প্রসঙ্গ : আল্লাহ কোথায়?
প্রশ্ন :
হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীর দাসীকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘আয়নাল্লাহ’ তথা ‘আল্লাহ কোথায়?’ দাসী মহিলাটি উত্তরে বলল, ‘আল্লাহ আসমানে’। এ হাদীস থেকে প্রমাণ হয়, ‘আল্লাহ তাআলা আসমানে’ থাকেন। তিনি যদি আসমানে না থাকেন, তাহলে উক্ত দাসী এ উত্তর দিল কেন? আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মেনে নিলেন কেন?
উত্তর :
প্রথমত : এটি ‘হাদীসুল জারিয়াহ’ নামে পরিচিত, এটি অনেক বড় হাদীস। মুসলিম শরীফে হাদিসটির শেষে এভাবে এসেছে, দাসীর মালিক সাহাবী তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন,“ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি তাকে আযাদ করে দেবো? তিনি বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি নিয়ে এলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আল্লাহ আসমানে আছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন, তাকে আযাদ করে দাও। কারণ, সে মুমিন।’
সনদের দিক থেকে এ হাদীস সহীহ হলেও এর মতন ও পাঠ বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে।
বিশেষত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাসীকে কী প্রশ্ন করেছিলেন—এটি ইবনে হাজার রাহ.-ও বলেছেন।
বিভিন্ন বর্ণনায় কয়েকভাবে এসেছে, সেখান থেকে একটি বর্ণনা আপনাদের সামনে পেশ করছি। ইমাম আবদুর রাযযাক সানআনী রাহ. (মৃ. ২১১ হি.) ও তাঁর থেকে ইমাম আহমদ রাহ. (মৃ. ২৪১ হি.) সহীহ সনদে বর্ণনা করেন,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাসীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এ সাক্ষী দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই?” সে বলল, “হ্যাঁ।” এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি সাক্ষী দাও যে, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম?” সে বলল, “হ্যাঁ।
ইবনে কাসীর রাহ. তাঁর ‘তাফসীরে’ (২/৩৩১) বলেন, ‘এর সনদ সহীহ।’
এ বর্ণনায় পেলাম যে, তাকে ‘আল্লাহ কোথায়?’ এটা জিজ্ঞাসা করেননি।
তা ছাড়া ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও ইবনে হিব্বান রাহ.-সহ অন্য একটি ঘটনার হাদীস বর্ণনা করেছেন। এতেও দাসীকে প্রশ্ন করার শব্দ হলো, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাসীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার রব কে?” সে বলল, “আল্লাহ।
এ হাদীসেও পেলাম যে, তাকে ‘আল্লাহ কোথায়?’ এটা জিজ্ঞাসা করেননি; বরং ‘তার রব কে?” জিজ্ঞাসা করেছেন। এটি আবার কবরের প্রসিদ্ধ তিন প্রশ্নের প্রথমটির সাথে হুবহু মিল।
সুতরাং ‘আল্লাহ কোথায়?’—এটাই জিজ্ঞাসা করেছেন দৃঢ়ভাবে বলার সুযোগ নেই।
এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মূল উদ্দেশ্য ছিল, দাসীর ঈমান পরীক্ষা করা।
অথচ ইসলামে স্বীকৃত বিষয় হলো, ঈমানের পরীক্ষা হয় ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বা কালেমার সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে, যা এখানে পাওয়া যায়নি। বুখারী-মুসলিমের প্রসিদ্ধ হাদীসে আছে, ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি, তন্মধ্যে প্রথম হলো, কালেমার সাক্ষ্যদান।’ বুখারীর অন্য হাদীসে এসেছে, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআয বিন জাবাল রাযি.-কে ইয়ামান প্রেরণকালে বলেন, “প্রথমে কালেমার সাক্ষ্যদানের দাওয়াত দেবে।”” বুখারী-মুসলিমের আরেক হাদীসে রয়েছে, ‘আমি লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, তারা কালেমার সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত।’ এ ধরনের আরও হাদীস আছে।
অথচ এ বর্ণনাটি ছাড়া অন্য কোনো হাদীসে ‘আল্লাহ আসমানে’ থাকার সাক্ষ্যদানের কথা বলেননি। তাও আবার এটি সব বর্ণনায় নেই।
তা ছাড়া লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে কারও থেকে জানা যায় না যে, ‘আয়নাল্লাহ’ বা ‘আল্লাহ কোথায়?’ বলে কারও ঈমান পরীক্ষা করেছেন কিংবা আকীদা শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ সালাফী বন্ধুরা এটাকেই আকীদার অন্যতম প্রধান বিষয় বানিয়ে নিয়েছেন! মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী রাহ. বলেন, ‘সৌদি সালাফীদের নিকট মূল আকীদা হলো, আল্লাহকে আরশের ওপর বসে আছেন মানতে হবে, তাহলে তুমি মুসলিম; অন্যথায় মুসলিম নও।
সারকথা, ‘আল্লাহ কোথায়?’ এমন শব্দ বলে দাসীকে জিজ্ঞাসা করাটা যেমন অকাট্য নয়, আবার ইসলামে ঈমানের পরীক্ষার এটা স্বীকৃত বিষয়ও নয়।
দ্বিতীয়ত : ইমামগণ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় কী বলেছেন, তা দেখুন।
ইমাম খাত্তাবী রাহ. (মৃ. ৩৮৮ হি.) হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন,“আয়নাল্লাহ’ বা ‘আল্লাহ কোথায়?” বলে ঈমানের আলামত ও আহলে ঈমানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা আসল ঈমান ও হাকীকতে ঈমান সম্পর্কে প্রশ্ন নয়। যদি কোনো কাফের আমাদের কাছে এসে কুফর থেকে ইসলামে প্রবেশ করতে চায় আর ওই দাসীর মতো ঈমানের বিবরণ দেয়, তাহলে সে কখনো মুসলমান হবে না, যতক্ষণ না ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র সাক্ষ্য দেবে এবং পূর্বের ধর্ম থেকে সম্পর্কহীন হবে।
ইবনুল জাওযী হাম্বলী রাহ.-ও (মৃ. ৩৮৮ হি.) একই কথা বলেছেন।
মুহাদ্দিস ইমাম কুরতুবী মালেকী রাহ. (মৃ. ৬৫৬ হি.) বলেন, ‘“আল্লাহ কোথায়?” প্রশ্নটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাসীর বুঝ অনুসারে করেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, দাসী থেকে এটার প্রমাণ গ্রহণ করা যে, সে জমিনের মূর্তি ও পাথরপূজারীদের মধ্য থেকে নয়। আর সেও ঠিক ওই জবাবটি দিয়েছে। ‘আয়না’ বা ‘কোথায়’ শব্দটি (আরবী ভাষায়) কোনো স্থান সম্পর্কে জানতে বলা হয়। ফলত আল্লাহর ক্ষেত্রে এর প্রকৃত অর্থের ব্যবহার শুদ্ধ নয়। কেননা, তিনি ‘সময়’-এর মতো ‘স্থান’ থেকেও পবিত্র; বরং তিনি নিজেই এসবের স্রষ্টা। তিনি তো সেই সময়ও ছিলেন, যখন সময়-স্থান বলতে কিছুই ছিল না। আর তিনি এখনো তেমনই আছেন, পূর্বে যেমন ছিলেন। কাজেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাসী সম্পর্কে এটা জানা উদ্দেশ্য ছিল যে, তার মাবুদ জমিনের মূর্তি কি না? ফলে তাকে এ বলে জিজ্ঞাসা করলেন যে, “আল্লাহ কোথায়?” সে উত্তরে বলল, “আল্লাহ আসমানে।” আর এতেই তিনি সন্দেহমুক্ত হলেন এবং উক্ত দাসীকে মুমিন সাব্যস্ত করলেন।
প্রসিদ্ধ মুফাসসির ইমাম কুরতুবী মালেকী রাহ. (মৃ. ৬৭১ হি.) তাঁর শায়খ মুহাদ্দিস কুরতুবী থেকে এটি নকল করার পর লেখেন, ‘(মুহাদ্দিস কুরতুবী) বলেছেন, এই হাদীস সম্পর্কে মুহাক্কিকদের মত এটা। (মুফাসসির) কুরতুবী বলেন, এটাই এ বিষয়ে সহীহ কথা।
হাদীস-ব্যাখ্যাকার ইমাম মুযহিরী হানাফী রাহ. (মৃ. ৭২৭ হি.) বলেন, ‘যদি উক্ত দাসী মুশরিক হতো, তাহলে সে শহর বা গোত্রের মূর্তির প্রতি ইশারা করত। আর এতে তার কুফর প্রকাশ পেত।’
এ ছাড়া ইমাম বায়হাকী, মাযেরী, ইবনুল আরবী, কাযী ইয়ায, নববী, বায়যাবী, তীবী, ইবনে রাসালান, আইনী, সুয়ূতী, মোল্লা আলী কারী, আব্দুল হক দেহলবী, আমীর ছানআনী রাহ.-সহ অনেক ইমাম এ ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ইমাম নববী রাহ. (মৃ. ৬৭৬ হি.) বলেন,‘এই হাদীস সিফাত-সংক্রান্ত হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। সিফাতের ব্যাপারে দুটি মাযহাব রয়েছে। একটি (তথা তাফবীয) হলো, এর অর্থ নিয়ে নিমগ্ন না হয়ে ঈমান রাখা। সাথে এ আকীদা রাখা যে, আল্লাহ তাআলার মতো কোনো কিছুই নেই এবং তিনি সৃষ্টির সকল সাদৃশ্য থেকে পবিত্র।
দ্বিতীয় মত হলো, আল্লাহর সত্তার উপযোগী এর তাবীল বা ব্যাখ্যা করা।
তৃতীয়ত : সালাফী বন্ধুরা আল্লাহ তাআলা আসমান বা আরশে থাকা বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর বক্তব্য পেশ করেন। তাই এ বিষয়ে তাঁর একটি বক্তব্য উল্লেখ করছি। আবু মুতী’ বলখী বলেন, আমি (ইমাম আবু হানীফাকে) বললাম,‘আচ্ছা বলুন তো, যদি প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহ কোথায়?
তিনি (আবু হানীফা রাহ.) বললেন, উত্তরে বলা হবে, আল্লাহ তাআলা তখন ছিলেন, যখন কোনো ‘স্থান’ ছিল না। গোটা সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার আগেও তিনি ছিলেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা তখন ছিলেন, যখন ‘আয়না’ বা ‘কোথায়’ (বলার মতো কিছু) ছিল না এবং ‘সৃষ্টি’ ও ‘বস্তু’ কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, তিনি সবকিছুর স্রষ্টা। এখানে তাঁকে স্থান থেকে মুক্ত বলেছেন।
একই কথা ইমাম আবু মানসুর মাতুরীদী রাহ.-ও বলেছেন। তিনি লেখেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ছিলেন, যখন কোনো স্থান ছিল না। আর সকল স্থান ধ্বংস হওয়া সম্ভব। (কিন্তু) তাঁর বিদ্যমানতা আগের মতোই থাকবে। কাজেই তিনি আগের মতোই (স্থানবিহীন) আছেন এবং বর্তমান যেভাবে আছেন, সেভাবে (আগেও) ছিলেন। তিনি সকল পরিবর্তন ও ধ্বংস ইত্যাদি হওয়া থেকে অতিপবিত্র।
ইমাম তাহাবী রাহ. (মৃ. ৩২১ হি.) তাঁর বিখ্যাত ‘আকীদা’ গ্রন্থ, যা তিনি ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহ.-এর মাসলাক অনুসারে সংকলন করেছেন, তাতে বলেন, ‘আল্লাহ তাআলাকে জগতের ছয় দিক থেকে কোনো দিক বেষ্টন করতে পারে না, যেভাবে সৃষ্টবস্তুসমূহকে বেষ্টন করে।’
এ কারণেই সৃষ্টি ও মানুষের বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং সাদৃশ্যের দৃশ্যমান দিকগুলো স্রষ্টা থেকে নাকচ করা ও অস্বীকার করা আকীদায়ে তাওহীদের অপরিহার্য অংশ।
ইমাম আহমদ রাহ. (মৃ. ২৪১ হি.)-এরও একই আকীদা ছিল, ‘তিনি ছিলেন, যখন কোনো স্থান ছিল না। এরপর তিনি স্থান সৃষ্টি করেছেন, আর তিনি এভাবেই আছেন, যেভাবে স্থান সৃষ্টি করার পূর্বে ছিলেন।
এ ধরনের বক্তব্য শুধু এ কয়েকজন ইমাম নয়; বরং আরও অনেকেই সুস্পষ্টভাবে দিয়েছেন। যেমন : ইমাম আবুল হাসান আশআরী, আবু বকর বাকিল্লানী, আবদুল কাহের বাগদাদী, ইবনে বাত্তাল, আবু বকর শীরাযী, গাযালী, আবু বকর কাসানী, মুহাদ্দিস ও মুফাসসির দুই কুরতুবী, ইবনুল মুনায়ির, নাসাফী, বদরুদ্দীন ইবনে জামাআহ, ইবনে রাসালান ও আবদুল বাকী মাওয়াহিবী হাম্বলী রাহ. প্রমুখ।
তথ্য সূত্রঃ
কিতাবঃ ঈমান – আকিদা
লেখকঃ মাওলানা সাঈদ আহমদ উস্তাদঃ দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম