‘ইস্তিওয়া আলাল আরশ’ তথা ‘আল্লাহ আরশের ওপর’ বা ‘আল্লাহ আসমানে আছেন’ সম্পর্কে আলোচনা
তৃতীয় প্রকার সিফাতের সাথে সংশ্লিষ্ট বড় একটি বিষয় হলো, ‘ইস্তিওয়া আলাল আরশ’ তথা ‘রহমান (আল্লাহ) আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন’ বা ‘আল্লাহ আসমানে আছেন’। তাই এ সম্পর্কে কিছু আলোচনা।
‘আল্লাহ আরশের ওপর’ বা ‘আল্লাহ আসমানে আছেন’ কথাটি অকাট্যভাবে সত্য এবং অনেক আয়াত দ্বারা তা প্রমাণিত, যা অস্বীকার করলে ঈমান থাকবে না। এ কারণেই আহলুস সুন্নাহর কেউ তা অস্বীকার করেনি; বরং ‘আল্লাহ আরশের ওপর’ বা ‘আল্লাহ আসমানে আছেন’ কথাটি আশআরী, মাতুরীদী ও আছারীসহ আহলুসসুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সর্বসম্মত আকীদা।
তবে উক্ত ‘সর্বসম্মত আকীদা’র ব্যাখ্যায় আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, কথাটির অর্থ কখনো আল্লাহর জন্য কোনো স্থান/অবস্থান বা দিক কিংবা তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন ও স্থানান্তর ইত্যাদি সাব্যস্ত করা নয়। অথবা কথাটির উদ্দেশ্য এটাও নয় যে, ‘আরশ’ বা ‘আসমান’ আল্লাহর থাকার স্থান কিংবা এতে তিনি অবস্থান গ্রহণ করেছেন, আর তিনি ওপরের দিকে রয়েছেন।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম খাত্তাবী রাহ. (মৃ. ৩৮৮ হি.) বলেন, ‘মুসলমানরা যে বলে “আল্লাহ আরশের ওপর”, এই কথার অর্থ এটা নয় যে, তিনি আরশকে স্পর্শ করেছেন কিংবা আরশে স্থির হয়েছেন অথবা আরশের কোনো দিকে স্থান গ্রহণ করেছেন; বরং তিনি তাঁর সকল সৃষ্টি থেকে পৃথক।
হাদীসের আরেক বিখ্যাত ইমাম বায়হাকী রাহ. (মৃ. ৪৫৮ হি.) বলেন, ‘মোটকথা, এটা জেনে রাখা আবশ্যক যে, আল্লাহ তাআলার ইস্তিওয়া কোনোরূপ কাত-চিত বা কুঁজো থেকে সোজা হওয়া নয়। কিংবা কোনো স্থানে অবস্থান বা আরোহণ/ওঠা নয় এবং তাঁর সৃষ্ট কোনো বস্তুর সাথে স্পর্শ করাও নয়; বরং তিনি তাঁর আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন, যেমনটা বর্ণিত হয়েছে। এতে ‘কোথায়’ ও‘কীভাবে’ বলতে কিছু নেই।’
তাই ইমাম ইবনে কাসীর রাহ. (মৃ. ৭৭৪ হি.) আরশের ওপর ইস্তিওয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘এ থেকে বাহ্যিক যে অর্থ সাদৃশ্যবাদীদের মাথায় আসে, তা থেকে আল্লাহ তাআলা মুক্ত। অর্থাৎ স্থান ও দিকসহ যত কিছু মাথায় আসে, তা থেকে তিনি পবিত্র।
ইমাম আযম আবু হানীফা রাহ. (মৃ. ১৫০ হি.) বলেন,“আমরা স্বীকার করি, “আল্লাহ তাআলা আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন।” কিন্তু তিনি আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন এবং আরশের ওপর অবস্থান গ্রহণকারী নন; বরং তিনি কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আরশ ও অন্য সবকিছুর রক্ষাকর্তা। সৃষ্টির মতো তিনি যদি (আরশ বা অন্য কিছুর প্রতি) মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করতে সক্ষম হতেন না। আর তিনি যদি (আরশে) বসা কিংবা অবস্থানের প্রতি মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে আরশ সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তাআলা কোথায় ছিলেন? আল্লাহ এসব থেকে মহাপবিত্র।
এখানে ইমাম আবু হানীফা রাহ. আল্লাহর আরশে অবস্থানকে এবং কোনো স্থানে থাকাকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করেছেন। আবু হানীফা রাহ. আরও বলেন,জান্নাতবাসীর জন্য আল্লাহ তাআলার দর্শন সত্য, তবে কোনো ধরন, সাদৃশ্য ও দিক ব্যতীত। এখানে তিনি আল্লাহ তাআলাকে দিক থেকে মুক্ত বলেছেন।
একই কথা ইমাম আবু মানসুর মাতুরীদী রাহ.-ও বলেছেন। তিনি লেখেন, ‘তিনি (আল্লাহ তাআলা) তখন ছিলেন, যখন কোনো ‘স্থান’ ছিল না। আর (কুরআনে যে) “তিনি আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন” বলে সম্বন্ধ করা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য কোনো ‘স্থান’ প্রমাণিত করা নয়। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার ‘আরশ’ নামক স্থানের ওপর অবস্থানগ্রহণ প্রমাণিত করা উদ্দেশ্য নয়।
আরও স্পষ্ট করে শাহ ওলীউল্লাহ দেহলবী রাহ. (মৃ. ১১৭৬ হি.) বলেন, ‘তিনি আরশের ওপর (ইস্তিওয়া) করেছেন, যেভাবে স্বয়ং (কুরআনে) বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু তা স্থানগ্রহণ ও (ওপরের) দিকে থাকার অর্থে নয়।
সুতরাং সালাফী বন্ধুদের ইমাম তাহাবীর (তিনি আরশের ওপর) শব্দ থেকে আল্লাহ তাআলা স্থানগতভাবে আরশের ওপর থাকার প্রমাণগ্রহণ যে ভুল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এ বিষয়ে অত্যন্ত চমৎকার করে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ ইমাম ইবনে নুজাইম মিসরী রাহ. (মৃ. ৯৭০ হি.) বলেন, ‘আল্লাহর জন্য ‘স্থান’ সাব্যস্ত করার দ্বারা কাফের হয়ে যাবে। অবশ্য কেউ যদি বলে, “আল্লাহ আসমানে আছেন”, আর এ কথা দ্বারা সে কুরআন-হাদীসের বাহ্যিক বর্ণনাকে উদ্ধৃত করতে চায়, তাহলে সে কাফের হবে না।
তবে যদি সে ‘স্থান’ উদ্দেশ্য নেয় (অর্থাৎ এ কথা দ্বারা সে “আল্লাহ তাআলা আসমানের ওপরে ‘স্থানে’ আছেন” উদ্দেশ্য নেয়), তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। এমনকি তার যদি কোনোরূপ নিয়তই না থাকে, তাহলেও অধিকাংশের মতে সে কাফের হয়ে যাবে। এটাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত এবং এর ওপরই ফতোয়া।
ইমাম আহমদ রাহ. (মৃ. ২৪১ হি.)-এর আকীদার বিবরণে এসেছে , ‘তিনি বলতেন, নিশ্চয় আল্লাহ আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন। তিনি আরও বলতেন, ইস্তিওয়ার অর্থ হলো সমুন্নত হওয়া ও সুউচ্চ হওয়া। আর আল্লাহ তাআলা আরশ সৃষ্টির পূর্ব থেকেই সুউচ্চ ও সমুন্নত, তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং সমস্ত কিছুর ওপরে। তিনি আরশকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, আরশের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্যান্য জিনিসে নেই। তা হলো, আরশ সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ জিনিস। এ কারণে মহান আল্লাহ নিজের প্রশংসা করে এ কথা বলেছেন, “তিনি আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন” অর্থাৎ তিনি আরশের ওপর সমুন্নত হয়েছেন।
আর এ কথা বলা বৈধ নয় যে, তিনি (আরশে) স্পর্শ করা ও লেগে থাকার দ্বারা ইস্তিওয়া করেছেন। আল্লাহ এ সবকিছু থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
আল্লাহর সঙ্গে কোনো ধরনের রূপান্তর ও পরিবর্তন সম্পৃক্ত হয়নি। আরশ সৃষ্টির পূর্বে এবং আরশ সৃষ্টির পরে সীমা-পরিধি তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়নি।
ইমাম ইবনে হামদান হাম্বলী (মৃ. ৬৯৫ হি.) তাঁর আকীদা নকল করেছেন যে, ‘(ইমাম আহমদের আকীদা হচ্ছে, ) মহান আল্লাহ আরশের ঊর্ধ্বে। তাঁর কোনো স্থান নেই এবং কোনো সীমা নেই। কেননা, তিনি ছিলেন, যখন কোনো স্থান ছিল না।
এরপর তিনি স্থান সৃষ্টি করেছেন, আর তিনি এভাবেই আছেন, যেভাবে স্থান সৃষ্টি করার পূর্বে ছিলেন।
তথ্য সূত্রঃ
কিতাবঃ ঈমান – আকিদা
লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম