ইসলাম

জিহাদ নিয়ে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি কোনোটাই কাম্য নয়

জিহাদ মজলুম ও অবহেলিত এক ফরজ বিধান, কাছের-দূরের সবার কাছেই এক আতঙ্কের নাম। মুসলিম-অমুসলিম সবাই যাকে ভিন্ন চোখে দেখে, এর পক্ষে কেউ বলতে যাবে কোন সাধে?

কাফের-মুশরিকরা এটাকে সন্ত্রাস বলে প্রচার করেছে, কতিপয় মুসলিমরা জঙ্গীবাদও উগ্রবাদ নামে আখ্যায়িত করেছে, আর সাধারণ মানুষও সেটাই বুঝে নিয়েছে!

এ ছাড়া কতিপয় সালাফী, রাজনৈতিক ইসলামী দলের শায়খ ও কিছু তাবলীগী ভাই এতে তাহরীফ ও বিকৃতি করে সীমালঙ্ঘন করছে। এবং জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর সাথে দ্বীনের অন্যান্য শাখার চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে গুলিয়ে ফেলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

কেউ এর ফরজ হওয়ার শর্ত না পেয়ে খোদ বিধানটাকেই অস্বীকার করে বসছে। আবার কেউ এ ভেবে অস্বীকার করছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন রহমতের নবী, যোদ্ধার নবী নয়।

কিছু লোক বলছে, মনের জিহাদই বড় জিহাদ। আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে একটি রাজনৈতিক দল ‘আমীরুল মুজাহিদীন’ পরিভাষাটা নিজেদের দলীয় আমীরের উপাধি বানিয়ে নিয়েছে! বস্তুত এ সবই অজ্ঞতা বা ভ্রষ্টতা!

সহীহ মুসলিমের হাদীসে আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে, জীবদ্দশায় সে না কখনো জিহাদ করেছে, আর না জিহাদের তামান্না রেখেছে, সে যেন মুনাফিক হয়ে মারা গেল।(মুসলিম,হাদীস নং,১৯১০)’

মোল্লা আলী কারী রাহ. (মৃ. ১০১৪ হি.) হাদীসটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে, যে লোক জিহাদের জন্য দৃঢ় সংকল্প করেনি এবং এ কথাও বলেনি যে, ‘হায় যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে পারতাম!’… এরূপ ব্যক্তি মারা গেলে সে মুনাফিক এবং জিহাদ থেকে পিছপা গ্রহণকারী হিসেবে মরবে। কারণ, যে ব্যক্তি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদের মধ্যে গণ্য হবে।

অতএব প্রত্যেক মুমিনের উচিত জিহাদের নিয়ত করা, চাই জিহাদ ফরজে কিফায়া হোক কিংবা ফরজে আইন।

হযরত উমর রাযি. দুআয় বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদাতের মর্যাদা নসীব করুন।(বুখারী, হাদীস নং,১৮৯০,) হে আল্লাহ, আমাদেরও মুজাহিদদের কাতারে শামিল করুন এবং আপনার রাস্তায় শাহাদাতের মওত নসীব করুন! আমীন।

বলাবাহুল্য, কিছু সন্ত্রাসী জিহাদের নামে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করে বেড়ায়; বরং বোমাবাজি, ভাঙচুর ও মানুষের ক্ষতি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

আবার কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তি ও দল রয়েছে, যারা জিহাদ ও তাওহীদুল হাকিমিয়া তথা রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকেই ‘মূল ইসলাম’ বানিয়ে নিয়েছে। নামাজ- রোযাসহ সবকিছুর ওপরে বিষয়দ্বয়কে স্থান দিয়েছে।

অথচ বিষয়দ্বয় ইসলামের অন্যান্য ফরজের মতো ফরজ। এমনকি জিহাদের স্থান ও ইসলামের পঞ্চ বুনিয়াদের পর, যা অনেক ইমাম সুস্পষ্ট করে বলেছেন।

এভাবে কিছু বক্তা ও লেখক সাধারণ মুসলিম ও যুবকদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভুল প্রক্রিয়ায় জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে কিংবা অনুপযুক্ত পন্থায় দীক্ষিত করে।

এমনকি তাদের কেউ কেউ দ্বীনের অন্যান্য অঙ্গনে মশগুল ব্যক্তিদের সঠিক পথে নেই মনে করে কিংবা আহলে ইলম ও বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি করে এবং তাঁদের গোমরাহ, বরং ‘তাগূতের দালাল’ পর্যন্ত বলে!

তারা এর স্বপক্ষে বুখারী-মুসলিমের নিম্নোক্ত হাদীস ‘সর্বদা আমার উম্মতের একটি দল হকের ওপর জয়ী থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের বিরোধিতাকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’ পেশ করে বলে, এখানে একটি দল থেকে ‘মুজাহিদগণ’ উদ্দেশ্য।

অথচ ইমান বুখারী রাহ, ‘সহীহ বুখারী’ তে এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আহলে ইলম’ উদ্দেশ্য। ইবনুল মুবারক ও ইমাম আহমদ বাহ, বলেছেন, ‘মুহাদ্দিসগণ’ উদ্দেশ্য।

তবে ইমাম নববী রাহ. (মৃ.৬৭৬ হি.) যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা সবচেয়ে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য। তিনি মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন, ‘হতে পারে উক্ত দল মুমিনদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিক্ষিপ্ত। যাদের কেউ মুজাহিদ, কেউ ফকীহ, কেউ মুহাদ্দিস, কেউ পীর-দরবেশ, কেউ তাবলীগী বা সৎ কাজের আদেশকারী ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধকারী কিংবা অন্য কোনো ভালো কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তি।

কেননা, প্রত্যেক শ্রেণি দ্বারা দ্বীনের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকার হচ্ছে এবং সবারই মূল উদ্দেশ্য হলো, দ্বীনের সংরক্ষণ করা। আর এই সংরক্ষণে সবারই কম-কোন ভূমিকা ও অবদান রয়েছে।

কাজেই আমিই হক পথে আছি এবং আমার কাজই সঠিক না বলে, বরং বলুন, আমিও হক পথে আছি এবং আমার কাজও সঠিক।

কেননা, আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত তথা যাদের আকীদা ও মানহাজ ঠিক আছে, তারা দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় খেদমত করছেন। কেউ শিক্ষা-দীক্ষায় কর্মরত, কেউ ওয়াজ- নসীহত নিয়ে অতিব্যস্ত, কেউ লেখালেখিতে সিদ্ধহস্ত, কেউ দাওয়াত-তাবলীগে আসক্ত, কেউ শাহাদাতের নেশায় জিহাদরত।

এগুলো সবই ইসলাম নামক গাছের এক-একটি শিকড়, যেগুলোর ভূমিকা ও অবদানে গাছটি বেঁচে আছে এবং ফল দিয়ে যাচ্ছে। এগুলো সবই দ্বীন নামক ইমারতের ইট, বালি ও সিমেন্ট, যা দিয়ে ইমারতটি তৈরি হয়েছে এবং সুন্দরভাবে বসবাস করতে ভূমিকা রাখছে।

সুতরাং দ্বীনের অন্যান্য ভালো কাজ যেমন প্রকৃত জিহাদ নয়, তেমনইভাবে জিহাদই একমাত্র ইসলাম নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহাদ নিয়ে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি থেকে হেফাজত করুন।

তথ্য সূত্রঃ

কিতাবঃ ঈমান – আকিদা ১

লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

এই ব্লগটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

খুশি
0
আরও উন্নত হতে পারে
0

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *