ইসলাম

কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সহযোগিতা করা ও গুপ্তচরবৃত্তি করা ঈমান ভঙ্গের কারণ কি না ?

কাফেরদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব স্থাপন করা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সহযোগিতা করা ও গুপ্তচরবৃত্তি করা নিঃসন্দেহে হারাম ও বড় ধরনের কবীরা গুনাহ। এতে কারও দ্বিমত নেই। আল্লাহ তাআলা এগুলো থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, যা ওপরে উল্লেখ হয়েছে।

এখন জানার বিষয় হলো, এগুলো ঈমান ভঙ্গের কারণ কি না?

উত্তর হচ্ছে, মুতলাকভাবে বা এককথায় এগুলোর কোনোটাই ঈমান ভঙ্গের কারণ নয়। চার মাযহাবের ইমামগণ সাধারণত এগুলোকে ঈমান ভঙ্গের কারণ বলেননি। তবে শায়খ মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নজদী রাহ. (মৃ. ১২০৬ হি.) তাঁর বহুল আলোচিত ‘নাওয়াকিদুল ইসলাম’ নামক পুস্তিকায় ঈমান ভঙ্গের যে দশটি কারণ উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে ৮ নম্বরে ‘মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সহযোগিতা করা’কে ঈমান ভঙ্গের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সম্ভবত এখান থেকেই বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং অনেকেই এটি ঈমান ভঙ্গের কারণ হিসেবে আলোচনা করেন বা লেখায় উল্লেখ করেন।

অথচ তাহকীক ও গবেষণার আলোকে বলা যায়, ইসলামের হাজার বছরের ইতিহাসে অধিকাংশ মুফাসসিরের বিভিন্ন আয়াতের তাফসীর, মুহাদ্দিসগণের হাদীসের ব্যাখ্যা এবং ফকীহ ইমামগণের আলোচনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে, মুতলাকভাবে বা এককথায় এগুলোর কোনোটাই ঈমান ভঙ্গের কারণ নয়; বরং শর্তসাপেক্ষে ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষে কুফর ও ঈমান ভঙ্গের কারণ হয়।

কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব গড়া বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সহযোগিতা করা ও গুপ্তচরবৃত্তি করা যদি তাদের কুফরীর কারণে হয় বা কুফরের প্রতি সন্তুষ্টি হয়ে কিংবা কুফরকে সঠিক মনে করার কারণে হয়, তাহলে এগুলো কুফর ও ঈমান ভঙ্গের কারণ হবে; অন্যথায় নয় ৷

আল্লাহ তাআলা বলেন,‘মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধু না বানায়। আর যে কেউ এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো ভয়ের আশঙ্কা থাকে। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ২৮)

এ আয়াতের তাফসীরে প্রখ্যাত মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে জারীর তাবারী রাহ. (মৃ. ৮৫০ হি.) বলেছেন,‘আয়াতের অর্থ হলো, হে মুমিনগণ! তোমরা কাফেরদেরকে এমন সহায়তাকারী ও সাহায্যকারীরূপে গ্রহণ কোরো না যে, তাদের ধর্মের ওপর (সন্তুষ্ট হয়ে) তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছ, মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করছ এবং মুসলিমদের গোপনীয় বিষয়াবলি তাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছ। কেননা, যে ব্যক্তি এমনটা করবে, আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, সে আল্লাহ থেকে সম্পর্কহীন, আল্লাহও তার থেকে সম্পর্কহীন। কেননা, সে দ্বীন থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে কুফরে প্রবেশ করেছে।

আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে মুমিন কাফেরের বন্ধু হওয়ার তিনটি ধরন উল্লেখ করে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রাহ. (মৃ. ৬০৬ হি.) বলেন,‘আয়াতের অর্থ হলো, আল্লাহর সাথে তার কোনো বন্ধুত্ব নেই। আর এটা কুফরকে আবশ্যক করে না। যদিও কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব হারাম।

আর জেনে রাখুন, মুমিন কাফেরের বন্ধু হওয়ার তিনটি ধরন হতে পারে :

১. তার কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া এবং কুফরের কারণেই তার সাথে বন্ধুত্ব গড়া। এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ, যারা এমন করবে, তারা প্রত্যেকেই ওই কুফরী ধর্মকে সঠিক বিবেচনাকারী। আর কুফরকে সঠিক বিবেচনা করা কুফর এবং কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়াও কুফর। কাজেই এমতাবস্থায় সে মুমিন থাকা অসম্ভব (অর্থাৎ সে কাফের হয়ে যাবে)

২. দুনিয়াতে বাহ্যিক সৌজন্যমূলক আচরণ করা। এটা নিষিদ্ধ নয়।

৩. তৃতীয় প্রকার হলো, প্রথম দুই প্রকারের মাঝামাঝি। তা হলো, কাফেরদের এ ধরনের বন্ধু হওয়া যে, তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়া ও সাহায্য-সহযোগিতা করা আত্মীয়তা বা সম্প্রীতির কারণে। তবে এই বিশ্বাস আছে যে, তার ধর্ম বাতিল। এটা কুফরকে আবশ্যক করে না, তবে তা নিষিদ্ধ। কারণ, এটাও তাকে কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা ধমকি দিয়ে বলেছেন, যে এ কাজ করবে, তার সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক নেই।

আয়াতটির তাফসীরে অনুরূপ কথা অষ্টম শতাব্দীর মুফাসসির ইবনে আদিল হাম্বলী রাহ. (মৃ. ৭৭৫ হি.) এবং নবম শতাব্দীর মুফাসসির নেযামুদ্দীন নীসাবুরী রাহ. (মৃ. ৮৫০ হি.) বলেছেন।

উল্লিখিত তিন প্রকারের তৃতীয়টা যে কুফর নয়, তা ইবনে তাইমিয়াও বলেছেন। শায়খ ইবনে তাইমিয়া রাহ. (মৃ. ৭২৮ হি.) কাফেরদের সঙ্গে সম্পর্কের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘কখনো কাফেরদের সঙ্গে কারও ভালোবাসা থাকে আত্মীয়তার কারণে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে। এটা গুনাহ, এর দ্বারা ঈমানে ঘাটতি আসে; কিন্তু এর দ্বারা সে কাফের হয়ে যায় না। যেমনটা হাতিব বিন আবী বালতাআ রাযি. করেছেন। তিনি মুশরিকদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু বিষয় জানিয়ে দিতে চিঠি লিখেছিলেন, যার প্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়, “হে মুমিনগণ, তোমরা আমার দুশমন ও তোমাদের দুশমনকে এমন মিত্র বানিয়ো না যে, তাদের কাছে ভালোবাসার বার্তা পৌঁছাতে শুরু করবে।”

সূরা মুমতাহিনার এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মাতুরীদী রাহ. (মৃ. ৩৩৩ হি.) বলেন,‘যদি ওই গুনাহ তাকে (হাতিব বিন আবী বালতাআ রাযি.) ঈমান থেকে খারেজ করে কাফের বানিয়ে দিত, তাহলে তিনি কাফেরদের দুশমন হতেন না; বরং মিত্র হতেন। তা ছাড়া “হে মুমিনগণ” শব্দের মধ্যে তাকে মুমিন বলা হয়েছে।

এর তাফসীরে ইমাম ইবনুল আরাবী মালেকী রাহ. (মৃ. ৫৪৩ হি.) এবং প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম কুরতুবী মালেকী রাহ. (মৃ. ৬৭১ হি.) বলেন,“যে ব্যক্তি মুসলমানদের গোপন ও দুর্বল বিষয়সমূহের প্রতি বেশি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং মুসলমানদের তথ্য ও সংবাদ তাদের দুশমনদের অবহিত করে, আর এটা যদি দুনিয়ার কোনো স্বার্থে করে এবং তার আকীদা (ইসলামের ওপর) অটুট থাকে,তাহলে এর কারণে সে কাফের হবে না। যেমনটা হাতিব বিন আবী বালতাআ রাযি.-করেছেন।

তথ্য সূত্রঃ

কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১

লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

এই ব্লগটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

খুশি
0
আরও উন্নত হতে পারে
0

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *