গান, বাজনা এবং বাদ্যযন্ত্র কেনো হারাম??
যে সকল পথ দিয়ে শয়তান মানুষের মনের কোণে আসন পেতে নিতে পারে, তার মধ্যে তিনটি প্রধান পথ হল, মানুষের ঔদাস্য, ক্রোধ ও কাম। একটু উদাসীন অথবা ক্রোধান্বিত হলে শয়তান যেমন সত্বর মনের সিংহাসনে আরোহণ করে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে বিপদে ফেলে থাকে, ঠিক তেমনি কাম ও কামনার ছিদ্রপথে প্রবেশ করে শয়তান প্রবৃত্তি-পূজায় লিপ্ত করে মানুষকে। তার মনে নতুন নতুন বাসনা সৃষ্টি করে এবং সেই বাসনা চরিতার্থ করার বিভিন্ন উপায়-উপকরণও বাতলে দেয়। গান-বাজনা এমনই এক শয়তানী উপকরণ, যার মাধ্যমে মানুষ তার কামনা-বাসনায় পরিপূর্ণ জ্বালাময় হৃদয়ে অপূর্ব শান্তির দিশা পায়। নিরানন্দ চিত্তে আনন্দের তুফান আনতে সক্ষম হয়। আর এরই মাঝে শয়তান ঐ মানুষের মনে গাফলতি ও ঔদাস্য সৃষ্টি করতে আরো সহজ রাস্তা পায়।
এর ফলে ধীরে-ধীরে সে মানুষকে তার আসল প্রভুর স্মরণ ও দাসত্ব থেকে দূরে সরিয়ে এনে নিজের দাস বানিয়ে নিতে কৃতার্থ হয়। কিছু যুবক আছে; যাদেরকে দ্বীনের কাজে আসতে বললে তারা বলে, কি করি? সময় পাই । অথচ যখন তাকে তাস, কেরাম বা দাবা খেলাতে অথবা গান-বাজনা শুনতে দেখে যদি বলা হয় যে, এ কাজ কেন করছ? এ তো হারাম!’ তখন চট করে সে বলে, কি করি বলুন? সময় তো কাটাতে হবে!’ এমন মানুষ দ্বীনের কথা শোনার জন্য সময় পায় না, আবার তার হাতে এত জ্বালাময় সময় আছে যে, তা কোন মন-মাতানো, হৃদয়-ভুলানো উদাসকারী বিষয় ছাড়া কাটতেই চায় না। এমন মানুষের মনে শয়তানের বড় প্রভাব থাকে।
এ ধরনের পরস্পর-বিরোধী জবাব দিয়ে সে শুধুমাত্র পিছল কেটে নিজ দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতি সাধন করে থাকে। কখনো বা গান-বাজনার নেশায় সংসারের কাজ ও কর্তব্য ভুলে বা ছেড়ে বসে। অবহেলা প্রদর্শন করে সামাজিক কাজেও। এস, এবারে দেখা যাক কোন্ কিতাবে আছে রে ভাই হারাম বাজনা-গান? কুরআন শরীফের সূরা লুকমানের ৬নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অন্ধভাবে অসার বাক্য ক্রয় করে (বেছে নেয়) এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।”
ইবনুল কাইয়িম রহ বলেন,
الأحاديثُ الواردة في ذَمِّ الغناء وتحريمه متواترةٌ، وعدَدُ رُواتها ثلاثةَ عشر صحابيًّا، وهم: أبو مالكٍ الأشعري، وسهل بن سعد، وعمران بن حُصَين، وعبدالله بن عمرو، وعبدالله بن عباس، وأبو هريرة، وأبو أُمَامة الباهلي، وعائشة، وعلي بن أبي طالب، وأنس بن مالك، وعبدالرحمن بن سابط، والغازي بن ربيعة، وعبدالله بن عمر
গান নিষেধ ও হারাম হওয়া সম্পর্কিত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির। এ সম্পর্কে ১৩ জন সাহাবি থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা হলেন, আবু মালিক আশআ’রী, সাহল ইবন সা’দ, ইমরান ইবন হুসাইন, আব্দুল্লাহ ইবন আমর, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবু হুরাইরা, আবু উমামা আলবাহিলি, আয়েশা, আলী ইবন আবী তালিব, আনাস ইবন মালিক, আব্দুর রহমান ইবন সাবিত, আল্ গাজী ইবন রবীয়া ও আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম। (ইগাসাতুল লাহফান ১/২৬০)
তম্মধ্য থেকে নিম্নে কিছু হাদিস পেশ করা হল–
এক- আবু মালিক আশআ’রী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَيَشْرَبَنَّ نَاسٌ مِنْ أُمَّتِي الْخَمْرَ ، يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا ، يُعْزَفُ عَلَى رُءُوسِهِمْ بِالْمَعَازِفِ وَالْمُغَنِّيَاتِ ، يَخْسِفُ اللَّهُ بِهِمْ الْأَرْضَ ، وَيَجْعَلُ مِنْهُمْ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ
আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন। আর তাদের কিছুকে বানর ও শূকর বানিয়ে দিবেন। (ইবন মাজাহ ৪০২০ সহীহ ইবনে হিব্বান ৬৭৫৮)
দুই- সাহল ইবন সা’দ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
سَيَكُوْنُ فِيْ آخِرِ الزَّمَانِ خَسْفٌ وَقَذْفٌ وَمَسْخٌ ، قِيْلَ: وَمَتَى ذَلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ ؟ قَالَ: إِذَا ظَهَرَتِ الْمَعَازِفُ وَالْقَيْنَاتُ
অচিরেই শেষ যুগে দেখা দিবে ভূমি ধস, নিক্ষেপ ও বিকৃতি। রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহ্’র রাসূল! তা কখন? তিনি বললেন, যখন বাদ্যযন্ত্র ও গায়ক-গায়িকারা বেশি হারে প্রকাশ পাবে। (ইবনু মাজাহ্ ২/১৩৫০)
তিন- ইমরান ইবন হুসাইন রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
فِي هَذِهِ الأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ . فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَتَى ذَاكَ قَالَ إِذَا ظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْخُمُورُ
এই উম্মতের জন্য ভূমিধ্বস, চেহারা বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণের আযাব রয়েছে। জনৈক মুসলিম ব্যক্তি তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, কখন হবে তা? তিনি বললেন, যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে এবং মদ্যপান দেখা দিবে। (তিরমিযী ২২১৫)
চার- আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ ﷺ نَهَى عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَالْكُوبَةِ وَالْغُبَيْرَاءِ وَقَالَ كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
রাসূলুল্লাহ ﷺ শরাব পান করতে, জুয়া খেলতে, ঢোল বা তবলা বাজাতে এবং ঘরের তৈরী শরাব পান করতে নিষেধ করেছেন। আর বলেছেন, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই হারাম। (আবু দাউদ ৩৬৪৪)
অনুরূপ হাদিস মুসনাদে আহমাদে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে।
পাঁচ- আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِذَا اتُّخِذَ الْفَئُْ دُوَلاً، وَالأَمَانَةُ مَغْنَماً، والزَّكَاةُ مَغْرَماً، وَتُعُلَّمَ الْعِلْمُ لِغَيْر الدِّين، وَأَطَاعَ الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ، وَعَقَّ أُمَّهُ، وأَدْنَى صَدِيقَهُ، وأُقْصَى أبَاهُ، وظَهَرَتِ الأصْوَاتُ فى المسَاجدِ، وسَادَ الْقَبيلَةَ فَاسِقُهُمْ، وَكانَ زَعِيمَ الْقَوْمِ أَرْذَلُهُمْ، وَأُكْرِمَ الرَّجُلُ مخَافَةَ شَرِّهِ، وَظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالمَعَازِفُ، وشُرِبَتِ الْخَمْرُ، وَلَعَنَ آخِرُ هذِهِ الأُمَّةِ أَوَّلهَا، فَلْيَرْ تَقِبُوا عِنْدَ ذلِكَ رِيحاً حَمْرَاءَ، وَزَلْزَلَةً وَخَسْفاً، وَمَسْخاً، وَقَذفاً، وآيَاتٍ تتابع كَنِظَامٍ بَالٍ قُطِعَ سِلْكُهُ فَتَتَابَعَ
গনীমত সম্পদ যখন ব্যক্তিগত সম্পদ বলে গণ্য করা হবে, যাকাত হবে জরিমানা বলে, দ্বীনী উদ্দেশ্য ছাড়া ইলম অর্জন করা হবে, পুরুষরা স্ত্রীদের আনুগত্য করবে, এবং মা‘দের অবাধ্য হবে, বন্ধুদের নিকট করবে আর পিতাকে করবে দূর, মসজিদে শোরগোল করবে, পাপাচারীরা গোত্রের নেতা হয়ে বসবে, নিকৃষ্ট লোকেরা সমাজের নেতা হবে, অনিষ্টের আশংকায় একজনকে সম্মান করা হবে, গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে, মদ্যপান দেখা দিবে, উম্মতের শেষ যুগের লোকেরা প্রথম যুগের লোকদেরকে অভিসম্পাত করবে তখন তোমরা অপেক্ষা করবে অগ্নিবায়ু, ভূমিকম্প, চেহারা বিকৃতি, পাথর বর্ষণের আযাবের এবং আরো আলামতের যা পরপর নিপতিত হতে থাকবে, যেমন একটি পুরান হারের সূতা ছিড়ে গেলে একটার পর একটা দানা পড়তে থাকে। (তিরমিযী ২২১৪)
ছয়- আবু উমামা আলবাহিলি রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لاَ تَبِيعُوا الْقَيْنَاتِ وَلاَ تَشْتَرُوهُنَّ وَلاَ تُعَلِّمُوهُنَّ وَلاَ خَيْرَ فِي تِجَارَةٍ فِيهِنَّ وَثَمَنُهُنَّ حَرَامٌ
গায়িকা দাসী বিক্রি করবে না। এবং কিনবেও না। তাদের গান শিক্ষা দিবে না। এদের ব্যবসায়ে কোন কল্যাণ নাই। এদের মূল্য হারাম। (তিরমিযী ১২৮৫)
সাত- আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি আয়েশা রাযি.-এর নিকট গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিল আরো একজন। তখন লোকটি বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাদেরকে ভূমিকম্প সম্পর্কে বলুন। তখন আয়েশা রাযি. বললেন,
إِذَا اسْتَبَاحُوا الزِّنَا ، وَشَرِبُوا الْخَمْرَ ، وَضَرَبُوا بِالْمَغَانِي ، وَغَارَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي سَمَائِهِ فَقَالَ لِلأَرْضِ : تَزَلْزَلِي بِهِمْ ، فَإِنْ تَابُوا وَنَزَعُوا ، وَإِلا هَدَمَهَا عَلَيْهِمْ
যখন লোকেরা ব্যভিচারকে বৈধ মনে করবে, মদ পান করবে এবং গানের চর্চা করবে আর আল্লাহ নিজ আকাশে ক্রোধান্বিত হবেন তখন তিনি জমিনকে বলবেন, এদেরকে নিয়ে প্রকম্পিত হও, যদি তারা তাওবা করে আর এসব ছেড়ে দেয় (তাহলে নয়)। অন্যথায় এদেরকে ধ্বংস করে দাও। (আল উ’কুবাত লি আবিদ্দুনয়া ৬)
আট- আলী ইবন আবী তালিব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِذَا فَعَلَتْ أُمَّتِي خَمْسَ عَشْرَةَ خَصْلَةً حَلَّ بِهَا الْبَلاَءُ ” . فَقِيلَ وَمَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ” إِذَا كَانَ الْمَغْنَمُ دُوَلاً وَالأَمَانَةُ مَغْنَمًا وَالزَّكَاةُ مَغْرَمًا وَأَطَاعَ الرَّجُلُ زَوْجَتَهُ وَعَقَّ أُمَّهُ وَبَرَّ صَدِيقَهُ وَجَفَا أَبَاهُ وَارْتَفَعَتِ الأَصْوَاتُ فِي الْمَسَاجِدِ وَكَانَ زَعِيمُ الْقَوْمِ أَرْذَلَهُمْ وَأُكْرِمَ الرَّجُلُ مَخَافَةَ شَرِّهِ وَشُرِبَتِ الْخُمُورُ وَلُبِسَ الْحَرِيرُ وَاتُّخِذَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْمَعَازِفُ وَلَعَنَ آخِرُ هَذِهِ الأُمَّةِ أَوَّلَهَا فَلْيَرْتَقِبُوا عِنْدَ ذَلِكَ رِيحًا حَمْرَاءَ أَوْ خَسْفًا وَمَسْخًا
আমার উম্মত যখন এ পনেরটি বিষয়ে লিপ্ত হবে তখন তাদের উপর মুসিবত নিপতিত হবে। জিজ্ঞাসা করা হল, সেগুলো কি ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বললেন, যখন গনীমত পরিণত হবে ব্যক্তিগত সম্পদে, আমানত পরিণত হবে লুটের মালরূপে, যাকাত গণ্য হবে জরিমানারূপে, পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের অনুগত হবে আর মা‘দের হবে অবাধ্য, বন্ধুদের সাথে তো সদাচারণ করবে অথচ পিতার সঙ্গে করবে দুর্ব্যবহার, মসজিদে শোরগোল করা হবে, নিকৃষ্টতম চরিত্রের লোকটি হবে তার সম্প্রদায়ের নেতা, কেবল অনিষ্টের ভয়ে কোন ব্যক্তিকে সম্মান করা হবে, মদপান করা হবে, রেশম বস্ত্র পরিধান করা হবে, গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের রেওয়াজ চলবে, উম্মতের শেষ যুগের লোকেরা প্রথম যুগের লোকদের অভিসম্পাত করবে তখন তোমরা অপেক্ষা করবে অগ্নিবায়ু বা ভূমিধ্বস বা চেহারা বিকৃতির আযাবের। (তিরমিযী ২২১৩)
নয়- আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
بَعَثَنِي اللهُ رَحْمَةً وَهَدًى لِلْعَالَمِينَ وَبَعَثَنِي لِمَحْقِ الْمَعَازِفِ وَالْمَزَامِيرِ، وَأَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ
আল্লাহ তাআলা আমাকে মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহেলি প্রথা বিলোপসাধনের নির্দেশ দিয়েছেন। (শুয়া’বুল ঈমান, বাইহাকি ৬০২৭)
দশ- বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত নাফে’ রহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একবার চলার পথে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বাঁশির আওয়াজ শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে আঙ্গুল দিলেন। কিছু দূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে নাফে’! এখনো কি আওয়াজ শুনছ? আমি বললাম হ্যাঁ। অতঃপর আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না তখন তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরালেন এবং বললেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ চলার পথে বাঁশির আওয়াজ শুনে এমনই করেছিলেন। (মুসনাদে আহমদ ৪৫৩৫ আবু দাউদ ৪৯২৪ )
একদিন আমার এক ছাত্র এসে বলল, উস্তাদ! গান শোনা তো জায়েয হয়ে গিয়েছে। এই বলে সে একটি মাসিক পত্রিকার রেফারেন্স দেখাল। আরেক ছাত্র বলল, উস্তাদ! ড. ইউসুফ কারযাভী তো বাদ্যসহ গানকে জায়েয বলেছেন! গান-বাজনার পক্ষে কেউ এই যুক্তি দেন যে, দফ ছিল তৎকালীন আরবের বাদ্যযন্ত্র। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন তা আরো উন্নত হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ এমন কথাও বলেন যে, বিয়ে-শাদিতে গান-বাজনা করা সুন্নত। কিছুদিন পর আমার সেই ছাত্র এসে বলল, উস্তাদ! বাদ্যসহ গান জায়েয, এটা শোনার পর গানের প্রতি আমার সংকোচ কেটে গেছে। কেমন আনন্দ আনন্দ লাগছে। এই বিষয়ে আপনি কিছু একটা বলুন।
বিষয়টি আমি অনুধাবন করলাম এবং সুস্পষ্টভাবেই বুঝতে পারলাম যে, এ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত শোনার চেয়ে প্রিয় শিল্পীর গান শোনাই তার কাছে বেশি ভালো লাগবে। আর ইবলিস শয়তান তো এটাই চায় যে, আল্লাহর বান্দা কুরআন থেকে দূরে থাকুক। এজন্যই তো আবু বকর রা. গানবাদ্যকে শয়তানের বাঁশি বলে আখ্যায়িত করেছেন। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার চেয়েও এটা ভয়ঙ্কর।
কুরআনের ভাষ্য : আল্লাহ তাআলা সূরা লুকমানে আখেরাত-প্রত্যাশী মুমিনদের প্রশংসা করার পর দুনিয়া-প্রত্যাশীদের ব্যাপারে বলছেন,
আর একশ্রেণীর লোক আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার বস্তু ক্রয় করে বান্দাকে আল্লাহর পথ থেকে গাফেল করার জন্য।-সূরা লুকমান : ৬
উক্ত আয়াতের শানে নুযূলে বলা হয়েছে যে, নযর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে একটি গায়িকা বাঁদী খরিদ করে এনে তাকে গান-বাজনায় নিয়োজিত করল। কেউ কুরআন শ্রবণের ইচ্ছা করলে তাকে গান শোনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ করত এবং বলত মুহাম্মদ তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে নামায, রোযা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে। এতে শুধু কষ্টই কষ্ট। তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর।-মাআরিফুল কুরআন ৭/৪
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত নাযিল করেন।
সাহাবী ও তাবেয়ীদের ব্যাখ্যা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. কে উক্ত আয়াতের ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তা হল গান।’ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একই কথা বলেন। তাবেয়ী সায়ীদ ইবনে যুবাইর থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে।
বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী রাহ. বলেন, উক্ত আয়াত গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, যা বান্দাকে কুরআন থেকে গাফেল করে দেয়।-তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/৪৪১
কুরআন মজীদের অন্য আয়াতে আছে, ইবলিস-শয়তান আদম সন্তানকে ধোঁকা দেওয়ার আরজী পেশ করলে আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে বললেন,
তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর।-সূরা ইসরা : ৬৪
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তাই ইবলিসের আওয়াজ।
বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা। এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯
সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী বহু গুনাহর সমষ্টি হল গান ও বাদ্যযন্ত্র। যথা :
ক) নিফাক এর উৎস
খ) ব্যভিচারের প্রেরণা জাগ্রতকারী
গ) মস্তিষ্কের উপর আবরণ
ঘ) কুরআনের প্রতি অনিহা সৃষ্টিকারী
ঙ) আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী
চ) গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ও
ছ) জিহাদী চেতনা বিনষ্টকারী।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭
বস্তুত গান বাজনার ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো দলীল খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বহু হাদীসের মাধ্যমে তা প্রমাণিত।
হাদীসের ভাষ্য
গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় কর না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১২৮২; ইবনে মাজাহ হাদীস : ২১৬৮
বর্তমানে গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে যাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, এর সকল উপার্জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস অনুযায়ী সম্পূর্ণ হারাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন।-সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ৪০২০; সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস : ৬৭৫৮
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২
উপরোক্ত বাণীর সত্যতা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। গান-বাজনার ব্যাপক বিস্তারের ফলে মানুষের অন্তরে এই পরিমাণ নিফাক সৃষ্টি হয়েছে যে, সাহাবীদের ইসলামকে এ যুগে অচল মনে করা হচ্ছে এবং গান-বাদ্য, নারী-পুরুষের মেলামেশা ইত্যাদিকে হালাল মনে করা হচ্ছে। সহীহ বুখারীতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।-সহীহ বুখারী হাদীস : ৫৫৯০ মুসনাদে আহমদের হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
আল্লাহ তাআলা আমাকে মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহেলি প্রথা বিলোপসাধনের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদীসের আলোয় সাহাবীদের জীবন
দু’একটি ক্ষেত্রে শুধু দফ বাজানোর বিষয়টি ব্যতিক্রম থাকলেও যে কোনো বাদ্যযন্ত্রই হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস এবং সাহাবীদের বাস্তব আমল তা প্রমাণ করে।
বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত নাফে’ রাহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার চলার পথে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বাঁশির আওয়াজ শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে আঙ্গুল দিলেন। কিছু দূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে নাফে’! এখনো কি আওয়াজ শুনছ? আমি বললাম হ্যাঁ। অতঃপর আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না তখন তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরালেন এবং বললেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলার পথে বাঁশির আওয়াজ শুনে এমনই করেছিলেন। -মুসনাদে আহমদ হাদীস : ৪৫৩৫; সুনানে আবু দাউদ হাদীস : ৪৯২৪ বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. থেকেও এমন একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।-ইবনে মাজাহ হাদীস : ১৯০১
একটু ভেবে দেখুন তো, যে আওয়াজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম মুহূর্তের জন্যও কানে তুলতে রাজি ছিলেন না সেই ইবলিসী আওয়াজের অনুকূলে কথা বলার দুঃসাহস আমরা দেখাতে পারি কি না?
বাজনাদার নুপুর ও ঘুঙুরের আওয়াজও সাহাবায়ে কেরাম বরদাশত করতেন না। তাহলে গান ও বাদ্যযন্ত্রের প্রশ্নই কি অবান্তর নয়? নাসাঈ ও সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে, একদিন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট বাজনাদার নুপুর পরে কোনো বালিকা আসলে আয়েশা রা. বললেন, খবরদার, তা কেটে না ফেলা পর্যন্ত আমার ঘরে প্রবেশ করবে না। অতঃপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
যে ঘরে ঘণ্টি থাকে সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।-সুনানে আবু দাউদ হাদীস : ৪২৩১; সুনানে নাসাঈ হাদীস : ৫২৩৭
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঘণ্টি, বাজা, ঘুঙুর হল শয়তানের বাদ্যযন্ত্র।-সহীহ মুসলিম হাদীস : ২১১৪
মৃদু আওয়াজের ঘণ্টি-ঘুঙুরের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আধুনিক সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের বিধান কী হবে তা খুব সহজেই বুঝা যায়।
চার ইমামের ভাষ্য
গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সকলেই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম মালেক রাহ. কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে।-কুরতুবী ১৪/৫৫
ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হল আহমক।
তিনি আরো বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯; কুরতুবী ১৪/৫৫
হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরূহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম।-আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮
ইমাম শাফেয়ী রাহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলীমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলীমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদীসে রয়েছে।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১০৮৯; সহীহ বুখারী হাদীস : ৫১৪৭, ৫১৬২
মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হল বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়।-ফাতহুল বারী ৯/২২৬
দফ-এর পরিচয়
যারা সরাসরি আরবে দফ দেখেছেন, তাদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, দফ-এর এক পাশ খোলা। বাজালে ঢ্যাব ঢ্যাব আওয়াজ হয়। প্লাস্টিকের গামলা বাজালে যেমন আওয়াজ হবে তেমন। আসলে দফ কোনো বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না।
আওনুল বারী গ্রন্থে দফ-এর পরিচয় দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে যে, এর আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়। কোনো দফ-এর আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয় তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে।-আওনুল বারী ২/৩৫৭
আর দফ-এর মধ্যে যখন বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এসে যাবে তখন তা সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েয বলে পরিগণিত হবে।-মিরকাত ৬/২১০
এখন কেউ যদি বলেন, তৎকালীন যুগে দফ ছিল আরবের সর্বোচ্চ বাদ্যযন্ত্র, বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তা-ই উন্নত হয়েছে। তাহলে একে অজ্ঞতাপ্রসূত অবাস্তব কথা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারি না। কেননা একাধিক হাদীসে ঢোল, তবলাসহ অনেক বাদ্যযন্ত্রের নাম এসেছে। বাস্তবে না থাকলে এসব বাদ্যযন্ত্রের নাম আসবে কোত্থেকে? তাছাড়া মুহাদ্দিসদের ভাষ্য অনুযায়ী দফ বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না, যা ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি। আরবে এখনো দফ বিদ্যমান আছে।
দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদানী উস্তাদকে ছাত্ররা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, দফ তো বাচ্চাদের জন্য, আর বড়দের জন্য হল কুরআন। পরিণত ব্যক্তিদের জন্য কুরআন ছেড়ে এসবের মধ্যে লিপ্ত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এরপরও যদি মেনে নেওয়া হয় যে, তৎকালীন যুগে দফ সর্বোচ্চ বাদ্যযন্ত্র ছিল তবে তাতেই বা লাভ কী? বাদ্যযন্ত্রকে তো আর জায়েয বানানো যাচ্ছে না। হাদীসে রাসূলই তাকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছে। ইসলামকে আধুনিক বানানোর ‘সদুদ্দেশ্যে’ আজ কেউ কেউ ফতোয়া দিচ্ছেন যে, মেয়েদের সাথে হাত মেলানো জায়েয, নারী-পুরুষের মাঝে পর্দা বিধানের এত কড়াকড়ির প্রয়োজন নেই, গান-বাদ্য, সিনেমা, টেলিভিশন এসব তো বিনোদনেরই অংশ। ক্লীন শেভে কোনো সমস্যা নেই, দাড়ি ইসলামের কোনো জরুরি বিষয় নয় ইত্যাদি বহুবিধ ‘আধুনিক’, ‘অতি আধুনিক’ ফাতাওয়া আজ শুনতে পাওয়া যায়। মনে রাখা উচিত যে, ইসলাম অন্যান্য ‘ধর্মে’র মতো নয়; বরং তা আল্লাহ প্রদত্ত চির আধুনিক আদর্শ, একে নিজেদের পক্ষ থেকে আরো অতি আধুনিক বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। ইসলামে যেমন বাড়াবাড়ির অবকাশ নেই, তেমন ছাড়াছাড়িরও সুযোগ নেই। ইসলাম হল মধ্য পন্থা। যে বিধান যতটুকু দেওয়া প্রয়োজন আল্লাহ তাআলা তা ততটুকুই দিয়েছেন। এর পূর্ণ অনুসরণই যে সকল কল্যাণের সূত্র সাহাবায়ে কেরামের পুণ্যযুগই তার বাস্তব প্রমাণ। আমরাও যদি কল্যাণের প্রত্যাশা করি তাহলে আমাদেরকেও ইসলামের সকল বিধানের পূর্ণ অনুসরণ করতে হবে এবং আমাদের ঈমান, আমল ও ফতোয়া সবকিছুকে যাচাই করতে হবে তাদেরই মানদণ্ডে।
আমরা কেউ তো এ দাবি করতে পারি না যে, সাহাবীদের চেয়ে ইসলামকে ও রাসূলের হাদীসকে চেপ্টা করে আমরা বেশি বুঝে ফেলেছি। বাদ্যসহ কাওয়ালি
সুফী সাধকের নাম ব্যবহারকারী একটি জগতেও আজ আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। তাই আধুনিক কিছু সুফী বলে থাকে, বাদ্যসহ যিকির ও কাওয়ালি জায়েয। দলীল হিসেবে তারা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম এ বর্ণিত দুটি বালিকার দফ বাজিয়ে কবিতা গাওয়ার হাদীসটি উপস্থাপন করে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. লেখেন, উক্ত হাদীসে আয়েশা রা.-এর বর্ণনাই তাদের অবাস্তব দাবির বিরুদ্ধে উৎকৃষ্ট জবাব। গান-বাদ্য যে নাজায়েয এই বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য হাদীসের রাবী হযরত আয়েশা রা. বলছেন, উক্ত বালিকাদ্বয় কোনো গায়িকা ছিল না। তারা কোনো গান গায়নি।-ফাতহুল বারী ২/৪৪২
ইমাম কুরতুবী রাহ. বলেন, গান বলতে যা বুঝায়, বালিকাদ্বয় তা গায়নি। পাছে কেউ ভুল বুঝতে পারে তাই আয়েশা রা. বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
ইমাম কুরতুবী আরো বলেন, বর্তমানে একশ্রেণীর সুফীরা যে ধরনের গান ও বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন ঘটিয়েছে তা সম্পূর্ণ হারাম।-তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫৪
বিখ্যাত সাধক হযরত জুনাইদ বাগদাদী রাহ. তার যুগে কাওয়ালি শোনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, বর্তমানে কাওয়ালি শোনার শর্তগুলো পালন করা হয় না। তাই আমি এর থেকে তওবা করছি।-আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৯২
জুনাইদ বাগদাদী রাহ.-এর যুগেরই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আমাদের যুগের অবস্থা কেমন হবে তা ভাববার বিষয়। এক বিদ্যান ব্যক্তি একটি শিক্ষণীয় উক্তি করেছিলেন যে, তোমরা আধুনিক হও ভালো কথা, কিন্তু আধুনিক হতে গিয়ে মনুষ্যত্বের সীমানা অতিক্রম করো না এবং শয়তানের দোসর বনে যেও না।
বর্তমান যুগে গান-বাজনা অনেকের জীবনের বিনোদনমূলক চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গান শুনে না এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অবসর পেলে অধিকাংশ লোকজন গান শোনায় ব্যস্ত হয়ে উঠে। আসুন দেখি, পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ কী বলে গান-বাজনা সম্পর্কে। গান-বাজনার প্রতি আগ্রহী ব্যক্তির শাস্তি খুবই ভয়াবহ। এসব কাজের ভালো-মন্দ বিবেচনা করা হয় চোখ ও কানের মাধ্যমে। তাই আল্লাহ তাআলা তার জন্য এমন শাস্তি নির্ধারণ করেছেন, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও অপমানজনক।
আল্লাহ তাআলা বলেন,وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ ‘আর মানুষের মধ্যে থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা ক্রয় করে। আর তারা এগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাজনক আযাব’ (লুক্বমান, ৩১/৬)।
আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি ‘লাহওয়াল হাদীছ’ ক্রয় করে, সে জাহান্নামে কঠিন শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। কাজেই তা হারাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘লাহওয়াল হাদীছ’ কী? উক্ত আয়াতে বর্ণিত ‘লাহওয়াল হাদীছ’-এর ব্যাখ্যায় তাফসীর ইবনে কাছীরে বলা হয়েছে, তা হলো গান-বাজনা।[1]
উক্ত আয়াত সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘ঐ সত্তার কসম, যিনি ছাড়া প্রকৃত কোনো মা‘বূদ নেই! নিশ্চয়ই এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গান’। তিনি একথাটি তিনবার বলেন।[2]
এভাবে বেশির ভাগ মুফাসসির ‘লাহওয়াল হাদীছ’ বলতে গান-বাজনাকে বুঝিয়েছেন। উপরিউক্ত আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, গান-বাজনা হারাম। যারা গান-বাজনা করে ও শোনে, তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।
ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মদ, জুয়া ও সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন’।[3]
এই হাদীছ থেকেও আমরা জানতে পারলাম যে, গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র হারাম।
নাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বাঁশির শব্দ শুনতে পেলে তিনি তার দুই কানে আঙুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গেলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, ‘হে নাফে‘! তুমি কি কিছু শুনতে পাচ্ছ?’ আমি বললাম, ‘না’। অতঃপর তিনি তাঁর দুই আঙুল কান হতে বের করে বললেন, আমি একদা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। অতঃপর তিনি এমন (বাঁশির আওয়াজ) শুনে এরূপ করেছিলেন’।[4] এই হাদীছ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, যেখানে গান-বাজনা হয় সেখানে থাকা যাবে না। গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দ যেন কানে না আসে তার সম্ভবপর চেষ্টা করতে হবে।
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَيَكُوْنَنَّ فِيْ هَذِهِ الْأُمَّةِ خَسْفٌ وَ قَذْفٌ وَمَسْخٌ وَذَلِكَ إِذَا شَرِبُوْا الْخُمُوْرَ وَاتَّخَذُوْا الْقَيْنَاتِ وَضَرَبُوْا بِالْمَعَازِفِ ‘অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে ভূমি ধস, পাথর বর্ষণ ও আকার-আকৃতির বিকৃতিসাধন হবে, যখন তারা মদপান করবে, নর্তকী গ্রহণ করবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে’।[5]
হতে পারে, বর্তমানে আমাদের উপর যে বিপদগুলো আসছে তার মধ্যে অনেকগুলোই মদ্যপান, গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার ফল। অধিকাংশ বাড়িতে বাজনা বাজে, অধিকাংশ হোটেলেই বাজনা বাজে, তাই তো এত বিপদ। আমাদের এসব বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সকলকে চেষ্টা করতে হবে এসব হতে বিরত থাকতে ও অন্যকে বিরত রাখতে।
ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অবশ্যই অবশ্যই আমার উম্মতের কিছু সম্প্রদায় রাত অতিবাহিত করবে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য-পানীয় এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদন, আমোদ-প্রমোদের সামগ্রী নিয়ে, অতঃপর তাদের সকাল হবে শূকর ও বানরের আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে’।[6]
আবূ মালেক আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মাঝে কিছু মানুষ মদপান করবে (মদের) ভিন্ন নাম দিয়ে। তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র বাজানো হবে এবং গায়িকারা গান পরিবেশন করবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জমিনে ধসিয়ে দিবেন এবং তাদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করবেন’।[7]
এই হাদীছ দ্বারা জানা যায় যে, মানুষ মদপান করবে কিন্তু তার নাম দিবে ভিন্ন। আমাদেরকে এসব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। অন্যথা আমাদেরকে আরো কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।
গান-বাজনার ক্ষতিকর দিক :
ইসলাম কোনো জিনিসের মধ্যে ক্ষতিকারক কোনো কিছু না থাকলে তাকে হারাম করে না। গান-বাজনার মধ্যে নানা ধরনের ক্ষতিকর দিক রয়েছে। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এ সম্পর্কে বলেছেন, গান-বাজনা হচ্ছে নফসের মদস্বরূপ। মদ যেমন মানুষের ক্ষতি করে, বাদ্যযন্ত্রও মানুষের সেই রকম ক্ষতি করে। যখন গান-বাজনা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখনই তারা শিরকে পতিত হয়। আর তখন তারা অশ্লীল কাজ ও যুলম করতে উদ্যত হয়। তারা শিরক করতে থাকে এবং যাদের হত্যা করা নিষেধ তাদেরকেও হত্যা করতে থাকে, যেনা করতে থাকে। যারা গান-বাজনায় জড়িত, তাদের বেশির ভাগের মধ্যেই এই তিনটি দোষ দেখা যায়। তাদের বেশির ভাগই মুখ দিয়ে শিস দেয় ও হাততালি দেয়।[8]
শিরকের নিদর্শন :
বর্তমান সময়ে অনেক যুবককে দেখা যায় গায়ক-গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এত পরিমাণে ভালোবাসে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা সহ্য করতে পারে না। কিছু বললেই তারা প্রতিবাদ করে। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কেউ মশকরা করলে বা আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে মশকরা করলে তারা তেমন কিছু বলে না। তাদের বেশির ভাগই তাদের গায়কদের আল্লাহর মতোই ভালোবাসে অথবা আরো অধিক (নাঊযুবিল্লাহ), যা শিরক এর অন্তর্ভুক্ত।
গান হলো যেনার রাস্তাস্বরূপ।
এর কারণেই অনেক অশ্লীল কাজ সঙ্ঘটিত হয়। যেখানে পুরুষ ও মহিলারা চরম লজ্জাহীন হয়ে পড়ে। এভাবে গান শ্রবণ করতে করতে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনে। তারা রাস্তায় অপদস্ত হয়, এমনকি এই গান-বাজনার পার্টিতে রাতের পর রাত জেগে এবং পার্টিতে গিয়ে ধর্ষিতা হয়। তাছাড়া তখন তাদের জন্য অন্যান্য অশ্লীল কাজ করা সহজ হয়ে যায়।
এছাড়াও গান-বাজনার আরো অনেক ক্ষতিকর দিক রয়েছে। যেমন-
- এটা ব্যভিচারের প্রেরণা দানকারী,
- মস্তিষ্কের উপর আবরণ ফেলে,
- কুরআনের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে,
- আখেরাতের চিন্তা নির্মূল করে,
- গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
বস্তুত গান-বাজনার বৈজ্ঞানিক ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদাভাবে কোনো দলীল খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও আমরা কুরআনের আয়াত ও অনেক হাদীছ থেকে প্রমাণ পেশ করলাম, যা সুস্পষ্টভাবে গান-বাজনা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
গান-বাজনা হতে পরিত্রাণের উপায় :
নিচে গান-বাজনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কী করণীয় তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
(১) কেউ যদি খালেছ অন্তরে গান-বাজনা শোনা থেকে নিবৃত হতে চায়, তাহলে হৃদয়ে এই বিশ্বাস করা জরুরী যে, ইসলামে গান-বাজনা হারাম এবং এর অনেক ক্ষতিকর দিকে রয়েছে, যা আজ বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। তবে কেউ যদি মুসলিম বলে নিজেকে দাবি করে, তাহলে তার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট যে, তার মহান মালিক তার জন্য গান-বাজনা হারাম করেছেন। আর কেউ যদি জেনে-বুঝে হারাম কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে সে যেন নিজেকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে ঠেলে দিল। সাথে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, ইসলামে যা কিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাতে অবশ্যই মানুষের জন্য ক্ষতি রয়েছে। তাতে কোনো কল্যাণ থাকলে অবশ্যই তা হারাম করা হতো না। যার অনেক ক্ষতিকর দিক আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি।
(২) একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখেরাতে প্রতিদান পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করার জন্য মনের মধ্যে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। কারণ সুদৃঢ় সিদ্ধান্তের কাছে আল্লাহর ইচ্ছায় প্রবৃত্তির হাতছানি ও শয়তানের কূটকৌশল পরাভূত হতে বাধ্য।
(৩) এ পথ থেকে ফিরে আসার জন্য মহান প্রতিপালকের কাছে আন্তরিকভাবে দু‘আ করা। কারণ আল্লাহ মানুষের অন্তরের নিয়ন্ত্রণকারী। তিনি যদি মনকে হারাম থেকে ঘুরিয়ে দেন, তাহলে তা সেদিকে আর মোড় নিতে পারবে না।
(৪) গান-বাজনার উপকরণ ঘর থেকে বের করা ফেলা দেওয়া। যেমন সাউন্ড সিস্টেম, স্পিকার, গিটার, তবলা, ইত্যাদি। সাথে সাথে যেখানে গান-বাজনা হয়, সেখানে না যাওয়া।
(৫) অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করা, সম্ভব হলে কুরআন মুখস্থ করা এবং ভালো ক্বারীদের তেলাওয়াত শোনা।
(৬) প্রচুর পরিমাণে যিকির-আযকারের মাধ্যমে জিহ্বাকে সতেজ রাখা। কারণ যিকির দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে আর তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে। জেনে রাখো! আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’ (আর-রা‘দ, ১৩/২৮)। সুতরাং যারা হতাশা, অস্থিরতা, ব্যর্থতা ইত্যাদি থেকে বাঁচার জন্য বিরহের গান শুনে মনের শান্তি খোঁজে, তাদের উচিত এসব হারাম থেকে তওবা করা এবং আল্লাহর যিকিরের প্রতি মনোযোগী হওয়া। তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই অন্তরে অনাবিল প্রশান্তি লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।
(৭) দ্বীনী ইলম, ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। ভালো আলেমদের লিখিত বই-পুস্তক পাঠ করা। তাদের শিক্ষণীয় বক্তৃতা শোনা।
(৮) হৃদয়ে এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে কেবল তার দাসত্ব করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ রয়েছে। এর বাইরে গেলে আমাদের জন্য অনেক ক্ষতি বা অকল্যাণ রয়েছে।
(৯) মনের মধ্যে গান শোনার ইচ্ছা জাগ্রত হলেই ‘আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রজীম’ (আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি) পাঠ করা।
(১০) মৃত্যুর কথা, পরকালে শাস্তির কথা বারবার মনে করা। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করতে বলেছেন। হাদীছে এসেছ, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِى الْمَوْتَ ‘তোমরা (দুনিয়ার) স্বাদ-ভোগবিলাসকে বিনষ্টকারী বিষয় তথা মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো’।[9]
(১১) গানের ক্ষতিকর দিকগুলো স্মরণ করা, যা প্রথম দিকে উল্লেখ করা হয়েছে।
(১২) মন্দ সংশ্রব বিশেষত পূর্বের গানের জগতের বন্ধু-বান্ধবদের এড়িয়ে চলা, পরিবর্তে ভালো দ্বীনদার লোকদের সাহচর্য লাভ করা। কেননা বন্ধু মানুষের জীবনে সীমাহীন প্রভাব সৃষ্টি করে। এজন্য এমন গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য একজন ভালো দ্বীনদার বন্ধুর গুরুত্ব অপরিসীম।
সুধী পাঠক! গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র অত্যন্ত নিকৃষ্ট এক বিষয়। এগুলোর প্রতি আসক্ত ব্যক্তিদের ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। বর্তমানে অনেক যুবক গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এত কিছু জানার পরও কোনো শিক্ষিত মানুষ গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আনন্দ বিনোদন করতে পারে না। আমাদেরকে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র থেকে সর্বদা দূরে থাকতে হবে। এগুলোর ব্যবসা করার কথা ভুলেও মাথায় আনা যাবে না এবং এগুলোর প্রতি আগ্রহী ব্যক্তির সঙ্গ এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা তার সাথে চললে তার মতো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কথায় আছে, ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’। লোহা এমনি এমনি পানিতে ভাসে না, লোহাকে কাঠের সাথে জুড়ে দিলে ভাসে। তাই ভালো সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে। সকল যুবক ভাইদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে এই নিকৃষ্টতম গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র হতে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সকল পাপ কর্ম হতে বিরত থাকার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
[1]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ৩/৪৫১।
[2]. ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ, ইগাসাতুল লাহফান, ১/২৫৮-২৫৯।
[3]. বায়হাক্বী, মিশকাত, হা/৪৫০৩, হাদীছ ছহীহ।
[4]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯২৪, সনদ ছহীহ।
[5]. আল-জামেউছ ছাগীর, হা/৯৫৯৮।
[6]. সিলসিলা ছহীহা, হা/১৬০৪, ২৬৯৯।
[7]. ইবনু মাজাহ, হা/৪০২০।
[8]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ১০/১১৭।
[9]. ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫৮।
বাদ্যযন্ত্রসহ কোন গজল বা সংগীত শোনা জায়েজ নয়। এমন কি দফের বাদ্যও জায়েজ নয়। ইসলামের শুরু যুগে তা বৈধ থাকলেও পরবর্তীতে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই দফের বাদ্যযুক্ত গজল শোনাও জায়েজ নেই।
আর একশ্রেণীর লোক আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার বস্তু ক্রয় করে বান্দাকে আল্লাহর পথ থেকে গাফেল করার জন্য।-সূরা লুকমান : ৬।
উক্ত আয়াতের শানে নুযূলে বলা হয়েছে যে, নযর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে একটি গায়িকা বাঁদী খরিদ করে এনে তাকে গান-বাজনায় নিয়োজিত করল। কেউ কুরআন শ্রবণের ইচ্ছা করলে তাকে গান শোনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ করত এবং বলত মুহাম্মদ তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে নামায, রোযা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে। এতে শুধু কষ্টই কষ্ট। তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর।-মাআরিফুল কুরআন ৭/৪
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত নাযিল করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন।-সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ৪০২০;সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস : ৬৭৫৮।
হযরত আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, দফ হারাম। বাদ্যযন্ত্র হারাম। মদের পেয়ালা হারাম। বাঁশী হারাম। [সুনানে সুগরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৩৩৫৯, সুনানে কুরবা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-২১০০০]
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শেষ
জমানায় আমার উম্মত বানর ও শুকরে রূপান্তরিত হবে। জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! তারা সাক্ষি দিবে যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোন মাবুদ নাই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল এবং রোযা রাখার পরও? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাদের অপরাধ কি? বললেন, তারা বাদ্য, গায়িকা এবং দফের বাজনা গ্রহণ করবে। মদ খাবে, রাতে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঘুমাবে। আর সকালে দেখবে তারা বানর ও শুকরে পরিণত হয়ে গেছে। [হিলয়াতুল আওলিয়া-৩/১১৯]
মানুষ স্বভাবতই বিনোদনপ্রিয়। ক্লান্ত হৃদয় কিছুটা প্রশান্তি খোঁজে, মন চায় আনন্দ ও স্বস্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে বিনোদন মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে, অন্তরকে কঠিন বানায় এবং গুনাহের দিকে টেনে নেয়, তা কি প্রকৃত আনন্দ হতে পারে? বর্তমান যুগে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রকে “সংস্কৃতি”, “শিল্প” কিংবা “মনের খোরাক” নামে উপস্থাপন করা হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ভয়াবহ একটি বিষয়।
গান-বাজনা : শয়তানের অন্যতম অস্ত্র
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমন কথাবার্তা ক্রয় করে, যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গাফেল করে…”
— সূরা লুকমান : ৬
সাহাবী ও তাফসীরকারদের অনেকেই “লাহওয়াল হাদীস” দ্বারা গান-বাজনাকে বুঝিয়েছেন। কারণ গান মানুষের অন্তরকে ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
শয়তান কখনো মানুষকে সরাসরি বড় গুনাহে ফেলতে পারে না। সে ধাপে ধাপে অন্তরকে দুর্বল করে। গান-বাজনা সেই ধাপগুলোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম। প্রথমে গান, এরপর অশ্লীলতা, তারপর নামাযে অলসতা, অবশেষে গুনাহকে স্বাভাবিক মনে হওয়া—এভাবেই আত্মিক পতন শুরু হয়।
রাসূল ﷺ-এর সতর্কবাণী
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
“আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।”
— সহীহ বুখারী
এই হাদীস অত্যন্ত ভয়ংকর। এখানে বাদ্যযন্ত্রকে এমন সব কবীরা গুনাহর সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম।
আজ আমরা দেখতে পাই—গান-বাজনা শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মানুষের জীবনযাপন, চিন্তা-চেতনা, পোশাক, ভালোবাসা, সম্পর্ক—সবকিছুকে প্রভাবিত করছে।
গান-বাজনার আত্মিক ক্ষতি
১. কুরআনের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে
যে হৃদয় সারাক্ষণ গানের সুরে ডুবে থাকে, সে হৃদয়ে কুরআনের প্রভাব কমে যায়। কুরআনের তিলাওয়াত তখন ভারী মনে হয়।
২. অন্তরকে কঠিন বানায়
গান মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করে; কিন্তু আত্মাকে পবিত্র করে না। ফলে ধীরে ধীরে অন্তর থেকে তাকওয়া ও আল্লাহভীতি কমে যায়।
৩. গুনাহের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়
অধিকাংশ গান প্রেম, অশ্লীলতা, অবাধ সম্পর্ক ও দুনিয়ামুখীতাকে উৎসাহিত করে। এগুলো মানুষের চরিত্র ধ্বংস করে।
৪. সময়ের অপচয় ঘটায়
মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান শুনে কাটিয়ে দেয়, অথচ কুরআন তিলাওয়াত, জিকির বা ইলম অর্জনের জন্য সময় বের করতে পারে না।
“সব গান কি হারাম?”—একটি প্রচলিত প্রশ্ন
অনেকে বলে থাকেন, “আমরা তো শুধু মন ভালো করার জন্য গান শুনি।” কিন্তু ইসলামে কোনো কিছু শুধু “ভালো লাগা”র উপর নির্ভর করে বৈধ হয় না। শরীয়তের সীমারেখাই হলো হালাল-হারামের মানদণ্ড।
তবে কিছু ক্ষেত্রে দফ ছাড়া সাধারণ কণ্ঠে বৈধ ও শালীন নাশীদ বা ইসলামী কবিতা অনুমোদিত হয়েছে—বিশেষত ঈদ বা বিয়ের মতো নির্দিষ্ট উপলক্ষে। কিন্তু আজকের আধুনিক সঙ্গীতজগত তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
যুবসমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
বর্তমানে হেডফোন যেন যুবকদের স্থায়ী সঙ্গী। ঘুম থেকে ওঠা, পড়াশোনা, ভ্রমণ—সবখানে গান। ফলে অন্তর ধীরে ধীরে গাফেল হয়ে যাচ্ছে। নামাযে মন বসে না, দুআয় কান্না আসে না, কুরআন শুনে হৃদয় নড়ে না।
একজন মুমিনের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি খুঁজে পাবে—এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ বলেন—
“জেনে রাখ! আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়ের প্রশান্তি লাভ হয়।”
— সূরা রা‘দ : ২৮
বাঁচার উপায়
১. কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন
প্রতিদিন নিয়মিত তিলাওয়াত করুন। কুরআনের সুর হৃদয়কে জীবিত করে।
২. ভালো পরিবেশ গ্রহণ করুন
গানপ্রিয় বন্ধুদের আড্ডা ও গুনাহর পরিবেশ থেকে দূরে থাকুন।
৩. ইসলামী আলোচনা ও নাশীদ শুনুন
অন্তরকে ভালো কিছুর দিকে ব্যস্ত রাখুন।
৪. আল্লাহর কাছে দুআ করুন
হেদায়াত ও অন্তরের পবিত্রতার জন্য বেশি বেশি দুআ করুন।
উপসংহার
গান-বাজনা হয়তো সাময়িক আনন্দ দেয়, কিন্তু তা আত্মার প্রকৃত প্রশান্তি দিতে পারে না। বরং ধীরে ধীরে মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একজন মুমিনের প্রকৃত সুখ কুরআন, ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণে। তাই আমাদের উচিত এমন বিনোদন থেকে বেঁচে থাকা, যা আখিরাতকে ধ্বংস করে দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে কুরআনের আলো দ্বারা জীবিত রাখুন এবং সকল গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
গান-বাজনার ক্ষতিকর দিক :
ইসলাম কোনো জিনিসের মধ্যে ক্ষতিকারক কোনো কিছু না থাকলে তাকে হারাম করে না। গান-বাজনার মধ্যে নানা ধরনের ক্ষতিকর দিক রয়েছে। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এ সম্পর্কে বলেছেন, গান-বাজনা হচ্ছে নফসের মদস্বরূপ। মদ যেমন মানুষের ক্ষতি করে, বাদ্যযন্ত্রও মানুষের সেই রকম ক্ষতি করে। যখন গান-বাজনা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখনই তারা শিরকে পতিত হয়। আর তখন তারা অশ্লীল কাজ ও যুলম করতে উদ্যত হয়। তারা শিরক করতে থাকে এবং যাদের হত্যা করা নিষেধ তাদেরকেও হত্যা করতে থাকে, যেনা করতে থাকে। যারা গান-বাজনায় জড়িত, তাদের বেশির ভাগের মধ্যেই এই তিনটি দোষ দেখা যায়। তাদের বেশির ভাগই মুখ দিয়ে শিস দেয় ও হাততালি দেয়।[8]
শিরকের নিদর্শন :
বর্তমান সময়ে অনেক যুবককে দেখা যায় গায়ক-গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এত পরিমাণে ভালোবাসে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা সহ্য করতে পারে না। কিছু বললেই তারা প্রতিবাদ করে। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কেউ মশকরা করলে বা আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে মশকরা করলে তারা তেমন কিছু বলে না। তাদের বেশির ভাগই তাদের গায়কদের আল্লাহর মতোই ভালোবাসে অথবা আরো অধিক (নাঊযুবিল্লাহ), যা শিরক এর অন্তর্ভুক্ত।
গান হলো যেনার রাস্তাস্বরূপ।
এর কারণেই অনেক অশ্লীল কাজ সঙ্ঘটিত হয়। যেখানে পুরুষ ও মহিলারা চরম লজ্জাহীন হয়ে পড়ে। এভাবে গান শ্রবণ করতে করতে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনে। তারা রাস্তায় অপদস্ত হয়, এমনকি এই গান-বাজনার পার্টিতে রাতের পর রাত জেগে এবং পার্টিতে গিয়ে ধর্ষিতা হয়। তাছাড়া তখন তাদের জন্য অন্যান্য অশ্লীল কাজ করা সহজ হয়ে যায়।
এছাড়াও গান-বাজনার আরো অনেক ক্ষতিকর দিক রয়েছে। যেমন- এটা ব্যভিচারের প্রেরণা দানকারী, মস্তিষ্কের উপর আবরণ ফেলে, কুরআনের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে, আখেরাতের চিন্তা নির্মূল করে, গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। বস্তুত গান-বাজনার বৈজ্ঞানিক ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদাভাবে কোনো দলীল খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও আমরা কুরআনের আয়াত ও অনেক হাদীছ থেকে প্রমাণ পেশ করলাম, যা সুস্পষ্টভাবে গান-বাজনা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
গান-বাজনা হতে পরিত্রাণের উপায় :
নিচে গান-বাজনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কী করণীয় তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
(১) কেউ যদি খালেছ অন্তরে গান-বাজনা শোনা থেকে নিবৃত হতে চায়, তাহলে হৃদয়ে এই বিশ্বাস করা জরুরী যে, ইসলামে গান-বাজনা হারাম এবং এর অনেক ক্ষতিকর দিকে রয়েছে, যা আজ বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। তবে কেউ যদি মুসলিম বলে নিজেকে দাবি করে, তাহলে তার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট যে, তার মহান মালিক তার জন্য গান-বাজনা হারাম করেছেন। আর কেউ যদি জেনে-বুঝে হারাম কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে সে যেন নিজেকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে ঠেলে দিল। সাথে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, ইসলামে যা কিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাতে অবশ্যই মানুষের জন্য ক্ষতি রয়েছে। তাতে কোনো কল্যাণ থাকলে অবশ্যই তা হারাম করা হতো না। যার অনেক ক্ষতিকর দিক আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি।
(২) একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখেরাতে প্রতিদান পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করার জন্য মনের মধ্যে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। কারণ সুদৃঢ় সিদ্ধান্তের কাছে আল্লাহর ইচ্ছায় প্রবৃত্তির হাতছানি ও শয়তানের কূটকৌশল পরাভূত হতে বাধ্য।
(৩) এ পথ থেকে ফিরে আসার জন্য মহান প্রতিপালকের কাছে আন্তরিকভাবে দু‘আ করা। কারণ আল্লাহ মানুষের অন্তরের নিয়ন্ত্রণকারী। তিনি যদি মনকে হারাম থেকে ঘুরিয়ে দেন, তাহলে তা সেদিকে আর মোড় নিতে পারবে না।
(৪) গান-বাজনার উপকরণ ঘর থেকে বের করা ফেলা দেওয়া। যেমন সাউন্ড সিস্টেম, স্পিকার, গিটার, তবলা, ইত্যাদি। সাথে সাথে যেখানে গান-বাজনা হয়, সেখানে না যাওয়া।
(৫) অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করা, সম্ভব হলে কুরআন মুখস্থ করা এবং ভালো ক্বারীদের তেলাওয়াত শোনা।
(৬) প্রচুর পরিমাণে যিকির-আযকারের মাধ্যমে জিহ্বাকে সতেজ রাখা। কারণ যিকির দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে আর তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে। জেনে রাখো! আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’ (আর-রা‘দ, ১৩/২৮)। সুতরাং যারা হতাশা, অস্থিরতা, ব্যর্থতা ইত্যাদি থেকে বাঁচার জন্য বিরহের গান শুনে মনের শান্তি খোঁজে, তাদের উচিত এসব হারাম থেকে তওবা করা এবং আল্লাহর যিকিরের প্রতি মনোযোগী হওয়া। তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই অন্তরে অনাবিল প্রশান্তি লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।
(৭) দ্বীনী ইলম, ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। ভালো আলেমদের লিখিত বই-পুস্তক পাঠ করা। তাদের শিক্ষণীয় বক্তৃতা শোনা।
(৮) হৃদয়ে এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে কেবল তার দাসত্ব করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ রয়েছে। এর বাইরে গেলে আমাদের জন্য অনেক ক্ষতি বা অকল্যাণ রয়েছে।
(৯) মনের মধ্যে গান শোনার ইচ্ছা জাগ্রত হলেই ‘আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রজীম’ (আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি) পাঠ করা।
(১০) মৃত্যুর কথা, পরকালে শাস্তির কথা বারবার মনে করা। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করতে বলেছেন। হাদীছে এসেছ, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِى الْمَوْتَ ‘তোমরা (দুনিয়ার) স্বাদ-ভোগবিলাসকে বিনষ্টকারী বিষয় তথা মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো’।[9]
(১১) গানের ক্ষতিকর দিকগুলো স্মরণ করা, যা প্রথম দিকে উল্লেখ করা হয়েছে।
(১২) মন্দ সংশ্রব বিশেষত পূর্বের গানের জগতের বন্ধু-বান্ধবদের এড়িয়ে চলা, পরিবর্তে ভালো দ্বীনদার লোকদের সাহচর্য লাভ করা। কেননা বন্ধু মানুষের জীবনে সীমাহীন প্রভাব সৃষ্টি করে। এজন্য এমন গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য একজন ভালো দ্বীনদার বন্ধুর গুরুত্ব অপরিসীম।
সুধী পাঠক! গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র অত্যন্ত নিকৃষ্ট এক বিষয়। এগুলোর প্রতি আসক্ত ব্যক্তিদের ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। বর্তমানে অনেক যুবক গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এত কিছু জানার পরও কোনো শিক্ষিত মানুষ গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আনন্দ বিনোদন করতে পারে না। আমাদেরকে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র থেকে সর্বদা দূরে থাকতে হবে। এগুলোর ব্যবসা করার কথা ভুলেও মাথায় আনা যাবে না এবং এগুলোর প্রতি আগ্রহী ব্যক্তির সঙ্গ এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা তার সাথে চললে তার মতো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কথায় আছে, ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’। লোহা এমনি এমনি পানিতে ভাসে না, লোহাকে কাঠের সাথে জুড়ে দিলে ভাসে। তাই ভালো সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে। সকল যুবক ভাইদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে এই নিকৃষ্টতম গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র হতে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সকল পাপ কর্ম হতে বিরত থাকার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
দফ বাজানোর শরয়ী বিধান
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী
দফের পরিচয়
الدف : بضم الدال ، آلة من آلات الموسيقى مستدبرة كالغربال ليس لها جلاجل يشد الجلد من أحدطرفيها)(الدف) الجنب من كمعجم لغة الفقهاء – (ج 1 / ص 251(
অর্থাৎ দফ বলা হয় ঐ বাদ্য যন্ত্রকে যার উপরের অংশ চালুনির মত, যাতে ঘন্টির মত আওয়াজ নেই, আর তার একাংশে থাকবে চামড়ার পর্দা।
তাফসীর গ্রন্থে দফের বিধান
)1(حدثنا هلال بن أبي هلال، عن عطاء بن يسار، عن عبد الله بن عمرو قال: إن هذه الآية التي في القرآن: { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأنْصَابُ وَالأزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ } قال: هي في التوراة: “إن الله أنزل الحق ليذهب به الباطل، ويبطل به اللعب، والمزامير، والزَّفْن، والكِبَارات -يعني البرابط–والزمارات -يعني به الدف-والطنابير-والشعر، والخمر مرة لمن طعمها. أقسم الله بيمينه وعزة حَيْله من شربها بعد ما حرمتها لأعطشنه يوم القيامة، ومن تركها بعد ما حرمتها لأسقينه إياها في حظيرة القدس”.
وهذا إسناد صحيح.)تفسير ابن كثير 3/187(
)2(أخرج ابن أبي حاتم وأبو الشيخ والبيهقي في سننه عن عبد الله بن عمرو قال : إن هذه الآية التي في القرآن يا أيها الذين آمنوا إنما الخمر والميسر والأنصاب والأزلام رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه لعلكم تفلحون هي في التوراة إن الله أنزل الحق ليذهب به الباطل ويبطل به اللعب والزفن والمزامير والكبارات
يعني البرابط والزمارات يعني الدف والطنابير والشعر والخمر مرة لمن طعمها وأقسم ربي بيمينه وعزة حيله لا يشربها عبد بعدما حرمتها عليه إلا عطشته يوم القيامة(الدر المنثور سورة الماءدة90- 3/163(
উল্লেখিত তাফসীরে আমরা দেখতে পাচ্ছি আল্লামা ইবনে কাসীর তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে সূরায়ে মায়েদার ৯০ নাম্বার আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে তাওরাতের উদ্বৃত দিয়ে তিনি বলেন “একই কথা তাওরাতে আল্লাহ তায়ালা এভাবে বলেছেন যে, নিশ্চয় আল্লাহ সত্য নাযিল করে এর দ্বারা বাতিলকে নির্মূল করেন”। আর বাতিলের অন্তর্ভূক্ত বিষয়ের মাঝে দফ বাজানোও শামিল। ঠিক একই তাফসীর আল্লামা সুয়ূতী রহ. প্রণীত আদ দুররুল মানসুর তাফসীর গ্রন্থেও দেখা যাচ্ছে।
হাদীসের ভাষায় দফের বিধান
(১)
عن ابن مسعود رضى الله تعالى قال نهى عن ضرب الدف ولعب الصنج وضرب الزمارة، لست من دد “1 ولا الدد مني.”خد، هق عن أنس؛ طب عن معاوية”.)كنز العمال فى سنن الاقوال والافعال –باب التغنى المحظور 15/219
২)
(– عن بشر بن عاصم عن أبيه عن جده فصل ما بين الحلال والحرام ضرب الدف والصوت فى النكاح (أحمد ، والترمذى – حسن – والنسائى ، وابن ماجه ، والبغوى ، والطبرانى ، والحاكم ، والبيهقى ، وأبو نعيم فى المعرفة عن محمد بن حاطب الجمحى)(جامع الاحاديث – باب حرف الفاء – 14/438)
(৩)
عن مطر بن سالم عن على قال : نهى رسول الله – صلى الله عليه وسلم – عن ضرب الدف ولعب الصنج وصوت الزماره (الخطيب قال فى المغنى عن مطر بن سالم عن على مجهول)
أخرجه الخطيب (13/300) . (جامع الاحاديث –قسم الأفعال- مسند علي ابن ابي طالب – 32/142)
(৪)
عن بريدة : أن النبى – صلى الله عليه وسلم – قدم من بعض مغازيه فأتته جارية سوداء فقالت : يا رسول الله إنى كنت نذرت إن ردك الله سالما أن أضرب بين يديك بالدف ، قال : إن كنت نذرت فاضربى وإلا فلا فجعلت تضرب والنبى – صلى الله عليه وسلم – جالس ، فدخل أبو بكر وهى تضرب ، ثم دخل عمر فألقت الدف تحتها وقعدت عليه ، فقال رسول الله – صلى الله عليه وسلم – : إن الشيطان ليخاف وفى لفظ : ليفرق منك يا عمر إنى كنت جالسا وهى تضرب ، ثم دخل أبو بكر وهى تضرب ، فلما دخلت ألقت الدف تحتها وقعدت عليه (أحمد ، وأبو يعلى ، وابن عساكر) [كنز العمال في سنن الأقوال والأفعال كتاب الفضائل من قسم الأفعال باب فضائل الصحابة فضائل الفاروق رضي الله عنه]
(৫)
حدثنا أحمد قال حدثنا ابن وهب قال أخبرنا عمرو أن محمد بن عبد الرحمن الأسدي حدثه عن عروة عن عائشة قالت : دخل علي رسول الله صلى الله عليه و سلم وعندي جاريتان تغنيان بغناء بعاث فاضطجع على الفراش وحول وجهه ودخل أبو بكر فانتهزني وقال مزمارة الشيطان عند النبي صلى الله عليه و سلم فأقبل عليه رسول الله عليه السلام فقال ( دعهما )
وفى تعليق د. مصطفى ديب البغا ( جاريتان ) مثنى جارية وهي الأنثى دون البلوغ . ( تغنيان بغناء بعاث ) تنشدان وترفعان أصواتهما بما قاله العرب في يوم بعاث وهو حصن وقع عنده مقتلة عظيمة بين الأوس والخزرج في الجاهلية . ( فانتهرني ) زجرني وأنبني . ( مزمارة الشيطان ) يعني الضرب على الدف والغناء مشتق من الزمير وهو صوت الذي له صفير وأضيف إلى الشيطان لأنه يلهي عن ذكر الله عز و جل وهذا من عمل الشيطان )صحيح البخاري – (ج ১ / ص ১৩০) – كتاب العيدين باب الحراب والدرق يوم العيد(
(৬)
وفي كتاب سعيد بن منصور حدثنا أبو داود وسليمان بن سالم البصري حدثنا حسان بن سنان عن رجل عن أبي هريرة يرفعه يمسخ قوم من أمتي آخر الزمان قردة وخنازير قالوا يا رسول الله ويشهدون أنك رسول الله وأن لا إله إلا الله قال نعم ويصلون ويصومون ويحجون قالوا فما بالهم يا رسول الله قال اتخذوا المعازف والقينات والدفوف ويشربون هذه الأشربة فباتوا على لهوهم وشرابهم فأصبحوا قردة وخنازير(عمدة القاري شرح صحيح البخاريكتاب الأشربة باب الأنتباذ في الأوعية والتور ) – (ج 31 / ص 167)
(৭)
– أَخْبَرَنَا أَبُو نَصْرِ بْنُ قَتَادَةَ أَنْبَأَنَا أَبُو مَنْصُورٍ الْعَبَّاسُ بْنُ الْفَضْلِ النَّضْرَوِىُّ حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ نَجْدَةَ حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ عَنْ عَبْدِ الْكَرِيمِ الْجَزَرِىِّ عَنْ أَبِى هَاشِمٍ الْكُوفِىِّ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ : الدُّفُّ حَرَامٌ وَالْمَعَازِفُ حَرَامٌ وَالْكُوبَةُ حَرَامٌ وَالْمِزْمَارُ حَرَامٌ.) السنن الكبرى للبيهقي وفي ذيله الجوهر النقي – (ج 10 / ص 222)
# উল্লেখিত হাদিস সমূহের মাঝে ১ ও ৩ নং হাদিসে যথাক্রমে হযরত ইবনে মাসউদ(রা.)ও হযরত আলী(রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে “দফ” বাজাতে নিষেধ করেছেন মর্মে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
# আর ৩নং হাদিসে হালাল ও হারামের মাঝে দোদুল্যমান দফের বিধান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
# ৪র্থ হাদিসে জনৈকা মহিলা সাহাবী রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা.) এর সামনে দফ বাজাতে থাকলে যখন হযরত ওমর (রা.) সে মজলিসে প্রবেশ করেন তখন সে ওমর (রা.) এর ভয়ে দফ বাজানো বন্ধ করে তা নিচে রেখে বসে গেলে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্তব্য করেন, হে ওমর! তোমাকে দেখে শয়তান ভয় পায়,মতান্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে, শয়তান তোমার থেকে দূরে থাকে। তাইতো এই মহিলা আমি ও আবু বকর (রা.) বসা থাকা অবস্থায় দফ বাজালো, কিন্তু যখনই তুমি প্রবেশ করলে তখনই সে দফ বাজানো বন্ধ করে তা নিচে দিয়ে বসে গেলো।
বিজ্ঞ পাঠক! হযরত ওমর (রা.) কে দেখে মহিলাটির দফ বাজানো বন্ধ করাকে নবীজি বলেছেন শয়তান ওমর (রা.) থেকে ভয়ে দূরে থাকে বলে মহিলাটি দফ বাজানো বন্ধ করে দিয়েছে। সুতরাং দফ বাজানো শয়তানী কাজ একথা কী প্রমাণিত হচ্ছেনা এ হাদিস থেকে?
৫নং হাদিসটি দিয়ে যারা দফ বাজানোকে যায়েজ বলেন তারা দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন। কিন্তু হাদিসটির দিকে আমরা ভালো করে নজর দিলে দেখতে পাই এ হাদিসটিও দফ বাজানো জায়েজ নয় বলেই প্রমাণ করছে, কারণ এ হাদিসে ঈদের দিন নাবালেগ দুটি শিশু জাহেলী যুগের নির্দোষ গজল গাচ্ছিল দফ বাজিয়ে তাই দেখে হযরত আবু বকর (রা.) মন্তব্য করলেন এটা তথা “দফ” হলো “শয়তানের বাঁশি” কিন্তু রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি শয়তানের বাঁশি নয় একথা না বলে ছোট মানুষের খেলাচ্ছলে বাঁশি বাজানোকে বন্ধ করতে নিষেধ করেছেন, সুতরাং এ হাদিসকে কোন যুক্তিতে বড় মানুষের জন্য বাঁশি বাজানো যায়েজ হবার পক্ষে দলীল পেশ করা যায়? এ ছাড়াও দেখুন মুহাদ্দিসীনে কেরাম এ হাদিসের উপর আলোচনা করতে গিয়ে কী বলেছেন,বুখারী শরীফে বর্ণিত এ হাদিসের আলোচনায় আল্লামা আবুল হাসান সিন্ধী (র.) হাশিয়াতে নকল করেন
وفى مجمع البحار قال الطيبى ومااحدث المتصوفة من السماع بالآلات فلا خلاف فى تحريمه حتى ظهرت على كثير منهم افعال المجانين فيرقصون بحركات مطابقة وتقطيعات متلاحقة وزعموا ان تلك الامور من البر ويثير سنيات الاحوال وهذا زندقة( حاشية صحيح البخارى لابى الحسن السندى 1/130)
“আল্লামা তীবী (র.) সুস্পষ্টভাবে বলছেন যে যন্ত্র বাজিয়ে সংগীত শুনা বিনা মতানৈক্যে হারাম, আর আজকাল এসবের মাধ্যমে গান শুনে তার তালে নেচে নেচে একে সুন্নতী কাজ বলা যিন্দিকী কর্মকান্ড ছাড়া কিছুই নয়”।
৬ নং ও ৭ নং হাদিস দু’টির অনুবাদের দিকে একবার নজর বুলালেই দফের শরয়ী বিধান সুস্পষ্ট হয়ে যাবার কথা………হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার উম্মতের মাঝে এক দল লোকের শেষ জমানায় বানর ও শূকরের সুরতে চেহারা বিকৃতি ঘটবে”। সাহাবা রা.নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করলেন , ইয়া রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! অথচ তারা স্বাক্ষ্য দিবে নিশ্চয় আপনি আল্লাহর মনোনিত রাসূল আর আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোন মাবুদ নেই ? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হ্যা এবং তারা নামায ও পড়বে আবার রোজাও রাখবে, এবং হজ্ব ও করবে, সাহাবারা বললেন, তবে তাদের অপরাধটা কী? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা বাদ্য ও গায়িকা আর “দফ” বাজানোকে গ্রহণ করবে। আর মদ খেয়ে প্রমোদ করে মাতাল হয়ে রাত কাটিয়ে সকালে বানর ও শুকরে পরিণত হবে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, “দফ” বাজানো হারাম , বাদ্য বাজনা হারাম, সুরা পান হারাম, গান শোনা হারাম।
ফুকাহাদের ভাষায় দফের বিধান
(১)
وأبو حنيفة أشد الأئمة قولا فيه ومذهبه فيه أغلظ المذاهب وقد صرح أصحابه بتحريم سماع الملاهي كلها المزمار والدف حتى الضرب بالقضيب وأنه معصية يوجب الفسق وترد به الشهادة بل قالوا التلذذ به كفر(عون المعبود –كتاب الأدب– باب كراهية الغناء والزمر 13/186
অর্থাৎ আর আবু হানিফা রাহ. এ ব্যপারে সবচে’ কঠুর। তার মাযহাব হলো সবচে’ কঠিন , তার সঙ্গীরা একথা সুস্পষ্ট করেছেন যে, সকল প্রমোদ সামগ্রি হারাম , সর্ব প্রকার বাঁশি এবং “দফ” ও। এমন কি লাঠি দিয়ে বাড়ি মারাও, আর এটা গোনাহ যা ফাসেক হওয়াকে ওয়াজিব করে, যার ফলে তার স্বাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য নয়, বরঞ্চ ফুকাহারা বলেন-এসব দ্বারা আনন্দ নেয়া কুফরী।(নাউজুবিল্লাহ) {আউনুল মাবুদ-১৩/১৮৬}
(২)
وأما الضرب بالدف فقد كان جماعة من التابعين يكسرون الدفوف ………وكان الحسن البصري يقول ليس الدف من سنة المرسلين في شيء )تلبيس إبليس باب في ذكر الشبه التي تعلق بها من اجاز سماع الغناء- (ج 1 / ص 293)
অর্থাৎ “দফ বাজানো” তাবেয়ীনদের এক জামাত দফ ভেঙ্গে ফেলতেন, আর হাসান বসরী রাহ. বলেছেন-দফ বাজানোতে নবী অনুস্বরণের কিছু নেই। {তালবীছে ইবলীস-১/২৯৩}
(৩)
وَاسْتِمَاعُ ضَرْبِ الدُّفِّ وَالْمِزْمَارِ وَغَيْرِ ذَلِكَ حَرَامٌ وَإِنْ سَمِعَ بَغْتَةً يَكُونُ مَعْذُورًا وَيَجِبُ أَنْ يَجْتَهِدَ أَنْ لَا يَسْمَعَ قُهُسْتَانِيٌّ )رد المحتار–كِتَابُ الْحَظْرِ وَالْإِبَاحَة–فَصْلٌ فِي الْبَيْعِ
অর্থাৎ দফের বাজনা ও বাঁশির আওয়াজ এবং এ জাতীয় বিষয় শোনা হারাম, আর যদি আচমকা শোনে ফেলে তবে তাকে মাজুর ধরা হবে। আর চেষ্টা করবে যেন তা না শুনতে পায়। [রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাজরি ওয়াল ইবাহা}
(৪)
السؤال– هل من الجائز شرعا النقر على الدفوف وضرب الطبول والمزمار أثناء الصلوات فى الجوامع
الجواب………………………… ومن هنا يعلم أن النقر على الدف وضرب الطبول والمزمار مما لا يجوز شرعا عند فقهاء الحنفية بل ذلك كله حرام عندهم، وهو أشد حرمة إذا كان فى الحالة المذكورة بالسؤال– فتاوى دار الإفتاء المصرية مواضع استعمال الدف والطبول والمزمار – (ج 7 / ص 231)
দারুল ইফতা মিশরের উল্লেখিত ফতোয়ার আন্ডার লাইন করা অংশটির দিকে একবার নজর বুলালেই বুঝা যাবে হানাফীদের মতে দফের বিধান কী, “এখানে জেনে রাখা উচিত যে, নিশ্চয় দফ বা তবলা কিংবা বাঁশি বাজানো ফুকাহায়ে আহনাফ এর কাছে শরীয়ত মোতাবেক জায়েজ নেই। বরঞ্চ এই প্রতিটি কাজ হারাম তাদের কাছে”। {ফাতাওয়া দারুল ইফতা মিশর-৭/২৩১}
(৫)
ولهذا كان جمهور العلماء على أن الضرب بالدف للغناء لا يباح فعله للرجال ؛ فإنه من التشبه بالنساء ، وهو ممنوع منه ، هذا قول الأوزاعي وأحمد ، وكذا ذكر الحليمي وغيره من الشافعية .
وإنما كان يضرب بالدفوف في عهد النبي – صلى الله عليه وسلم – النساء ، أو من يشبه بهن من المخنثين ، وقد أمر النبي – صلى الله عليه وسلم – بنفي المخنثين وإخراجهم من البيوت .
وقد نص على نفيهم أحمد وإسحاق ، عملا بهذه السنة الصحيحة (فتح الباري لابن رجب – كتاب الصلاة 7/34-(35
অর্থাৎ জমহুর ওলামায়ে কেরামের কাছে সংগীতের জন্য দফ বাজানো পুরুষের জন্য জায়েজ নেই, কারণ এর দ্বারা মহিলাদের সাথে সাদৃশ্যায়ন হচ্ছে, আর এটা জায়েজ নেই, এ বক্তব্য ইমাম আওযায়ী ও ইমাম আহমাদের, আর ঠিক এই অভিমতই উল্লেখ করেছেন আল্লামা হালিমী ও অন্যান্যরা ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মত বলে। এছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে দফ বাজাতো মহিলারা অথবা তাদের মত হিজড়ারা, আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজড়াদের ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। তেমনি ইমাম আহমাদ ও ইসহাক রাহ. থেকেও বর্ণিত যে তারা হিজড়াদের ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন এই সহিহ হাদিসের উপর আমল করতে গিয়ে। [ফাতহুল বারী-৭/৩৪-৩৫}
(৬)
السؤال:ما حكم ضرب الدف للرجال؟
الجواب:بسم الله الرحمن الرحيم –اختلف أهل العلم في ضرب الرجال الدف على قولين:الأول: يباح ضرب الرجال بالدف في الأعراس ونحوها وهو الذي ظهر لي من مذهب المالكية، والشافعية، وهو ظاهر نصوص أحمد وكلام أصحابه.
الثاني: كراهية ضرب الرجال بالدف في الأعراس ونحوها وهذا مذهب أبي حنيفة، وقول عند المالكية والشافعية والحنابلة. )أكثر من 100 فتوى للشيخ خالد مصلح – (ج 1 / ص 61(
উল্লেখিত শায়েখ খালেদ মুসলিহ এর ফতোয়ার দাগটানা অংশের দিকে তাকালেও হানাফীদের মত স্পষ্ট হয় দফের ক্ষেত্রে,… পুরুষের জন্য বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে দফ বাজানো নিষিদ্ধ, আর এটাই ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাযহাব এবং মালেকী ও শাফেয়ী এবং হানাবেলা ইমামদের মত। {ফাতাওয়া খালেদ মুসলিহ-১/৬১}
(৭)
جواز الدف للنساء في المناسباتلا يجوز للرجال استعمال الدف على الصحيح) فتاوى الشبكة الإسلامية – (ج 10 / ص 4288) المفتي: مركز الفتوى بإشراف د.عبدالله الفقيه
শাবাকাতুল ইসলামিয়ার ফতোয়ায় ও পূর্বে উদ্বৃত ফতোয়ার বক্তব্যই ধ্বনিত হচ্ছে যে, সহীহ বক্তব্য অনুযায়ী পুরুষের জন্য দফ বাজানো জায়েজ নেই। {ফাতাওয়া শাবাকাতুল ইসলামিয়া-১০/৪২৮৮}
উপসংহার
উল্লেখিত তাফসীর ,হাদিস ও ফুকাহাদের বক্তব্য থেকে একথা নির্ধিদ্বায় বলা যায়, হানাফীদের মতে দফ বাজানো পুরুষের জন্য জায়েজ নেই। সুস্পষ্ট হারাম। নিম্ন লিখিত কয়েকটি সঙ্গত কারণে বর্তমানে মহিলা ও পুরুষদের জন্য দফ বাজানো সম্পুর্ণ হারাম।
(১) অনেকেই দফ বাজানো জায়েজ একথা প্রমাণ করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী তথা ‘বিয়েকে প্রকাশ করো যদিও দফের দ্বারা হয়’ এই হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে اعلنو النكاح ولو باالدف
থাকেন যে, বিয়েতে দফ বাজানো জায়েজ কোন শর্ত ছাড়াই এবং এটা সুন্নত।
কিন্তু ঠান্ডা মাথায় একবার চিন্তা করলেই একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্যেশ্য এর দ্বারা কেবল প্রচারণার গুরুত্ব বুঝানো। কেননা তৎকালে কোন কিছু ‘ইলান’ করার জন্য দফে বাড়ি মারলে লোকজন একত্র হতো, তারপর ঘোষক তার বক্তব্য বলে সবাইকে শোনাতো। দেখুন হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর “বিয়ে শাদিতে বাজনা বাজনোর একটি বিরল তাহকীক” নামে লিখিত প্রবন্ধে ( যা মুফতী শফী রহ. এর ফতোয়া সংকলন জাওয়াহিরুল ফিক্বহ এর চতুর্থ খন্ডের ২০৮ নং পৃষ্ঠায় সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে) বুস্তানুল আরেফীন ও নিসাবুল ইহতিসাব এবং শরহে নুকায়া গ্রন্থের উদ্বৃতি দেন,
وفى شرح نقايه – قال التور بشتى انه حرام على قول اكثرالمشاءخ وما ورد من ضرب الدف فى العرس كناية من الاعلان
অর্থাৎ আল্লামা তুরে পেশতী রহ. বলেন, অধিকাংশ মাশায়েখে কেরামের মতে দফ বাজানো হারাম,
তবে বিয়েতে দফ বাজানোর ক্ষেত্রে যেসব বর্ণনা এসেছে এর দ্বারা উদ্যেশ্য হচ্ছে প্রচারণা করা।
সুতরাং বুঝা গেলো বিয়েতে দফ বাজানোর কথা বলার দ্বারা মুরাদ হলো প্রচারণা করা, আসলেই দফ বাজানো নয়,
যদি সত্যিই দফ বাজানোই উদ্দেশ্য থাকতো তবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চার মেয়ের বিয়ের সময় কেন দফ বাজালেন না? এ ব্যাপারে একটি জাল রেওয়ায়েত ও কী আছে?
যেই সাহাবারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন তাদের কারও বিয়েতে দফ বাজিয়েছেন বলেছেন বলে কোন বর্ণনা কী আছে?
তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাটির অর্থ কী এই দাঁড়াচ্ছেনা যে, এর দ্বারা কেবল প্রচারণা উদ্দেশ্য দফ বাজানো নয়।
(২) দফের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার উপর হাদিস সুস্পষ্ট যা উপরে বর্ণিত।
(৩) হানাফী ফুকাহায়ে কেরামের রায় ও সুস্পষ্ট প্রমাণ করছে দফ বাজানো জায়েজ নেই। দেখুন উপরে বর্ণিত ফুক্বাহায়ে কেরামের বক্তব্য।
(৪) হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর তাহকীক ও ফতোয়া প্রণিদান যোগ্য যা জাওয়াহিরুল ফিক্বহ এর চতুর্থ খন্ডে বিধৃত হয়েছে , যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন দফ বাজানো জায়েজ নেই। আর এক্ষেত্রে বিভিন্ন হানাফী ফিক্বহী কিতাবে ভুল বর্ণনা(যে দফ বাজানো হানাফীদের কাছে বিয়ে বা আনন্দ অনুষ্ঠানে জায়েজ) একজন থেকে আরেকজন করে গেছেন তাহকীক ছাড়াই, এমনটা বলেছেন পরিস্কার হাকিমুল উম্মত রহ.। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ ৪/২১২)
(৫) সুবিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীর ও আদ দুররুল মানসুরের বর্ণনা প্রমাণ করে দফ বাজানো কিছুতেই জায়েজ হতে পারেনা।
(৬) কতিপয় মুফতীর ফতোয়া দ্বারা কেবল এতটুকু প্রমাণিত হয় যে মহিলাদের জন্য দফ বাজানোর সুযোগ আছে, পুরুষের কোন সুযোগ নেই, কিন্তু একথাও উপরে বর্ণিত তাফসীর ও হাদিস এবং ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য দ্বারা বাতিল বলে সাব্যস্ত হয়।
একটি সতর্ক বাণী
পূর্ণাঙ্গ তাহকীক করা ছাড়া হক্কানী ওলামায়ে কেরামের ‘দফ বাজানো জায়েজ’ মর্মে ফতোয়া দেয়া, বিভিন্ন মাহফিল বা লেখনিতে জায়েজ বলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাউল গানে বাজনা বাজানো বা পীরের মাজারে বাজনা বাজানোকে কী পরোক্ষভাবে জায়েজ বলছিনা আমরা? সুতরাং দ্বীন দরদী সকল ভাইদের প্রতি আমার আকুল আবেদন রইলো এই বিষয়টির ক্ষেত্রে ফতোয়া দেবার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। নইলে হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলা শেষ জমানায় গান বাজনা ও মদ ও “দফ” বাজানোর ফলে একদল লোক শুকর ও বানরে পরিণত হবে সেই ধমকির কারণ না হতে আল্লাহ তায়ালা আমাদের হিফাযত করুন।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ননা:
১-الدُّفُّ حرامٌ দফ হারাম
২-والمعازفُ حرامٌ বাদ্যযন্ত্র হারাম
৩- والكُوبةُ حرامٌ ঢোল, তবলা হারাম
৪-والمزمارُ حرامٌ গানবাজনা হারাম।
তবরানী-৭৩৮৮
ক. দফ (الدف) এর পরিচয়:
দফ বলা হয় ঐ বাদ্য যন্ত্রকে যার উপরের অংশ চালুনির মত, যাতে ঝুনঝুন আওয়াজ থাকে না এবং একপাশে চামড়ার পর্দা টেনে বাঁধা হয়।
মু‘জামু লুগাতিল ফুক্বাহা
(বৈরূত : দারুন নাফায়েস, ১ম সংস্করণ ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খৃ.)পৃ. ১৮৬।
খ. রাসুলের যুগে দফ যেমন ছিল:
হাদিসের ব্যাখ্যাকার, যারা নবীজি (সা.)-এর যুগে ব্যবহৃত দফ সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছেন, তাঁরা বলেছেন দফ হলো, একপাশ খোলা ঢোলবিশেষ। বাজালে ঢ্যাব ঢ্যাব আওয়াজ হয়। প্রকৃতপক্ষে দফ সংগীতে ব্যবহৃত কোনো বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না। আউনুল বারি গ্রন্থাকার বলেন, দফের আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়।
কোনো দফের আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয় তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে। (আউনুল বারি : ২/৩৫৭)
গ. বাদ্যযন্ত্র হিসেবে দফের ব্যবহার:
যদি কোনো ব্যক্তি দফকে বাদ্যযন্ত্রের মতো ব্যবহার করে, তবে বাদ্যযন্ত্র হিসেবেই গণ্য হবে। মোল্লা আলী কারি (রহ.) বলেন, আর দফের মধ্যে যখন বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এসে যাবে, তখন তা সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েজ বলে পরিগণিত হবে। (মিরকাতুল মাফাতিহ : ৬/২১০)
ঘ. সাহাবী আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ননা:
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মাঝে এক দল লোকের শেষ জমানায় বানর ও শূকরের সুরতে চেহারা বিকৃতি ঘটবে।
সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করলেন , ইয়া রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! অথচ তারা স্বাক্ষ্য দিবে নিশ্চয় আপনি আল্লাহর মনোনিত রাসূল আর আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোন মাবুদ নেই ? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হ্যা এবং তারা নামায ও পড়বে আবার রোজাও রাখবে, এবং হজ্ব ও করবে।
সাহাবারা বললেন, তবে তাদের অপরাধটা কী? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা বাদ্য ও গায়িকা আর “দফ” বাজানোকে গ্রহণ করবে। আর মদ খেয়ে প্রমোদ করে মাতাল হয়ে রাত কাটিয়ে সকালে বানর ও শুকরে পরিণত হবে। উমদাতুল কারী খন্ড-৩১ পৃষ্ঠা-১৬৭, কিতাবুল আসরিবাহ।
ঙ. ফকীহগণের অভিমত:
১-ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ:
আর ইমাম আবু হানিফা রাহ. এ ব্যপারে সবচে’ কঠুর। তার মাযহাব হলো সবচে’ কঠিন , তার সঙ্গীরা একথা সুস্পষ্ট করেছেন যে, সকল প্রমোদ সামগ্রি হারাম , সর্ব প্রকার বাঁশি এবং “দফ” ও। এমন কি লাঠি দিয়ে বাড়ি মারাও, আর এটা গোনাহ যা ফাসেক হওয়াকে ওয়াজিব করে, যার ফলে তার স্বাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য নয়, বরঞ্চ ফুকাহারা বলেন-এসব দ্বারা আনন্দ নেয়া কুফরী।(নাউজুবিল্লাহ) {আউনুল মাবুদ-১৩/১৮৬}
২-তাবেয়ীগন:
“দফ বাজানো” তাবেয়ীনদের এক জামাত দফ ভেঙ্গে ফেলতেন, আর হাসান বসরী রাহ. বলেছেন-দফ বাজানোতে নবী অনুস্বরণের কিছু নেই। {তালবীছে ইবলীস-১/২৯৩}
৩-দফের বাজনা ও বাঁশির আওয়াজ এবং এ জাতীয় বিষয় শোনা হারাম, আর যদি আচমকা শোনে ফেলে তবে তাকে মাজুর ধরা হবে। আর চেষ্টা করবে যেন তা না শুনতে পায়। [রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাজরি ওয়াল ইবাহা}
৪-দফ প্রমাণ করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী তথা ‘বিয়েকে প্রকাশ করো যদিও দফের দ্বারা হয়’ এই হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে اعلنو النكاح ولو باالدف
থাকেন যে, বিয়েতে দফ বাজানো জায়েজ কোন শর্ত ছাড়াই এবং এটা সুন্নত।
গভীরভাবে চিন্তা করলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্যেশ্য এর দ্বারা কেবল প্রচারণার গুরুত্ব বুঝানো। কেননা তৎকালে কোন কিছু ‘ইলান’ করার জন্য দফে বাড়ি মারলে লোকজন একত্রিত হতো, তারপর ঘোষক তার বক্তব্য বলে সবাইকে শোনাতো।
হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর “বিয়ে শাদিতে বাজনা বাজনোর একটি বিরল তাহকীক” নামে লিখিত প্রবন্ধে ( যা মুফতী শফী রহ. এর ফতোয়া সংকলন জাওয়াহিরুল ফিক্বহ এর চতুর্থ খন্ডের ২০৮ নং পৃষ্ঠায় সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে) বুস্তানুল আরেফীন ও নিসাবুল ইহতিসাব এবং শরহে নুকায়া গ্রন্থের উদ্বৃতি দেন,
وفى شرح نقايه – قال التور بشتى انه حرام على قول اكثرالمشاءخ وما ورد من ضرب الدف فى العرس كناية من الاعلان
অর্থাৎ আল্লামা তুরে পেশতী রহ. বলেন, অধিকাংশ মাশায়েখে কেরামের মতে দফ বাজানো হারাম।
তবে বিয়েতে দফ বাজানোর ক্ষেত্রে যেসব বর্ণনা এসেছে এর দ্বারা উদ্যেশ্য হচ্ছে প্রচারণা করা।
সুতরাং বুঝা গেলো বিয়েতে দফ বাজানোর কথা বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রচারণা করা, আসলেই দফ বাজানো নয়। ৫- বুখারী হা/৫১৪৭ ইবনু মাজাহ হা/১৮৯৬, বুখারী হা/৯৫২ ইবনে মাজা- ১৮৯৯
তিরমিযী হা/৩৬৯০
এসব হাদীস দিয়ে দফ বাজানোর বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করে থাকেন, উপরে উল্লিখিত সবক’টি হাদীছে
১-বিয়ে ও ঈদের দিনের কথা এসেছে,
২-বালিকা মেয়েদের দফ বাজানোর কথা এসেছে। সেজন্য প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী কিংবা পুরুষের দফ বাজানো জায়েয নয়।
বাদ্যযন্ত্রের আলোচনা:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَاسۡتَفۡزِزۡ مَنِ اسۡتَطَعۡتَ مِنۡہُمۡ بِصَوۡتِکَ
তাদের মধ্যে যার উপর তোমার ক্ষমতা চলে নিজ ডাক(আওয়াজ দ্বারা)দ্বারা বিভ্রান্ত কর।
ইসরা-৬৪
বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বাদ্যযন্ত্র কে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯
হাদিস-১
বাদ্যযন্ত্র( معازف)
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে।
বুখারী- ৫৫৯০
হাদীস-২
বাদ্যযন্ত্র (مزمار)
নাফে‘ (রাঃ) বলেন, একদা ইবনু ওমর (রাঃ) বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেলে তিনি তাঁর দুই কানে দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গেলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, নাফে‘ তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ কি? আমি বললাম, না। তিনি তার দুই আঙ্গুল দুই কান হতে বের করে বললেন, আমি একদা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গিয়েছিলেন এবং আমাকে এভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন যেভাবে আজ তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম
(ছহীহ আবূদাঊদ হা/ ৪৯২৪, সনদ ছহীহ)।
হাদীস-৩
বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহ গজব নিয়ে আসে।
আনাস (রা.) বলেন, নবী করীম(সা.) বলেছেন, যখন আমার উম্মত নেশাদার দ্রব্য পান করবে, গায়িকাদের নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হবে এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত হবে তখন অবশ্যই তিনটি ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে-
(১) বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ধসে যাবে
(২) উপর থেকে অথবা কোন জাতির পক্ষ থেকে যুলুম অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়া হবে
(৩) অনেকের পাপের দরুণ আকার-আকৃতি বিকৃত করা হবে।
আর এ গজবের মূল কারণ তিনটি। (ক) মদ পান করা (খ) নায়িকাদের নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হওয়া (গ) বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী হওয়া। তিরমিজি – ২২১২
হাদীস-৪
নেতাদেরকে গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সম্মান করা হবে।
আবু মালিক আশ‘আরী (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, আমার কিছু উম্মত মদ পান করবে এবং তার নাম রাখবে ভিন্ন। তাদের নেতাদেরকে গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সম্মান করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ভুমিকম্পের মাধ্যমে মাটিতেই ধসিয়ে দিবেন। আর তাদেরকে বানর ও শুকুরে পরিণত করবেন (বুখারী, ইবনে মাজাহ হা/৪০২০)।
হাদীস-৫
বজনাদার নুপুর
একটি ছোট্ট বালিকাকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে নিয়ে আসা হলো। বালিকার পায়ে নুপুরের আওয়াজ শুনে তিনি বলেন, এর পা থেকে নুপুর না খুলে তাকে আমার কাছে আনবে না। তিনি আরো বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যে ঘরে ঘণ্টা থাকে সে ঘরে ফিরিশতা প্রবেশ করে না। আবু দাউদ-৪২৩১
নোট:
মৃদু আওয়াজের ঘণ্টি-ঘুঙুরের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আধুনিক সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের বিধান কী হবে তা খুব সহজেই বুঝা যায়।
হাদীস-৬
ঢোল(كوبة ) তবলা।
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’আলা মদ্যপান করা, জুয়া খেলা এবং ঢোল বাজানো হারাম করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু হারাম। কেহ কেহ বলিয়াছেন, কূবা অর্থ তবলা।
বায়হাক্বী, হাদীছ ছহীহ, মিশকাত হা/৪৫০৩
শেষ কথা:
তোমাদের জন্য সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র হারাম! আল্লাহ ডাইরেক্ট কেন বললেন না? এগুলো হাদিস অস্বীকারকারীদের প্রশ্ন:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ অচিরেই কোন ব্যাক্তি তার আসনে হেলান দেয়া অবস্থায় বসে থাকবে এবং তার সামনে আমার হাদীস থেকে বর্ণনা করা হবে, তখন সে বলবে, আমাদের ও তোমাদের মাঝে মহামহিম আল্লাহ্র কিতাবই যথেষ্ট। আমরা তাতে যা হালাল পাবো তাকেই হালাল মানবো এবং তাতে যা হারাম পাবো তাকেই হারাম মানবো। (মহানবী (সাঃ) বলেন) সাবধান! নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার অনুরূপ। ইবনে মাজা- ১২
- কাওয়ালী গান গাওয়া ও শোনার বিধান বাদ্যযন্ত্র ছাড়া এমনিতে আল্লাহর হামদ ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের না’ত নির্ভর, বা উত্তম ও জায়েজ কথা নির্ভর কাওয়ালী শোনা ও গাওয়া জায়েজ আছে। তবে যদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়, শিরকী বা কুফরী বিষয়, কিংবা অন্য কোন নাজায়েজ বিষয় এতে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তা নাজায়েজ হবে। বাকি জায়েজ নির্ভর বিষয় নিয়ে জায়েজ পদ্ধতিতে কাওয়ালী গাওয়া ও শোনার অনুমোদন আছে। খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী রহঃ কাওয়ালী গানের অনুমোদন দিয়েছেন মর্মে প্রমাণিত নয়। নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহঃ এর একজন মুরীদ মীর্যা খসরু এ কাওয়ালী গানের উদ্ভাবক বলে পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে যেভাবে মিউজিক ব্যবহার করে, বেপর্দা নারীসহ, এছাড়া হারাম ও শিরকী বিষয় সম্বলিত কাওয়ালী বিভিন্ন মাজারে গাওয়া হয়, এর কোন নজীর নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহঃ, মুঈনুদ্দীন চিশতীসহ কোন গ্রহণযোগ্য বুযুর্গানে দ্বীন থেকে প্রমাণিত নয়। তাই হারাম বিষয় সম্বলিত কাওয়ালী গান গাওয়া ও শোনা কোনটাই জায়েজ নয়। عن ابن عباس ، قال : جاءأعرابي إلى النبي صلى الله عليه وسلم ، فجعل يتكلم بكلام ، فقالرسول الله صلى الله عليه وسلم : إن من البيان سحرا ، وإن من الشعرحكما (سنن ابى داود، رقم-5011) عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مِنَ الشَّعْرِ لَحِكْمَةً (حلية الأولياء-7/269) حَسَّانَ بْنَ ثَابِتٍ الْأَنْصَارِيَّ يَسْتَشْهِدُ أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْشُدُكَ اللَّهَ هَلْ سَمِعْتَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ يَا حَسَّانُ أَجِبْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ نَعَمْ (صحيح البخارى، رقم-453) عن ابى سعيد الخدرى قال: بينا نحن نسير مع رسول الله صلى الله عليه وسلم بالعرج إذ عرض شاعر ينشد، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : خذوا الشيطان، أو امسكوا الشيطان، لأن يمتليئ جوف رجل قيحا خير له من ان يمتلي شعرا (صحيح مسلم، الشعر، النسخة الهندية-2/240، بيت الأفكار، رقم-2295) وما نقل أنه عليه السلام سمع الشعر لم يدل على إباحة الغناء (رد المحتار، زكريا-9/503، كرتاشى-6/) عن جابر بن عبد الله قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: الغناء ينبت النفاق فى القلب كما ينبت الماء الزرع (شعب الإيمان للبيهقى-4/279، رقم-5100) عن أبي مالك الأشعري قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم: ليشربن ناس من أمتي الخمر . يسمونها بغير اسمها . يعزف على رءوسهم بالمعازف والمغنيات يخسف الله بهم الأرض . ويجعل منهم القردة والخنازير (سنن ابن ماجه، رقم-4020
প্রশ্নোত্তর
হ্যাঁ। কুরআন ও সহীহ হাদীসে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অসার বাক্য ক্রয় করে, যাতে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করতে পারে…”
— সূরা লুকমান : ৬
অনেক সাহাবী ও তাফসীরকার “অসার বাক্য” দ্বারা গান-বাজনাকে বুঝিয়েছেন।
কারণ গান-বাজনা মানুষের অন্তরে গাফলতি সৃষ্টি করে, কামনা-বাসনা বাড়ায় এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে নামায, কুরআন ও ইবাদতের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়।
কারণ অধিকাংশ গান প্রেম, অশ্লীলতা ও অবৈধ সম্পর্ককে উসকে দেয়। এগুলো মানুষের অন্তরে কু-প্রবৃত্তি ও হারাম আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“আমার উম্মতের কিছু লোক ব্যভিচার, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।”
— সহীহ বুখারী : ৫৫৯০
এ হাদীসে বাদ্যযন্ত্রকে বড় গুনাহর সাথে উল্লেখ করা হয়েছে।
না। সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত, আযান বা শরীয়তসম্মত নাশীদ বৈধ। হারাম হলো অশ্লীল, গাফলতিমূলক ও বাদ্যযন্ত্রসংবলিত গান-বাজনা।
না। এটি একটি ভিত্তিহীন ধারণা। হযরত দাউদ (আ.)-এর কণ্ঠ অত্যন্ত সুমধুর ছিল এবং তিনি সুন্দর সুরে যবুর তিলাওয়াত করতেন; তিনি বাঁশীবাদক ছিলেন না।
1. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা
2. আল্লাহর যিকিরে অভ্যস্ত হওয়া
3. নেককার বন্ধু নির্বাচন করা
4. মোবাইল ও মিডিয়ার অপব্যবহার কমানো
5. ইসলামী আলোচনা ও নাশীদ শোনা
6. আল্লাহর কাছে হেদায়াত চাওয়া
উপসংহাড়
অনেকের ধারণা যে, ‘গান হল রূহের খোরাক। দুশ্চিন্তা ও কষ্টের সময় জ্বালাময় হৃদয়ের পোড়া-ঘায়ের মলম!
অথচ প্রকৃতপ্রস্তাবে গান হল, ‘প্রেম-পীড়িত’ রূহের খোরাক। কারণ, প্রেমে থাকে মাদকতা। বনের ময়ুর নাচার মত হৃদয়ের মঞ্চে প্রেমের রুনুঝুনু নাচ আছে। আর সে নাচের সাথে তাল মিলায় ঐ গান-বাজনা। তাছাড়া অবৈধ প্রেম ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে শয়তান। তাই শয়তানের বাণীর মাঝেই পিরীতের জ্বালাময় অন্তরে মিঠাপানির আস্বাদ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে কুরআন হল রহমানের বাণী। আর তা হল মুসলিম রূহের একমাত্র খোরাক। বিরহ বেদনাহত বহু যুবক, যাদের স্ত্রী (কাছে) নেই, অনুরূপ বহু যুবতী, যাদের স্বামী (কাছে) নেই, তারা গান-বাজনা শুনে (অনেকে বা গেয়ে-বাজিয়ে) মনকে ‘ফ্রি’, স্থির ও সানিত করতে চায়। এরা কিন্তু আসলে মনের তাপকে গানের আগুন দিয়ে ঠান্ডা করতে চায়। যার ফলে সেই তাপ আরো বৃদ্ধি পায়।
কারণ, অধিকাংশ গান হল প্রেমমূলক; প্রেমকাহিনী, প্রেম-মিলন, বিরহ-বেদনা, মিলন-আবেদন, নারী-সৌন্দর্য প্রভৃতি যৌনজীবনের গাথা কথাই গানে গাওয়া হয়ে থাকে। যা শুনে যৌনক্ষুধা আরো বেড়ে যায়। ছাই-চাপা প্রেমের আগুন গানের বাতাসে গল্প করে জ্বলে উঠে ফিনকি উড়াতে শুরু করে। আর তখনই মন চুরি করে গোপনে স্বামী বা স্ত্রীর খেয়ানত করে বসে অথবা করতে চায়! মনের জ্বালা মিটাবার জন্য দুরের বন্ধুর প্রতীক্ষা করতে আর ধৈর্য থাকে না।
বলা বাহুল্য, এ জন্যই সুবিজ্ঞ সাহাবী বলেন, ‘গান হল ব্যভিচারের মন্ত্র। অতএব গানে কক্ষনই মন সানিত হয় না; বরং আরো বিক্ষিপ্ত, চিন্তিত ও উত্তেজিত হয়। দগ্ধ, অস্থির ও ব্যাকুল মনকে শান্ত ও স্থির করতে হলে মনের সৃষ্টিকর্তার প্রেকিশন’ নিতে হবে। তিনি বলেন, “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকরে (স্মরণে) প্রশান্ত থাকে। আর জেনে রাখ, আল্লাহর যিকরেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।” (সূরা রা’দ ২৮ আয়াত)
পক্ষান্তরে যারা এর বিপরীত কাজ করে, তাদের ফলও হয় উল্ট। মহান আল্লাহ সে কথাও বলেন যে, “যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর যিকর (স্মরণে) বিমুখ হয়, তিনি তার জন্য নিয়োজিত করেন এক শয়তানকে। অতঃপর সেই হয় তার সহচর। শয়তানরাই মানুষকে সৎপথ হতে বিরত রাখে, অথচ মানুষ মনে করে তারা সৎপথে পরিচালিত হচ্ছে। যখন সে আমার নিকট উপস্থিত হবে, তখন সে শয়তানকে বলবে, ‘হায়! আমার ও তোমার মাঝে যদি পুর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধান হত! কত নিকৃষ্ট সে সহচর।” (সূরা যুখরুফ ৩৬-৩৮ আয়াত)