প্রসঙ্গ : আসমানের দিকে ইশারা করে আল্লাহ তাআলার নাম বলা
প্রশ্ন : বয়ান ও আলোচনার সময় নিজের হাত দিয়ে আসমানের দিকে ইশারা করে আল্লাহ তাআলার নাম বলা যাবে কি না?
উত্তর : এভাবে ইশারা করে না বলা উচিত। তবে কুরআন-হাদীসে আল্লাহ তাআলার দিকে আসমানের সম্বন্ধ করে ‘আল্লাহ আসমানে’ বলা হয়েছে। যেমন : কুরআনে এসেছে, ‘তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়ে গেছ যে, যিনি আসমানে ? (সূরা মূলক,আয়াত: ১৭)
তিরমিযীর সহীহ হাদীসে রয়েছে, ‘তোমরা জমিনওয়ালাদের ওপর রহম করো। তাহলে আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের ওপর রহম করবেন।'(তিরমিজি, হাদিস : ১৯২৪)
উক্ত আয়াত ও এ-জাতীয় হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমামগণ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ‘স্থান’ ও ‘দিক’ থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু অন্যান্য দিক থেকে ‘ওপরের দিক’ অধিকতর মর্যাদাবান, তাই ‘আল্লাহ আসমানে’ বলে ‘ওপরের দিক টাকে আল্লাহ তাআলার দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে। এর দ্বারা ইশারা হলো, আল্লাহ তাআলার সত্তা ও তাঁর সিফাত সুউচ্চ ও সমুন্নত।
এর কারণ হলো, আরবীতে (السماء) শব্দটি ‘আসমান/আকাশ” অর্থে প্রসিদ্ধ হলেও শব্দটি অধিক, অত্যন্ত ও সুউচ্চ বোঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়, অর্থাৎ ‘অমুক আসমানে তথা তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও অত্যন্ত সম্মানিত’ বা ‘তার অবস্থা, সম্মান ও মর্যাদা সুউচ্চ।’
আমাদের বাংলা ভাষাতেও এমন ব্যবহার হয়। যেমন বলা হয়, ‘আকাশচুম্বী মর্যাদা’, ‘আকাশচুম্বী দাম’, ‘আকাশচুম্বী সাফল্য’ ইত্যাদি।
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার শামসুদ্দীন কিরমানী রাহ. (মৃ. ৭৮৬ হি.) লেখেন,‘তুমি যদি প্রশ্ন করো, আল্লাহ তাআলা ‘স্থান’ ও ‘দিক’ থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও ‘আল্লাহ আসমানে’ বলার কী উদ্দেশ্য?
আমি উত্তরে বলব, যেহেতু ‘ওপরের দিক’ অধিকতর মর্যাদাবান, তাই ‘ওপরের দিক’টাকে আল্লাহ তাআলার দিকে সম্বন্ধ করা হয়। এর দ্বারা ইশারা হলো, আল্লাহ তাআলার সত্তা ও তাঁর সিফাত সুউচ্চ হওয়া। এ হিসেবে নয় যে, তা আল্লাহ তাআলার ‘স্থান’ বা ‘দিক’, যা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে।
বুখারী শরীফের আরেক শাফেয়ী ব্যাখ্যাকার প্রখ্যাত হাদীসবিশারদ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (মৃ. ৮৫২ হি.) কিরমানী থেকে নকল করেন,‘“আল্লাহ আসমানে’ বাক্য থেকে বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা ‘স্থানে’ প্রবিষ্ট হওয়া থেকে পবিত্র। তবে অন্যান্য দিক থেকে যেহেতু ‘ওপরের দিক’ অধিকতর মর্যাদাবান, তাই ‘ওপরের দিক’টাকে আল্লাহ তাআলার দিকে নিসবত করে ইশারা করা হলো যে, তাঁর সত্তা ও সিফাত সমুন্নত হওয়া।
বুখারীর অন্যতম হানাফী ব্যাখ্যাকার আল্লামা আইনী রাহ. (মৃ. ৮৫৫ হি.) বলেন, ‘অন্যান্য দিক থেকে ‘ওপরের দিক’ অধিক মর্যাদাবান, তাই সেই দিকটাকে আল্লাহ তাআলার দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে। এ থেকে উদ্দেশ্য হলো, তাঁর সত্তা ও সিফাত তিনি বহু ঊর্ধ্বে।’ সমুন্নত হওয়া। এ হিসেবে নয় যে, তা আল্লাহ তাআলার ‘স্থান’ বা ‘দিক’, যা থেকে রাহ.-ও (মৃ. ৯২৩ হি.) বলেছেন,
একই কথা বুখারী শরীফের আরেক ব্যাখ্যাকার আল্লামা শিহাবুদ্দীন কাসতাল্লানী (রহ:) ও বলেছেন ‘আল্লাহ তাআলার সত্তা ‘স্থান’ ও ‘দিক’ থেকে পবিত্র। কাজেই ‘আল্লাহ আসমানে’ থেকে উদ্দেশ্য হলো, তাঁর সত্তা ও সিফাত সমুন্নত হওয়া। এ হিসেবে নয় যে, তা আল্লাহ তাআলার ‘স্থান’, যা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে।’
ইমামগণের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলাকে ‘স্থান’ ও ‘দিক’ থেকে পবিত্র বিশ্বাস করা সত্ত্বেও যেহেতু অন্যান্য দিক থেকে ‘ওপরের দিক’ অধিক মর্যাদাবান, তাই আসমানের দিকে ইশারা করে আল্লাহ তাআলার সাথে কথা বলার সুযোগ রয়েছে। বিশেষত সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে, ‘বিদায় হজের ভাষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাকো”—এ কথা বলে আসমানের দিকে ইশারা করেছেন।’ তবে শ্রোতারা ‘আসমান’কে আল্লাহ তাআলার ‘স্থান’ মনে করার আশঙ্কা রয়েছে, তাই এমন না করা চাই। কেননা, আকীদার হেফাজত করা জরুরি।
তথ্য সূত্রঃ
কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১
লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম