ইসলাম

মুরতাদ বা ইসলাম ত্যাগকারীর বিধান

ইসলাম ত্যাগ করে অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করা কিংবা কোনো ধর্মই না মানা। যেমন :খ্রিষ্টান বা ‘ঈসায়ী মুসলিম’ হওয়া, অদৃশ্য বস্তুকে না মানার কথা বলে আল্লাহকে বিশ্বাস না করা এবং প্রকৃতিবাদী বা নাস্তিক হওয়া ইত্যাদি।

ব্যাখ্যা

পরিভাষায় এটাকে ‘ইরতিদাদ’ বা ‘মুরতাদ’ হওয়া বলে। আর মুরতাদ দুই প্রকারের হয়ে থাকে : ১. যে নিজের ইরতিদাদ বা ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। ২. যে ইরতিদাদমূলক (তথা নিশ্চিত ঈমান নষ্ট ও ভঙ্গ হয় এমন) কোনো কুফর করার পরেও নিজেকে মুসলমান দাবি করে অথবা মুসলমানের বেশভূষা ধারণ করে।

দ্বিতীয় প্রকারের মুরতাদকে মুনাফিক ও যিন্দীকও বলা হয়৷

দ্বিতীয় প্রকারের ব্যাপারে মুফতী শফী রাহ. (মৃ. ১৩৯৬ হি.) বলেন,‘এ প্রকারেও সর্বসম্মতভাবে মুরতাদ হয়ে যাবে, যদিও সে এই একটি বিধান ছাড়া ইসলামের অন্য সমস্ত বিধান দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে। ইরতিদাদের এ দ্বিতীয় প্রকারে অধিকাংশ মুসলমান ভুল বুঝে থাকে।

মুরতাদের বিধান

‘মুরতাদ’ হওয়া সকল প্রকার কুফরের চেয়েও ভয়াবহ। সাধারণ কুফর হলো, সত্য দ্বীন গ্রহণ না করা বা বিমুখ থাকা। কিন্তু ইরতিদাদ শুধু বিমুখতা নয়; বরং তা বিদ্রোহ ও বিরুদ্ধতা! কেননা, সত্য দ্বীন গ্রহণ করার পর তা বর্জনের অর্থ ওই দ্বীনকে অভিযুক্ত করা, যা নির্জলা অপবাদ। যে কারণে এটাকে কুরআনে কারীমে ‘ইফসাদ ফিল আরদ’ তথা পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি করা বলা হয়েছে।

মুরতাদের আসল শাস্তি তো হবে পরকালে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে কারও অন্তরের একান্ত গোপন কথাও অজানা নয়। তাই দুনিয়াতে কেউ নিজের ইরতিদাদ ও কুফর লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও পরকালে বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না !

স্বঘোষিত মুরতাদ হোক কিংবা মুনাফিক-জাতীয় মুরতাদ হোক, উভয় প্রকার মুরতাদই জঘন্য কাফের এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,‘তোমাদের মধ্যে যারা মুরতাদ হয়ে কাফের অবস্থায় মারা যাবে, তাদের দুনিয়া- আখিরাতে সকল কাজ বরবাদ হয়ে যাবে এবং তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,“যে ব্যক্তি ইসলাম ছেড়ে দেবে, তাকে তোমরা হত্যা করো।

কেউ যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তার ব্যাপারে বিধান হলো, তাকে তিন দিনের সুযোগ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে তাকে বোঝানো হবে এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তার যাবতীয় প্রশ্ন ও সন্দেহ দূরীভূত করার চেষ্টা করা হবে। যদি তিন দিনের মধ্যে তার বুঝে এসে যায় এবং পুনরায় সে ইসলাম ধর্মে ফিরে আসে, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। অন্যথায় সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো, এসব লোকের অস্তিত্ব থেকে এ পৃথিবীর মাটিকে পবিত্র করে দেওয়া। এটাই মুরতাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।

তবে মুরতাদ যদি মহিলা হয়, তাহলে হানাফী মাযহাব মতে কতল করবে না; বরং পুনরায় ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত জেলে ভরে রাখবে।

আমাদের দেশসহ অনেক দেশের সংবিধানে যুদ্ধাপরাধী ও রাষ্ট্রদ্রোহীর চূড়ান্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা আছে। আর মুরতাদ হচ্ছে ইসলামদ্রোহী। তাই ইসলাম ধর্মে তার চূড়ান্ত শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। কিন্তু ইসলাম এ বিধানের ক্ষেত্রেও তার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল আচরণ করে থাকে। কারণ, কোনো দেশই রাষ্ট্রদ্রোহীকে কখনো ছাড় দেয় না। সে যতই ক্ষমা চাক আর তাওবা করুক, কোনো কিছুই শোনা হয় না এবং কোনোভাবেই তাকে ক্ষমার উপযুক্ত মনে করা হয় না।

অথচ ইসলামদ্রোহীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও ইসলাম তার প্রতি এতটুকু সহানুভূতি পোষণ করেছে যে, তাকে তিন দিনের সময় দেওয়া হবে, তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হবে। শুধু তা-ই নয়, নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাকে তাওবা করার জন্য বলা হবে, তাওবা করে নাও, একটু ক্ষমা চেয়ে নাও, তাহলেই তুমি মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে।

এত কিছুর পরও যদি কেউ ফিরে না আসে, এরূপ হতভাগার জন্য মৃত্যুদণ্ডই বাঞ্ছনীয়। কারণ, সে তো এ সমাজের জন্য বিষাক্ত ক্ষতের মতো। কোনো অঙ্গ যদি বিষাক্ত পচনশীল রোগে আক্রান্ত হয়, ডাক্তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গকে রক্ষা করার জন্য সে অঙ্গটিকে কেটে ফেলে। দুনিয়ার কোনো আদালত একে অত্যাচার মনে করে না। কারণ, না কাটলে এর বিষক্রিয়া সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে তার মৃত্যু ডেকে আনবে।

অতএব বিষাক্ত পচনশীল অঙ্গের পচন রোধ করার জন্য একটি অঙ্গ কেটে ফেলা যদি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বলে বিবেচিত হয়, মুরতাদ হওয়াটাও ইসলাম ধর্মের একটি বিষাক্ত পচনশীল রোগের মতো। তাওবার সুযোগ দেওয়ার পরও যদি কোনো মুরতাদ ফিরে না আসে, তার মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত। কারণ, তাকে ছেড়ে দিলে সমাজের জন্য মৃত্যু ডেকে আনবে। তাই মৃত্যুদণ্ডই মুরতাদের চূড়ান্ত ফয়সালা। এটাই যুক্তিযুক্ত ও সুস্থ বিবেকের দাবি। গোটা উম্মতের শাস্তি তাতেই নিহিত।

পরিতাপের বিষয় হলো, মুরতাদের প্রতি ইসলাম এমন সহানুভূতি দেখালেও ইসলাম ধর্মে মুরতাদের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কেন রাখা হলো, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের রাজ সিংহাসন উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে কেউ ধরা পড়লে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, এতে কোনো প্রশ্ন উঠে না৷ বাংলাদেশের বিদ্রোহকারী পাকড়াও হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও কোনো সমস্যা হয় না। দুনিয়ার কোনো আদালত বা সংবিধান নাক গলায় না ৷

আশ্চর্য হলো, কেবল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর বিদ্রোহীদের ওপর যদি কোনো মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ করা হয় তখন সকলেই বলে ওঠে, এ শাস্তি অমানবিক! এটা হওয়া উচিত নয়!

তথ্য সূত্রঃ

কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১

লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

এই ব্লগটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

খুশি
0
আরও উন্নত হতে পারে
0

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *