেন,‘হারাম ও কুফরী শব্দ (তথা কোন কথা বা কাজ করলে ঈমান চলে যায় এ ) সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।

কসম বর্তমান সময়ে যে সকল বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য তন্মধ্যে এটি অন্যতম। কারণ, অনেক মানুষ কুফরী কথা বলে, যা তাকে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় অথচ এ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন!’ অতঃপর এর ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে এমনও বলেছেন, ‘সতর্কতা হলো, সাধারণ ব্যক্তি (ও অনভিজ্ঞ আলেম) প্রতিদিন তার ঈমানকে নবায়ন করবে এবং প্রতি মাসে এক-দুবার দুজন সাক্ষীর সামনে বিবাহকে নবায়ন করবে। কেননা, পুরুষরা যদিও কিছুটা সতর্ক থাকে, কিন্তু মহিলাদের থেকে কুফরী কথা খুব বেশি পরিমাণ বের হয়।

এই ফরজের প্রতি আমরা চরম উদাসীন এবং এটি আমাদের মাঝে অবহেলিত ‘ফরজে আইন’। এ বিষয়ে আমরা ফিকহ ও ফাতাওয়ার কিতাবসমূহে শুধু ‘মুরতাদ’ অধ্যায় দেখলে এর গুরুত্ব বুঝে আসবে। সহজে দেখতে চাইলে বদরুর রশীদ হানাফীর (মৃ. ৭৬৮ হি.) ‘আলফাউযুল কুফর’ ও মোল্লা আলী কারী (মৃ. ১০১৪ হি.) রাহ.-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে চোখ বুলাতে পারি এবং ইবনে হাজার হাইতামী শাফেয়ীর (মৃ. ৯৭৪ হি.) ‘আল-ই’লাম বি-কাওয়াতিয়িল ইসলাম’ পড়তে পারি।

আর সাধারণরা শুধু কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী রাহ.-এর ‘মালাবুদ্দা মিনহু’ (দশম অধ্যায়, কুফরী কালাম অধ্যায়ের আলোচনা, পৃষ্ঠা ২৪৭-২৭০, মাওলানা আনোয়ার হুসাইনের অনুবাদ) পড়ে নিতে পারি।”

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. (মৃ. ১৩৬২ হি.) আজ থেকে ৮০ বছর পূর্বে আধুনিক শিক্ষার কারণে ঈমান হারানোর মতো ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরে মানুষকে সতর্ক করে লেখেন, ‘এই যুগে পাত্রের ঈমান-কুফরের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া জরুরি। বর্তমানে এমন এক সময় চলছে যে, (বিয়ে-শাদীতে) হবু বর দ্বীনদার নাকি বদকার তা দেখার আগে, বরং সে ইসলামের গণ্ডির ভেতরে আছে কি নেই, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, মুসলমান কনের সাথে বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ছেলের ঈমান থাকা শর্ত।’

অতঃপর থানভী রাহ. বলেন,‘মুসলিম নারী ও কুফরে লিপ্ত পুরুষের মাঝে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপিত হতে পারে না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে যাদের হাতে কন্যা সোপর্দ করা হচ্ছে, সেসব পাত্রের একটি অংশের আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে দ্বীন ও ঈমানের সাথে কোনো রকম সম্পর্কই অবশিষ্ট নেই (শুধু নামেই তারা মুসলমান রয়ে গেছে)।

এদের মুখ দিয়ে কুফরী কথাবার্তা বের হয় এবং ধর্মীয় বিষয়াদিকে এরা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করে না। অথচ এরপরও এমন ছেলের সাথেই মুসলিম নারীদের বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে! এদিকে পরিবারের লোকজন বিয়ের ‘সুন্নাত’ পালন করতে পেরে খুশি প্রকাশ করছে। অথচ এই বৈবাহিক সুন্নাতের শুদ্ধতা নির্ভর করে ঈমানের শুদ্ধতার ওপর।

অথচ যার সাথে বিয়ে পড়ানো হচ্ছে, সেই পাত্র কতবার ঈমান ভেঙে ইসলাম থেকে খারেজ হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বলাবাহুল্য, এখানে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বরের কথা বলা হয়েছে। অন্যথায় মেয়ের খবর নেওয়াও জরুরি।

এভাবে প্রায় ১০০ বছর পূর্বে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ.-ও (মৃ. ১৩৫৩ হি.) আরও ভয়ংকর কথা বলেছেন, যার বাস্তবতা এখন দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।

তিনি বলতেন, ‘বর্তমান নবীন জেনারেল শিক্ষিতদের (অন্তরে লুক্কায়িত আকীদাগত) কুফর আমাদের জানা না থাকার (ও তা প্রকাশিত না হওয়ার) কারণে আমরা তাদেরকে মুসলমান বলি !

মনে রাখতে হবে, ঈমান ভঙ্গকারী বিষয় আর ঈমান একত্র হতে পারে না। যেভাবে ওযু-নামাজ ভঙ্গের কারণ পাওয়া যাওয়া আর ওযু নামাজ ঠিক থাকা একসাথে হতে পারে না। কিন্তু আমরা ওযু নামাজেরটা বুঝি, ঈমানেরটা বুঝি না। ফলে ওযু- নামাজের বিষয়ে যতটা সচেষ্ট থাকি, ঈমান-আকীদার বিষয়ে ততই অবহেলা করি! অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, আমরা ওযু ভঙ্গের কারণ শিখি, অনেকেই নামাজ নষ্ট হওয়ার কারণও জানি। কিন্তু ঈমান ভঙ্গকারী বিষয় শিখি না, কোন কথা বললে, কী কাজ করলে, কেমন বিশ্বাস রাখলে ঈমান চলে যায়, তা জানি না এবং জানার চেষ্টাও করি না।

এভাবে আমাদের মাহফিল ও সম্মেলনগুলোতে ঈমান-আকীদার বিষয়বস্তু গুরুত্ব দেওয়া হয় না এবং জুমআর দিন মিম্বার থেকেও এ সম্পর্কে আওয়াজ যথাযথ পর্যায়ে উচ্চারিত হয় না বা হতে দেওয়া হয় না। এ ছাড়া রচনা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধে ও এ-জাতীয় আলোচনা কমই চোখে পড়ে কিংবা খুব কম গুরুত্ব পায়। যার ভয়াবহ পরিণতি আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। বর্তমানে এর চিত্র একেবারেই সুস্পষ্ট। এমনকি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী ও তাহাজ্জুদ আদায়ের দাবিকারীর আচরণ-উচ্চারণেও এমন কিছু প্রকাশ পাচ্ছে, যা সর্বসম্মত আকীদা-বিরোধী ও সরাসরি ঈমান বিনষ্টকারী।

এই চিত্র পরিবর্তন করার দায়িত্ব আমাদের; নতুবা এই দেশে নামে মুসলমান ঠিকই থাকবে, নামাজ, তাহাজ্জুদ ও কুরআন তিলাওয়াতকারীও পাওয়া যাবে, মসজিদ- মাদরাসা ও মাহফিলে দান করার জন্য অনেকেই এগিয়ে আসবে, এমনকি মাদরাসা- খানকায় ধরনা দেওয়া এমপি-মন্ত্রীরও দেখা মিলবে, কিন্তু তাদের ভেতর ঈমান থাকবে না।

কোনো ভালো কাজই ঈমানের সমতুল্য হতে পারে না

কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো ও মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করাকে সেই ব্যক্তির (কার্যাবলির) সমান মনে করো, যে আল্লাহ ও পরকালে ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? আল্লাহর কাছে এরা সমতুল্য নয়।(সুরা তাওবা ৯-১৯)

শানে নুযুল

মক্কার অনেক মুশরিক গর্ব সহকারে মুসলমানদের বলত, মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের পানি সরবরাহের ব্যবস্থা আমরাই করে থাকি। এর ওপর অন্য কারও আমল শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে পারে না। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হযরত আব্বাস রাযি. যখন বদর যুদ্ধে বন্দি হন এবং তাঁর মুসলিম-আত্মীয়রা তাকে বাতিল ধর্মে বহাল থাকায় বিদ্রুপের সঙ্গে বলেন, আপনি এখনো ঈমানের দৌলত হতে বঞ্চিত রয়েছেন?

উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা ঈমান ও হিজরতকে বড় শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে করেছ। কিন্তু আমরাও তো মসজিদুল হারামের হেফাজত ও হাজীদের পানি সরবরাহের কাজ করে থাকি, তাই আমাদের সমান অন্য কারও আমল হতে পারে না। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে উপরিউক্ত আয়াতসমূহ নাযিল হয়।

এ আয়াতে মূলনীতি বলে দেওয়া হয়েছে যে, সমস্ত নেক কাজ সম-মর্যাদার হয় না। কোনো ব্যক্তি যদি ফরজ কাজসমূহ আদায় না করে নফল ইবাদতে লিপ্ত থাকে, তবে এটা কোনো নেক কাজ হিসেবেই গণ্য হবে না। নিশ্চয়ই হাজীদেরকে পানি পান করানো একটি মহৎ কাজ, কিন্তু মর্যাদা হিসেবে তা নফলই। অনুরূপ মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধানও অবস্থাভেদে ফরজে কিফায়া কিংবা একটি নফল ইবাদত।

পক্ষান্তরে ঈমান তো মানুষের মুক্তির জন্য বুনিয়াদি শর্ত। আর জিহাদ কখনো ফরজে আইন এবং কখনো ফরজে কিফায়া। প্রথমোক্ত কাজ দুটির তুলনায় এ দুটোর মর্যাদা অনেক ওপরে। সুতরাং ঈমান ব্যতিরেকে কেবল এ-জাতীয় সেবার কারণে কেউ কোনো মুমিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে না।”

কাজেই রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের-দশের সেবা করলেও ঈমান ব্যতিরেকে কেবল এ-জাতীয় সেবার কারণে কোনো মুমিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে না। এবং ঈমান বিধ্বংসী কার্যকলাপ, হারাম কাজ ও উপার্জন থেকে দূরে না থেকে বেশি নফল ইবাদতকারী ও তাহাজ্জুদগুযারী কখনো হারাম ও ফরজ কাজসমূহের প্রতি গুরুত্ব প্রদানকারী মুমিনের সমতুল্য হতে পারে না।

আমলের গ্রহণযোগ্যতার জন্য ঈমান-আকীদা ঠিক থাকা শর্ত

আমাদের সমাজে হয়তো নামে মুসলমান কেউ কেউ নামাজ-হজ ও কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি পালন করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, বিভিন্ন আয়াতে কারীমায় আমলের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিদানের জন্য ঈমান- আকীদা ঠিক থাকা পূর্বশর্ত বলা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘পুরুষ বা নারীর মধ্যে যে কেউ নেক আমল করলে, (শর্ত হলো) যদি ঈমানদার হয়, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না।'(সুরা : নিসা, আয়াত : ১২৩-১২৪)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে এবং সেই জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, (শর্ত হলো) যদি সে মুমিন হয়, তবে এরূপ চেষ্টার পরিপূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হবে।”(সূরা বনী ইসরাঈল : ১৯)।

এ আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়, সমস্ত আমলের রূহ ও ভিত্তি হলো ঈমান-আকীদা ঠিক থাকা।

তথ্য সূত্রঃ

কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১

লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

এই ব্লগটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

খুশি
0
আরও উন্নত হতে পারে
0

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *